দক্ষিণের মতো না হলেও বাংলার ভোট রাজনীতিতে টলিউডের প্রভাব ছিল। সেই প্রভাব বিশেষ ও ব্যাপক হয় ২০১১ সালে এবং পরবর্তী সময়ে। তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয়েই জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক ও কলাকুশলীদের দলে টেনে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা চালায়। তবে তারকাদের রাজনীতিতে আনা এবং ভোটযুদ্ধে নামনোর ক্ষেত্রে অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে তৃণমূল। অনেক ক্ষেত্রেই তারকারা তৃণমূলের নির্বাচনী জনসমর্থন ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে বিজেপিও “আউটসাইডার” তকমা মুছতে এবং বাঙালি মনস্তত্ত্বে জায়গা করে নিতে টলিউডের তারকাদের দলে টানার নীতি নেয়। সামগ্রিকভাবে, বাংলার রাজনীতি এখন টলিউড থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এটি ভোটের বাক্সে তারকাদের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানোর একটি নতুন কৌশল।
যদিও তৃণমূলে বরাবই বিনোদন জগতের আধিপত্য দেখা যায় তবে ২০২৬ সালের বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকায় টলিউড তারকাদের উপস্থিতি নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে যে চর্চা শুরু হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে এবার ‘নবীন-প্রবীণ’ দ্বন্দ্ব এবং ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তি’র ওপর জোর দিয়ে প্রার্থী তালিকায় একটা বড়সড় রদবদল ঘটেছে। যদিও হাইভোল্টেজ বিধানসভা ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের চূড়ান্ত তালিকায় প্রতিবারের মতো এবারও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাজি টলিউডের কিছু পরিচিত মুখ। তবে এবারের তালিকায় তেমন বিশেষ চমক নেই, চেনা পরিচিত ঘাসফুল শিবিরের মুখেরাই জায়গা পেয়েছেন। অনেকেই যেমন টিকিট পেয়েছেন, প্রার্থী হিসাবে কেন্দ্র বদল হয়েছে, সোহম চক্রবর্তী, করিমপুর, ইন্দ্রনীল সেন, চন্দননগর, অদিতি মুন্সী, রাজারহাট গোপালপুর, রাজ চক্রবর্তী, ব্যারাকপুর, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, বরাহনগর, অরুন্ধতী (লাভলী) মৈত্র, সোনারপুর দক্ষিণ। তেমনি বাদও পড়েছেন তারকা বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিক, চিরঞ্জিত প্রমুখ। প্রশ্ন, সায়নী ঘোষ, জুন মালিয়া, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দেবের মতো জনপ্রিয় মুখেরা সংগঠনের কাজে এবং লোকসভায় ব্যস্ত তাহলে বিধানসভা নির্বাচনে তাঁদের ভূমিকা কী হবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অবশ্য বলছেন, তারকাদের জনপ্রিয়তা ও জনসংযোগ রাজনৈতিক দলগুলির কাছে একটা বড় সম্পদ। সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি সংযোগ স্থাপন করা, প্রচারে ভিড় টানা এবং ইমেজ সৃষ্টি করা — সব মিলিয়ে তারকা প্রার্থীরা যে নির্বাচনী কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বরাবরের মতো এবারও তারকাদের উপর ভরসা রেখে ভোটের লড়াইয়ে নামালেও ২০২৬-এর নির্বাচনে শুধুমাত্র গ্ল্যামার নয়, বরং ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তি’ ইমেজটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বিজেপিতে তারকাদের আসা যাওয়া চলছে কিন্তু প্রার্থী তালিকায় এখনও তারকা মুখ দেখা যায়নি। তবে তার মধ্যে অন্যতম চমক রুদ্রনীল ঘোষ। একসময় বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এরপর রং বদলে হয়েছেন তৃণমূল। মমতা সরকারে রাজ্য কারিগরি শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ পর্ষদের সভাপতি রুদ্রনীল মমতাকে ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে যোগ দেওয়ার পর এবার টিকিট পেয়েছেন শিবপুর কেন্দ্রে। অন্যদিকে তৃণমূলের একাধিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে শ্রাবন্তীকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন এই অভিনেত্রী। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি তৃণমূলেই যোগ দেবেন। কিন্তু তিনি শিবির পালটেছেন। বিজেপিতে যোগ দেওয়া আরেক অভিনেত্রী হলেন পায়েল সরকার। যদিও এঁদের কেউই বিজেপির টিকিট পায়নি।
২০২৬ বিধানসভা ভোটের বহু আগে থেকেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ছিল, এবার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় কোন কোন টলিউড তারকা জায়গা পাচ্ছেন? পুরোনো কারা থাকছেন, নতুন কারা আসছেন। সেই জল্পনার ইতি ঘটেছে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হওয়ার পর। দেখা যাচ্ছে, প্রার্থী তালিকায় তারকার সংখ্যা অন্যান্যবারের তুলনায় কম। বলা যায় তৃণমূল সুপ্রিমো এবার একটু ভেবে চিন্তে পা ফেলেছেন। জল্পনা ছিল শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, ইমন চক্রবর্তী, পার্নো মিত্র, অঙ্কুশ হাজরা প্রমুখ নাম ঘিরে জল্পনা ছিল কিন্তু এঁদের কাউকেই শেষ পর্যন্ত প্রার্থী করা হয়নি। ফলে তারকা চমকের যে আশা ছিল, তা বেশ খানিকটা ফিকে হয়ে গিয়েছে। নতুন মুখের দেখা যেমন মেলেনি পাশাপাশি পুরনো প্রার্থীদের উপরেই বেশি আস্থা রাখা হয়েছে। ব্যারাকপুর কেন্দ্রে ফের প্রার্থী হয়েছেন পরিচালক রাজ চক্রবর্তী। তবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীর ক্ষেত্রে। চণ্ডীপুর থেকে সরিয়ে তাঁকে করিমপুর কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছে। এই বদলকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা। অন্যদিকে লাভলি মৈত্রকে নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। কিন্তু সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্রে ফের টিকিট পেলেন লাভলি মৈত্র। পাশাপাশি চেনা ছবি দেখা গেল রাজারহাট গোপালপুর ও বরাহনগরে। সেখানে যথাক্রমে অদিতি মুন্সী ও সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী হিসেবে পাওয়া গেল। বোঝা যাচ্ছে অনিশ্চিত সময়ে দল পরীক্ষিত মুখদের উপর ভরসা রেখেই তৃণমূল ভোটের লড়ার কৌশল নিয়েছে।
উল্লেখ্য, ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে টিকিট পেয়েছেন নাট্য ব্যক্তিত্ব অর্পিতা ঘোষ, ক্রিকেটার শিবশংকর পাল, ক্রীড়াবিদ স্বপ্না বর্মণ। হেভিওয়েটদের মধ্যে বাদ পার্থ চট্টোপাধ্যায়। উত্তরপাড়া থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অভিনেতা-বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিককেও। বাদ পড়েছেন চিরঞ্জিৎও। অর্থাৎ ২০২৬-এর বিধানসভায় টলিউড তারকাদের রিটার্ন ঘটলেও ছাঁটকাটও হয়েছে। পাশাপাশি প্রার্থী ঘোষণার আগেই জোর জল্পনা ছিল গায়িকা ইমন চক্রবর্তী প্রার্থী হতে পারেন। তবে শেষমেশ সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইমন নিজেই রসিকতার সুরে জানিয়ে দেন, তাঁকে নানা জায়গায় “দাঁড় করানো” হলেও এবার তিনি গানেই মন দিতে চান।