আলুতে লোকসানের হাত থেকে চাষিদের বাঁচাতে এগিয়ে এল সরকার। আগেই চাষিদের কাছ থেকে সহায়ক মূল্যে আলু কিনতে শুরু করেছে সরকার। এবার বাইরের রাজ্যে ও বিদেশেও আলু রপ্তানি শুরু হল। মঙ্গলবার থেকেই তারকেশ্বর থেকে আলু বাইরে যাওয়ার জন্য র্যাক হাজির হয়েছে। লোডের কাজও দ্রুত শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, আলু প্রতিবেশী রাজ্য অসম ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় যাবে বলে র্যাক এসে হাজির হয়েছে। এবার আলুর চাহিদা যেমন বাড়বে, সেইসঙ্গে দামও বাড়বে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা।
এবার রাজ্যে আলু নিয়ে চাষিরা নাস্তানাবুদ হচ্ছিল। এমনকি হিমঘরে আলু রাখতে গিয়ে ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে। কেবল তাই নয় অধিকাংশ হিমঘর আলু রাখার চাপ সহ্য করতে না পেরে বন্ধ রেখেছে। ব্যবসায়ীদের আলু কেনায় অনীহা এসে গিয়েছিল। ভোটের মুখে এরকম দুর্দশায় পড়তে হবে ভাবতে পারছে না চাষিরা। ইতিমধ্যে আলু বাইরে যাওয়ার খবর শুনে চাষিমহলে খুশির হাওয়া।
এদিকে বিদেশে আলু রপ্তানিতে দিল্লির উদ্যোগ চায় রাজ্য। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে নির্ধারিত সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে আলু কেনা হচ্ছে। ভিন রাজ্যে বা বিদেশে আলু পাঠাতেও কোনো বাধা নেই। কেন্দ্রীয় সরকার যাতে বিদেশে আলু পাঠানোর জন্য উদ্যোগী হয় সে-ব্যাপারে দাবি তুলেছে রাজ্য। রাজ্য কৃষি বিপণন দপ্তর জানিয়েছে, এখনো পর্যন্ত ৩৮ লক্ষ টন আলু হিমঘরে মজুত করা হয়েছে। যেখানে ৮৫ লক্ষ টন আলু মজুত রাখা যাবে। আলু হিমঘরে রাখার সুযোগ এখনো রয়েছে। হিমঘরে ছোটো চাষিদের আলু রাখার জন্য ৩০ শতাংশ জায়গা সংরক্ষিত রাখার সময় বাড়িয়ে ২৫ মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছিল। কৃষি বিপণন দপ্তর সূত্রে বলা হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এবার পশ্চিমবঙ্গের মতো ব্যাপক আলুর ফলন হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে তো চাষিরা পশ্চিমবঙ্গের থেকেও কম দাম পাচ্ছেন। সেখানকার তুলনায় এরাজ্যের মাঠে দাম কুইন্টালে ২০০ টাকা বেশি বলে সরকারের দাবি। প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির নেতা লালু মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ভিন রাজ্যে প্রচুর পরিমাণে আলু পাঠানো হচ্ছে। এ-ব্যাপারে কোনো প্রশাসনিক বাধা নেই। তবে বিদেশে আলু পাঠানোর সুযোগ নেই।এর মধ্যেই শ্রীলঙ্কায় আলু যেতে শুরু করেছে।
প্রসঙ্গত, এবার পশ্চিমবঙ্গসহ দেশজুড়ে ব্যাপক ফলনের জন্য দাম পড়ে গিয়েছে। আলু মজুত রাখলে বেশি লাভ পরে হবে না, এই আশঙ্কায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেনার আগ্রহ কম। তাই দাম আরো কমেছে। এই অবস্থায় সরকারি উদ্যোগে যত বেশি আলু কেনা হবে তাতে চাষিদের লাভ হবে। ইতিমধ্যে সরকার আলু কিনছে। আশা করা হচ্ছে আগামী দিনে দাম বাড়বে।
এদিকে, হুগলিতে প্রথম আলু বীজ সংরক্ষণের জন্য দুটি হিমঘর চালু হল।অভাবী বিক্রি রোধে সরকার সংগ্ৰহ প্রকল্প চালু করেছে। সেই সঙ্গে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় আলুর অভাবী বিক্রি রোধ ও লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে সংগ্ৰহ প্রকল্প চালু করেছে।
কিন্তু আলুবীজের জন্য বিশেষ হিমঘর এই প্রথম চালু হল হুগলিতে। হুগলির পান্ডুয়া ব্লকের বৈঁচিতে সিএডিসি প্রকল্প এলাকায় ওই হিমঘর তৈরি হয়েছে। রাজ্য সরকারের ভরতুকি প্রকল্পে তৈরি ওই হিমঘর আলুচাষিদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করবে বলে দাবি করেছেন কৃষিকর্তারা। সাম্প্রতিক সময়ে ভিন রাজ্যের আলুবীজ নিয়ে জটিলতার জেরে, রাজ্যেই উন্নতমানের আলুবীজ তৈরির ভ্রুণ কাজে হাত দিয়েছিল রাজ্য সরকার। বস্তুত সেই পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে ওই হিমঘর চালু করা হলে তাতে স্ত্রী আলুবীজ সংরক্ষণ করা যাবে। আলুবীজ উৎপাদক থেকে চাষিদের বাড়তি সুবিধা দেবে। হুগলিতে আলুচাষ এমনিতেই জনপ্রিয়। বাংলার আলুর ভাণ্ডার বলাও চলে। সেই ভৌগোলিক ক্ষেত্রে আলুবীজের হিমঘর কৃষকদের জন্য আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাওয়া বলেই কৃষিকর্তারা মনে করছেন।

তারকেশ্বরে আজ র্যাক লোড হচ্ছে। ট্রেনে আলু পৌঁছে যাবে আসাম ও শ্রীলঙ্কাতে।
এদিকে আলু কেন্দ্রিক কিছু শিল্প গড়ে তোলার দাবিতে সরব চাষিরা। সরকার আলুর অভাবী বিক্রি রোধ করার লক্ষ্যে এবং লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে আলু সংগ্রহ প্রকল্প (পটাটো প্রোকিওরমেন্ট স্কিম)চালু করেছে। সময়সীমা ১০ এপ্রিল, ২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এ-বছর আলুর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বৃদ্ধি করে প্রতি কুইন্টাল ৯৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাপক অংশের আলুচাষির স্বার্থে রাজ্যের সমবায় দপ্তরের আওতাধীন হিমঘরগুলি ইতিমধ্যে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছে। কেবলমাত্র সঠিক গুণমান-যুক্ত জ্যোতি আলু সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, রাজ্যের সকল হিমঘরে ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক আলুচাষিদের জন্য ৩০ শতাংশ স্থান সংরক্ষিত করা হয়েছে। চলতি বছরে কৃষকস্বার্থে এই সংক্রান্ত বেশ কিছু নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। রাজ্যে হিমঘরে আলু সংরক্ষণ ক্ষমতা ৬১ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৯১ লক্ষ মেট্রিক টন হয়েছে। সরকার সবসময় কৃষকদের সাথে, কৃষকদের পাশে আছে।
উল্লেখ্য, এই রাজ্যে গত বছরে আলুর ফলন হয়েছিল ১৪৬ লক্ষ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবারেও মোট আলুর পরিমাণ তারচেয়ে বেশি কিংবা কাছাকাছি থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। এই রাজ্যের আলুর চাহিদা মাসে মাত্র চার থেকে পাঁচ লক্ষ মেট্রিক টন। এখানে হিমঘরে চেপেচুপে ৯১ লক্ষ মেট্রিক টন আলু রাখার ব্যবস্থা আছে।
আলু চাষিরা জানিয়েছেন, চাষ করতে বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ৩০-৩২ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে ৮০- ৯০ প্যাকেট অর্থাৎ ৪৫০০ কেজি মতো। যার বর্তমান বাজারদর পাওয়া যাচ্ছে ১৫-১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘা প্রতি চাষীদের লোকসান হচ্ছে ১৫-১৬ হাজার টাকা।
রাজ্য প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি লালু মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘এই সমস্ত পদক্ষেপের ফলে আলু চাষিরা ও ক্রেতারা কিছুটা উপকৃত হবেন। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়।
কৃষিবিশেষজ্ঞ তথা রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার জানান, ২০১১ থেকে আলু চাষিদের পাশে দাঁড়াতে পাঁচবার সহায়ক মূল্যে আলু কিনেছে রাজ্য। এর আগে ন্যূনতম দর ছিল ৯ টাকা। এবার ষষ্ঠবার ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে আলু কেনা হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার বাইরে আলু পাঠানো শুরু করেছে। যা চাষিদের কাছে সুখবর।