কুন্তি
কুন্তির আসল নাম পৃথা। তিনি শ্রীকৃষ্ণের পিসি। একবার মহর্ষি দুর্বাসা অতিথিরূপে গৃহে এলে কুন্তি তাঁকে আতিথেয়তা ও পরিচর্যায় সন্তুষ্ট করেন। দুর্বাসা তাঁকে এক অমোঘ মন্ত্র শিখিয়ে দিয়ে বলেন যে, এই মন্ত্রের প্রভাবে কুন্তি যে-দেবতাকে স্মরণ করবেন সেই দেবতাই তাঁর নিকটে আসবেন এবং তাঁর সাহায্যে কুন্তির পুত্রলাভ হবে। বর পেয়ে যে কোনো দেবতার সঙ্গে পুত্রসন্তান জন্মাতে পারবেন জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে কিছু না বুঝেই কিশোরী কুন্তি কৌতূহলবশত মন্ত্রের গুণাগুণ পরীক্ষা করার জন্যে সূর্যদেবকে ডেকে বসেন। আসলে কুমারী কুন্তিদেবী গুরুদেবের দেওয়া মন্ত্রের গুরুত্ব না বুঝে ভুলক্রমে বিবাহের পূর্বে সন্তান প্রার্থনার মন্ত্রটা পাঠ করে ফেলেছিলেন। ফলে অবিবাহিত অবস্থায় তাঁর গর্ভে জন্ম নেন কর্ণ। সূর্য যথারীতি চলে যান নিজ গৃহে কুন্তির গর্ভে সন্তানের ভ্রূণ প্রতিস্থাপন করে। তবে কুন্তি যে জেনেশুনেবুঝে সূর্যকে ডাকেননি এটা বুঝতে পেরে সূর্য কুন্তিকে পুনরায় কুমারীত্বে ফিরে যাওয়ার আশ্বাস দেন পুত্রজন্মের পর, এবং সেটা ঘটে। কৌমার্য হারালে কুন্তির আর বিয়ে হতো না। যথাসময়ে পুত্র কর্ণের জন্ম হয়। মা-বাবা বা সমাজ কেউ কুন্তিকে এই অবস্থায় গ্রহণ করতে পারবে না বলে পুত্র কর্ণকে তিনি জলে ভাসিয়ে দেন। এক সন্তানহীন রথচালক ও তার স্ত্রী আদি রাধা কর্ণকে প্রতিপালন করেন। অতঃপর স্বয়ংবর-সভার মাধ্যমে কুন্তির সঙ্গে বিয়ে হলো পান্ডুর। পান্ডু সন্তান উৎপাদনক্ষম ছিলেন না। হরিণের বেশে রতিক্রিয়ায় রত দুই ঋষিকে শিকার করায় তাঁর প্রতি দেবতার অভিশাপও ছিল, কোনো নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করলেই তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। পান্ডু কুন্তিকে অনুরোধ করেন, দুর্বাসার দেওয়া মন্ত্রের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন করতে। কুন্তি তখন একে একে তিন ধর্মদেবতাকে স্মরণ করে তিন পুত্র লাভ করেন। যমরাজের সঙ্গে জন্ম নেন যুধিষ্ঠির, বায়ুর সঙ্গে ভীম আর ইন্দ্রের সঙ্গে অর্জুন। পৌরুষত্বহীন, নির্জীব পান্ডুকে বিয়ে করে শরীরের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করতে পারেননি কুন্তি। কিন্তু মন্ত্র ও বরের শক্তিতে তিন দেবতাকে দিয়ে তিন পুত্রের জননী হয়েছেন। এছাড়া, পান্ডু অন্য স্ত্রী মন্দ্রাকে সেই গোপন মন্ত্র শিখিয়ে তাঁর দ্বারাও পান্ডুকে দুই পুত্র, সহদেব আর নকুল, দান করতে সমর্থ হন কুন্তি। এসবই করেছেন তিনি হস্তিনাপুরে নিজ বংশের উত্তরাধিকারী তৈরি করার জন্যে। পঞ্চপান্ডবেরই জন্ম নিয়োগ-পদ্ধতিতে। মন্দ্রার প্রতি একদিন অপ্রতিরোধ্য কামভাব জাগ্রত হলে রতিক্রিয়ার সময়ে পান্ডু অভিশাপের শর্ত-অনুযায়ী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সঙ্গে সহমরণে যান প্রথম স্ত্রী কুন্তি নন, কনিষ্ঠা স্ত্রী মন্দ্রা। তবে মন্দ্রার দুই ছেলেকে কুন্তি নিজের ছেলের মতো করে বড় করেন। ক্ষমতা ও শক্তির খেলায় কুন্তি খুবই পারদর্শী ছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের একপর্যায়ে তাঁর নিজের পুত্র যুধিষ্ঠির ও ভাইয়ের (বাসুদেব) পুত্র কৃষ্ণ যখন যুদ্ধ বন্ধ করতে সমঝোতায় যেতে চেয়েছিলেন, কুন্তি তাঁদের তিরস্কার করে আবার যুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং দুর্যোধনকে হত্যা করতে বিশেষভাবে আদেশ করেছিলেন। উন্মুক্ত সভাস্থলে দ্রৌপদীর পরিধেয় বস্ত্র খুলে নেওয়ার চেষ্টার অপমান কুন্তি কখনো ভুলতে পারেননি। কুন্তির প্রথম পুত্র কর্ণ (বিবাহের আগে যাঁর জন্ম) যখন কৌরবদের সেনাপতি হিসেবে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, মা কুন্তি তখন বাধ্য হয়ে তাঁর নিজ পরিচয় দিয়ে কর্ণকে বোঝাতে চান, পান্ডবদের একই মায়ের পেটের ভাই সে। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়া অনুচিত। ফলে দেখা যায় কুন্তি একদিকে যেমন ঘোর বাস্তববাদী, অন্যদিকে তেমনি ক্ষমতালোভী এবং কৌশলী। তা নইলে কর্ণকে অস্বীকার ও পরিত্যাগ করতেন না জন্মের পরেই, তেমনি আবার পান্ডবদের ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে কর্ণকে ফিরিয়ে আনতে স্বপরিচয় প্রদানেও দ্বিধান্বিত হতেন। কুন্তিই একমাত্র রাজনৈতিক নারীচরিত্র মহাভারতে। রবীন্দ্রনাথ কর্ণ-কুন্তী সংবাদে কুন্তির মুখ দিয়ে কর্ণকে পান্ডবদের হয়ে যুদ্ধ করতে যে বলেছিলেন, আসলে মহাভারতে তার বেশিরভাগ কথা শ্রীকৃষ্ণ আগেই কর্ণকে বলেছিলেন। কর্ণের সঙ্গে কুন্তির কথোপকথন সেখানে ছিল অনেক সংক্ষিপ্ত। তবে কর্ণ-কুন্তি আলাপ মহাভারতে যতটা রাজনৈতিক, রবীন্দ্রনাথের কর্ণ-কুন্তী সংবাদে সেটি ততটা চোখে পড়ে না। রবীন্দ্রনাথ কুন্তিকে আরো বেশি মানবিক, প্রকৃত একজন মা হিসেবেই চিত্রণ করেন। মহাভারতে কর্ণ সূর্যের তপস্যা করেন এবং সূর্য তাঁকে নির্দেশ দেন করণীয়ের ব্যাপারে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কর্ণ-কুন্তী সংবাদে সূর্যের নির্দেশের ব্যাপারটা উপেক্ষা করে কাহিনিটিকে পৌরাণিকতা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
গান্ধারী
মহাভারতের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র। গান্ধারী, মহাভারতে বর্ণিত হস্তিনাপুরের জন্মান্ধ মহারাজা ধৃতরাষ্ট্রের সহধর্মিণী, নরেশ-শকুনীর বোন ও দুর্যোধনসহ শত পুত্রের মাতা। সততা, ধর্মনিষ্ঠা, স্বামীভক্তি এবং পরিস্থিতিকে সহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন চারিত্রিক দৃঢ়তা মহাভারতের অন্য কোনো নারীচরিত্রের মধ্যে দেখা যায় না। তবে তাঁর চরিত্রের সকল রূপকে যে রূপটি ঢেকে দিয়েছে, তা হচ্ছে, পুত্রস্নেহ। যদিও পঞ্চপান্ডব ও কুন্তির সঙ্গে শক্তি ও ক্ষমতার রেষারেষি ছিল কৌরবদের এবং গান্ধারীরও, তাহলেও এই শক্তি প্রদর্শনে গান্ধারী কখনো তাঁর যুক্তি, ন্যায়পরায়ণতা, ধর্ম থেকে বিচ্যুত হননি। এছাড়া যখন যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের সঙ্গে পাশা খেলায় হারতে হারতে শেষ পর্যন্ত দ্রৌপদীকে বাজি ধরেও হেরে যায়, তখন দুর্যোধনের আদেশে দুঃশাসন সর্বসম্মুখে দ্রৌপদীর শাড়ি খুলতে থাকে, সভাকক্ষে উপস্থিত ভীষ্ম, কর্ণসহ কেউ কিছু বলেন না। ধৃতরাষ্ট্র প্রথমে প্রতিবাদ করলেও পরে চুপ হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত এর বিরোধিতা করেন শুধু একজন বিবেকবান নারী, তিনি গান্ধারী, যিনি এটাকে অধর্ম বলে পরিত্যাজ্য মনে করেন। তিনি এই কুকর্মের জন্যে পুত্রকেও ত্যাগ করতে বলেন স্বামীকে। ধৃতরাষ্ট্র যখন বলেন, তাহলে কী নিয়ে তিনি থাকবেন, গান্ধারী বলেন, ‘ধর্ম’। শত বিপদেও তিনি অধর্মের পথে চলেননি, সততার সঙ্গেও রফা করেননি। এত শত্রুতা সত্ত্বেও কুন্তির সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখেন। পাশা খেলায় হেরে দ্রৌপদীসহ পঞ্চপান্ডব যখন বনবাসে যান, তাঁরা গান্ধারীর কাছে বিদায় নিতে আসেন। গান্ধারী তাঁদের আশীর্বাদ করেন। স্বামী অন্ধ ছিলেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, স্বামীর মতো এ-পৃথিবীর আলো তিনিও দেখবেন না। তাই স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছিলেন অন্ধত্ব। শত পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের কাউকে কখনো চোখে দেখেননি। সততার কারণেই পুত্রদের প্রতি স্বামীর অন্ধ ভালোবাসাকে যেমন মেনে নেননি, তেমনি ভ্রাতা শকুনীর কূটচালকেও প্রশ্রয় দেননি। ধর্মের প্রতি তিনি ছিলেন অবিচল। তিনি জানতেন, তাঁর ছেলেরা অধর্মের পথে আছে। তাই কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ তিনি চাননি। তবু অনিবার্য সে-যুদ্ধ শুরু হলে তিনি নিজ পুত্রদের দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ দিলেও বিজয়ের আশীর্বাদ দেননি। অধর্মী পুত্রের বিজয় তিনি চাননি সত্য। তবে তাঁদের ধ্বংস এড়াতে শেষ পর্যন্ত সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছেন। তিনি তাঁর ছেলেকে দীর্ঘজীবী দেখতে চেয়েছিলেন। এই কারণে স্বামীর প্রতি আনুগত্যের নির্দশন সেই স্বেচ্ছা অন্ধত্বকেও কিছুক্ষণের জন্য তিনি ত্যাগ করেছিলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের এক পর্যায়ে দুর্যোধনের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যেই তাঁর সকল শক্তিশালী পরামর্শক ও নেতা – ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য ও কর্ণ – নিহত হয়েছেন। দুঃশাসনসহ নিরানববই ভাই নিহত হয়েছেন। এই চরম দুঃসময়ে গান্ধারী দুর্যোধনকে বললেন সন্ধি করার জন্য। বরাবরের মতোই উদ্ধত দুর্যোধন তাতে রাজি হলেন না। গান্ধারী বুঝলেন ছেলের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, তবু শেষ চেষ্টা করলেন। দুর্যোধনকে তিনি বললেন, নগ্ন অবস্থায় গঙ্গায় স্নান করে সে-অবস্থাতেই তাঁর কাছে আসার জন্য। দুর্যোধন বিব্রতবোধ করলে গান্ধারী বললেন, মায়ের সামনে ছেলের নগ্নাবস্থা বিব্রত হওয়ার মতো কিছু নয়। তাছাড়া দুর্যোধন তো তাঁর কাছে সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের মতোই, যেহেতু তাঁকে তিনি কোনোদিন দেখেননি। দুর্যোধন নগ্ন অবস্থায় গঙ্গায় স্নান করতে গেলেন। ফেরার পথে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা হলো। চতুর শ্রীকৃষ্ণ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে দুর্যোধনকে বললেন, রাজপুত্রের এ বেশ শোভা পায় না। দুর্যোধন জানালেন, মায়ের আদেশেই তিনি এটি করেছেন। শ্রীকৃষ্ণ বললেন, এ-অবস্থায় একজন সাবালক সন্তানের পক্ষে মায়ের সামনে যাওয়াটা সভ্যতার পর্যায়ে পড়ে না। শ্রীকৃষ্ণের কথায় প্রণোদিত হয়ে দুর্যোধন শরীরের নিম্নাংশটিকে কলাপাতায় আবৃত করে মায়ের সামনে গেলেন। গান্ধারী তাঁর চোখের আবরণ খুললেন। অবাক বিস্ময়ে জীবনে প্রথম নিজ পুত্রকে দেখলেন। পরে ব্যথিত হয়ে বললেন, ‘পুত্র! আমি তোমাকে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আমার কাছে আসতে বলেছিলাম। জীবনের এই চরম ক্ষণেও তুমি আমার কথা শুনলে না। যদি তুমি আমার কথা শুনতে তবে তুমি নিরাপদ হয়ে যেতে। কারণ তোমার শরীরের যে-অংশে আমার দৃষ্টির আলোকচ্ছটা লেগেছে, সে-অংশ সকল অকল্যাণ থেকে মুক্তি পেয়েছে। যদি তুমি নগ্নাবস্থায় আসতে তবে তোমার পুরো শরীরই রক্ষা পেত।’ উদ্ধত দুর্যোধন বললেন, ‘এতেই চলবে। আগামীকাল আমি ভীমের সঙ্গে গদাযুদ্ধ করব। এ-যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে কেউ শরীরের নিম্নাংশে আঘাত করতে পারে না। শরীরের বাকি অংশ যেহেতু নিরাপদ সেহেতু ভীম আমার কিছুই করতে পারবে না। আমিই ভীমকে এমন আঘাত করব যে, সে নিশ্চিত মারা যাবে।’ পরদিন যথারীতি গদাযুদ্ধ হলো। ভীম কিছুতেই দুর্যোধনের সঙ্গে পেরে উঠছিল না। উপায় না পেয়ে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে যুদ্ধের নিয়ম ভঙ্গ করে ভীম কাপুরুষের মতো দুর্যোধনের নিম্নাংশে আঘাত করে তাঁকে হত্যা করেন। একশ কৌরবকে খুন করে যুদ্ধে জিতে যুধিষ্ঠির যখন গান্ধারীর সঙ্গে দেখা করলেন, বাঁধা চোখের সামান্য ফাঁক দিয়ে পুত্রহারা শোকাতুরা, আহত ও ক্রুদ্ধ গান্ধারী যুধিষ্ঠিরকে সামান্য দেখলেন, তাঁর সেই দৃষ্টির তীক্ষ্ণতায় যুধিষ্ঠিরের শরীর আংশিকভাবে পুড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘গান্ধারীর আবেদন’ কাব্যনাটকে মহাভারত আখ্যান থেকে তুলে আনা এক ঘটনাকে অসাধারণ এবং কালজয়ী এক শিল্পকর্মে পরিণত করেছেন। সব মানুষ ও সর্বকালের জন্য রচনা করেছেন তিনি ‘গান্ধারীর আবেদন’। গান্ধারীর ব্যক্তিত্ব এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তাঁর আগ্রহ ও দৃঢ় অবস্থান, আবার সেইসঙ্গে সন্তানের দীর্ঘ জীবনের জন্যে তাঁর আকুতি তাঁকে অনন্য এক নারীতে পরিণত করেছে। সত্যের এবং ন্যায়ের জন্যে প্রয়োজনে নিজ সন্তানকে শাস্তিপ্রদানে পিছপা নন গান্ধারী। মহাভারতের গান্ধারীর চাইতেও রবীন্দ্রনাথের গান্ধারী অধিক সাহসী, প্রাজ্ঞ এবং সৎ।
ঋণস্বীকার প্রচ্ছদ ছবি নন্দলাল বসু