আগামীকাল (বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল) কেরালায় যে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে বলাই বাহুল্য তা এই উপমহাদেশের বহু আলোচিত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রসঙ্গত, কেরালার ভোটে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে, যা স্বতন্ত্র। কারণ এখানে সাধারণভাবে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জোটগুলির মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়। যদিও গত নির্বাচনে সেই ধারাটি ভেঙে গিয়েছিল, শাসন ক্ষমতায় থাকা সরকার পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। এবারের নির্বাচনে তাই প্রথম প্রশ্ন, ভোটাররা শাসক দলকেই বহাল রাখবেন, নাকি বিরোধী দলকে ফিরিয়ে আনবেন। আসল উত্তরটি উঠে আসবে ২.৭ কোটি ভোটার এবং ১৪০টি আসনের জয় পরাজয়ের ভিত্তিতে। প্রধান দুটি জোট এলডিএফ এবং ইউডিএফ উভয়ই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি। যেহেতু রাজ্যটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের নির্বাচন এবং ভোটারদের পরিবর্তনমুখী রায়দানের লম্বা ইতিহাস রয়েছে। তাই ২০২৬ সালের কেরালা বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ী কে হবে সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা সহজ নয়। তবে আসল লড়াই যে শাসক দল বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) এবং বিরোধী সংযুক্ত গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের (ইউডিএফ) মধ্যে হবে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
ক্ষমতা ধরে রাখতে এলডিএফ তাদের শাসন প্রক্রিয়ার রেকর্ড, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করেছে, অন্যদিকে ইউডিএফ সরকারবিরোধী যেকোনো মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চালিয়েছে। একই সঙ্গে, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সরকার গঠনের মতো অবস্থানে না থাকলেও, ভোটের শতাংশকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচনী এলাকার ফলাফলকে প্রভাবিত করবে বলেই মনে হয়। চূড়ান্ত ফলাফল বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করবে, যার মধ্যে রয়েছে কত শতাংশ ভোট পড়ছে, মালাবার অঞ্চলের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে তাদের কার্যকারিতা এবং প্রতিটি জোট বেকারত্ব, উন্নয়ন ও সুশাসনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি কতটা কার্যকরভাবে সমাধান করেছে তার উপর। তবে এবারের কেরালা বিধানসভা নির্বাচন বামপন্থীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নির্বাচন।
কেরালাতে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তনের রীতি প্রচলিত ছিল। ২০১৬ সালে সেই সরকার পরিবর্তনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি ভেঙে যায় যখন বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার পর বামফ্রন্ট টানা ১০ বছরের ক্ষমতাসীন হয়। এখন প্রশ্ন দলটি কি হ্যাটট্রিক করে ফের ইতিহাস গড়তে পারবে, নাকি ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাবে? বাংলায় বামফ্রন্ট একটানা ৩৪ বছর ক্ষমতাসীন ছিল, ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস তাদের বিরোধী পক্ষে নির্বাসিত করে। সেই নির্বাসন থেকে ২০২১ সালের নির্বাচনে বাংলায় বামেরা এককভাবে একটি আসন জিততেও ব্যর্থ হয়। উত্তর পূর্বাঞ্চলের ত্রিপুরা রাজ্যের পরিস্থিতিটা আরও নির্মম। ১৯৯৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সিপিএম শাসন ক্ষমতায় থাকার পর বিজেপি তাদের নির্বাসিত করে বিরোধী পক্ষে। এরপর বাম কর্মীদের একটি অংশ সরাসরি গেরুয়া শিবিরে চলে যায়। এর থেকে বোঝা যায় যে সিপিএম কোনো স্বস্তির জায়গাতেই নেই।
কেরালা হল সেই রাজ্য যেখানে এখনও সিপিএম শাসন ক্ষমতায়। ২০১৬ সাল থেকে পিনারাই বিজয়ন মুখ্যমন্ত্রী। ২০২১ সালে ১৪০ আসনের মধ্যে ৯৯ আসনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফিরে আসায় চার দশক ধরে পালা করে পাঁচ বছর বাম আর পাঁচ বছর কংগ্রেসের ক্ষমতায় ধারা বিজয়ন ভেঙে দেন। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভায় কী হবে? কেরালায় একটি গোটা দশক শাসন করেছে এলডিএফ। প্রায় ১৫ বছর ধরে অধিকাংশ পঞ্চায়েত ও পৌরসভা ছিল বামেদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু আজ সেই রাজ্যের ভোটারদের মধ্যে ক্লান্তির রেখা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট কেরালার ২০ আসনের মধ্যে ১৮ আসনে জয়লাভ করে; এলডিএফ এসে দাঁড়ায় মাত্র একটি আসনে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের স্থানীয় পঞ্চায়েত-পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফলে রীতিমতো বিপর্যয় ঘটে এলডিএফের । ৯৪১ গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ইউডিএফ পায় ৫০৪টি আসন। ইউডিএফ ছটা কর্পোরেশনের মধ্যে চারটে, ৮৬ পৌরসভার মধ্যে ৫৪ এবং ১৫২ ব্লক পঞ্চায়েতের মধ্যে ৮১ টি আসনে জয়ী হয়।
এখনও কেরালা বিজয়নের নিয়ন্ত্রণে তবে বিরোধী দলনেতা ভি ডি সতীশনের জনপ্রিয়তার হার বিজয়নের প্রায় সমান— ২৭.৭৭% বনাম ২৭.৮৫%। ইউডিএফের নির্বাচনী প্রচার তিনটে স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে— সরকারবিরোধী মনোভাব, সিপিএম-বিজেপি আঁতাতের অভিযোগ এবং পুথুযুগম (নতুন যুগ) নামক নির্বাচনী ইশতেহার, যেখানে প্রত্যেক পরিবারের জন্য ২৫ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্য বীমা, কলেজের ছাত্রীদের জন্য মাসিক ১,০০০ টাকা ভাতা, পেনশন বাড়িয়ে ৩,০০০ টাকা করা এবং তরুণ উদ্যোগীদের জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সুদবিহীন ঋণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে কংগ্রেসের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হল সিপিআইএম ও বিজেপির মধ্যে অলিখিত বোঝাপড়ার অভিযোগ। পালাক্কাড়ে বিজেপির শোভা সুরেন্দ্রনের বিরুদ্ধে দলীয় প্রার্থী না দিয়ে সিপিএম নির্দল প্রার্থী এন এম রাজাককে সমর্থন করছে। রানি, কোন্নি, ত্রিপুনিথুরা এবং কোডুঙ্গাল্লুরে ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়া সত্ত্বেও বিজেপি তার শরিক দল বিডিজেএস এবং টোয়েন্টি২০-কে আসন ছেড়ে দিয়েছে। কংগ্রেস এই পদক্ষেপকে বিজেপি-সিপিএমের সমন্বয় হিসাবে দেখছে। এনডিএ-র নির্বাচনী ইশতেহারে বিনামূল্যে দুটো এলপিজি সিলিন্ডার, মাসিক ৩,০০০ টাকা পেনশন, একটা এইমস মানের হাসপাতাল তৈরি এবং মহিলাদের জন্য মাসিক ২,৫০০ টাকা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এসআইআর ভোটার তালিকাকে নতুন চেহারা দিয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের তালিকা থেকে ৮,৯৭,২১১ জনের নাম বাদ পড়ে চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার রয়েছেন ২,৬৯,৫৩,৬৪৪ জন। তাছাড়া প্রায় ন’লক্ষ ভোটারের বাদ পড়া কিন্তু অনেক আসনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কারণ এই রাজ্যে এমন কয়েক ডজন আসন রয়েছে, যেগুলোর ফলাফল খুব কম ব্যবধানে নির্ধারিত হয়। কেরালায় ২,৩৪,০৪৯ জন নথিভুক্ত প্রবাসী ভোটার রয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকেন। বিগত নির্বাচনগুলোতে চার্টার্ড ‘ভোট ফ্লাইট’ হাজার হাজার ভোটারকে দেশে নিয়ে এসেছিল। এবার আমেরিকা-ইজরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে সেই ব্যবস্থা করা যায়নি। বিমান ভাড়া ১৫,০০০-২০,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০,০০০-৭০,০০০ টাকায় পৌঁছেছে। এর প্রভাব মালাবারের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলিতে পড়তে চলেছে। এইসব কারণেই কেরালার নির্বাচন বামদের জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন।