শুক্রবার | ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৮:০০
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বরেন্দ্র ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজের ইতিহাস, কুলপঞ্জি ও অভিলিখনের সমন্বয়ে একটি পুনঃপাঠ : অত্রি ভট্টাচার্য ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘ছেঁড়া জামার ঈশ্বর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অশুভ শক্তির বিনাশ ও ভক্তের সুরক্ষায় নৃসিংহ চতুর্দশী : রিঙ্কি সামন্ত বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিচিত্র লোক সংস্কৃতি শিব গাজনের সঙ ও বোলান গান : সুব্রত দত্ত

সুব্রত দত্ত / ৫৫২ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

“ও বাবা ভোলানাথ,

আজ তোমার সদনে।

‘বোলান’গান গাইতে এলাম,

আমরা ক’জনে।

ঠাই দিও গো তোমার চরণে।”

বাংলার লোক সংস্কৃতির নানা বৈচিত্র। সেই বৈচিত্র্যের অন্যতম উপাদান গান। বাংলা গানেও নানান বৈচিত্র্য। বাংলার মানুষের সুখ দুঃখ, রাগ অনুরাগ প্রেম প্রার্থনা প্রতিবাদ, সব আবেগ অনুভূতি প্রাণ পেয়েছে গানের ভাষায়। যে কথা মুখে বলা যায় না, মানুষ তাই বলে গানে গানে, সুরে সুরে। তাই অতুলপ্রসাদ বলেছেন —

“কী যাদু বাংলা গানে! গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,

গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা।”

গান ছাড়া বাংলার উৎসব অনুষ্ঠান মানায় না। পূজা পার্বণে গান যেন মানুষের মন্ত্রোচারণ। এভাবেই অদৃশ্য দেবতার পায়ে নিজেদের মনের কথা নিবেদন করে মানুষ। কখনও একক, কখনো দল বেঁধে মানুষ গান গায়। কেউ গায় কেউ শোনে। চৈত্রে শিব গাজনের গান আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। নানা অঞ্চলে এ গান নানা রকমের। ছোট বেলা থেকে আমাদের কাটোয়া অঞ্চলে চৈত্র গাজনে মানুষকে দল বেঁধে গান ‘বোলান’ গাইতে দেখছি। গ্রামের শিব তলায় গানের আসর বসে। সাধারণত ২৭ চৈত্র গানের জন্য নির্ধারিত দিন। এ দিন বিকেলে দল গুলো প্রথমে নিজের গ্রামে শিব তলায় গান গেয়ে পরিক্রমায় বের হয়। তার পর সারা রাত গান গায় দূর দূরান্তের গ্রামে গ্রামে। ফেরে পরের দিন বিকালে বা সন্ধ্যায়। মুর্শিদাবাদে শুনেছি তৃতীয় দিনেও চলে গান। গানের প্রতিযোগিতা হয়। গান শুনতে ভীড় জমে খুব। শুধু গান নয় সঙ্গে থাকে চৈত্র খ্যাপার রঙ্গ রসের সং। জং ধরা জীবনটাকে এ দিন নতুন করে চেনে মানুষ। গ্রামের শিবতলার প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে ভীড়ে। মাঝে গান গায় দল গুলো,তাদের ঘিরে চারদিকে বসে দাঁড়িয়ে থাকে জনতা। এই দিনটার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে গ্রামের মানুষ।

আমাদের দুর্গাগ্রামেও গাজনে বোলান গানের আসর বসে। শৈশব থেকে দেখছি। সারা রাত ঘুম নেই চোখে। দুর দুরান্তের নানা গ্রাম থেকে দল আসছে গান গাইতে। পালা গান, রসের পাঁচালির রসিক বয়স্করা।আমাদের প্রিয় চৈত্র খ্যাপাদের কীর্তি। সুরের আসরে ওরা অন্য সুর। ওরা গান জানে না। তাই সং সেজে পিছু নিত গানের দলের। কেউ কেউ নিজের গ্রামের আসর মাত করত রাত। কেউ এসেছে বউয়ের শাড়ি ব্লাউজ গহনা পড়ে,কেউ পলুই বা খ্যাপলা জাল নিয়ে মাছ ধরছে গানের আসরের মাঝে।কেউ মুণ্ডিত মস্তক, তিলক কৌপীণধারী বৈরাগীর ভেক ধরেছে,হাতে খঞ্জনী ঝণঝণি,গলায় গুগুলি বা রসুনের মালা,মাথার পিছনে শিখিতে ঝুলছে পেল্লাই পেঁয়াজ। কেউ পিঠে পুরোনো টিভির এন্টেনা বেঁধে ঘুরছে। যেন স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ‘Go as you like’ কম্পিটিশন চলছে। সারা বছর এরা মাঠে ঘাটে খাটে। কঠোর পরিশ্রম, মাথায় রোদ বৃষ্টি ঝড়, তবুও মনের রস শুকায় না। তার মধ্যেই চিন্তা করে চৈত্র গাজনের থিম। গাজনের দিন এলেই বের করে চমক। কখনও একা, কখনও দল বেঁধে সং সাজে ওরা। এজন্য গ্যাঁটের কড়ি খরচেও পিছু পা হয় না। শুধু হাততালি আর মানুষের আনন্দেই ওরা খুশি। অনেকেই খুশি হয়ে পুরস্কার দেন। দু দশ টাকার নোট সেফটিপিন দিয়ে আটকে দেন বুকে। ওদের পরিশ্রম, সাধনা যেন সার্থক হয়। অথচ এই খ্যাপামির জন্য অনেককেই অশান্তি পোয়াতে দেখেছি সংসারে। বাবার সং দেখে ছেলের লজ্জার শেষ নেই। অনেকের বউ আসরে কর্তার কীর্তি দেখে মাথা হেঁট করে। বাড়ি ফিরে গোসা ঘরে খিল মারে। কিন্তু যাকে নিয়ে এত কাণ্ড তার হুস নেই। সে আপন রসে ডুবে থাকে। চৈত্র এলেই খ্যাপামির নেশা ফিরে আসে। ঘরে চাল নেই,চালে খড় নেই,পকেট গড়ের মাঠ। কুছ পরোয়া নেই। ওদের ভোলে বাবা আছেন। সব অভাব দৈন্য ফুঁড়েও রসের ফল্গু ধারা বয় মনে। গান গাওয়া আর এক খ্যাপামি! অধিকাংশের সুরের পাঠ নেই। তবুও ওরা নাচে গায়।

পঁচাত্তর বছরের মধুসূদন ঘোষ বউ-এর শাড়ি চুরি পরে, নাকে নোলক, মাথায় ওড়না দিয়ে সখী সেজে এখনও নেচে গেয়ে আসর মাত করে গ্রামে গ্রামে। তেমনই ছিলেন স্বর্গত নগেন দাস। বুড়ো বয়সে ছেলে নাতি নিয়ে বের হতেন বোলান গান গাইতে। এভাবেই পরম্পরাগত ভাবে গ্রামে বইছে লোক সংস্কৃতির ধারা।

বোলান গান পশ্চিমবাংলার কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। যেমন নদিয়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ জেলা। পূর্ব-বর্ধমান জেলার কাটোয়া ১নং ও ২নং ব্লক, কেতুগ্রাম ১নং ও ২নং ব্লক আর মঙ্গলকোট ব্লকের কিছু অঞ্চলে। বীরভূম জেলার লাভপুর ও নানুর ব্লক এবং মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর, খড়গ্রাম, সালার ও কর্ণসুবর্ণ ব্লকে শিবগাজনে বোলান গান গাওয়া হয়। অর্থাৎ অজয় ও ভাগীরথী নদীর সঙ্গমের তীরবর্তী অঞ্চলেই এ গান জনপ্রিয়তা বেশি। কাটোয়ার ব্রাহ্মণী নদীর দক্ষিণাঞ্চলে এ গানের তেমন চল নেই।

বোলান গানের ঐতিহ্য খুব পুরোনো। বাংলায় তুর্কি আক্রমণের ঠিক পর থেকেই বোলান গানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে বোলান গানের প্রসঙ্গ দেখা গেছে। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অনুযায়ী, ‘বোলান’ শব্দের অর্থ প্রবচন বা সম্ভাষণ। সেখান থেকেই গানের নাম এসেছে। আরেকটা মত হল, ‘বুলা’ শব্দটিই হল ‘বোলান’ নামের উৎস, যার অর্থ ‘ভ্রমণ’ বা ‘যাত্রা’ অর্থাৎ ঘুরে বেড়ানো। এক গ্রাম থেকে অন্য এক গ্রামে ঘুরে ঘুরে গাওয়া গান তাই ‘বোলান’।

বোলান গানের কাঠামো পালাগানের মতন। প্রথমে থাকে দেবদেবতার বন্দনাগীতি। তারপর শুরু হয় গানের পালা। কথোপকথন, সংলাপের মাধ্যমে গান এগিয়ে চলে, পালা শেষে রঙ্গকৌতুক, যাকে বলে রং-পাঁচালী। পালাবন্দী বোলানের গান ও সুর বৈচিত্রময়। পৌরাণিক সামাজিক রাজনৈতিক ইত্যাদি নানান বিষয়ে গানের পালা বাঁধা হয়। পালা অনুসারে সাজসজ্জা করেন দলের অনেক সদস্য। সেজন্য খরচ করে শহর থেকে ড্রেস ও মেকআপ করে আসেন বা এজন্য লোক ভাড়া করে আনেন। এখন বোলান গানে হিন্দি বাংলা সিনেমার গানের সুর ঢুকেছে। নতুন যুগের বাদ্যযন্ত্র বাজছে এখন।

বোলান দল প্রধানত চার ধরণের।

১. শ্মশানের দল : আদি বা পুরানো ধারার গানকে বলে পোঁড়ো বোলান, এই দল তন্ত্র ধর্মী শিব পূজার আচার আচরণের পাশাপাশি মুখোশ নর মুণ্ড করোটি নিয়ে নাচ গান করে।

২. ডাক ও পালাবন্দী গান : যাত্রাধর্মী ও নৃত্য গীত প্রধান। একে দাঁড়া বোলানও বলে।এখানে এক দল গানের ধুয়ো ধরে অন্যরা তাদের অনুসরণ করে। দুই পক্ষকে গানের কথা স্মরণ করায় দলের মুহুরী। এ দলের বিশেষ সাজসজ্জা থাকে না।

৩. সখীর দল : এ দলে পুরুষরা মহিলা বেশে সখী সেজে নাচ ও গান করে।

৪. সাঁওতালী বা রণপা নৃত্যের দল : সাঁওতাল সেজে মাদল ধামসা বাজিয়ে তাদের ঢঙে নৃত্য গীত পরিবেশন করে এ দল। বাঁশের রনপা চড়ে নানা কলা কৌশল দেখায়। এক সময়ে সুদপুর, কোশীগ্রাম, কাঁকুরহাঁটি গ্রামের রণপা নৃত্যের দল বিখ্যাত ছিল। এরা অনেকেই রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন।

এক সময়ে কাটোয়া সংলগ্ন খাজুরডিহি গ্রামের নাম করা বোলান লেখক ছিলেন কবিয়াল মধুসূদন ঘোষাল। বর্তমানে বোলান লেখক হিসাবে বিশেষভাবে নাম করেছেন কাটোয়া ১নং ব্লকের টিকরখাঁজি গ্রামের বাসুদেব ঘোষ। এখনও পর্যন্ত ৩০০-৩৫০টি বোলান লিখেছেন। এজন্য অনেক সম্বর্ধনা ও পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

বিগত দিনে পায়ে হেঁটে গান গাইতে যেত দল গুলো। এখন চার চাকার গাড়ি ভাড়া করেন। অনেকে রান্নার গ্যাস ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে বের হন। পথেই বিশ্রাম পথেই খাওয়া দাওয়া। সব কিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া। গানের আসরে ইলেকট্রিক আলো, মাইক। আগে দল গুলোর সাম্মানিক ছিল না বললেই চলে। এখন পাঁচশো, হাজার টাকাও মেলে। তবুও গানের দল কমছে। নতুন প্রজন্মের আর তেমন আগ্রহ নেই এ গানে।

বিগত ১৯৫০ থেকে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছিল বোলান গানের স্বর্ণযুগ। এক একটা গ্রামে চার পাঁচটা পর্যন্ত গানের দল। হৈ হৈ কাণ্ড। তারপরেই বিশ্বায়নের ছোঁয়া লাগল গ্রামে। শিক্ষার অগ্রগতি, বছরে দু-তিন বার চাষবাস, মানুষের সময় কমে গেল। গ্রামের সম্পন্ন পরিবার গুলো এখন গ্রাম ছাড়া। তারা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। এ দিকে চাষ করে পেট ভরে না। চাষীর ছেলেরা তাই কাজের খোঁজে পাড়ি দিচ্ছে শহরে বা ভিন রাজ্যে। কে গাইবে বোলান, ভাদু, টুসু, ঝুমুর? ক্রমেই অন্ধকার ঘনাচ্ছে গ্রামে! যারা আছেন তারা এখনও জ্বেলে রেখেছেন মাটির প্রদীপ। কিন্তু সে আলো আর কতদিন কে জানে!

যখন গ্রামে বিদ্যুত ছিল না। ছিল না রেডিও, টেলিভিশন, স্মার্ট ফোন, সকাল সন্ধ্যার সিরিয়াল, রিয়েলিটি শো। গ্রামের বদ্ধ জীবন বড়ই বিবর্ণ ছিল তখন। বিনোদন বলতে গ্রাম্য বিবাদ, কেচ্ছা আর গান। পালা পার্বণে কৃষ্ণ যাত্রা, আলকাপ, লোটো, ভাদু, বোলান, কবিগান। তখন গ্রামে শিল্পীদের খুবই মর্যাদা ছিল। সবাই চিনত, ভালবাসতো। রঙ্গ রসিকদের খুব আদর ছিল। পালা পার্বণ বা বাড়ির অনুষ্ঠানে তাদের নিমন্ত্রণ থাকত। এখন গ্রামীণ শিল্পীদের আর সে মর্যাদা নেই।

সময়ের সাথে বদলে গেছে গ্রাম তথা সমাজের পরিবেশ। আজ আর বিনোদনের জন্য বাইরে ছুটতে হয় না। ঘরেই অন্দরে হাজির বিশ্বের সব বিনোদন। দর্শকের অভাবে বন্ধ হতে চলেছে গ্রামের যাত্রা, বোলান, ভাদু, পালা পার্বণের নানান অনুষ্ঠান। গ্রামের শিল্প আর শিল্পীর মৃত্যুতে নানান অপসংস্কৃতি অসামাজিক চিন্তা গ্রাস করছে গ্রামকে। তাই রাজনীতির রমরমা, সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা, এত হিংসা হানাহানি। মনে হবে এ সব অপ্রাসঙ্গিক কথা! কিন্তু কেন সমাজের এমন অবস্থা? উত্তর খুঁজতে হবে এখানেই। গ্রামের ছোট অখ্যাত শিল্পীরাই একদিন সম্পর্কের সেতু বেঁধেছিলেন গ্রামে। তাদের অনুষ্ঠানে মানুষের মেলবন্ধন হত। সেই সুত্রে আপদ বিপদ, সুখ দুঃখের দিনে এক থাকতো গ্রামের মানুষ। যেন একটা পরিবার। আজ সেই ভীড় নেই। শিল্পীরা বিলীন হচ্ছে। তাদের অবদানকে তুচ্ছ ভেবেই আমরা তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছি। আমাদের সর্বনাশ ডেকে এনেছি আমরাই। গ্রামীণ সংস্কৃতি নব মূল্যায়ন হোক। সেই নতুন ভাবনার দিন এসেছে। মনে রাখতে হবে সভ্যতার সূতিকাগার গ্রামেই এখনও আমাদের প্রাণ ভোমরার বাস।

ছবি : লেখক


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন