| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইয়ে দুর্গা কাঁহাসে আয়ী : নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

Reporter
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী / ১১০৮ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২২

মহামতি দিলীপ ঘোষের প্রশ্ন, ‘ইয়ে দুর্গা কাঁহাসে আয়ী’—এবার দেখ দুর্গা কাঁহাসে আয়ী

প্রথমেই একটা বৃহৎ-কথায় আসি—দুর্গা কাঁহাসে আয়ী? এমন ভয়ঙ্কর এক মৌলিক প্রশ্ন ৫১২১ বছরের কল্যব্দে কেউ করেনি। আর এখন বৃহদারণ্যকের সেই ব্রহ্মর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যও নেই যে, স্বয়ং ব্রহ্ম কোথায় ওতপ্রোত আছেন—এইরকম একটা সাংঘাতিক প্রশ্ন শুনেই ‘রেডি রিঅ্যাকশনে’ বলবেন— অ্যাই চোপ্‌। আর একটা কথা বলিস যদি, তোর মুন্ডুটা খসে পরবে ধর থেকে—যে দেবতা প্রশ্নের অতীত যাঁকে নিয়ে প্রশ্ন করার ক্ষমতাই নেই, তাকে নিয়ে অতি প্রশ্ন করো না, এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে— মাতিপ্রাক্ষীর্মা তে মূর্ধা ব্যপপ্তদ্‌, অনতিপ্রশ্ন্যাং বৈ দেবতাম্‌ অতিপৃচ্ছসি। এটাও ঠিক একই কথা—অতিপ্রশ্ন। এখন আমার মতো একজন সদ্‌ব্রাহ্মণ (কলির বামুন ঢোঁড়া সাপ) যদি সেই ত্রিকালজ্ঞ প্রশ্নকর্তাকে বলি—তোর মুন্ডু খসে পরবে। তাহলে তার প্রথম সমস্যা হবে—মুন্ডু গেলে খাবেটা কী? আর দ্বিতীয় সমস্যা, এই ভোটের বাজারে মুন্ডু গেলে আত্মধ্বংসের জন্য এই প্রতিপ্রশ্নগুলি করবে কে?

তবে এটাও খুব স্বস্তির কথা যে, মূর্খামির জন্য ব্রহ্মদর্শী যাজ্ঞবল্ক্যের ধমকটা অভিশাপ নয় বলেই বৃহদারণ্যক উপনিষদের সেই প্রশ্নকর্তার মুন্ডুটা খসে পড়েনি, বোধকরি—অভিশাপ হলেও মুন্ডুটা খসে পড়তো না। কেন না ধমক বা অভিশাপের প্রয়োজন ততটুকুই, যাতে অজ্ঞ-মূর্খের সহসা-মুখর অতিপ্রশ্নগুলি সাময়িক-ভাবে স্তব্ধ হয়। এই জন্য (সাময়িক ভাবে) বললাম যে, অকারণে এবং অপ্রসঙ্গে মুখর হওয়া যার স্বভাব, সে পুনরায় নূতন কোনও অপ্রসঙ্গে নূতন মূর্খামি করে বসবে। তা নইলে এই শ্যাম বঙ্গদেশে প্রায় সমস্ত গৃহকুটীতে পূজিত-প্রতিষ্ঠিত, সেই প্রিয় দেবতার ব্যাপারে এমন সন্দিহান প্রশ্ন তৈরি হয়—রামকে পূর্বজকা নাম মিলা হ্যায় অর্থাৎ রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষদের নাম পাওয়া যায়— অর্থাৎ তাঁর একটা বংশপরিচয় আছে, অতএব বংশগরিমাও আছে— দুর্গার কী সেসব আছে? কোনও বংশমহিমা?

এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে দুটো উলটো প্রশ্ন আসে। প্রথম কথা ভগবান রামচন্দ্রকে তাহলে কীভাবে দেখছেন? পুরোপুরি মানুষ হিসেবে দেখছেন তো? তাহলেই বিচার্য হবে কোন অভিজাত বংশে, কোন কুলীন বংশে তাঁর জন্ম। এখানে উত্তর একটাই। যতবড়ো বংশমহিমাই থাকুক, এঁদের কিন্তু কোনও ‘টাইটেল’ ছিল না। রামচন্দ্র দ্বিবেদী, চতুর্বেদীও নন, কিংবা বর্মা, চৌহানও নন। তিনি রামচন্দ্র। কখনও বাপের নামে, কখনও বাবার বাবা, তাঁরও বাবা এমকী চতুর্দশতম পূর্বজ বিখ্যাত পুরুষের নামে তাঁদের পরিচয় প্রতিপন্ন হত— যেমন দাশরথি রাম, রাম রাঘব, রঘুপুঙ্গব, অথবা ইক্ষ্বাকূলাং কুলে জাত:— তিনি বিখ্যাত ইক্ষ্বাকু-বংশে জন্মেছেন। এই যে রামচন্দ্রের পূর্বজদের নাম পাওয়া গেল— যেমনটি এই বিতর্কের প্রস্তাবক স্বয়ং সগর্বে বলেছেন— রামকে পূর্বজকা নাম মিলা— মুশকিল হচ্ছে, পূর্বজদের নামটুকুই যদি একজন মানুষের মহত্ত্ব, বৃহত্ত্ব অথবা পূজ্যত্বের পরিমাপক হয়, তাহলে ভারতবর্ষে চন্দ্রগুপ্ত থেকে আকবর, অথবা এই বাংলায় লক্ষ্মণসেন থেকে সিরাজউদ্দৌলা— কেউই তো কম কুলীন নন, তাঁদেরও সকলের বিখ্যাত পূর্বজ পুরুষদের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু এঁদের কাউকে কি রামচন্দ্রের মহাকাব্যিক মহিমায় বর্ণনা করা যাবে? কাজেই পূর্বজ পুরুষদের কৌলীন্য কিংবা বংশমহিমায় রামচন্দ্রকে ভগবতী দুর্গার বিপরীতে মহিমান্বিত করে তাঁকে বৃহত্তর কোনও উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করাটা অপোগন্ডের কাজ হয়ে উঠবে।

এবার রামচন্দ্রকে যদি ভগবান বিষ্ণুর অবতার বলে মনে করেন— আমরা ভারতবর্ষের সমস্ত লোকেরাই তাই মনে করি— শুধু সিপিএমওয়ালারা ছাড়া— ওঁরা তো আবার একটু আলাদা, ওঁদের কাছে কৃষ্ণ, রাম, বলরাম, সবাই কবি-কল্পিত কাল্পনিক চরিত্র— কিন্তু ওঁদের কথায় কান না দিয়ে যদি রামচন্দ্রকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার বলে মনে করেন, তাহলে রামচন্দ্রের মহিমা প্রকটিত করার জন্য তাঁর পূর্বজদের কোনও মূল্যই থাকে না। কেননা, ভাগবান বিষ্ণুই সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে মহিমান্বিত হয়ে ওঠেন এবং বিষ্ণুর অবতার হিসেবে রামচন্দ্রের মহিমাতেই দশরথ-অজ-রঘু-দিলীপের মতো পূর্বপুরুষেরা মহামহিম হয়ে ওঠেন। অন্তত রামায়ণের বক্তব্যে সেটাই প্রমাণিত হয়।

রামায়ণে পুত্রহীন দশরথ পুত্রলাভের জন্য পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, প্রস্তুত যজ্ঞে দেবতারা যজ্ঞভাগ নেবার জন্য উপস্থিত, সেই সময়েই দেবতারা ব্রহ্মার কাছে লঙ্কাধিপতি রাবণের অত্যাচারের কথা সবিস্তারে জানালেন। এই কথা হতে-হতেই সেখানে উপস্থিত হলেন ভগবান বিষ্ণু। বিষ্ণুকে দেবতারা সব জানিয়ে রাবণ-বধের জন্য মনুষ্যরূপে ধারণ করতে বললেন। তাতে বিষ্ণু সম্মত হলেন এবং রাজা দশরথকেই পিতা হিসেবে তাঁর পছন্দ হল— পিতরং রোচয়ামাস তদা দশরথং নৃপম। এই যে বাক্যটি— ভগবান বিষ্ণু মনুষ্যরূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবার জন্য দশরথকেই পিতা হিসেবে পছন্দ করলেন— ঠিক এইখানেই প্রমাণ হয়ে যায় যে, এখানে রামচন্দ্রেরও কোনও বাহাদুরি নেই, আর দশরথ কিংবা তাঁর পূর্বজ চোদ্দ পুরুষেরও কোনও মূল্য নেই। যা ক্ষমতা, যত মহিমা, সবই ভগবান বিষ্ণুর এবং তিনি রাজা দশরথের পুত্রত্ব স্বীকার করার পরেই— পুত্রত্বন্তু গতে বিষ্ণৌ রাজ্ঞস্পস্য মহাত্মনছ— কিন্তু সেই পুত্রের অর্থাৎ রামচন্দ্রের মধ্যে ভগবান বিষ্ণুর দৈব মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাহলে এটাই দাঁড়ায় যে, রামচন্দ্রের পূর্ব পুরুষ যদি খুঁজে বার করতে হয়, তাহলে ভগবান বিষ্ণুর পূর্বপুরুষ খুঁজে বার করতে হবে এবং সেটা কিন্তু দুর্গা দেবীর পূর্ব পুরুষ খোঁজার মতোই কঠিন হবে।

এবারে দুর্গার কথাতেও আসি— তাঁর তো আবার পূর্বজদের নাম মেলেনি নাকি? সবিনয়ে জানাই— এক মহাশক্তি দেবতার পূর্ব পুরুষের নাম তো এই ভাবে থাকে না কোথাও। এবং এই প্রশ্নটা একজন পুরুত-টাইপের মানুষ শিব-মহাদেবকে করেছিলেন তাঁর বিয়ের সময়। আর তার জবাবটা দিয়েছিলেন স্বয়ং ব্রহ্মা লোক-পিতামহ। ‘সিচুয়েশন’? যা তৈরী করেছেন সেই মহাকবি, যিনি বুঝেছিলেন যে ভবিষ্যতে এই পুরুত-গোছের লোকেরা স্বয়ম্ভূ মহাদেবেরও বাপ-পিতামোহের বংশ নিয়ে এমন মাথা ঘামাতে পারে। কবির সিচুয়েশনটা ছিল এইরকম— পার্বতীর সঙ্গে শিবের বিয়ে। বিয়ের পিঁড়িতে বসে আছেন শিব, কন্যা সম্প্রদান হচ্ছে। পুরোহিত এবার শিবকে বললেন— এবার পিতা থেকে আরম্ভ করে তিন পুরুষের নাম বলুন। কথাটা শুনেই শিব-মহাদেব খানিক লজ্জা পেলেন সেই মানুষগুলির মতো, যারা অসংস্কারের দোষে অন্যভাবে জন্মেছে এই পৃথিবীতে। কিন্তু তাঁর যে জন্ম মরণ নেই, তিনি নিজেই নিজে জন্মেছেন, স্বয়ম্ভূ— এই অলৌকিক তত্ত্ব তিনি ওই সংস্কারবদ্ধ পুরোহিতকে বোঝাবেন কী করে? অতএব সরল শিব একটু লজ্জা পেয়েই মাথা নীচু করলেন।

এই অবস্থায় ব্রহ্মা বললেন— ঠিক যেমনভাবে বললে একজন অবিদ্বান পুরোহিত স্তব্ধ হয়ে যায় ঠিক সেই মেজাজে বহ্মা বললেন— তিন পুরুষ কেন, আমি শিবের চার পুরুষের নাম বলছি। শিবের প্রপিতামহের নাম হল বেদকণ্ঠ, বেদকণ্ঠের ছেলে উগ্রকণ্ঠ হলেন শিবের পিতামহ, তাঁর পুত্র শ্রীকণ্ঠ হলেন শিবের পিতা, আর সেই শ্রীকণ্ঠের পুত্র হচ্ছেন নীলকণ্ঠ শিব। তিনি এবার লজ্জা ভেঙে হাসিমুখে বাঁচিয়ে রাখুন আপনাদের সকলকে— শ্রীকণ্ঠান্নীলকণ্ঠ:  প্রহসিতবদন: পাতু বশ্চন্দ্রচূড়:।

এই শ্লোকে বেদকণ্ঠ থেকে শ্রীকণ্ঠ— এই সবগুলিই কিন্তু শিবেরই অন্য নাম। যজুর্বেদে কয়েকটি অধ্যায় (অনুবাক) জুড়ে শুধু শিবের নাম, ফলে বেদ তাঁর কণ্ঠে ধারণ করেছেন বলেই শিব বেদকণ্ঠ। তাঁর অন্য বিখ্যাত নামের মধ্যে তিনি উগ্র-ভাষণ বলেই তাঁকে উগ্রকণ্ঠ বলা যায়। তাঁর কণ্ঠভূষণ নাগরাজ— বাহনং বৃষভো যস্য বাসুকি: কণ্ঠভূষণম্— তাই শিবের এক নাম শ্রীকণ্ঠও বটে। আর হলাহল বিষ পান করে শিব যে নীলকণ্ঠ হলেন, তাঁর এই নাম তো পার্বতীর পরম প্রিয় সম্বোধন এবং কে না জানে এই বিখ্যাত নাম! আর এটা খেয়াল করলেন তো যে, সাধারণ মানুষ যেমন অনেক সময় পিতার নামের আদ্য বা শেষাক্ষর মিলিয়ে সন্তানদের নাম রাখে, ব্রহ্মাও কিন্তু সেই লোক-ব্যবহারেই কণ্ঠ শব্দটি জুড়ে দিয়ে স্বয়ম্ভূ শিবের বংশ-পরম্পরা তৈরী করেছেন।

আমরা শিবের উদাহরণটি নিতান্ত লোকোচিতভাবে প্রকাশ করলাম এইজন্য যে, সেই পরমা শক্তিরূপিনী দুর্গার পূর্বজ বাপ-পিতামহের নামও কিন্তু তাঁরই অন্য নাম। শক্তি-দেবতার পূর্বজরা আসলে তাঁরই পূর্ব-পূর্ব আবির্ভাব— incarnations and reincarnations. আর তাতে দুর্গা, চণ্ডী, পার্বতী, কালী— সকলেই কিন্তু একাকার এবং তাতে সমস্যা আরও বাড়ে। যদিও বা এই মহাদেবীর মানবায়িত লীলাস্বরূপে পার্বতীর পিতা হিসেবে নগাধিরাজ হিমালয়কে পাবেন অথবা পাবেন মা মেনকাকেও, কিন্তু হিমালয়ের বাবাকে পাবেন কথায়? আমাদের শাস্ত্রে তো হিমালয়ও দেবতা এবং তিনিই শিবের শ্বশুর। ওই একই পার্বতীর একটা পূর্বজন্মও আজে, যেখানে তিনি প্রজাপতি দক্ষের কন্যা দাক্ষায়ণী সতী, তাঁর মায়ের নাম বীরিণী, আশ্চর্য হল সেই জন্মেও কিন্তু শিব-মহাদেবই তাঁর স্বামী— দক্ষস্য কন্যা ভব-পূর্বপত্নী।

কিন্তু পার্বতীর এই পূর্ব-জন্ম অথবা এক জন্মে তাঁর হিমালয়-পিতা— এগুলি পার্বতী কিংবা দুর্গার পরিচয়ই নয়, বংশগরিমার তো প্রশ্নই ওঠে না। কেননা দুর্গা, পার্বতী কিংবা কালীর মৌল স্বরূপ হল— তিনি পরমা প্রকৃতি এবং তিনি সর্বজগৎ-প্রসূতি— সকলের মা-বাবা, পিতা-পিতামহ সবই তিনি। তিনি স্বতন্ত্রা এবং তাঁর সাহায্য ছাড়া চৈতন্যময় সেই বিরাট পুরুষ সৃষ্টিকার্যই করতে পারেন না— ত্বং বৈষ্ণবী শক্তি রনন্তবীর্য্যা/বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া। পরম ঈশ্বরের এই পরমেশ্বরী মায়া শক্তির যে কোনও মনুষ্যোচিত বংশমর্যাদার প্রয়োজন কিংবা বালাই কিছুই নেই, তা ওই ঘোষদিগের কাঁড়াটাকে বুঝাবি কেমন করে?

যে মহাদেবীর মহিমা তৈরী হয় আবির্ভাবে এবং পুনরাবির্ভাবে তখন বুঝতে হবে বাছা, দুর্গার পূর্বপুরুষ দুর্গাই অথবা চণ্ডীর পূর্বপুরুষ রক্তদন্তিকা অথবা তাঁর পূর্বপুরুষ শতাক্ষী-শাকম্ভরী, অথবা তাঁর পূর্বজ ভীমা-ভয়ঙ্করী দুর্গা। আমরা এই বাংলার মানুষেরা অবশ্য এই তত্ত্বকথার বিশ্লেষণ মেনে চলি না। কেননা আমাদের সঙ্গে তাঁর প্রিয়ত্বের সম্বন্ধ আছে। আমরা দুর্গাকে মা বলে জানি অথবা মেয়ে বলে জানি। আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুর দেশের লোক, আমরা শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃতে চলি। দেবতাকে প্রকট করে তোলার জন্য আমাদের জয়-জয়কার দিয়ে গলা ফাটাতে হয় না। আমরা সকালবেলায় ঘুমচোখ ফুটতেই বলি— মা-মাগো, দিনটা যেন ভাল যায় মা! আবার সারাদিনের কর্মক্লান্ত চোখে ঘুম নেমে আসতেই হাই তুলতে-তুলতে মায়ের নামটুকুও ভেঙে যায় আধো উচ্চারণে প্রায় বাস্পায়িত— মা-মাগো।

এই বাংলায় দুগ্‌গা-মায়ের ছেলে-মেয়ে যারা, তারা মায়ের মহিমা বোঝার জন্য, তাঁর পূজ্যত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মায়ের বাপ-পিতামোহ খুঁজে বেড়ায় না, এমনকী জারজ সন্তানও বাপ-ঠাকুর্দার মহিমায় মাকে খোঁজে না। আর আমার মাকে খোঁজার জন্য পাঁচ মাইল দৌড়ে রেল-লাইনের ধারে যেতেই বুঝতে পারি— মা আসছেন— কাশফুল ফুটেছে। স্কুলের বেঞ্চে বসে একবার ঢাকের বাদ্যি শুনলেই মনে হয়— এতক্ষণে হয়তো মায়ের মুখ হল রঙ করা— তখন কী মনে হয়— কত মহিমা শ্রীরামচন্দ্রের— রামকে পূর্বজকা নাম মিলা, ইয়ে দুর্গা কাঁহাসে আয়ী? ঘাসের ওপর পাঁচটা শিউলি ফুল পড়লেই যেখানে মনে হয়— পুজোর গন্ধ এসেছে, সেখানে এমন সহজে পাওয়া দুগ্‌গা মায়ের বংশ আর পূর্বপুরুষ নিয়ে যারা মাথা ঘামাচ্ছে, তাদের শুধু বলি— ওরে পাগলা! আমার প্রভু রামচন্দ্র কিছুতেই যখন আর রাক্ষস রাবণকে সামাল দিতে পারছিলেন না, তখন সেই রামচন্দ্রের প্রতি অনুগ্রহ দেখিয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মা— রাত্রিবেলায় পুজো করা যায় না জেনেও সেই আকালিক রাত্রিবেলায় তিনি এই মহাদেবী দুর্গার বোধন করেছিলেন— রাত্রাবেব মহাদেবী ব্রহ্মণা বোধিতা পুরা। তাই বলছিলাম— রাম আর দুর্গার মধ্যে কোনও লড়াই নেইরে, তোরা মনুষ্যবুদ্ধিতে এই দুই মহাশক্তিমান আর মহাশক্তিকে নিজেদের পণ্য করে তুলিস না। ভগবানকে নিয়ে ভোটাভুটি করিস না বাছা।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev