আজ থেকে ৪১ বছর আগে ১৯৮৫ সালের ৮ই মে সরস্বতী চিত্রমের ব্যানারে মুক্তি পেয়েছিল তপন সিনহা পরিচালিত বিখ্যাত বাংলা রহস্য চলচ্চিত্র ‘বৈদুর্য রহস্য’। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্পের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সিনেমাটি অনেকেরই দেখা।
একটি দ্বীপে অবস্থিত বিখ্যাত কৃষ্ণমন্দির থেকে চুরি হয়ে যায় দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী, অত্যন্ত মূল্যবান ‘বৈদুর্য মণি’। মণিটি ৮ লক্ষ টাকার বিমাকৃত থাকায়, বিমা কোম্পানি হিন্দুস্থান ডিটেকটিভ এজেন্সিকে তদন্তের ভার দেয়। ডিটেকটিভ এজেন্সির প্রধান মদন বোস তাঁর সহকারীকে নিয়ে মন্দিরের মহন্ত মহারাজের সাথে দেখা করতে যান। একই সময়ে, দুই তরুণী ছদ্মবেশে ভক্ত হিসেবে মন্দিরে প্রবেশ করে এবং গোপনে তদন্ত শুরু করে। মন্দিরের আশেপাশের সন্দেহভাজন মানুষজন, পুরোহিত নিত্যানন্দ এবং ট্রাস্টি সিং জি-এর মধ্যে ঘটনাটি আবর্তিত হয়। রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন মন্দিরের বৃদ্ধ মালী চরণদাসকে রাতে মুখোশধারী কেউ নির্মমভাবে হত্যা করে।
পুলিশ এবং বেসরকারি গোয়েন্দা দল সমান্তরালভাবে তদন্ত চালিয়ে অবশেষে চুরির রহস্য উদ্ঘাটন করে। শুধু চুরি নয়, মন্দিরে আগে ঘটা আরেকটি খুনের রহস্যও বেরিয়ে আসে এবং দোষী ব্যক্তিকে শনাক্ত করে মণিটি উদ্ধার করা হয়।এই সিনেমাটি টানটান উত্তেজনা এবং চমৎকার রহস্যের জন্য পরিচিত।
বিখ্যাত পরিচালক তপন সিনহা সিনেমাটির পরিচালনা, চিত্রনাট্য এবং সঙ্গীত পরিচালনা — তিনটিই করেছিলেন। এই ছবিতে প্রধান ডিটেকটিভের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মুনমুন সেন এবং তার সাথে ছিলেন আল্পনা গোস্বামী। এছাড়া তাপস পাল, বসন্ত চৌধুরী, মনোজ মিত্রের মতো শক্তিশালী অভিনেতারা ছিলেন। বসন্ত চৌধুরীর দ্বৈত ভূমিকা দর্শকদের নজর কেড়েছিল। বাংলা চলচ্চিত্রে পুরুষ গোয়েন্দাদের ভিড়ে এটি একটি ব্যতিক্রমি নারী-কেন্দ্রিক গোয়েন্দা গল্প ছিল। অনেকেই এটিকে খুব প্রিয় একটি সিনেমা হিসেবে গণ্য করেন। এই ছবির জন্য অরুন্ধতী দেবী HMV-এর জন্য গান রেকর্ড করেছিলেন।

আজগৈবীনাথ মন্দির
সিনেমাটির শুটিং বিহারের (বর্তমান ঝাড়খণ্ড) ভাগলপুরের কাছে কাহালগাঁও এবং ঐতিহাসিক বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হয়েছিল। এই দ্বীপের মতো জায়গায় ছড়িয়ে থাকা বড় বড় পাথর এবং প্রকৃতির মাঝে রহস্যময় পরিবেশ শুটিংয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল।
রহস্য রোমাঞ্চ চলচ্চিত্র “বৈদূর্য রহস্য”-এর শুটিংয়ের গল্প বেশ আকর্ষণীয়। অভিনেতা মনোজ মিত্র তার একটি লেখায় বৈদূর্য রহস্যের ছবি শুটিং এর একটি মজার গল্প বলেছিলেন।
এই ছবিতে মনোজ মিত্র ছিলেন গোয়েন্দা সংস্থা বা ডিটেকটিভ এজেন্সির প্রধান মদন বোস হিসেবে। বৈষ্ণব মন্দিরে মহামূল্যবান হার চুরির তদন্তে চলেছে গোয়েন্দারা টুরিস্ট বাসে চড়ে। সহযাত্রীদের মধ্যে দুই অষ্টদশীকে পেয়ে মনোজ মিত্রের বকবকানি শুরু হল। লেবু ছাড়িয়ে কোয়া চুষছে, আড়চোখে মেয়ে দুটিকে দেখছে আর রাধা কৃষ্ণ সম্পর্ক নিয়ে টক-ঝাল টিপ্পনি কাটছে। প্রায় একপাতা সংলাপ সঙ্গে এককলি গান।
ঠিক হলো পুরোটা একসাথে ক্যামেরা বন্দি করা হবে। ক্যামেরা চালুও হলো। বাসটা যেই চলতে শুরু করল, তখনই মালুম হল স্টুডিওর ঘরে বসে রিহার্সাল আর বিহারের সুলতানগঞ্জের রাস্তায় চলন্ত বাসে শর্ট দেওয়ার মধ্যে কতটা ফারাক। মুহুর্মুহুর ঝাঁকুনিতে রিহার্সাল করে তৈরি থাকা সংলাপের কমা, ফুলস্টপ, পাংচুয়েশন, পজ সব ক্যারামবোর্ডের ঘুঁটির মতো এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করল। যখন যেদিকে তাকাবার কথা নয় সেদিকে লক্ষ্য চলে গেল। হাসির কথা নয় তবুও বাসের ঝাঁকুনিতে হাসি বেরিয়ে এলো। তাকানো যেদিকে উচিত ঠিক তার উল্টোদিকে তাকানো হল। গানের কথা তো বাদ দেওয়াই হল। মনোজ মিত্রের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যে ডায়লগ থ্রয়িং সেটাও আর বলা হলো না।
শট শেষ হতেই মুখ কালো করে মনোজ মিত্র ছুটলেন পরিচালকের কাছে আর একবার শর্ট নেওয়ার জন্য। তখন তপন সিংহ মিষ্টি গলায় বললেন — বাসটা কিন্তু আবারো দুলবে এবং নতুন নতুন জায়গায় ঝাঁকুনি খাবে। আপনি কোন ভাবেই রিহার্সালের সঙ্গে মেলাতে পারবেন না।
মনোজ মিত্র — তাহলে?
তপন সিংহ — আপনি চরিত্রটি ভুলে গিয়ে সংলাপের প্রেমে পড়েছেন। লাইনগুলোকেই চাইনা আমি, মানুষটিকে চাই। চলন্ত বাসে যেটা ঘটতে পারে তাই ঘটেছে। ও নিয়ে আর না ভেবে আসুন আমরা পরের শট নিয়ে আলোচনা করি।
আরো বললেন, — থিয়েটারে আপনাদের সবকিছু নিশ্চিত প্রত্যাশার মতো ঘটে। কিন্তু সিনেমায় অনেকটাই অনিশ্চিত থাকতে পারে। অভিনব পরিস্থিতিতে নিজেকে প্রয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। সিনেমায় অভিনয় তাই অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
‘বৈদুর্য রহস্য’-এ তপন সিংহ একজন দক্ষ পরিচালক হিসেবে তাঁর মুনশিয়ানা দেখিয়ে ছিলেন। তপন সিংহ তাঁর স্বভাবজাত ভঙ্গিতে গল্পের রহস্যকে এমন ভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন যে দর্শকরা সিনেমার শেষ পর্যন্ত রহস্যের মধ্যে ছিলেন।এই ছবিতে তাপস পাল-এর মতো জনপ্রিয় অভিনেতাকে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করান, যা তৎকালীন দর্শকদের কাছে ছবিটিকে জনপ্রিয় করেছিল।

আজগৈবীনাথ মন্দির
জানলে অবাক হবেন, বিহারের সুলতানগঞ্জের কাছে যে ঐতিহাসিক মন্দিরে “বৈদুর্য রহস্য”-এর শুটিং হয়েছিল, সেটি হলো আজগৈবীনাথ মন্দির (Ajgaibinath Temple)। এই মন্দিরটি গঙ্গা নদীর মাঝে একটি পাথুরে দ্বীপে অবস্থিত। সুলতানগঞ্জে গঙ্গা থেকে নৌকায় করে এই মন্দিরে পৌঁছাতে হয়। এটি শিবের অত্যন্ত পবিত্র ও প্রাচীন ‘স্বয়ম্ভু’ মন্দির। অনেকেই এই স্থানটিকে ভুল করে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের মন্দির বলে মনে করেন, কিন্তু সিনেমার মন্দিরটি বিহারের সুলতানগঞ্জের আজগৈবীনাথ মন্দির।
এখানে গঙ্গা উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়, যা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।বিশ্বাস করা হয়, ভগবান শিব এখানে তাঁর ‘আজগভ’ নামক ধনুকটি ধারণ করেছিলেন, তাই এই স্থানের নাম আজগৈবীনাথ। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী,এটি ঋষি জাহ্নুর আশ্রমের স্থান হিসেবে পরিচিত, যিনি গঙ্গা নদীকে পান করেছিলেন এবং পরে ভাগীরথের অনুরোধে উরু চিরে মুক্ত করে দেন। এজন্য গঙ্গার নাম জাহ্নবী। এই মন্দিরটি কালাপাহাড় ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে লোককথা প্রচলিত আছে।
প্রতি বছর জুলাই-আগস্ট মাসে অর্থ্যৎ শ্রাবণ মাসে এখানে লাখ লাখ ভক্ত (কাওয়ারিয়া) সমবেত হন। তারা সুলতানগঞ্জের উত্তরবাহিনী গঙ্গা থেকে পবিত্র জল নিয়ে প্রায় ১০৪ কিমি পথ হেঁটে দেওঘরের বাবা বৈদ্যনাথ ধামে শিবলিঙ্গ পূজা করতে যান।
আপনি যদি এই মন্দির দর্শন করতে চান তবে জানিয়ে রাখি, কলকাতা থেকে সুলতানগঞ্জ স্টেশন পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন পাওয়া যায়। সাধারণত হাওড়া-গয়া বা শিয়ালদহ থেকে রাধিকাপুর এক্সপ্রেসের মতো ট্রেন সুলতানগঞ্জে থামে। ট্রেন থেকে নেমে অটো বা রিকশা নিয়ে সহজেই মন্দিরে পৌঁছানো যায়।স্টেশন থেকে মন্দির খুব কাছে।
যারা ক্লাসিক বাংলা সিনেমা পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার নস্টালজিক অভিজ্ঞতা। যদিও আধুনিক দর্শকদের কাছে কিছু পুরনো সিনেমা খুব ধীরগতির বা পুরনো প্রযুক্তির মনে হতে পারে, তবুও তপন সিনহার মতো পরিচালকের কাজের যে একটি স্বতন্ত্র শৈলী আছে, তা এই চলচ্চিত্রটি দেখলে বোঝা যায়।