সুয়াদীঘি। কলকাতা থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরত্বে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি মহকুমার ভূপতিনগর থানার মুগবেড়িয়ার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। সুয়াদীঘি গ্রামের গ্রামদেবী মুগেশ্বরীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আজকের মুগবেড়িয়া জনপদ। মুগবেড়িয়ার জমিদার হিসেবে নন্দ পরিবার ভুস্বামী, দাতা পরিবার ও আধুনিকতার অগ্রদূত বলে সুখ্যাতি ও সুপরিচিতি আজও বর্তমান। মেদিনীপুরের আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ ও প্রবীণ শিক্ষক মম্মথ নাথ দাসের লেখায় জানা যায়, সপ্তদশ শতক পর্যন্ত মুগবেড়িয়া উৎকল রাজ্যের মালঝিটা দন্ডপাটের একটি অংশ হিসেবে হিজলীর পাঠান শাসকদের অধীনে ছিল। সপ্তদশ শতকে হিজলীর তাজ খাঁ-র মৃত্যুর কিছুদিন পরেই তাজ খাঁর রাজ্য বিভক্ত হয়ে জলামুঠা ও মাজনামুঠা জমিদারী গড়ে উঠে।
মাজনামুঠার কিশোরনগর গড়ের জমিদার রাজা যাদবরাম রায় মাজনামুঠা জমিদদারীর শ্রেষ্ঠ বৈদিক ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে উড়িষ্যা থেকে নন্দ, ত্রিপাঠী, ষড়ঙ্গী প্রভৃতি ব্রাহ্মনদের আনিয়ে জমি দিয়ে নিজ জমিদারীতে বসবাস করার জন্য প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে উড়িষ্যার বিরামচন্দ্রপুর থেকে রাজা যাদবরামের আনা বৈদিক ব্রাহ্মণ অপর্তি চরণ বা অপত্যাচরণ নন্দ-ই মুগবেড়িয়ায় নব্য প্রতিষ্ঠিত নন্দ পরিবারের আদি পুরুষ। অপর্তি চরণের পরবর্তী পঞ্চম পুরুষ ভোলানাথ নন্দ আপন সাহস আর বুদ্ধি বলে বিশাল জঙ্গলময় অনাবাদী মহাল বন্দোবস্ত নিয়ে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করে জনহিতকর ও দেশপ্রেম মূলক কর্মসাধনায় খ্যাতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন। সেই নন্দ পরিবারের প্রতিষ্ঠিত শ্যামা মন্দিরে একই সঙ্গে গৌরাঙ্গ ও কালী পূজিত হয়ে আসছে। নন্দ পরিবারের সদস্য প্রাক্তন বিধায়ক অধ্যাপক ব্রহ্মময় নন্দ বলেন, “অতীতে মাটির মন্দিরে খড়ের চালাঘরে মা’র মৃন্ময়ী মূর্তির পুজো হত।

১৩৩৬ বঙ্গাব্দে নন্দ পরিবারের গঙ্গাধর নন্দ বতর্মান পাকা মন্দিরটি তৈরি করেন। মন্দির নির্মানের পর গঙ্গাধর নন্দের ছেলে বিরজাচরণ নন্দের ইচ্ছানুসারে নৌকায় করে কাশীধামের দশাশ্বমেধ ঘাটের শিল্পীর তৈরি কষ্টিপাথরের কালী মূর্তি এনে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়।” ব্রহ্মময়বাবু আরও জানান,” মন্দির ও কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করার বেশ কিছু বছর পরে নবদ্বীপের এক বৈষ্ণব মানুষ একটি গৌরাঙ্গ মূর্তি নিয়ে মুগবেড়িয়া নন্দ পরিবারে উপস্থিত হন। ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলতেন, কালী ও গৌরাঙ্গ এক। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের সেই ভাবনাকে পাথেয় করেই মন্দিরে বৈষ্ণবের আনা গৌরাঙ্গ মূর্তিও প্রতিষ্ঠা করে নন্দ পরিবারের শ্যামা মন্দিরে একই সঙ্গে গৌরাঙ্গ ও কালী পূজিত হয়ে আসছেন।”
শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দিরে একাধিকবার কালীপুজোর সময় চারণ কবি মুকুন্দ দাস দেশাত্মবোধক গানের আসর বসিয়েছিলেন। বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু মুকুন্দ দাসের গান তখন লোকের মুখে মুখে ঘুরত।

বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু স্বদেশী আন্দোলনের জন্য মুগবেড়িয়া নন্দ পরিবারে আস্তানা তৈরী করে স্থানীয় যুবকদের লাঠি খেলায় পারদর্শী করে তুলতে আখড়া তৈরি করেছিলেন। কালীপুজোর সময় ক্ষুদিরাম বসুর উপস্থিতিতে সন্ধ্যায় কালীমন্দিরের সামনে লাঠি খেলার আখড়া বসত। এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরেই শ্যামা মায়ের সামনে বসে স্বকীয় উদাত্ত কন্ঠে চণ্ডীপাঠ করে গিয়েছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আজও দূর দূরান্তের বহু মানুষ নন্দ পরিবারের এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন। পুজোর সময় মাকে পঞ্চ ব্যাঞ্জন ও মিষ্টান্ন-সহ নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। এখানে আমিষ ভোগের প্রচলন নেই। নন্দ পরিবারের সদস্য চৈতন্যময় নন্দ বলেন, “শতাব্দী প্রাচীন এই শ্যামা মন্দিরে মন্দির প্রতিষ্ঠাতা গঙ্গাধর নন্দের ছেলে বিরজাচরণ নন্দের মায়ের মন্দিরে বলি প্রথা চালু করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু মন্দির প্রতিষ্ঠা করার আগের রাতে বিরজাচরণবাবু বলি চালু না করার জন্য মায়ের স্বপ্নাদেশ পান। সেই সময় থেকে কালী মাকে নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়।” মন্দিরে সারা বছর ধরে একই সঙ্গে গোবিন্দ জিউও পূজিত হন। প্রতিদিন একইসঙ্গে শ্যামাসঙ্গীত ও কীর্তনে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। নন্দ পরিবারের ঐতিহ্যময় কালীপুজোকে ঘিরেই মেতে ওঠে মুগবেড়িয়া সহ দূরদুরান্তের আবালবৃদ্ধবণিতা।