হঠাৎ করেই সান্ত্বনার কাছ থেকে এক অন্য নেপালের পথে যাওয়ার আহ্বান এসেছিল। কোনো রকম মানসিক প্রস্তুতি নেই, ট্রেনের রিজার্ভেশনেরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাঠমান্ডু হয়ে পোখরার ফ্লাইটের ভাড়া আকাশছোঁয়া! তার ওপর ভোটের সময় — তৎকাল টিকিট পাওয়া নিয়েও এজেন্টের সন্দেহ।এই অনিশ্চয়তার মাঝেই টিকিটটা শেষ পর্যন্ত পেয়েই গেলাম। তখনই যেন মনে হল — এখন আমার পাহাড়-যোগ চলছে! আমার পথ আর কেউ আটকাতে পারবে না। না হলে উত্তরাখণ্ড, হিমাচলের পরপরই বা হঠাৎ নেপাল কেন!
হাওড়া থেকে রক্সৌল হয়ে নেপালের বীরগঞ্জ। রক্সৌল অবধি যেতে হবে মিথিলা এক্সপ্রেসে। মিথিলাঞ্চল দিয়ে এ ট্রেন যাবে নাকি! আমার মৈথিলী বান্ধবীদের প্রচ্ছন্ন অহংকার তারা সীতার দেশের মেয়ে। সেখানকার মেয়েদের নাকি সীতার মতই রূপ লাবণ্য।

ট্রেনে আমার মৈথিলী সহযাত্রিনীটিও যথেষ্ট সুন্দরী। দুটি পিঠোপিঠি দেবশিশু নিয়ে অল্পবয়সী মেয়েটি হিমশিম খাচ্ছে! কোলের ছেলেটি কেঁদে উঠলেই কোলে নিয়ে ও মেরে বৌয়া! আ যা মেরী জান! মেরী প্রাণ! পতিদেবটি অবশ্য বাচ্ছা সামলানোর চেয়ে সুন্দরী স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করতেই বেশি আগ্রহী।
এইসব সুখী দাম্পত্যের ছবি দেখতে দেখতেই পানের পিক আর মাছি ভনভনে রক্সৌল স্টেশন। সেখানে চাচাজানেরা টাঙ্গা নিয়ে রেডি। নেপালে পা দেবার আগে ভারতের টাকা বদলে নেপালী কারেন্সী নিতে হবে ।
আমাদের এখানকার লটারির টিকিট বিক্রেতার মতই স্টেশনের কাছেই হুন্ডি এজেন্টরা বসে আছেন। কপালে লাল তিলক; ছাতার তলায় টেবিল পেতে, সারিসারি নোট সাজিয়ে। উগ্র ধূপের গন্ধ হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। ব্যবসায় পুজোপাঠ না করলে চলে!

আমরা বাপুর বদলে নেপালের রাজা, গন্ডার, হিমালয়, বাঘ, রডোডেনড্রনের ছবি দেওয়া নোট পেলাম। ভারতীয় একশ টাকায় নেপালী একশ ঊনষাট টাকা বিরাশি পয়সা। মনে মনে উৎফুল্ল হলেও হুন্ডি এজেন্টরা বেশ খানিকটা বাট্টা কেটে নিল ।
বিহারের রক্সৌল আর নেপালের বীরগঞ্জের মাঝে শঙ্করাচার্য গেট। সেখানে চাঁদ-সূর্য শোভিত নেপালের লাল পতাকা উড়ছে। হিন্দি-নেপাল ভাই ভাই হাত মিলিয়েছে গেটের সামনে। আশ্চর্য, সীমান্তে নেপালের গেট পেরোতেই আমার হুড়মুড়িয়ে মাউন্ট এভারেস্ট, লুম্বিনী, মনীষা কৈরালা, রাজপরিবারের হত্যাকান্ড, মায় নাতনী এলার সুনীতাদিদিকেও (সেও নেপালী মেয়ে) মনে পড়ল! স্থান মাহাত্ম্য আর কি!
নেপালে সদ্য সদ্য প্রধানমন্ত্রীর পদ পেয়েছেন মাত্র পঁয়ত্রিশ বছরের যুবক বালেন্দ্র শাহ্। তাঁর নির্দেশে সপ্তাহে দু’দিন সরকারি ছুটি। নতুন সরকার রাস্তা চওড়া করছে। পথঘাট এখন ঝকঝকে, তকতকে। লোকজনও এমন তারুণ্যের উদ্দীপনায় খুশি।

আমাদের গাড়ির হাসিখুশি, মোটাসোটা নেপালী চালকটির নাম ঈশ্বর শ্রেষ্ঠ। ভাবলাম, পথে যখন স্বয়ং ‘ঈশ্বর’ সঙ্গী, তখন আর ভয়ের কী আছে! তবে তার ধারাভাষ্যে হিন্দি আর ইংরেজির ব্যবহারে আমার সামান্য ভাষাজ্ঞান বারবার হোঁচট খাচ্ছিল!
আমাদের প্রথম গন্তব্য পোখরা, বাঙালির ভ্রমণসূচীতে অনেকদিনই প্রিয়-চেনা নাম। পোখরার ফেবা লেক সন্ধ্যের আলোয় ঝলমল করে। দিনের আলোয় তার সাজসজ্জা পুরোটাই প্রকৃতির হাতে। নীল আকাশ, সবুজ পাহাড় আর দূরে তুষারাবৃত অন্নপূর্ণা রেঞ্জের ছায়া। হ্রদের মাঝখানে দ্বীপে অধিষ্ঠিতা তাল বরাহী দেবী। প্যাগোডা শৈলীর মন্দিরে তন্ত্র সাধনার আরাধ্যা দেবী শূকরমুখী। বিষ্ণু যখন হিরণ্যাক্ষ রাক্ষসের হাত থেকে পৃথিবীকে উদ্ধারের জন্য বরাহ রূপ ধারণ করেছিলেন, তখন তাঁর সেই তেজ বা শক্তি থেকেই দেবী বরাহীর উৎপত্তি। মন্দিরে পর্যটকদের ভিড়ই বেশি। হ্রদে নৌকাবিহার করে দেবী দর্শনের পুণ্যার্জনে খুশি ভ্রমণার্থীরা।

নেপালের ধার্মিকস্থলে যেমন স্বদেশী লোকসমাগম,পাহাড়ি পথে তেমন বিদেশি পর্যটক। গোটা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ হিমালয়ের অপার আকর্ষণে এই পাহাড়বেষ্টিত দেশে ছুটে আসেন। দুর্গম পাহাড়ি পথে ট্রেকার, বাইকার, সাইকেল আরোহীরা যেন এক অদম্য অভিযাত্রার গল্প লিখে চলেছেন প্রতিদিন!
আমাদের লক্ষ্য ছিল আরো গভীর, অন্যরকম নেপালকে দেখা। পোখরা থেকে কাগবেণীর পথ এক চলমান ভৌগোলিক কাব্য। প্রকৃতি এখানে প্রতি মুহূর্তে নিজের রূপ বদলাচ্ছে। সবুজে মোড়া উপত্যকা, ধানক্ষেত আর শান্ত গ্রামজীবন, ঢাকা টুপি পরা গাঁওবুড়ো, পাতার দোনায় আইসেলু বেরী বিক্রি করা আদিবাসী মহিলাকে পেরিয়ে আমাদের পারডিতে থামতে হয় পারমিটের জন্যে। হিমালয়ের কোলে অন্নপূর্ণা আর তার সংসারকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছে নেপাল (The Annapurna Conservation Area Project, ACAP).সে কারণেই নানা নিয়ম শৃঙ্খলা।

এরপর জোমসম থেকে কাগবেণীর পথ এক ভিন্ন ভূখণ্ডের যাত্রা। পাহাড়ের গঠন যেন বিমূর্ত ভাস্কর্যের অনন্য প্রদর্শনী। সেই কোরা ক্যানভ্যাসে প্রকৃতি আপনমনে নানা ধূসর রঙে উদাস ছবি এঁকে চলে। আমাদের সঙ্গে পথে পথে পাথর ছড়িয়ে বয়ে যায় কালিগন্ডকি নদী। কখনো আমাদের সমান্তরালে, কখনো গভীর গিরিখাত তৈরি করে। সেই কোন আদি অনন্তকাল ধরে তার পথ চলা! হিমালয়কেও সে জন্মাতে দেখেছে! তার পথের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে আছে জলজ প্রাণীর জীবাশ্মভূত দুর্লভ শালগ্রাম শিলা। আমাদের হরু ঠাকুর যাকে হলুদ কাপড়ে মুড়ে, সিংহাসনে বসিয়ে অতি সন্তর্পণে বাড়ির সত্যনারায়ণ পুজোয় এনে প্রতিষ্ঠা করেন। নারীর ছোঁয়া বিবর্জিত সেই একটুকরো কালো পাথরের আগমনের পথ গঙ্গাজলের ছিটেয় বিশুদ্ধ করা হয়! নারী তাকে ছুঁতে পারে না, অথচ এক প্রাচীনা নদীর গর্ভে তার জন্মের ইতিহাস লেখা থাকে!

কালি আর গন্ডকি দুই জলসই মিলে এক হয়ে গেছে নেপালের কাগবেণীতে। এ যেন দুই প্রাচীন স্রোতের একাত্মতা। ভোরের নির্মল আলোয় সেখানে ধ্বনিত হচ্ছে, “উদীরতামবরউৎপরাসহুন্মধ্যমাঃপিতরসোম্যাসঃ” । হে আমার স্বর্গগত সমস্ত পিতৃপুরুষ! তোমরা জাগ্রত হও। আমার আহ্বান গ্রহণ করো। আমাকে রক্ষা কোরো।

এই প্রার্থনা, গুরুদায়িত্ব পালন করে শ্রদ্ধালুরা মুক্তিনাথ দর্শনে যাবেন। আমরাও সে পথ অনুসরণ করলাম।
“পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে!
এত কামনা, এত সাধনা কোথায় মেশে?”
ক্রমশঃ
প্রশান্তিময় ভ্রমণকাহিনী।
ভালোবাসা বর্ণালী
ভালো লাগলো নন্দিনীদি।
ভালোবাসা মহুয়া