মেট্রো থেকে নেমে শোভাবাজারের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। উদ্দেশ্য ‘তাকে’ চোখের দেখা দেখার। প্রতি বছর সে আসে ঠিকই, কিন্তু শহরে তাকে খুব-একটা দেখা যায় না। তার স্ব-মহিমায় বিরাজ গ্রামে। কয়েক মিনিট হাঁটার পর ডানদিকে রামদুলাল সরকার স্ট্রিট পড়ল। সেখানে ঢুকে পড়লাম। বাজার বা বাজারটি আপনার ডানদিকে পড়ে। ভেতরে একটি বড় খোলা জায়গা আছে। আগে থেকে খবর নিয়ে জেনেছিলাম, সেখানেই সে থাকবে এ-কদিন।
না, আমি কোনও ব্যক্তির কথা বলছি না। আমি বলছি বহু দিন যাবৎ আমার মনের মধ্যে দেখার বাসনা থাকা, ‘চড়ক’-এর কথা। কংক্রিটে ভরা শহরে তাকেই খুঁজতেই বের হয়েছিলাম। কলকাতায় চড়ক পুজো হলেও সং সেজে পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য বেশ বিরল। ছাতুবাবুর বাজারের মেলাটি আজও কলকাতার সবচেয়ে বড় চড়কের মেলা। চৈত্র সংক্রান্তির দিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই এখানে মানুষের ঢল নামে। প্রথমত চড়ক দেখতে, দ্বিতীয়ত মেলার আকর্ষণে। তবে, শহরে দিনে দিনে কমে আসছে মেলার সংখ্যা। উত্তর কলকাতার বাসিন্দাদের মতে, আজও এখানে কিছুটা হলেও পুরনো সেই মেলার আমেজ পাওয়া যায়। গেরস্থালির দৈনন্দিন জিনিসপত্র থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর শৌখিন সামগ্রীও মেলে সেখানে। পাশাপাশি এখানেই পাওয়া যায় বসিরহাটের বঁটি, দা, ছুরি থেকে শুরু করে কাঠের নানা জিনিস। চৈত্রসংক্রান্তির বিকেল থেকে শুরু করে সারা রাত অতিক্রম করে পর দিন দুপুর পর্যন্ত চলে এই মেলাটি। স্বামীজির সহোদর, শ্রীমহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা, ‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা’তে তিনি কলিকাতার প্রাচীন সময়ের নানা ঘটনা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছিলেন। সেই বইয়ে, ‘চড়ক’ ও ‘চড়কপূজার উৎপত্তি’ শিরোনামে দুটি লেখা রয়েছে। ‘চড়ক’ নামক লেখায় তিনি লিখেছেন — ‘আমাদের জন্মের কিছু পূর্ব পর্যন্ত অথবা আমার জ্ঞান হইবার পূর্ব পর্যন্ত বাণ ফোঁড়ার প্রথা ছিল। চড়ক যেদিন হইবে, সেই দিন প্রাতে গাজনের সন্ন্যাসীরা কালীঘাট যাইত। যে কজন লোক বাণ ফুঁড়িবে তাহারা তৈয়ারী হইত। কে একজন বিশিষ্ট বলবান লোক ছিল সে গাজনের সন্ন্যাসীর পিঠে জোরে এক কিল মারিত, মারিলে পিঠ ফুলিয়া উঠিত। তখন বাঁ-হাতে পিঠের চামড়া টানিয়া ধরিয়া ডান-হাতে ধারাল বঁড়শির মত হুক বিঁধাইয়া দিত। পিঠে এইরূপ দুইটা বঁড়শি বিধাইত ও রক্ত বাহির হইত। কিন্তু সেই স্থানে গাওয়া ঘি গরম করিয়া মালিশ করিলে রক্ত পড়া বন্ধ হইত। আবার কেহ কেহ বা জিভেতে ফুটো করে এক বিঘত, দেড় বিঘত অশ্বত্থচারা শেকড়শুদ্ধ সেই জিভের ফুটোতে বসাইত।’
এই অংশের সমাজচিত্রে সন্ন্যাসীদের কৃচ্ছ্রসাধনের ইচ্ছে ও প্রক্রিয়ার বেশ প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে বাণফোঁড়ার যে-প্রথা, তাকে কেন্দ্র করে কালীঘাট যাত্রার উল্লেখও পাওয়া যায়। মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা থেকে জানা যায়, ছাতুবাবুর বাজারে যে চড়কের মেলা আজও বেঁচে আছে, সে তখনও ছিল। ছাতুবাবুর মাঠ ছিল প্রকাণ্ড, সেখানে তিনি বাল্যে খেলেছেন। মাঠের উত্তর-পূর্ব দিকে শান-বাঁধানো চাতালওয়ালা একটা বড় পুকুর ছিল। সেখানেই চড়কের গাছ ভেজানো থাকত। মহেন্দ্রনাথ চড়ক ছাড়াও ঝাঁপান বা ঝাঁপ উৎসব নিয়ে বিস্তারে বর্ণনা করেছিলেন। সেখানে তিনি ঝুলঝাঁপ, বঁটিঝাঁপ, আগুনঝাঁপ-এর প্রক্রিয়া ও বর্ণনা দিয়েছিলেন।
বাংলার এমনই একটি লোকসংস্কৃতি উৎসব হলো চড়ক ও গাজন। চড়ক পূজার ঐতিহ্য হল চড়ক গাছের উপাসনা এবং গাছের চারপাশে এবং চরক সন্ন্যাসিদের দ্বারা সম্পাদিত বেশ কয়েকটি তপস্যা। এই অনুষ্ঠানটি প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল হয়। বাংলা ভাষায় গাজন শব্দটি এসেছে উৎসবের সময় সন্ন্যাসীদের দ্বারা উৎপন্ন গর্জন বা গর্জন শব্দ থেকে। বিকল্প তত্ত্ব বলে যে এটি দুটি শব্দ থেকে এসেছে গা (গ্রাম) এবং জন (জন), যা মানুষের উৎসব নির্দেশ করে।
হুতোম প্যাঁচার নকশা’র প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘কলিকাতার চড়ক পার্ব্বণ’। সেখানে হুতোম ওরফে কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখছেন—
‘এদিকে দুলে বেয়ারা হাড়ি ও কাওরারা নূপুর পায়ে উত্তরি সুতা গলায় দিয়ে নিজ নিজ বীরব্রতের ও মহত্বের স্তম্ভস্বরূপ বাণ ও দশলকি হাতে করে প্রত্যেক মদের দোকানে বেশ্যালয়ে ও লোকের উঠানে ঢাকের সংগতে নেচে ব্যাড়াচ্চে। ঢাকীরা ঢাকের টোয়েতে চামর, পাখির পালক, ঘণ্টা ও ঘুমুর বেধে পাড়ায় পাড়ায় ধাক বাজিয়ে সন্ন্যাসী সংগ্রহ কচ্চে; গুরু মশায়ের পাঠশাল বন্দ হয়ে গিয়েছে — ছেলেরা গাজনতলাই বাড়ি করে তুলেচে; আহার নাই, নিদ্রা নাই; ঢাকের পেচোনে পেচোনে রপ্টে রপ্টে ব্যাড়াচ্ছে; কখন ‘বলে ভদ্দেশ্বরে শিবো মহাদেব’ চিৎকারের সঙ্গে যোগ দিচ্চে…’
এই বর্ণনা থেকে দুটি জিনিস বেশ স্পষ্ট, সেই সময়েও এই ‘সন্ন্যাসী ধরা’, এবং চড়কের আগের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নিম্নবর্গীয়দের অবস্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। ‘বৃহৎধর্মপুরাণ’ অনুযায়ী, ডুলি বহনকারী যে-জাতির উল্লেখ ছিল, তাঁরাই পরবর্তীতে ‘দুলে বেয়ারা’। হড্ডি যে-জাতির পূর্বনাম, তাঁরাই ‘হাড়ি’। কাওরা, ক্যাওরা বা কেওড়া নামেও পরিচিত। এঁরা প্রত্যেকেই অন্ত্যজ পর্যায়ের উপবর্ণ, অস্পৃশ্য, বর্ণাশ্রমের বর্ণব্যবস্থার মধ্যে এঁদের কোনও স্থান ছিল না। এবং সন্ন্যাসী বিষয়ে এত উন্মাদনা তৈরি হত যে, গুরুমশায়ের পাঠশালা বন্ধ করে ছেলেপুলেরা গাজনতলাকেই বাড়ি বানিয়ে দিনরাত্রি একেবারে ভক্তির নেশায় মেতে উঠেছিল।
চড়কের সঙ্গে, সম্পৃক্ত বিষয় ছিল সং ও সঙের গান। সং ও চড়ক ছিল একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সঙে অংশগ্রহণকারীদের মূল অংশ ছিল অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষেরা। তাঁদের শ্লেষবাণে বিদ্ধ করতেন তথাকথিত কলিকাতার বাবুদের। চড়ক বন্ধ করার ক্ষেত্রে যত প্রচেষ্টা ছিল, সঙের ক্ষেত্রেও প্রায় একই। সেই সময়ে চড়কে প্রায় কিংবদন্তীতুল্য জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, জেলেপাড়া এবং কাঁসারিপাড়ার সং। এই অঞ্চলের নিম্নজ এবং গরিব মানুষেরা এই সঙের প্রধান ভূমিকায়। নেপথ্যে ছিলেন কাঁসারিপাড়ার বিখ্যাত তারকনাথ প্রামাণিক। তাঁদের শ্লেষের মূল বিষয় ছিল, বড়লোক বাবুর ধার্মিক ভণ্ডামি। এই চিত্র আমরা হুতোমের নকশায় বার বার ফিরে পাই। এমনকী ওই প্রথম অধ্যায়েই। ১৮৬৮, ১৩ এপ্রিলের ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ খবরের কাগজের একটি রিপোর্ট থেকে জানতে পারছি, সেবার সঙের বহর ছিল অন্তত এক মাইল। সকাল ছ-টায় শুরু হয়ে সেই সং চলেছিল বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত, প্রায় ন-ঘণ্টা ধরে। গান-বাজনা-মশকরা-পুতুলনাচ-মূকাভিনয় কী ছিল না সেই সমাবেশে! যে-এলাকা থেকে যখন এই সঙের সমাবেশ পেরিয়েছে, প্রতিটি বাড়ি, বারান্দা, জানলা, ছাদ, সবখানেই উৎসুক জনতার ভিড়। সেখানে আট থেকে আশি। পুরুষ থেকে মহিলা সবাই দর্শক।
গাজন
গাজন কখন থেকে শুরু হয়েছিল তা নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। তবে কিছু ঐতিহাসিকের মতে, মধ্যযুগে এমন একটি সময় ছিল যখন ভারতে বৌদ্ধধর্ম কিছুটা কোণঠাসা ছিল, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা অনেক জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একটি ছিল বাংলায় যেখানে তারা হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। তাদের সাথে বৌদ্ধধর্মের তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানও এসেছিল যার মধ্যে ছিল কঠোর তপস্যা এবং পার্থিব সাধনা ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক কাজে আত্মনিয়োগ করার চিন্তাভাবনা, যা প্রায়শই সন্ন্যাসবাদ নামে পরিচিত। এই কারণেই হয়তো গাজন ” ধর্মের গাজন ” নামে শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে “শিবের গাজন”-এ পরিণত হয়েছিল। বাংলায় ধর্মঠাকুর সাধারণত বাউরি, বাগদি, হরি, ডোম প্রভৃতি তফসিলি জাতি দ্বারা পূজিত হন। ধর্মঠাকুর বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মরাজ থেকে উদ্ভূত হতে পারে। যদিও ধর্মঠাকুরকে একটি আকৃতিহীন পাথর (যেমনটি বাঁকুড়ায় দেখা যায়) দ্বারা চিহ্নিত করা হয় এবং এর বাহন পোড়ামাটির ঘোড়া দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করা হয়, তবুও বাঁকুড়ার গ্রামগুলিতে বুদ্ধ মূর্তিকে ধর্ম ঠাকুর হিসেবে পূজিত করা হয়েছে এমন উদাহরণ রয়েছে। এখনও এমন কিছু গ্রাম রয়েছে যেখানে ধর্মরাজ এবং শিব উভয়কেই গাজন নৈবেদ্য দিয়ে স্থাপন করা হয়।
গাজন আসলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্কিত। তারা বৃষ্টিপাত এবং উন্নত ফসলের জন্য প্রার্থনা করে। ভগবান শিব এই সম্প্রদায়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত বলে জানা যায়। এখানে উল্লেখ করা উচিত যে ধর্মঠাকুরকে প্রকৃতপক্ষে উর্বরতার দেবতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়।গাজন উৎসব ছিল এবং এখনও কিছুটা হলেও সামাজিক শান্তির জন্য একটি মহান পদক্ষেপ। যারা এই উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন তারা শিবভক্ত হয়ে ওঠেন এবং সকলের কাছে সম্মানিত হন। প্রাচীনকালে যারা কাঠের কাঠামোর ঝুলন্ত ধারালো বস্তা থেকে নিজেকে ঝুলিয়ে রাখার জন্য ধারালো সূঁচ দিয়ে জিহ্বা বিদ্ধ করতেন, তাদের জমিদার সম্মান করতেন। গাজন উৎসবের সময় তথাকথিত “নিম্ন বর্ণ”-রা নিজের স্তরের উপরে উঠে শিবের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃত হতেন।

গাজন উৎসবের সময় ভক্তরা শিব, নীল বা ধর্মরাজের পুরুষ শক্তির তাদের নিজ নিজ স্ত্রীদের সাথে বিবাহের প্রতীক হিসেবে পালন করেন। একভাবে এটি সূর্য ও পৃথিবীর শক্তির মিলনকে নির্দেশ করে। যদিও এই উৎসবটি পূর্ণ উদ্যমে তিন দিন ধরে চলে, চৈত্র সংক্রান্তির আগে থেকে পরের দিন পর্যন্ত, এটি আষাঢ় মাসের শুরু পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, যা বর্ষাকালকে নির্দেশ করে।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হল ভালো বর্ষাকাল এবং ভালো ফসলের আশায় সংশ্লিষ্ট ভক্তদের দেবতাদের পূজা করা। এছাড়াও, লোকেরা বিশ্বাস করে যে এই উৎসব তাদের সমৃদ্ধি প্রদান করবে এবং গত বছরের যেকোনো দুঃখ ও যন্ত্রণা দূর করবে।
মূলত বিভিন্ন শিব মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই উৎসবটি মূলত ভিক্ষুকদের (ভিক্ষাকারী বা দানের উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের) দ্বারা আয়োজিত হয়, যাদের “গজন সন্ন্যাসী” বলা হয়। এই উৎসবটি খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়, কারও বাড়িতে নয়। বাংলায় সাধারণত এই উৎসবটি তফসিলি বর্ণের বাঙালিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
চড়ক পুজো
গাজন উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হল চড়ক পূজা। চড়ক পূজার ঐতিহ্য হল চলক গাছের পূজা এবং চরক সন্ন্যাসীদের দ্বারা চরক গাছের চারপাশে এবং তার উপর করা বিভিন্ন তপস্যা। প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই পূজা করা হয়। চড়ক গাছ আসলে একটি গাছের কাণ্ড যার কোন শিকড় বা শাখা নেই। উচ্চতা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট। কাণ্ডটি সোজা হওয়া প্রয়োজন। পুরোহিতরা গাছটিকে পূজা করেন এবং তারপর একটি খাদের ভেতরে স্থাপন করেন এবং বাঁশ দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখেন। তারপর সন্ন্যাসীরা তাদের তপস্যা করেন। এই কর্মের পর গাছটিকে যথাযথভাবে নদীতে নিমজ্জিত করা হয় যা পরের বছর নদীর একই ঘাটে যাবে বলে বিশ্বাস করা হয়। চড়ক সন্ন্যাসীরা তারপর এটিকে পূজার মাঠে ফিরিয়ে আনেন, যা একটি স্থানীয় ক্ষেত্র (সাধারণত আজকাল একটি খেলার মাঠ)।
চড়ক গাছকে অর্ধনারীশ্বরের (শিব ও পার্বতীর যৌগিক রূপ) বাসস্থান বলে মনে করা হয়। পূজার আগে প্রথমে একটি মূর্তি বা মুখোশ গাছের মাথায় লাগানো হয় এবং এটিকে মাটিতে সোজা করে তোলা হয়। বেশ কয়েকজন লোক এটিকে টেনে তুলতে নিযুক্ত থাকে। কিছু গ্রামে, হরকালীর মুখোশও বলা হয়। তবে, প্রধান ধারণা হল অর্ধনারীশ্বর — যা দেবতার মধ্যে পুরুষ (মানুষ) এবং প্রকৃতি (প্রকৃতি) এর প্রতীক। এর গভীর অর্থ হল মানব জীবন প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করে।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হল, সন্ন্যাসী পুরোহিতরা কীভাবে অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসীর শরীরে ধারালো বস্তা বিদ্ধ করেন, প্রায় কোনও কাটা বা আঘাত ছাড়াই। সাধক পুরোহিতদের দ্বারা মানবদেহে ধারালো ধাতুর রক্তপাতহীন ছিদ্র করা একটি জাদুর মতো দেখায়। আসলে বছরের পর বছর ধরে অনুশীলনের ফলে, তারা জানেন কীভাবে শিরাগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে এবং কম ব্যথা না করে এই ধারালো বস্তা বিদ্ধ করতে হয়। এটা বিশ্বাস করা হয় যে এই ধরনের কাজগুলি আসলে নারীত্বের যন্ত্রণা, যার মধ্যে সন্তান প্রসবও অন্তর্ভুক্ত, অনুভব করার চেষ্টা করা পুরুষদের জন্য প্রায় ভূমিকা বিপরীত করে।
হুক ধরে থাকা লোকেরা তারপর এক প্রান্তে চরক গাছের সাথে এবং অন্য প্রান্তে হুকের সাথে দড়ি বেঁধে একটি বৃত্তাকার পথে উড়ে যায়। বারবার বৃত্তাকার গতিতে চলার পরেও কেউ কেউ এত উচ্চতা থেকে পড়ে যায়, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কেউই খুব বেশি আঘাত পায় না। কেউ কেউ একাধিক সূঁচ দিয়ে তাদের জিহ্বা বিদ্ধ করে এবং অন্য ভক্তদের কাঁধে বসে চড়ক গাছের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। মায়েরা ঝুলন্তভক্তদের তাদের শিশু সন্তানকে আলিঙ্গন করতে দেন, যা শিশুদের সুস্থতা বয়ে আনে! কিছু গ্রামে মেরুদণ্ড-ঠাণ্ডা করার মতো ঘটনা ঘটে যেখানে ভক্তরা পেরেকের উপর শুয়ে থাকেন, কাঁটার তলায় বাঁশের প্ল্যাটফর্মে উঠে যান এবং কিছু জায়গায় তাদের শরীরে তীর দিয়ে বিদ্ধ করা হয়।
সে কাল থেকে এ কাল চড়কের আকর্ষণ খুব একটা বদলায়নি। শুধু বদলেছে কিছু আচার অনুষ্ঠান। তবে গ্রামের সঙ্গে শহরের ইদানীং কিছুটা ফারাক দেখা দিয়েছে। গ্রামবাংলায় আজও চৈত্রের শুরু থেকেই ধ্বনিত হয় ‘বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে’। সমাজের প্রান্তিক স্তরের নারী-পুরুষের একাংশ সন্ন্যাস পালন করেন। কেউ কেউ আবার শিব-পার্বতী সেজে হাতে ‘ভিক্ষাপাত্র’ নিয়ে বের হন। সারা দিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আতপচাল, রাঙাআলু, কাঁচা আম, কাঁচকলা-সহ নানা আনাজের সঙ্গে পয়সাকড়ি সংগ্রহ চলে। সন্ধেবেলা সেই চাল-আনাজ সেদ্ধ করেই ওঁরা আহারপর্ব সারেন।
সে কালের চড়ক উৎসব প্রসঙ্গে কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘হুতোম প্যাঁচার নক্শা’-য় লিখেছিলেন, ‘…রাস্তায় লোকারণ্য, চারদিকে ঢাকের বাদ্যি, ধুনোর ধোঁ, আর মদের দুর্গন্ধ। সন্ন্যাসীরা বাণ, দশলকি, সূতোশোন, সাপ, ছিপ, ও বাঁশ ফুঁড়ে একবারে মরিয়া হয়ে নাচ্তে নাচ্তে কালীঘাট থেকে আস্চে।…চড়কগাছ পুকুর থেকে তুলে মোচ বেন্ধে মাথায় ঘি কলা দিয়ে খাড়া করা হয়েচে। ক্রমে রোদ্দুরের তেজ পড়ে এলে চড়কতলা লোকারণ্য হয়ে উঠল।…এদিকে চড়কতলায় টিনের ঘুরঘুরি, টিনের মুহুরি দেওয়া তল্তা বাঁশের বাঁশি, হলদে রং করা বাঁখারির চড়কগাছ, ছেঁড়া নেকড়ার তৈরি গুরিয়া পুতুল, শোলার নানা প্রকার খেলনা, পেল্লাদে পুতুল, চিত্তির করা হাঁড়ি বিক্রি করতে বসেচে…। এক জন চড়কী পিঠে কাঁটা ফুঁড়ে নাচ্তে নাচ্তে এসে চড়কগাছের সঙ্গে কোলাকুলি কল্লে— মইয়ে করে তাকে উপরে তুলে পাক দেওয়া হতে লাগলো। সকলেই আকাশ পানে চড়কীর পিঠের দিকে চেয়ে রইলেন। চড়কী প্রাণপণে দড়ি ধরে কখনও ছেড়ে, পা নড়ে ঘুরতে লাগ্লো। কেবল ‘‘দে পাক দে পাক’’ শব্দ। কারু সর্ব্বনাশ, কারু পৌষ মাস! একজনের পিঠ ফুঁড়ে ঘোরান হচ্চে, হাজার লোক মজা দেখচেন।’
সে কালের যে কোনও উৎসবই ছিল বাবুকেন্দ্রিক। তাই দোল, দুর্গোৎসবের মতো চড়কের পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন বাবুরা। চড়ক লোকায়ত উৎসব হলেও সেকেলে বাবুদের এতে উৎসাহের কমতি ছিল না। গাজনের সঙ দেখতে চিৎপুর রোড-সহ অন্যান্য রাস্তায় তখন লোকে লোকারণ্য। চড়ক উপলক্ষে সে কালেও শোভাযাত্রা বেরতো কালীঘাট অঞ্চলে। কলকাতার বিশপ হেবার এবং ফ্যানি পার্কস তাঁদের লেখায় কলকাতার চড়ক উৎসবের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই সব লেখা থেকে জানা যায়, সে কালের এই শোভাযাত্রায় দেখা যেত সন্ন্যাসীদের বীভৎস সব ক্রিয়াকলাপ!
এক সময় চড়কের এই প্রথাটিকেই অমানুষিক আখ্যা দিয়েছিল খ্রিস্টান মিশনারিরা। ১৮৬৩ থেকে ৬৫-র মধ্যে ছোটলাট বিডন এই প্রথা রদ করেন। শোনা যায়, সেই থেকেই সন্ন্যাসীরা পিঠে গামছা বেঁধে চড়কগাছে পাক খেয়ে উঠতে শুরু করেন। কাঁসারিপাড়ার কাঁসারিরা সঙ বের করতেন। অশ্লীলতার দায়ে এক সময় তা বন্ধও হয়ে যায়।
মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধভাবে একত্রে বসবাস করে। তাদের বিশ্বাস-সংস্কার, আচার-আচরণ, প্রথা-পদ্ধতি, উৎসব-অনুষ্ঠান ইত্যাদি জীবন সংলগ্ন সমস্ত কিছুকে নিয়েই লোকজীবনের ধারা বহমান। অন্যদিকে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির মধ্যে নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়, সাহিত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য ইত্যাদির যোগ নিবিড়। গোষ্ঠীবদ্দ সমাজজীবনে লোকসংস্কৃতির বিস্তৃতি বা পরিধি রেখাটা যত বড়ই হোক না কেন, তা বিশ্ববাসীর স্বাভাবিক মানববন্ধনশৃঙ্খলে আবদ্ধ।
নীল পুজো
১৩ই এপ্রিল বাঙালিরা “নীল পূজা” উদযাপন করে। এই পূজা বা পূজা মূলত বিবাহিত মহিলারা করেন যারা সারাদিন উপবাস করেন এবং নিকটবর্তী শিব মন্দিরে “শিব লিঙ্গ”-এর উপর দুধ ঢেলে দেন। এই পূজা ভগবানকে খুশি করার জন্য এবং তার স্বামী ও সন্তানদের জন্য তাঁর আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য করা হয়। “নীল পূজা”-এর অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে। সবচেয়ে প্রধান ব্যাখ্যা হল দেবী পার্বতীর সাথে ভগবান শিবের বিবাহ উদযাপন। এখানে শিবকে নীল বলে মনে করা হয়, যা তাঁর “নীলকণ্ঠ” (নীল রঙের গলা) নাম থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা হয়। কেউ কেউ এটিকে “নীল ষষ্ঠী” নামেও উল্লেখ করেন। এখন কলকাতায় অনেক পরিবারে এটি “নীল ষষ্ঠী” হিসেবে উদযাপন করা হয়। এই ক্ষেত্রে, “ষষ্ঠী” নামে স্থানীয় দেবতার অতিরিক্ত পূজাও করা হয়। ষষ্ঠী হলেন একজন দেবী যিনি মহিলাদের, বিশেষ করে তাদের বিদ্যমান এবং অজাত সন্তানদের, মঙ্গলের প্রতীক। ভেজা চালের দানার গুঁড়ো দিয়ে দেবী তৈরি করা হয়। তার সাথে একটি বিড়াল এবং ছয়টি শিশু থাকে।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, যখন দেবতা (ঈশ্বর) এবং অসুররা (দানব) “অমৃত” পাওয়ার জন্য সমুদ্র মন্থন করছিলেন, তখন প্রথমেই বেরিয়ে আসে “হলহল” — মারাত্মক বিষ। বিষের বিষাক্ততা সমস্ত সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে পারত। তবে, ভগবান শিব উদ্ধার করতে এসে বিষটি গ্রাস করেছিলেন। তিনি তা হজম করেননি বরং নিজের গলায় রেখেছিলেন। ফলস্বরূপ, গলা নীল হয়ে যায় এবং তাই শিব নীলকণ্ঠ নামে পরিচিত হন। এই দিনটি মহাশিবরাত্রি নামেও পালিত হয়।
গাজন-চড়ক-নীল — প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে যদি যাবতীয় পূজার দিকে তাকাই তো দেখা যাবে সর্বত্রই নিজেকে কষ্ট দিয়ে ঈশ্বরকে খুশি করার প্রয়াস। তার প্রথম শুরুটা না খেয়ে পুজো দেওয়া থেকে হয়। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে শিবের মাথায় জল ঢালাতে কষ্ট নেই? ‘ধর্মপুরাণে’ দেখি লাউসেন নিজের শররীরকে খন্ড খণ্ড করে ধর্মের কাছে নিজেকে উৎসর্গ করছেন কারণ তিনি চাইছেন কৃপা লাভ করতে। বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধা কাঁটা বিছিয়ে সেই পথে হাঁটা অভ্যাস করছে এই কান্ড কারখানাগুলো ঈশ্বরের প্রতি প্রেমের প্রকাশ ছাড়া তো আর কিছুই নয়। আসলেগাজন উৎসব, চরক পুজো ও নীল পুজো — সবই বাঙালির ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের গভীরে প্রোথিত এবং দেবতাদের প্রতি তাদের বিশ্বাস ও ভক্তি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই উৎসবগুলি সাম্প্রদায়িক বন্ধনের জন্য একটি প্ল্যাটফর্মও সরবরাহ করে, কারণ লোকেরা উদযাপন করতে এবং আচার-অনুষ্ঠান এবং উৎসবগুলিতে অংশ নিতে একত্রিত হয়।এই উৎসবগুলি প্রজন্মের মধ্য দিয়ে চলে আসা গভীর-মূল ঐতিহ্য এবং বিশ্বাসের অনুস্মারক হিসাবে কাজ করে এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান ধরে রাখে।
পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৪-এ প্রকাশিত।