‘জুটি’ শব্দটি ভারি অদ্ভুত। প্রেম, বিবাহে এই শব্দের যেমন ব্যবহার, তেমনি খুব বন্ধু দুজনকে বোঝাতেও এই ‘জুটি’ শব্দের ব্যবহার হয়। আবার গায়ক ও বাদকের জুটি কিংবা চলচ্চিত্রে নায়ক নায়িকার জুটি। এখন তো নায়ক এবং খলনায়ককেও জুটি বলা হয়। তবে একথা সত্য যে ঠিকঠাক সঙ্গত না হলে জুটি কখনো বেশিদিন টেকে না। জোর করে জোড়াতালি দিয়ে জুটি ধরে রাখতে হলে কিছুদিনের মধ্যেই চিড়ের দাগ লক্ষ্য করা যায়। আর ঠিকঠাক সঙ্গত হলে সেই জোড় রাজজোটক হয়। যেমন গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মান্না দে’র জুটি। এই জুটি যদি না বাঁধত তবে বাঙালি যে কত অসাধারণ গান থেকে বঞ্চিত হতেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
হাওড়ার সালকিয়ায় ১৯৩১ সালে ২রা মে জন্ম পুলকের আর ১৯১৯ সালে ১লা মে জন্ম মান্না দে’র। এক মাসে একটি দিনের হেরফের জন্মতারিখেও। মান্না দে কলকাতা আর পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় হাওড়ার। দুজনেই স্কটিশ চার্চ কলেজের স্নাতক। কলেজে থাকাকালীন দুজনেরই সঙ্গীতের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক নিবিড় হয়। দুজনের পরিবারেই নাটক, সাহিত্য ও সঙ্গীতের পরিবেশ ছিল, যার ফলে ছোট থেকেই উভয়েই সঙ্গীত মনেপ্রাণে ধারণ করেছিলেন। মান্না দে কলেজে বন্ধুদের গান শুনিয়ে মাতিয়ে রাখতেন। তিনি গান শিখতেন নিজের ছোটকাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে এবং উস্তাদ দাবির খানের কাছে। আন্তঃকলেজ গানের প্রতিযোগিতায় তিনি ধারাবাহিকভাবে পরপর তিন বছর তিনটি আলাদা শ্রেণীবিভাগে প্রথম হয়েছিলেন। অন্যদিকে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় মাত্র সতেরো বছর বয়সে চলচ্চিত্র পরিচালক সরোজ মুখোপাধ্যায়ের ‘অভিমান’ ছবিতে প্রথম গান লেখেন।
মান্না দে আর পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন পরবর্তী সময়কালে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও পুলকের লেখায় মান্না দে ছাড়াও অনেক গুণী শিল্পী নিজের কন্ঠ দিয়েছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, হৈমন্তী শুক্লা, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, অরুন্ধতী হোম চৌধুরী, ভূপেন হাজারিকা, অনুপ ঘোষাল এঁরা সকলেই পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় গান করেছেন। ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শঙ্খবেলা’ চলচ্চিত্রে তাঁর লেখা গান আজও সমুজ্জ্বল। ‘কে প্রথম কাছে এসেছি / কে প্রথম ভালোবেসেছি’ এই গানের কথা তখনকার দিনের হিসাবে যথেষ্ট সাহসী। আবার পুলকের কথায় ও মান্না দে’র কন্ঠে ‘প্রথম কদম ফুলে’র সেই বিখ্যাত গান ‘আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না’ একেবারে অন্যরকম একটি গান। আবার ‘ধন্যি মেয়ে’ ছায়াছবির ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’ শুনলেই ফুটবল ম্যাচের উন্মাদনা শ্রোতার মনে আন্দোলিত হয়। আসলে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় জানতেন কোন গান কি গল্প শোনাতে পারে। কারণ তিনি একাধারে ছিলেন গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, ছড়াকার ও ঔপ্যনাসিক। তাই গানও যে সুরের মাধ্যমে একটি নিটোল গল্পের জন্ম দেয়, তা তিনি জানতেন। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গানের সংকলন ‘আমার প্রিয় গান’, ছড়ার সংকলন ‘বাহাত্তুরে’, গল্প সংকলন ‘শেষ সংলাপ’ ও তাঁর আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘কথায় কথায় রাত হয়ে যায়’ তাঁর বহুমুখী প্রতিভার নিদর্শন।
তখন গানের সঙ্গে প্রাণের একটা যোগ হয়ত ছিল। এই বিশাল মাপের ব্যক্তিত্বরা নিজেদের মধ্যে যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রাখতেন। একটা নতুন গান তাঁদের এই আড্ডার মাঝখানেই সৃষ্টি হয়ে যেত। একটা গানের কথা লেখা হলে তার সুর নিয়েও এঁরা বসতেন। আড্ডা, চা আর গান এই নিয়ে নতুন নতুন সুরের সন্ধানে কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব – এই ছিল তখনকার সময়ের সৃষ্টিশীল একটা বিকেল অথবা সন্ধে। মান্না দে’র কথায়, ওঁদের যখন কাজ থাকত না, তখনই ওঁরা একসঙ্গে জড়ো হতেন কারো একটা বাড়িতে। চলত দেদার আড্ডা। সেখানে মান্না দে, পুলকবাবু তো থাকতেনই, এছাড়া থাকতেন রাধুবাবু অর্থাৎ রাধাকান্ত নন্দী, মান্না দে’র ছোট ভাই ভেলু, সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত এবং নচিকেতাবাবু। বাঙালি মানেই আড্ডা, আড্ডা মানেই চা, আর চায়ের সঙ্গে সুর এবং ছন্দ মিলিয়ে গানের পর গান।

একবার নচিকেতা ঘোষের শ্যামবাজারের বাড়িতে পুজোর গান নিয়ে আড্ডা বসেছে। নচিকেতাবাবু পুলকবাবুকে পুজোর গানের জন্য দুটো ‘মুখড়া’ দিলেন। মুখড়া অর্থাৎ গানের প্রথম লাইন। একটি হল ‘চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি’ আর অপরটি হল ‘মুকুটটা তো পড়েই আছে রাজাই শুধু নেই’। নচিকেতা ঘোষ যদিও সুরকার ছিলেন তবু এরকম কোনো লাইন হঠাৎ মাথায় এসে গেলে তিনি লিখে রাখতেন। জানতেন ঠিক কাজে লেগে যাবে। পরে সেগুলো গীতিকারদের দিতেন। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘চাঁদ দেখতে গিয়ে’ লাইনটা শুনে বেশ খুশি হলেও ‘মুকুটটা তো পড়েই আছে’ এই লাইনটা শুনে মোটেই আপ্লুত হলেন না। বললেন, ‘এ আবার কী? রাজা নেই অথচ মুকুটটা পড়ে আছে। এটা দিয়ে কী করে গান হবে?’ নচিকেতা ঘোষ তাঁকে বললেন, ‘আরে, চেষ্টা তো করুন।’ এর দু’দিনের মধ্যেই পুলকবাবু গান রেডি করে ফেললেন। প্রথমটার মুখড়া যথাযথ রেখেই গান তৈরি। আর অপরটি মুখড়া পাল্টে হল ‘আমার ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে’ মাঝে ঢুকে গেল ‘মুকুটটা তো পড়েই আছে রাজাই শুধু নেই।’ আর ‘চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি’ র আগে একটা শায়েরি ঢুকিয়ে দেওয়া হল — ‘আকাশ পানে চেয়ে চেয়ে’।
গান লেখার ক্ষেত্রে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসামান্য প্রতিভা ছিল। যে কোনো পরিস্থিতিতে যে কোনো অবস্থায় তিনি লিখে ফেলতে পারতেন অসাধারণ সব গান। ছোট একটি কথা বা কোনো একটা লাইন থেকে তিনি গান লিখে ফেলতে পারতেন। ছায়াছবির গানের জন্য একটা পরিবেশ ও পরিস্থিতি থাকে, সেই মুড অনুযায়ী গান লেখা তো গীতিকারের পক্ষে সহজ ব্যাপার। কিন্তু তখন ছায়াছবি ছাড়াও তখন গানের রেকর্ড বের হত। পুজোর সময় প্রতি বছর অসংখ্য বাঙালি শ্রোতা আশা করে থাকতেন এইসব গানের জন্য।
একবার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় রাতে প্লেনে করে ফিরছেন। রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ প্লেন থেকে কবির চোখে ধরা দিল এক মোহময়ী রূপে। সেই চাঁদের রূপে যখন তিনি বিভোর হয়ে আছেন তখনই বিমানসেবিকা তাঁকে খাবার দিতে এলেন। সেই সুন্দরী বিমানসেবিকাকে দেখে পুলকবাবুর মনে হল আকাশের চাঁদের সৌন্দর্য আর এই মেয়ের সুন্দর মুখের কোন তফাৎ নেই। বিমানের ভেতর এবং বাইরে জোছনায় ছাপিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে এয়ার হোস্টেসের দেওয়া ন্যাপকিনে লিখে ফেললেন ‘ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে…’। সৃষ্টি হল এক কালজয়ী গান।
গীতিকার যখন গানটি লিখছেন তখন নিশ্চয়ই তিনি মনে মনে জানতেন যে এই গান মান্নাবাবুর গলা ছাড়া আর কারোর গলাতেই ঠিক মানাবে না। মান্না দে’র সঙ্গে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে মান্না দে অন্য গীতিকারের গান গাইলে পুলকবাবুর বেশ অভিমান হত। মান্না দে নিজেও বলতেন যে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এত ভালো গান লিখতেন যে অন্য গীতিকারের গান গাইবার প্রয়োজন হত না। তবু যখনই অন্য কারো লেখা গানে গাইতেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় রাগ করতেন। এই অভিমান নিয়ে পুলকবাবু একটা গানও লিখেছিলেন – ‘তুমি একজনই শুধু বন্ধু আমার, শত্রুও তুমি একজনই।’ অর্থাৎ অন্য কারো গান গাইলেই মান্না দে পুলকবাবুর শত্রু আর তাঁর লেখা গান গাইলেই বন্ধু। এই অভিমান থেকেই দুজনের ভালবাসা বোঝা যায়। তবে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটা গান মান্না দে কিছুতেই গাননি। মান্না দে নিমরাজি থাকলেও মান্না দে’র স্ত্রী সুলোচনা দেবী এই গান গাইতে দেননি। গানটি ছিল ‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণযাত্রা যেদিন যাবে।’ কারণ এই গানের কিছুদিন আগে মান্না দে’কে কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তি ছুরি মেরেছিল। শেষ অবধি এই গানটি গেয়েছিলেন কিশোর কুমার। তবে গাওয়ার আগে মজা করে বলেছিলেন, “না ভাই, এই গান আমি গাইব না। আমার তো এরই মধ্যে দু’বার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে, এই গান গাইলে তিন নম্বর অ্যাটাকটাও হয়ে যাবে।’ আশ্চর্য ব্যাপার কিশোর কুমার এই গানের পর বেশিদিন বাঁচেননি। কিন্তু গানটিকে অমর করে দিলেন কিশোর কুমার।
কিশোর কুমারের মৃত্যু মন ভারী করে দেয়। তাই পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় আর মান্না দে’র প্রথম সাক্ষাৎ কিভাবে হয় সেই মজার প্রসঙ্গ দিয়ে বরং এই প্রতিবেদনে দাঁড়ি টানি। একবার পুলকবাবুর ইচ্ছে হল তাঁর গান কোনো নাম করা গায়ককে দিয়ে গাওয়াবেন। নামকরা গায়কটি হলেন শ্রীযুক্ত মান্না দে। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব? গায়ক থাকেন মুম্বইতে আর গীতিকার হাওড়া। কি করেন, কিভাবে করেন ভাবতে ভাবতে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় চারটে গান চিঠিতে লিখে পাঠিয়ে দিলেন মান্না দে’র মুম্বইয়ের ঠিকানায়। ওই চারটে গানের মধ্যে দুটি গান গায়ক রেকর্ড করেন পরবর্তী কালে। গান পাওয়ার পরে টেলিফোনে গীতিকার ও গায়কের কথা হল কিন্তু কেউ কাউকে দেখেননি। দেখা হল রেকর্ড বের হবার পরে গায়কের বাড়িতে। তখন মান্না দে বেশ কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিলেন। ধুতি পাঞ্জাবি পরা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ঢুকতেই মান্না দে ভাবলেন আবার কোনো বাঙালি বিরক্ত করতে এসেছে। তাই রুক্ষভাবে আগন্তুকের পরিচয় জানতে চাইলেন। পুলকবাবুর পরিচয় জেনে মান্না দে তাঁকে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন। সেই থেকেই এই জুটির শুভারম্ভ।
ভালো লাগলো মৈত্রেয়ী