আগামী কাল ২৩ এপ্রিল। পশ্চিমবঙ্গের প্র্রথম পর্যায়ের নির্বাচন। নির্বাচন একটা যুদ্ধ। সেখানে পক্ষ-প্রতিপক্ষ থাকে। কিন্তু যুদ্ধকে ‘মহারণ’ বলাটা কি বাড়াবাড়ি নয়? না, বাড়াবাড়ি নয়। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচনের ছবিটা সামনে রাখুন। বোঝা যাবে তাহলেই।
সেনা-আধাসেনা-সিকিসেনায় ছয়লাপ। মার্চ করছে তারা। বোঁ বোঁ ঘুরছে তাদের গাড়ি। টহল দিচ্ছে সাঁজোয়া গাড়ি। সৈনাধ্যক্ষ ঘাঁটি গেড়ে বসেছেন রাজ্যে। ইনি আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। তাঁদের পালের গোদা, স্বঘোষিত বিশ্বগুরু, নন বায়োলজিক্যাল মানুষটিও বড় সক্রিয়। সুনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন হরবখত। সুনার ভারত ছেড়ে সুনার বাংলা কেন রে বাবা!
এই যুদ্ধের প্রস্তুতি অনেক দিন আগে থেকেই। তাই এস আই আর। অন্য রাজ্যে তা দিয়ে কাজ হাসিল হয়েছে। এস আই আর করার আগে রটিয়ে দেওয়া হল রোহিঙ্গার কথা। ঘুষপেটিয়ার কথা। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা নাকি এই রাজ্যে ঘুরছে। সুনার বাংলা করার বাধা তারা। একজনও রোহিঙ্গা যখন খুঁজে পাওয়া গেল না, তখন এল লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি। তার মানে বাদ দিতে হবে। এমনভাবে বাদ দিতে হবে যাতে শাসকদলের প্রার্থী হেরে যায়। এসবের জন্যই তো নির্বাচন কমিশন আর তার কমিশনার। যা খুশি তাই করার স্বাধীনতা পেয়ে গেছে কমিশন। তোমাকে স্পিকটি নট হয়ে থাকতে হবে। তার মানে সুনার বাংলা গড়ার যুদ্ধে নির্বাচন কমিশনও সৈনিক। আর কোন সৈনিক আছে কি? আছে, আছে। ইডি আছে। সি বি আই আছে। ইনকাম ট্যাক্স আছে। শাসক দলের নেতা মন্ত্রীদের টপাটপ পাকড়াও করা হচ্ছে। এই সব নেতা–টেতা কুকর্ম করতে পারে, কিন্তু ঠিক ভোটের আগে তাদের উপর চড়াও হওয়ার তো একটাই মানে দাঁড়ায়। তার পর হাজার রকম বিধি নিষেধ। সুকুমার রায়ের একুশে আইনের কথা মনে আসে।
আচ্ছা, কেন এই মহারণ! যুদ্ধটা কার বিরুদ্ধে?
বৃ্হত্তর অর্থে যুদ্ধটা বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে। অপরাধ আছে বইকি বাঙালির। স্বাধীনতার লড়াইতে যে পরিমাণ বাঙালি অংশ্গ্রহণ করেছে, তার সিকিভাগও অন্য রাজ্যে নেই। একথা যদি বলি যে, বাঙালির রক্তে ভারতের স্বাধীনতা, তাহলে কি খুব অতিশয়োক্তি হবে? এই বাংলায় হয়েছে নবজাগরণ। তিন তিনটে নোবেল প্রাইজ (মাদার টেরেসাকে ধরলে চার ) বাঙালির ঝুলিতে , বাঙালির ঝুলিতে একটা অস্কার। বাংলায় যত কবি, যত লেখক, যত বুদ্ধিজীবী, তা আর কেন রাজ্যে আছে? সারা পৃথিবীতে বাঙালি মনীষার যে পরিচিতি, তা আর কোন রাজ্যের মানুষ দাবি করতে পারে?
বাঙালির প্রতি প্রচ্ছন্ন ঈর্ষা কংগ্রেসেরও ছিল। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের মতো মানুষও কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ মনোভাবের মুখোমুখী হয়েছেন। বহুদিন ধরে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন সরকার বঞ্চনা করেছেন বাংলাকে। আর কোন বই না পড়ে শুধু সাংবাদিক রণজিৎ রায়ের ‘অ্যাগনি অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’ পড়লেই তা বোঝা যায়। কংগ্রেসের মতো বিজেপিও বাংলার প্রতি বিরূপ। তবে পার্থক্য আছে কংগ্রেসের সঙ্গে। কংগ্রেসের মধ্যে কারও কারও হিন্দুত্ববাদী ঝোঁক থাকলেও সার্বিকভাবে উদারতাও ছিল। সে কারণে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সংখ্যালঘুরা সমর্থন করেছে কংগ্রেসকে। কিন্তু আর এস এস বা বিজেপির জন্মই হয়েছে হিন্দুত্বের কারখানাঘরে। হিন্দুত্ববাদী বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বাঙালির কোন মিল নেই নেই। বাংলায় খাওয়া-পরার স্বাধীনতা, বাংলায় প্রেমের স্বাধীনতা, বাংলায় নারীর স্বাধীনতা ও নারীবাদের রমরমা, বাংলায় হিন্দু মুসলমানের পাশাপাশি বাস, বাংলার মনীষীদের বহুত্ববাদী চেতনা, এমন কি ধর্মগুরুদেরও যত মত তত পথের সাধনা । এসব বিজেপির কাছে অসহ্য। তাই বাংলাকে জয় করো। জয় করে তাকে কড়কে দাও, তাঁবে নিয়ে এসো।
মহারণের একটা কারণ বোঝা গেল।
আরও একটা কারণ আছে। সেটা রাজনৈতিক। সেটা হল এখানকার শাসকদল তৃণমূলের উচ্ছেদ। কিন্তু আমরা যে শুনেছি তৃণমূল আসলে বিজেমূল! গত কয়েক বছর তৃণমূল–বিজেপির সেটিং তত্ত্ব বেশ প্রচারিত। সেটিং থাকলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে মহারণ কেন বিজেপির?
তৃণমূল যে নিছক একটা আঞ্চলিক দল সেকথা আমরা মানি। তৃণমূলের যে কোন আন্তর্জাতিক মতাদর্শ নেই সেকথাও আমরা মানি। এই দল তার জন্মলগ্নে একটা ভিত্তি খোঁজার জন্য যে অটলবিহারীর হাত ধরেছিল, সে কথাও আমরা মানি। ভোটবাক্সের তাগিদে এই দল যে ধর্মের তাস খেলেএবং মোটামুটিভাবে দলটিকে দক্ষিণপন্থী বলা যায়, সে কথাও মেনে নিতে দ্বিধা নেই আমাদের। কিন্তু এই মুহুর্তে বিজেপির সঙ্গে তার যে কোন সেটিং নেই, সেকথাও মানতে হবে। তা না মানলে বিজেপিসৃষ্ট এই মহারণের কোন ব্যাখ্যা করা যাবে না। সাম-দান-দণ্ড-ভেদ যে কোন অস্ত্র প্রয়োগ করে বাংলার ক্ষমতা দখল করতে হবে বিজেপিকে। মনুবাদীরা একা এক নারীর কাছে হেরে যাবে নাকি?
আর এই মহারণ নিয়ে আলোড়ন সারা দেশে।
এই মহারণের ফলাফলের উপর নির্ভর করছে ভারতের ভবিষ্যত রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গে বাইনারি ভেঙে বাম ও কংগ্রেসের উথ্থান ঘটলে, বামের ভোট বামে ফেরার ফলে বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে ধ্বস নামলে, তৃণমূল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করলে এন ডি-এর শরিকদের মধ্যে শুরু হয়ে যাবে দোলাচল, যেটুকু অবশিষ্ট আছে মোদিম্যাজিক, তা মিলিয়ে যাবে হাওয়ায়। কারণ মানুষ বুঝবে, মানুষ যদি এককাট্টা হয় তাহলে সাম-দান-দণ্ড-ভেদ কোন কাজে আসবে না।
খুব ভাল লাগলো…স্যার….
খুব সুন্দর বিশ্লেষণ।
কোনোটির সঙ্গেই দ্বিমত করার উপায় নেই।
চমৎকার বিশ্লেষণাত্মক রচনা। যক্তিপূর্ণ এবং তথ্য নিষ্ঠ। তবে ড. মজুমদার কমিশন ও আদালত সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত মত প্রকাশ করলে আমরা সমৃদ্ধ হব। আমার মনে হয়বৈধ ভোটার যেন একজনও ভোটদানের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন এমন দাবি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের। কিন্তু একজন আধজন নন যদি লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিক ভোটদানের সুযোগ না পান তা হলে কী হবে? সব দল বলেছেন শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়বেন। বেশ, সবাই লড়াই করলেন যে যার মতো করে কিন্তু তার পরেও যদি লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিক ভোটদানের সুযোগ না পান তা হলে কী হবে? রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কী হবে? কেউ তো অস্বীকার করছেন না যে লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিক অধিকারভ্রষ্ট হচ্ছেন। তবে? কেন আদালত আছে! সেখানে লড়বেন। নাহলে আর কি করার আছে!
এটা দায়সারা উত্তর। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই আদালত শুধু নির্বাচন কমিশনকে অপদার্থ প্রমাণ করেননি, নিজেরা দায়িত্ব নিয়েছেন, নিশ্চয়ই তাঁদের সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা আছে সেই আস্থা রেখে, নইলে নিজেরা দায়িত্ব নিলেন কেন? অন্য পথের সন্ধান দেবার দায়িত্ব তাঁদের। সমস্যা রয়েই গেল। কিছু লোক সুরাহা পেলেন ঠিক কিন্তু এর পরেও লক্ষ লক্ষ নাগরিক ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়ে গেলেন। এটা যে অনিবার্য ছিল তা বিচারকদের অজানা এমন নির্বোধ তাঁরা নন। নির্বাচন এসে গেল। তাহলে বিচারপতিরা ব্যর্থ এটা মানতে হবে। ধরুন পাঁচ জনের নিম্ন আদালতে ফাঁসির আদেশ হয়েছিল এবার সূপ্রিম কোর্ট ঠিক করলো, তিন জনের ফাঁসি হওয়া উচিত নয়, তারা বেকসুর খালাস। বাকি দুজনের ফাঁসি হওয়া উচিত কিনা তা এখনই ঠিক করা যাচ্ছে না। আজকেই শেষ বিচারের দিন তাই কীকরা যাবে অগত্যা দাও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে। এই দুজন তো ফাঁসির উপযুক্ত হতেও পারতো— এমন বিচারকে কি বিচার বলে? যদি আইনে না আটকায় (অর্থাৎ আমার ফাঁসির ভয় না থাকে কারণ আমার ফাঁসিতে মরার ইচ্ছে নেই) তবে আমি এ বিচারকে অপদার্থের বিচার বলি অথবা তাঁদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায় না কি?
বিচারকদের ধর্মাবতার বলা হয় সেটা সম্মান জানিয়ে কিন্তু অনেক সময় তাঁরা ভাবেন তাঁরাই ধর্ম দেবতা! তা তাঁরা নন, তাঁরাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন, একথা সব বিচারক মনে রাখেন না। সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয় বিচার ব্যবস্থা যখন তাঁদের প্রবঞ্চিত করে তখন জনতা আত্মবল প্রয়োগে বাধ্য হয়। কবি বলেছেন না— “সহায় মোর না যদি জুটে, নিজের বল না যেন টুটে”। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল নয়, গণদেবতা রুষ্ঠ হলে তাকে সামলাবে কে?
এবারের ভোটে রুষ্ট গণদেবতা এ কথা মাথায় রেখে ভোট দেবেন — এই আমার বিশ্বাস।