শনিবার | ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:১০
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বরেন্দ্র ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজের ইতিহাস, কুলপঞ্জি ও অভিলিখনের সমন্বয়ে একটি পুনঃপাঠ : অত্রি ভট্টাচার্য ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘ছেঁড়া জামার ঈশ্বর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

গোয়ালপাড়ার ধর্ম ঠাকুর এবং ‘গাজন’ শব্দের উৎস বিষয়ে দু-চারকথা : সুব্রত ঘোষ

সুব্রত ঘোষ / ২৩৯৩ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৩

রাঢ়ের প্রাচীন দেবতা ধর্ম্মঠাকুর বা ধর্ম্মরাজ। তাঁকে ঘিরেই রচিত হয় শূন্যপুরাণ, অনিলপুরাণ, সৃষ্টিপুরাণ। আদ্য-গোঁসাঞি ধর্ম্মঠাকুর বা ধর্ম্মরাজের মূর্তি হয় না। কেউ মনে করেন বৌদ্ধধর্মের শেষ পরিণতি হল ধর্ম্মঠাকুর। শ্রীসুকুমার সেন মনে করেন ধর্ম্মঠাকুর একাধারে সূর্যদেবতা, যম দেবতা, বরুণ দেবতা, কূর্মদেবতা এবং অবশ্যই অশ্বারোহী যোদ্ধা দেবতা। বিনয় ঘোষ অনুমান করেছেন, “পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের সাধারণ লোকদেবতা ‘ধর্মঠাকুর’ ক্রমে বর্ধমান, হাওড়া, হুগলীর ভিতর দিয়ে ভাগীরথীর তীরে এসে নিম্নবঙ্গে বাবাঠাকুর ও পঞ্চাননের কলেবর ধারণ করে, অবশেষে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ গণদেবতা শিব-মহাদেবে রূপান্তরিত হয়েছেন।” বিষয়টির জটিলতা এতটাই যে বর্ধমান জেলার জামালপুরের ধর্মঠাকুর বুড়োরাজের পূজায় নৈবেদ্যর মাঝে দাগ টেনে অর্ধেক ধর্মঠাকুরকে, অর্ধেক শিবকে দেওয়া হয়। ধর্মের গাজন, শিবের গাজন, নীলের গাজন- নানা নাম। রাঢ়বঙ্গে শিবের গাজন এবং ধর্মের গাজন আলাদা আলাদা দিনেই হয়ে থাকে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘গাজন’ অর্থে লিখেছেন “শিবের গাজন, ধর্ম্মের গাজনেরই পরিণাম।”

মন্দির থেকে ধর্মরাজকে পুকুর পাড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

বীরভূমের বোলপুর শান্তিনিকেতন থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে গোয়ালপাড়া গ্রাম। সেই গ্রামের ধরমপুজোর নির্দিষ্ট তারিখ বসন্ত পূর্ণিমার পরের পূর্ণিমা। এমনটাই চলে আসছে। বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে গ্রামের ধর্মঠাকুর পূজা পেলে তবেই স্থানীয় এলাকার অন্যান্য ধর্মঠাকুরের পুজো শুরু হয়। ‘শ্রীশ্রী বঁহড়াডিহি ধর্ম্মঠাকুর জিউ’ হল মূল ধর্মঠাকুর। এছাড়া আছে চাঁদ রায়, ফটিক রায়, মেঘ রায় এবং বুড়ো রায়। গ্রামের বাসিন্দা কালীশঙ্কর চট্টোপাধ্যায় হলেন মূল পূজারি। এই পরিবার পুরুষানুক্রমে গ্রামের ধর্মঠাকুরের পূজা করে আসছেন। পূর্ণিমার একদিন আগে উত্তরীয় গ্রহণ করে ভক্ত্যা হন নানা সম্প্রদায়ের মানুষ। মহিলা ভক্ত্যা যারা মাথায় আগুন নিয়ে ধরম তলায় আসেন তাদের স্থানীয় নাম ‘মহামেল’। এই বছর পুরুষ ভক্ত্যা ছিলেন ৫৬ জন। মহামেল ছিলেন ৮ জন। পূর্ণিমার দিন মুক্তস্নান।

মুকুট পরে চাঁদ রায়, পাশে ফটিকরায়, নিচে বানেশ্বর

পরদিন সকালে ‘মেঘগর্জন’ নামের একটি অনুষ্ঠানে গ্রামের আর এক প্রান্তে মেঘ রায়ের কাছে গিয়ে সমবেত কয়েকশ ঢাকি ঢাক বাজান। গোয়ালপাড়ার ধর্মরাজের গাজনে ‘মেঘগর্জন’ বীরভূমের অন্যতম একটা আকর্ষনীয় অনুষ্ঠান। গ্রামের প্রান্তে থাকেন দেবতা মেঘ রায়। তাঁর থানেই সবাই মিলিতভাবে ঢাকের গর্জন করেন। দূর থেকে শুনলে মনে হয় মেঘ গর্জন করছে। আসলে এ এক অনুকরণ মূলক যাদু বিশ্বাস। মেঘের দেবতাকে মানুষ বার্তা পাঠায় সময় হয়েছে তোমার গর্জন করার: এদিকে গরমে, জলের আকালে আর টেকা দায়। বীরভূম জেলার ঢাকিদের অলিখিত মিলন উৎসব বলা যায় একে। কোন নিয়ন্ত্রন নেই, ঢাক বাজাতে জানলেই এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন কেউ। তবে এই অলিখিত নিমন্ত্রণ কেবলমাত্র বীরভূম জেলার ঢাকিদের জন্য। সামান্য রাহা খরচ ছাড়াও কমিটির পক্ষ থেকে ঢাকিদের থাকা খাওয়ার বিশেষ আয়োজন করা হয়। হাজিরা খাতায় নাম লেখালেই প্রতি দুজনের জন্য একটি নতুন মাদুর, একতাড়া বিড়ি আর সামান্য মদ্যপানের স্লিপ দেওয়া হয় কমিটি থেকে। হাজিরা খাতায় নাম লিখিয়েই দলগুলি ধর্মরাজের সামনে বাদ্যযন্ত্র বাজান। তাদের আপ্যায়নে কোথাও ত্রুটি হওয়ার জো নেই। কারণ গোয়ালপাড়া গ্রামের প্রত্যেকটি পরিবারে এই অতিথিদের চারবেলা খাওয়ার জন্য আলাদা করে আয়োজন করা হয়। এবার সাড়ে পাঁচশোর বেশি ঢাকি এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় হাজার দেড়েক অতিথি। উদ্যক্তারা জানালেন, শিবের গাজন শুরু হয়নি বলেই এত ভিড়।

গাদি ঢাকি ও তার নাতি

বরাবরের মতো সুখবাজারের সুশীল দাস (গাদি ঢাকি) ছিলেন ‘মেঘগর্জন’ আসরের মূল বায়েন। তখন সকাল নটা পেরিয়েছে। তাঁকে অনুসরণ করেই বাকিদের ঢাক গর্জন করে উঠল। সুশীল দাসের বর্তমান বয়স পঁচাত্তর। তাঁর সঙ্গে আমরা কথা বলেছিলাম পূর্ণিমার দিন। তিনি জানালেন, “কতদিনের পুজো আমি বলতে পারব না। কেউ বলতে পারবে না। এখানের বাবা ধর্মরাজ নিজে গিয়ে আমার দাদামশাইকে স্বপ্ন দেয়। সেই স্বপ্নের নির্দেশে ঢাক বাজানোর প্রথাটা পরস্পর চলে আসছে। আমিও দেখচি। এর পরেও থাকবে। আর এই যে মেঘগর্জন প্রথাটা আর কোথাও নাই। আমি তো দেখি নাই। ওখানে মেঘ রায় ধরম আছে। সেও বাবা স্বপ্ন দিয়েছিলেন। আমার এখানে পুজর দিনে এই ডাঙাতে গর্জন করতে হবে। ডাঙাটা আছে গ্রামের পশ্চিম দিকে। নথিপত্র নিয়ে তো আমরা কাজ করিনা বাবা। বাল্যকালে দেখেছি তখন সাতশ আটশ ঢাকি হত। তারপরে আসতে আসতে কমে গেল। আবার যাক গতবার থেকে আবার যোগ দিয়েছে। এবছর পাঁচশ পেরিয়ে গেছে। শুধু ঢাক। অন্যান্য আরও আছে। শুধু ঢাক এসেছে পাঁচশ। তারপরে ধরুন ডঙ্কা আছে ডগর আছে তাসা আছে ব্যান্ড পার্টি আছে।” সুশীলবাবুর নাতি তন্ময় দাস জানালেন, “বাবার এমন একটা মহিমা আছে আমরা ছোট থেকে দেখে আসছি, গোটা বীরভূম ডিসট্রিক্টের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন যদি খবর পায় কেউ, সে এখানে চলে আসবে। এখানে ঢাকের জন্য অসুবিধা হবে না। আর এই গ্রামটাও খুব ধনী গ্রাম। আগে হয়তো এতটা ধনী ছিল না। বাবার মাহাত্মে এখন অনেকেই উন্নতি করেছে। ওদের একটা বাড়ি লিস্ট হয়ে যায়। ধরুন একশটা বাড়ি আছে। প্রথমে যখন আসে, ধরুন দশটা ঢাকি এল, দশটা বাড়িতে একটা একটা করে দিল। এদের সিস্টেম বুঝতে পারছেন তো? বাকি দুশো বাড়ি তখন গ্যাপিং আছে। এবার আবার আসলে আবার একটা একটা করে দিয়ে দিল। দুশো বাড়ি হলে একটা একটা করে দিল। আরও দুশো ঢুকছে? তখন আবার একটা একটা করে দিল। একটা বাড়িতে পাঁচটা নিতে হতে পারে দশটা নিতে হতে পাড়ে কুড়িটা নিতে হতে পারে। যারা যাবে তাদের কোন রকম অসুবিধা হলে কিন্তু পানিশমেন্ট হয়। চা থেকে শুরু করে টিফিন থেকে শুরু করে সবটাই ওদের দায়িত্ব। এই তিনদিন।”

মেঘগর্জন অনুষ্ঠানে ঢাকিরা জড় হচ্ছে

মেঘগর্জন অনুষ্ঠানের পরে ধরম পুকুরের পাড়ে বুড়ো রায়ের কাছে দোলায় চড়িয়ে চাঁদ রায়, ফটিক রায় এবং বাণেশ্বরকে নিয়ে আসেন ভক্ত্যারা। সারাদিন সেখানে সাধারণ মানুষ পূজা দেন। দুপুরে রাজ ভাঁড়াল নিয়ে গ্রাম পরিক্রমায় বের হন ভক্ত্যারা। মদে পূর্ণ রাজ ভাঁড়াল বুড়ো রায়ের কাছে ফিরে এলে বলি শুরু হয়। মেঘ রায়ের উদ্দেশ্যে যে শুকর বলি দেওয়া হয় তাই দেখতে ভিড় উপচে পড়ে। তরোয়ালের এক কোপে বলিদানের পরেই শুকরের কাটা মাথাটি রাজা ভাঁড়ালে পুরে নিমেষের মধ্যে ধরম পুকুরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ ভক্তরা পুকুরের জল সংগ্রহ করে বাড়ি নিয়ে যান মঙ্গল কামনায়।

‘ধরম পুজো’র সময় ক্ষেত্রসমীক্ষায় যাচ্ছি প্রায় এক দশক। পূর্বজদের সঙ্গে একমত হয়েই একসময় লিখেছিলামঃ বলি প্রথাই শিব ও ধর্মের গাজনে একমাত্র ভেদরেখা। ধর্মরাজের সামনে বলি হয়। শিবের সামনে বলি হয় না। মন্ত্র ছাড়া বাকি সব কৃত্য প্রায় এক। দেয়াশী, ভক্ত, বেতাসন, মুক্তস্নান, বাণেশ্বর, ফুল খেলা, গাজন, বিবাহ, চড়ক। কিন্তু আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেদরেখা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ধর্ম ঠাকুরের পূজায় ‘রাজ ভাঁড়ালে’ দেশীয় পদ্ধতিতে বাখর দিয়ে শস্য গাঁজান (Fermentation) হয়। ভক্তরা সেই বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি মদকে মহাপ্রসাদ মানেন। শিবের গাজনে মদ এবং গাঁজার ব্যবহার চোখে পড়লেও উপাসনার অঙ্গ হিসেবে গাঁজান পদ্ধতির ব্যাবহার এখনও পর্যন্ত আমাদের চোখে পড়েনি। হান্টার সাহেবের মতে সম্মতি দিয়ে শিব ও মারাং বুরুকে এক দেবতা হিসেবে ধরে নিলে বলা যায়ঃ আদিবাসীরা আজও মারাং বুরুর উপাসনায় নৈবেদ্য হিসেবে পচাই বা হাঁড়িয়া দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রেও উপাসনা স্থলে শস্য গাঁজিয়ে মদ তৈরির রেওয়াজ নেই। “সাঁওতালী ধর্ম বিশ্বাসে মারাং বুরু কর্তৃক মদ্যের হাণ্ডা তৈরি করার কথা বিবৃত হয়েছে। ঐ খাদ্য তৈরি হবার পর মারাং বুরুর আদেশে তাঁকে পূজা করে পাতার ঠেঙায় ঐ মদ্য পান করা হয়েছিল।” ভাঁড়াল খেলা বা ভাঁড়াল নাচ ধর্ম পূজার অন্যতম কৃত্য। মাথায় রাজ ভাঁড়াল নিয়ে প্রধান ভক্ত নৃত্য করতে করতে গ্রাম প্রদক্ষিণ করেন। কোথাও ভক্তদের এক এক করে ভাঁড়াল থেকে অল্প পরিমাণে মদ দেওয়া হয় পান করার জন্য। কোথাও সেই মদ নিজের কাছে থাকা মাটির পাত্রে নিয়েই দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে মেতে ওঠেন ভক্তরা। বুদ্ধ পূর্ণিমায় পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরে যে ধর্ম পুজো হয় সেখানে মাটির হাঁড়িতে ভাত পচিয়ে মদ তৈরি করে তা মাথায় নিয়ে নাচতে নাচতে ভক্তরা ধরমতলায় আসে। জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় বীরভূমের নানুর থানার বড়া গ্রামে যে ধরম পুজো হয় সেখানে গাঁজানো মদের ভাঁড়াল নিয়ে নৃত্য করে ভক্তরা। পূর্ব বর্ধমানের কোমরপুরে স্নান যাত্রার দিন যে ধরম পুজো হয় সেখানে ভক্তদের নিজস্ব ভাঁড়ে মদ দেওয়ার পরেই শুরু হয় ভাঁড়াল নাচ। শেষ ভক্তের হাতে তুলে দেওয়া হয় রাজ ভাঁড়াল। তবে উত্তরীয় খোলার আগে সেখানে ভক্তরা কেউই মদ্যপান করেন না। আমাদের চোখেই বিষয়টি ধরা পড়েছে এমন নয়। ডঃ অমলেন্দু মিত্র তাঁর ‘রাঢ়ের সংস্কৃতি ও ধর্মঠাকুর’ গ্রন্থে পাঁচ দশক আগেই অসংখ্য প্রমাণ দিয়েছেন ভাঁড়াল খেলার। সরাসরি কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছিঃ —

১ “একটি বড় ভাঁড়াল দেয়াশীর বাড়ি থেকে আনা হয়। একে বলা হয় মাণিক ভাঁড়াল। এই ভাঁড়ালে থাকে বাখর, এলাচ, লবঙ্গ, আতপ, পাকাকলা, পান, সুপারি ইত্যাদি। এটি ধর্মতলায় আনার পর ধর্মঠাকুরকে ডাক দিতে দিতে মদ্য তৈরি হয়ে গাঁজিয়ে উঠে উপচে মাটিতে পড়তে থাকে (গ্রাম কালীপুর, ছিনপাই, কচুজোড় )।”

২ “(লখীন্দরপুর গ্রামে) ভক্ত্যারা মদের দোকান থেকে মাথায় ভাঁড়াল নিয়ে ছুটে আসে ও ধর্মরাজতলায় যায়।”

৩ “ঘুরিষা গ্রামে আটদিন আগে থেকে মাঠ তোলা হয়। অর্থাৎ মদ্য তৈরির ব্যবস্থা করা হয়। কামারহাটি ও শ্রীকণ্ঠপুরেও তাই।”

৪ “গ্রাম ভবানীপুরে পূর্ণিমার পূর্বদিন গ্রামান্তরে একটি মদের জালাকে পুজা করা হয়।”

৫ “লাঙ্গুলিয়া গ্রামে ধর্মশিলাকে পূর্ণিমার দিন মদের দোকানে নিয়ে গিয়ে মদ দিয়ে স্নান করানো হয়। জলে স্নান করানোর বিধি নেই।” … ইত্যাদি। ধর্মের ভাঁড়ালে দুধ, গঙ্গাজল বা জলের অনুপ্রবেশে যে পরবর্তী কালের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাব আছে সেই বিষয়ে ডাঃ মিত্রের সঙ্গে আমরা একমত।

ধর্মমঙ্গল কাব্যে আমরা একাধিক বার ‘গাজন’ শব্দের প্রয়োগ দেখেছি। যেমন —

ক) ‘আদ্যের গাজনে খেলে হাথে লয়্যা ভেটা।

আমি কি ভক্ষণ করি তোর লুঞা বেটা।।’ (রূপরাম চক্রবর্তী)

খ) ‘শুভ কর্ম্মে বিফল বিলম্বে কিবা কাজ।

গাজন আরম্ভ কর পূজি ধর্ম্মরাজ।।’ (ঘনরাম চক্রবর্তী)

কৃষি দেবতা শিব ও ধর্মের পুজো পদ্ধতির নির্দিষ্ট পার্থক্যটি দেখে আমাদের অনুমানঃ ‘গাজন’ শব্দটির উৎপত্তি, সংস্কৃত ‘গর্জ্জন’ থেকেও নয়, ‘গ্রাম-জন’ থেকেও নয়। বাংলা প্রচলিত শব্দ ‘গাঁজ’, যার অর্থ ‘মাতিয়া ওঠা’। বাংলায় ভাব ও করণবাচ্যে ‘অন’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। অতএব গাঁজ+অন= গাঁজন। অর্থ হল পচন, ফেনাইয়া ওঠা। ‘গাঁ(গেঁ)জান’ শব্দের অর্থ ‘মাতিয়ে তোলা’। [‘বেশি গাঁজাস না’]। সংস্কৃত ‘গঞ্জিকা’ শব্দের অর্থ ‘মদিরাগৃহ’। দেশি ‘গংজা’ শব্দের অর্থ ‘সুরাগৃহ’। আমাদের মতে গাঁজ > গাঁজন> গাজন — হওয়াটাই ব্যাকরণ সম্মত। প্রথমে ‘বাংলা কৃৎ-প্রত্যয়’ যুক্ত হয়েছে বাংলা ভাষার নিজস্ব ধাতু ‘গাঁজ’ শব্দে। পরে আদি ব্যঞ্জনলোপ পেয়েছে। অতএব আমাদের সিদ্ধান্ত— যে দেবতার অলৌকিক ক্ষমতায় গাঁজান পক্রিয়ায় মদ তৈরি হয় সেই দেবতাকে স্মরণ করতেই কৃষক সমাজ মেতে ওঠে গাজনে। শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল দেখিয়েছেন, অষ্ট্রিক ধর্ম্ম ঠাকুরের ‘ধর্ম্ম-নিরঞ্জন’ ও নাথযোগী সম্প্রদায়ের ‘নাথ-নিরঞ্জন’ মিলে মিশে গেছেন শিব ঠাকুর ও ধর্ম্মঠাকুরের সংমিশ্রণের মতই। গোর্খনাথের জাতি পরিচয় দিতে গিয়ে তাঁকে স্বর্ণকার ও তেলী-র পাশাপাশি ‘চোলাই উৎপাদক’ হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল।

“এইবাঁ মদ শ্রী গোরখ কেবট্যা, বদংত মছীংন্দ্রনা পূতা,

জিনি কৈবট্যা তিনি ভরি ভরি পীয়া, অমর ভয়া অবধূতা।

(সমস্ত মল অপগত হইয়া কেবল সারভাগ মদিরারূপে উৎরাইয়াছে।) শ্রীগোরখনাথ এইরূপ মদ চোলাই করিয়াছেন। মছংদরনাথের পুত্রশীষ্য বলেন, জিনি মদ তৈয়ারী করেন তিনি আকণ্ঠ পান করেন; আর (যিনি পান করেন) সেই অবধূত অমর হইয়া যান।” ধর্মঠাকুরের গাজনে ভাঁড়াল খেলায় ও নৃত্যে নাথযোগী গোর্খনাথ এইভাবে আজও পূজা পেয়ে চলেছেন এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায়। রূপরাম চক্রবর্তী প্রণীত ধর্মমঙ্গল কাব্যের ‘স্থাপনা পালা’ অংশে একবার মাত্র মদের পুষ্করিণীর উল্লেখ পাই যেখানে অর্ঘ্য হিসেবে মদ ব্যবহৃত হয়েছে।

“তবে আদ্য পূজা দিল আশ্বোয়া চণ্ডাল।

মদের পুষ্কর্ণি দিল পিষ্টের জাঙ্গাল।”

মনে রাখতে হবে, মানুষ নামের প্রাণী হয়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই আমরা মদ খাচ্ছি। বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মদকে যে আমরা বিপাক ক্রিয়ায় সহ্য করে নিতে পারছি তা গরিলা, শিম্পাঞ্জিরা পারলেও ওরাংওটাং পারেনা, বেবুন পারেনা। মায়োসিন যুগের মাঝামাঝি সময়ে একটা বড় প্রাকৃতিক পরিবর্তন হয়। এর ফলে পূর্ব আফ্রিকার ইকোসিস্টেম বদলে গিয়ে বড় বড় ঘাস ও ফলের লতায় মাঠ ভরে যায়। মনে করা হয় তখন আমাদের পূর্বপুরুষদের পূর্বজরা আরও বেশি ফল খাওয়া শুরু করে। মাটিতে জন্মানো ফল পেকে পচলে খুব দ্রুত প্রাকৃতিক নিয়মে তার শর্করা পরিণত হয় ইথাইনলে। এই ধরণের ফল খাওয়ার অভ্যাস থেকেই মদকে ভেঙে ফেলার এনজাইম নিঃসরণের সূত্রপাত এককোটি বছর আগে। অ্যালকোহলকে বিপাক ক্রিয়ায় ভেঙে ফেলে যে ADH4 এনজাইম, তার উৎস খুঁজতে গিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভালো মদের জন্য অনবরত খোঁজ করতে করতে মানুষ নতুন নতুন শস্যকে খুঁজে পেয়েছে। নতুন শস্য মানেই নতুন মদ। যব, চাল, গম, আঙুর, বেরি জাতীয় ফল গাঁজিয়েই মদ তৈরি হত, এখনও তাই হয়। মিশর, ব্যবিলন, সুমের, হরপ্পা সর্বত্র ভাটিখানা ছিল। সুরা ছিল ইন্দ্রের পছন্দের পানীয়। অন্তত চারহাজার বছর আগে সুমেরিয়রা, মিশরীয়রা চিকিৎসার কাজে অ্যালকোহলের ব্যাবহার করতেন। হিব্রু বাইবেল অবসাদগ্রস্ত বা মৃতপ্রায় ব্যক্তিকে মদ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। আনুমানিক দশ হাজার বছর আমরা বিয়ার জাতীয় পানীয় খাচ্ছি। ভারতের জনপ্রিয় পানীয় ‘তাড়ি’, ‘হাঁড়িয়া’ও তৈরি হয় গাঁজান পদ্ধতিতে। ভাত গাঁজিয়ে পান্তা খেয়ে যে দেশের মানুষ গ্রীষ্মে বর্ষায় স্বাস্থ্য ধরে রেখেছেন তারা তো এই উৎসবে মাতবেনই। ‘গাঁজান’ পদ্ধতিতে একমাত্র দেশি মদ-ই তৈরি হয় এমন নয়। ব্রেড, চিজ, বিয়ার, ওয়াইনও তৈরি হয়। পাট পচিয়ে পাটের তন্তু বের করা হয়, নীল গাছকে গাঁজিয়ে নীল রঙের বটিকাও তৈরি হয়। পৃথিবীর প্রাচীন দেবতা মাত্রই তার উপাসনায় মদের ব্যাবহার লক্ষ্য করা গেছে। মদ দীর্ঘদিন তৈরি হয়েছে গাঁজানো (Fermentation) পদ্ধতিতে। অনেক পরে পাতন প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে মদ তৈরি শুরু হয়। ইষ্ট বলে আলাদা করে তখন কিছু ছিল না। মানুষের পক্ষে তখন এই পক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা ও মিশরীয় সভ্যতার মানুষ মনে করতেন তাদের উপাস্য দেবতাই এই অদ্ভুত অলৌকিক কাণ্ড ঘটাচ্ছেন। অতএব এই অলৌকিক ঘটনার উদযাপন প্রয়োজন।

 

বাঙালীর আদি অস্ত্রাল যোগাযোগ বুঝতে হলে অন্ত্যজের পরব পার্বণগুলি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এখনও পর্যন্ত আমরা যতদূর পর্যবেক্ষণ করেছি তাতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছি। দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণের কারণে হয়তো কিছু নতুন দিকে আলো ফেলতেও পারছি। কিন্তু সব দেখা হয়ে গেছে এমন বলার ধৃষ্টতা আমাদের নেই। গাজন নিয়ে আগামীদিনে আরও নতুন নতুন কাজ হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

সহায়ক গ্রন্থ

১। রাঢ়ের সংস্কৃতি ও ধর্মঠাকুর : ডঃ অমলেন্দু মিত্র

২। গোর্খ-বিজয়: সম্পাদনা শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল

৩। রূপরামের ধর্ম্মমঙ্গল — সম্পাদনা শ্রীসুকুমার সেন ও শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল

৪। শ্রীশ্যামপণ্ডিত ও ধর্মদাস বণিক বিরচিত ধর্মমঙ্গল (নিরঞ্জন মঙ্গল): সম্পাদনা ডঃ সুমিত্রা কুণ্ডু

৫। Evolution: the Human Story: Dr. Alice Roberts

৬। সরল বাঙ্গালা অভিধান — সুবলচন্দ্র মিত্র

৭। বঙ্গীয় শব্দকোষ — হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

৮। শ্রীধর্ম্মমঙ্গল — ঘনরাম চক্রবর্তী প্রণীত

 


আপনার মতামত লিখুন :

6 responses to “গোয়ালপাড়ার ধর্ম ঠাকুর এবং ‘গাজন’ শব্দের উৎস বিষয়ে দু-চারকথা : সুব্রত ঘোষ”

  1. ভালো লাগলো।
    এত বৈচিত্র্য আছে, জানতাম না।
    ধন্যবাদ আপনাকে।

  2. বিশ্বেন্দু নন্দ says:

    দারুন সুব্রত।

  3. Pradyot Bhattacharyya says:

    সত্যিই অদ্ভুত লেখাটা খুব ভালো লাগলো ।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন