শনিবার | ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:২৮
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (প্রথম পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজুরিকা চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘একাকিনী’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটির অনবদ্য সুরঞ্জলি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী : ফারজানা নাজ শম্পা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিপ্লবের নাম কালী : লিখছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু

শঙ্করীপ্রসাদ বসু / ১৬৩৭ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০

শৃঙ্খল-স্বাধীনতা-সংগ্রাম-মৃত্যু—অথবা মুক্তি—এখানেই শেষ নয় বিবেকানন্দের বার্তা ও তার অঙ্গীকার সুভাষচন্দ্রে। আরও ভয়ঙ্কর একটি ভূমি আছে, যেখানে জন্ম নিয়েছে মৃত্যুদর্শন, যা বিপ্লবদর্শনের অঙ্গাঙ্গি। বিবেকানন্দের কালী—সুভাষচন্দ্রেরও কালী। সুভাষচন্দ্রের কণ্ঠে প্রলয়ের বিকর্ণ উল্লাস প্রকাশিত হতো বিবেকানন্দের দিব্যদর্শনের সৃষ্টি ‘কালী দি মাদার’ কবিতার মুহুর্মুহু উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। ‘কালী তুই প্রলয়রূপিণী, আয় মাগো, আয় মোর পাশে।’ ‘সাহসে যে দুঃখদৈন্য চায়, মৃত্যুরে সে বাঁধে বাহুপাশে, কালনৃত্য করে উপভোগ, মাতৃরূপা তারই কাছে আসে।’

এই ভয়ঙ্করী মহাদেবী বিপ্লবের মহামাতা রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন বিবেকানন্দের উৎসারিত স্বরে :

‘যারা আমার তাদের হৃদয়ে ঝলসায় বলির খড়্গ,

তার মৃত্যুপ্রেমিক, জীবনলুব্ধ নয়,

তারা ভালবাসে ঝড়-ঝঞ্ঝা-দ্বন্দ্ব-সংঘাত,

তারা আসবে না-জ্বলা মশাল নিয়ে আগুনের জন্য।

পৃথিবীর উপর দিয়ে আমার কণ্ঠ ডাক দিয়ে ফিরছে।

আমি বুভুক্ষু। জীবন চাই। তৃষ্ণা আমার।…

 

সেদিন এসেছে আজ যখন আমার হাতের ত্যাগের আগুন

মানুষকে ছিঁড়ে এনে দগ্ধ করবে দারুণ বাসনায়।…

সংকুচিত হয়ো না পরাজয়ে, আলিঙ্গন করো নৈরাশ্যকে,

সুখের থেকে ভিন্ন নয় যন্ত্রণা,

অশ্রুর জগতে আনন্দ করো কেননা হাসছি আমি,

প্রাসাদ ছেড়ে ঝাঁপ দাও ভয়ানকের সমুদ্রে,

বিলাসের কক্ষ ছেড়ে প্রহরী হও জ্বলন্ত নগরীর।’

স্বামীজি বলেছিলেন :

“আমি ভয়ঙ্করকে ভয়ঙ্কর বলে ভালবাসি, নৈরাশ্যকে নৈরাশ্য বলে ভালবাসি, দুঃখকে দুঃখ বলে ভালবাসি। সংগ্রাম করো, অবিরাম সংগ্রাম করো, প্রতি পদে পরাজয়—তবু সংগ্রাম করো।”

বিকোনন্দের ভাষা অন্যের হতে পারে না—সে ভাষা কদাচিৎ মনুষ্যকণ্ঠে আবির্ভূত হয়। কিন্তু বিবেকানন্দের ভয়ঙ্করকে যিনি দু-হাতে আলিঙ্গন করেছিলেন সেই সুভাষচন্দ্রের ভাষায় বিবেকানন্দের অনুরণন :

“আমাকে চলতেই হবে। পথ দীর্ঘ এবং দুর্গম। ক্লান্ত হয়ে পড়ি কখনো কখনো। অন্ধকার ঘিরে ফেলে তার উপর দিয়ে ফাল্ করে ছুটে যায় বিদ্যুৎ। তাতে কী এসে যায়। চলাতেই আনন্দ। আমি গৃহহারা পথিক। শান্তি! শান্তি! কোথায় শান্তি? শান্তি পাইনি এখনো—তৃপ্তিও নয়। আমার লোভের টান কেবল বিদ্যুতের আলোকে নয়—অন্ধকারেও। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎই কেবল ডাক দেয়না—ডাক দেয় অনিশ্চয়তার তমসাও। যদি আলোকের উৎসে পৌছতে না পারি, তাতেই-বা কী এসে যায়? চলছি—সেই তো আনন্দ। অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি—তাতেও। লুটিয়ে পড়ছি—তাতেও।”

১৯৩৭ সালে, যখন একদিকে সাম্রাজ্যবাদের যত্নে-বিছানো বহু বৎসরের কণ্টকাকীর্ণ শৃঙ্খলজাল, অন্যদিকে নাৎসীবাদ ও ফ্যাসীবাদের কালো নখর দুই স্বার্থের মধ্যে লোভের কাড়াকাড়ি—অর্থাৎ যুদ্ধ আসন্ন এবং সুভাষচন্দ্র ভারতের স্বাধীনতার স্বার্থে শত্রু ইংরেজের শত্রু জার্মানি-ইতালির সঙ্গে যোগসাজশ করছেন—তা জেনে তাঁর পরিচিত চেক ভদ্রমহিলা কিট্টি কুর্তি প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন। তাতে সুভাষচন্দ্র কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে বললেন :

‘আর কী করবারই-বা আছে? জঘন্য কাজ, কিন্তু করতেই হবে। কাউকে না কাউকে করতে হবে। একটিমাত্র সুযোগ জীবনে পেয়েছি, তাকে ছেড়ে দিতে পারি না। ভারতের জনগণকে অনাহারে, উৎপীড়নে, শোষণে, নরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিরদিন এ জিনিস চলতে দেওয়া যায়না। আমি একাজ করতে এসেছি—না করে উপায় নেই বলে। পথ নেই—পথ নেই।’

সুভাষচন্দ্র বলে চললেন :

‘ভয়ঙ্কর সত্যই। কিন্তু উপায় কি। আমাদের কাছে একটি পথই খোলা আছে। ভারতকে তার স্বাধীনতা পেতেই হবে—যে কোনো মূল্যে। তার অর্থ যদি ইউরোপের ধ্বংস হয়—হোক। কিন্তু ইউরোপ—এই ইউরোপ তো আবর্জনার স্তূপ। এর জন্য কোনো মাথাব্যথা আমার নেই। নিশ্চয় চমৎকার কিছু মানুষ এখানে আছেন, ইংল্যান্ডেও, যাঁদের সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট প্রীতি ও শ্রদ্ধা রয়েছে। তাঁদের কেউ থাকবেন, কেউ যাবেন। তাঁদের বিনাশে বেদনাবোধ করব। অপরপক্ষে ভারতবর্ষে কিছু লোক টিকে যাবে যাদের বাঁচার অধিকার নেই। কিন্তু ভাবালু হয়ে লাভ নেই।’

স্বামী বিবেকানন্দের লেখা ‘সখার প্রতি’ এবং ‘নাচুক তাহাতে শ্যামা’—এই কবিতা দুটি সুভাষচন্দ্রের প্রিয় ছিল, একথা বললে যথেষ্ট হবেনা—এই দুই কবিতার মধ্যে তিনি নিজের জীবনদর্শনকে পেয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে সেবাধর্মের মৌল প্রেরণার কথা কিভাবে কবিতাটিতে মন্ত্রধ্বনিতে উচ্চারিত, তা উল্লিখিত হয়েছে। এই সেবাই নানা আকারে সুভাষচন্দ্রের কর্মাবলীতে বিস্তারিত—রাজনৈতিক সংগ্রামও তার অন্তর্গত। উল্লিখিত কবিতাতেই সুভাষচন্দ্র পেয়েছিলেন তাঁর সংসারে প্রত্যাবর্তনের সংকেত : ‘পক্ষহীন শোনো বিহঙ্গম, এ যে নহে পথ পালাবার,/ বারবার পাইছ আঘাত, কেন কর বৃথায় উদ্যম?’ জেনেছিলেন, স্বার্থহীন প্রেমকে সম্বল করতে হবে—এবং তা সহজে সাধ্য নয়—সে প্রেম বস্তুতপক্ষে মৃত্যুমূল্যেই লভ্য : ‘স্বার্থহীন প্রেম যে সম্বল;/ দেখ, শিক্ষা দেয় পতঙ্গম—/ অগ্নিশিখা করি আলিঙ্গন।’

সুভাষচন্ত্রের রক্তস্রোতে মিশ্রিত ঐ কবিতার কয়েকটি ছত্র :

“ভিক্ষুকের কবে বলো সুখ? কৃপাপাত্র হয়ে কিবা ফল?

দাও আর ফিরে নাহি চাও, থাকে যদি হৃদয়ে সম্বল।

অনন্তের তুমি অধিকারী, প্রেমসিন্ধু হৃদে বিদ্যমান,

‘দাও দাও’—ফিরে যেবা চায়, তার সিন্ধু বিন্দু হয়ে যান।”

‘বিপ্লবের মহাদেবী কালী’ অধ্যায়ে স্বামীজির ইংরাজি কবিতা ‘কালী দি মাদার’-এর উল্লেখ করেছি, যার অনবদ্য বাংলা রূপান্তর করেছেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত— ‘মৃত্যুরূপা কালী’ কবিতাটি কোন অসহনীয় প্রেরণায় অগ্নিজ্বলন্ত, তার সংবাদ পাই নিবেদিতার ‘দি মাস্টার অ্যাজ আই স হিম’ গ্রন্থে। কাশ্মীরে অবস্থানকালে (১৮৯৮ সেপ্টেম্বর) ঘটনাটি ঘটেছিল। নিবেদিতা লিখেছেন :

“…‘The worship of the Terrible’ now became his whole cry. Illness or pain would always draw forth the reminder that “She is the organ. She is the pain. And she is the giver of pain. Kali !Kali ! Kali! ,

“His brain was teeming with thoughts, he said one day, and his fingers would not rest till they were written down. It was that same evening that we came back to our house-boat from some expedition,and found waiting for us, where he had called and left them, his manuscript lines on ‘Kali the Mother’.Writing in a fever of inspiration, he had fallenon floor, when he had finished—as we learnt afterwards,—exhausted with his own intensity.”

[মোটামুটি অনুবাদ :

“ভয়ঙ্করের অর্চনাই এখন তাঁর মূল মন্ত্রধ্বনি হয়ে দাঁড়াল। রোগ ও যন্ত্রণা দেখলেই তাঁর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসত এই কথাগুলি-মা-ই যন্ত্র। মা-ই যন্ত্ৰী। মা-ই যন্ত্রণাদাত্রী। কালী! কালী!

“একদিন তিনি বললেন, তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু চিন্তা যতক্ষণ না সেগুলি লিখে ফেলতে পারছেন ততক্ষণ অব্যাহতি নেই। সেইদিনই সন্ধ্যায় ভ্রমণাদি সাঙ্গ করে বজরায় ফিরে এসে জানলাম—স্বামীজি আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন—দেখা না পেয়ে রেখে গেছে ‘কালী দি মাদার’ কবিতার পাণ্ডুলিপি। পরে জেনেছিলাম—দিব্য উন্মাদনায় জ্বলতে জ্বলতে কবিতাটি তিনি লেখেন—শেষ করা মাত্র মেঝেয় লুটিয়ে পড়েন—এমনই অসহ্য ছিল প্রেরণার দাহ—তাঁর তীব্রতা নিঃশেষিত করে দিয়েছিল—তাঁর শারীরিক শক্তি।”]

অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করে ভয়ব্যথিত হয়ে আর্তনাদ করেছিলেন। বিকোনন্দ কিন্তু মহাকালীর বিশ্বপ্রলয়রূপ দর্শন করে, তা সংবরণ করবার জন্য আর্ত অনুরোধ করেছিলেন, এমন সংবাদ নেই—তিনি তার শব্দরেখাঙ্কন পর্যন্ত করতে পেরেছিলেন—তারপর অবশ্য তীব্র আবেশে মূৰ্ছিত হয়ে পড়েন।

নিবেদিতার একই গ্রন্থে আর একটি অসাধারণ বিবেকানন্দচিত্র আছে যার মধ্যে কালচক্রের আবর্তনের দ্রষ্টা বিবেকানন্দকে দেখা গেছে।

নিবেদিতা লিখেছেন : স্বামীজি যখন মাতৃপ্রণামমন্ত্রগুলি উচ্চারণ করতেন, তখন মনে হতো যেন তাঁর কণ্ঠস্বরের মধ্য দিয়ে একসুরে নির্গত হচ্ছে কোনো এক মহান ঐতিহাসিক নাটকের বহুবাদ্যযন্ত্রের ঐকতান। তাঁর মধ্যে মিশ্রিত ছিল—উৎপীড়ক ও উৎপীড়িতের আশা ও আতঙ্ক, সৈন্যবাহিনীর মর্দনকারী সদর্প পদক্ষেপ, জাতিসমূহের অন্তর্বিপ্লব। ক্রমেই সেই স্বর স্বামীজির কণ্ঠে উচ্চ থেকে উচ্চতর হয়ে উঠত মহাস্তোত্রের বজ্রধ্বনিতে :

হে মাতঃ! তুমি আশীর্বাদদাত্রী,

হে মাতঃ! তুমি বাসনাদাত্রী,

হে মাতঃ! তুমি মঙ্গলকর্ত্রী,

তোমাকে নমস্কার, তোমাকে নমস্কার, তোমাকে নমস্কার।

হে মাতঃ! তুমি ঘোররাত্রি,

হে মাতঃ! তুমি মোহরাত্রি,

হে মাতঃ! তুমি কালরাত্রি,

তোমাকে নমস্কার, তোমাকে নমস্কার, তোমাকে নমস্কার।

সুভাষচন্দ্রের অতিপ্রিয় ছিল নিবেদিতার এই গ্রন্থটি। দিলীপকুমার রায় তার উল্লেখ করেছেন।

সুভাষচন্দ্রের হৃদয়-সত্যের প্রতিচ্ছবি মেলে স্বামীজির আর একটি কবিতায়, যার উল্লেখ আগেই করেছি—‘নাচুক তাহাতে শ্যামা’। সে কবিতার গোড়ায় মোহিনী প্রকৃতির নানা রূপবিকাশের বর্ণনা আছে, শিল্পী ও ভাস্করদের সৃষ্টিতে যার রাগ-রূপ-ছন্দ ফুটে ওঠে স্বর্ণরেখায়। কিন্তু তার পরেই আছড়ে পড়েছে সেই সুন্দর স্বপ্নভুবনে প্রকৃতির উন্মাদ তাণ্ডব। স্বামীজির কবিতার ছত্রগুলিতে এখানে প্রলয়ের কলরোল :

‘মেঘমন্ত্র কুলিশ-নিঃস্বন, মহারণ—দুলোক-ভূলোক-ব্যাপী।

অন্ধকার উগরে আঁধার, হুহুঙ্কার শসিছে প্রলয়বায়ু।।

ঝলকি ঝলকি তাহে ভায়, রক্তকায় করাল বিজলীজ্বালা।

ফেনময় গর্জি মহাকায় ঊর্মি ধায় লঙ্ঘিতে পর্বতচূড়া।।

ঘোষে ভীম গম্ভীর ভূতল, টলমল রসাতল যায় ধরা।

পৃথ্বীচ্ছেদি উঠিছে অনল, মহাচল চূর্ণ হয়ে যায় বেগে’।।

রসাতলে যাচ্ছে যে-পৃথিবী, তাতে ছিল সংসারের সুন্দরের প্রভূত আয়োজন। শোভাময় মন্দিরভবন,নীলজল-হ্রদে মনোহর পদ্মরাজি, পানপাত্ৰভরা দ্রাক্ষারসের বুদবুদ, শ্রুতিপথে বীণারঝঙ্কার, সুরের প্রবাহে বাসনার বিস্তার, ‘বিম্বফল যুবতী-অধর’, ভাবের সাগরে ভাসমান নীলোৎপল দুটি আঁখি, আকৃতিভরা দুই হাতের পিঞ্জরে বাঁধা প্রেমিকের প্রাণপাখী।

এই সবকিছু খা খা করে দিয়ে শোনা গেল রণদুন্দুভি—সাজো সাজো সাজো!

‘ডাকে ভেরী, বাজে ঝর্‌র্ ঝর্‌র্ দামামা নাকাড়া, বীর-দাপে কঁপে ধরা।

ঘোষে তোপ বব-বব-বম্, বব-বব-বম্,বন্দুকের কড়কড়া।।

ধূমে ধূম ভীম রণস্থল, গরজি অনল বমে শত জ্বালামুখী।

ফাটে গোলা-লাগে বুকে গায়, কোথা উড়ে যায় আ-সোয়ার ঘোড়া হাতি৷৷

পৃথ্বীতল কাঁপে থরথর, লক্ষ অশ্ববরপৃষ্ঠে বীর ঝাঁকে রণে।

ভেদি ধূম গোলাবরিষণ গুলি সন্ সন্, শত্রুতোপআনে ছিনে।।

আগে যায় বীর্য-পরিচয় পতাকা-নিচয়, দণ্ডে ঝরে রক্তধারা।

সঙ্গে সঙ্গে পদাতিকদল, বন্দুক প্রবল, বীরমদে মাতোয়ারা।।

ঐ পড়ে বীর ধ্বজাধারী—অন্য বীর তারি ধ্বজা লয়েআগে চলে।

তলে তার ঢের হয়ে যায় মৃত বীরকায়, তবু পিছেনাহি টলে’৷৷

কিছু পূর্বকালের ভয়ঙ্কর ঐ যুদ্ধদৃশ্য—যখন দুই পদাতিক সৈন্যবাহিনী মুখোমুখি হয়ে মরণপণ লড়াই করত। সুভাষচন্দ্রের ক্ষত্রিয়রক্ত উন্মত্ত হতো ঐ রণসঙ্গীতে, সন্দেহ নেই। বাস্তবজীবনের মুখখামুখি হয়ে এই নির্মম সত্যকে স্বীকার করতেই হবে—যে-আকারেই হোক, যুদ্ধ ছাড়া অব্যাহতি নেই। কৃষ্ণের মোহন বংশীধারী রূপ হলো খণ্ড সত্য, আর বৃহৎ সত্য—‘কালের রাখাল তুমি, সন্ধ্যায় তোমার শিঙা বাজে’—যে কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন। সত্যের উদ্‌ঘাটনে বিবেকানন্দ আরও কঠিন—একটানে ছিড়ে ফেলেছেন সুচিত্রিত আচ্ছাদনের প্রতারণা:

‘সুখ তরে সবাই কাতর, কেবা সে পামর দুঃখে যার ভালবাসা?

সুখে দুঃখ, অমৃতে গরল, কণ্ঠে হলাহল, তবু নাহি ছাড়ে আশা।।

রুদ্রমুখে সবাই ডরায়, কেহ নাহি চায় মৃত্যুরূপা এলোকেশী।

উষ্ণধার রুধির-উদ্‌গার, ভীম তরবার খসাইয়ে দেয় বাঁশী।।

সত্য তুমি মৃত্যুরূপা কালী, সুখবনমালী তোমার মায়ার ছায়া।

করালিনি! কর্ মর্মচ্ছেদ, হোক মায়াভেদ, সুখস্বপ্ন দেহে দয়া৷।

মুণ্ডমালা পরায়ে তোমায় ভয়ে ফিরে চায়, নাম দেয়দয়াময়ী।।

প্রাণ কাপে, ভীম অট্টহাস, নগ্ন দিক্‌বাস, বলে মা দানবজয়ী।।

মুখে বলে দেখিবে তোমায়, আসিলে সময় কোথা যায়কেবা জানে।

মৃত্যু তুমি, রোগ মহামারী বিষকুম্ভ ভরি বিতরিছজনে জনে’।।

বিবেকানন্দের সতর্কবাণী—প্রলুব্ধ হয়ো না আত্মপ্রতারণায়, বলি দিওনা সত্যকে স্বার্থের পায়ে, কাপুরুষের আতঙ্কিত স্তুতিকে ভক্তির আবেশ বলে প্রচার করার চেষ্টা করো না, ভেঙে ফেলো বীণা, সঙ্গীত হোক মহাসিন্ধুর তরঙ্গগর্জন— অগ্রসর হও! অগ্রসর হও!

‘জাগো বীর ঘুচায়ে স্বপন, শিয়রে শমন, ভয় কি তোমারসাজে?

দুঃখভার এ ভব-ঈশ্বর, মন্দির তাহার প্রেতভূমি চিতামাঝে।

পূজা তার সংগ্রাম অপার, সদা পরাজয় তাহা না ডরাক তোমা।

চূর্ণ হোক স্বার্থ সাধ মান, হৃদয় শ্মশান, নাচুক তাহাতেশ্যামা।’

সুভাষচন্দ্র যখন সত্যের মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন এই জগৎ-সংসারের কর্কশ কঠিন ভূমিতে দাঁড়িয়ে—তখন তাঁর দার্শনিক ও পথপ্রদর্শক ছিলেন বিবেকানন্দ। সুভাষচন্দ্রের মন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ‘পূজা তাঁর সংগ্রাম অপার, সদা পরাজয়, তাহা না ডরাক তোমা’। মহাকালের পটে মহাকালীকে তিনি বরণ করেছিলেন। আত্মবলিদানই হয়েছিল তার ব্রত। যখন তার বয়স সতের, (৩.১০.১৪), তখন বন্ধু হেমন্তকুমার সরকারকে লেখা চিঠিতে কালীর সম্মুখবর্তী রামকৃষ্ণের এই ছবি এঁকেছেন :

‘মনে পড়ে একটি চিত্র। কালীমন্দির দক্ষিণেশ্বরে। সম্মুখে খড়হস্তা মা কালী, আনন্দময়ী—শিবের আসনের উপর অধিষ্ঠিত—শতদলবাসিনী। তার সম্মুখে একটি বালক—বালক হইতেও বালপ্রকৃতি—আধ আধ স্বরে কাঁদিতেছে এবং কাকে যেন ডেকে ডেকে বলিতেছে—‘মা, এই নাও তোমার ভালো, এই নাও তোমার মন্দ। এই নাও তোমার পাপ, এই নাও তোমার পুণ্য’। করালমুখী ভীষণদ্রংষ্ট্রা মা অল্পেতে সন্তুষ্ট নয়—সব গ্রাস করিতে চায়—তাই ভালোও চাই, মন্দও চাই—পুণ্যও চাই, পাপও চাই। বালককে সবই দিতে হইবে—না দিলে শান্তি নাই—মা-ও ছাড়িবেন না। বড় কষ্ট—মাকে সবই দিতে হইবে। মা কিছুতেই সন্তুষ্ট না—তাই কাঁদিতেছে আর বলিতেছে—‘এই নাও—নাও’। দেখিতে দেখিতে অশ্রুধারা বন্ধ হইল—গণ্ডস্থল ও বক্ষ শুকাইল—হৃদয় জুড়াইল—হৃদয়ে আর কিছু নাই—যেখানে ভীষণ কণ্টকযন্ত্রণা দিতেছিল, তার চিহ্নও নাই—সবই শান্তিময়। হৃদয় মধুতে ভরিয়া গেল—বালক উঠিল—আপনার বলিয়া তার আর কিছু নাই—সব দিয়ে ফেলেছে’।

“বালকটি রামকৃষ্ণ।”

‘মাকে সবই দিতে হইবে’—সতের বৎসর বয়সেই সুভাষচন্দ্র জেনে ফেলেছিলেন—আর তা দিতে পারলেই শান্তি। রামকৃষ্ণ চিত্রের মধ্যে সদ্য-তরুণ সুভাষ আত্মবিম্ব দেখতে চাইছিলেন। ক্রমে তিনি গভীরভাবে আক্রান্ত হলেন বিবেকানন্দের দ্বারা। তাঁর জীবনগত হলো কালীদর্শন—মৃত্যুদর্শন। মৃত্যুর মূল্যে জীবন।

১৯৪০ সালে ইংরেজের কারাগারে আবদ্ধ সুভাষচন্দ্র। তাকে মুক্তি পেতেই হবে। অনশনই একমাত্র উপায় মুক্তি পারার। হয় মুক্তি, না হয় মৃত্যু—এই প্রতিজ্ঞা তার। ‘ইচ্ছাপত্র’ রচনা করলেন তিনি—সেই ধরনের একাধিক পত্র পাঠালেন প্রেসিডেন্সি জেলের সুপারিনটেনডেন্ট, বাংলার ‘হোম মিনিস্টার’, বাংলার গভর্নর, এবং প্রিমিয়ারের কাছে। সেইসব চিঠিতে লিখলেন, আমার অনশনের প্রতিজ্ঞা ব্যাপারটিকে হালকাভাবে নিওনা, কালীপূজার পবিত্র রাত্রে আমি প্রতিজ্ঞা করে অনশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চিঠিগুলি যাঁদের কাছে লেখা হয়েছিল তারা ধর্মে খ্রিস্টান অথবা মুসলমান।

“I repeat that this letter, written on the sacred day of Kali Pujah, should not be treated as a threat or ultimatum. It is merely an affiramtion of one’s faith, written in all humility.” “The step that I have now taken is not an ordinary fast. It is the result of several months mature deliberation, sealed by vow prayerfully taken by me on the sacred day of Kali Pujah.”

সরকারকে সুভাষচন্দ্র অনুরোধ করেছিলেন, তার এই চিঠি যেন নষ্ট করা না হয়—যেন তা রক্ষা করা হয় তার ‘পলিটিক্যাল টেস্টামেন্ট’হিসাবে। এর মধ্যে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তার বার্তাআছে।

সুভাষচন্দ্রের এই ‘রাজনৈতিক ইচ্ছাপত্রে’ কিন্তু রাজনৈতিক বচনাদি ছিলনা—ছিল কেবল অসহ্য পরাধীনতার কথা—এবং তার দূরীকরণের জন্য সম্পূর্ণ আত্মত্যাগের আহ্বান—যার ভাষা তিনি পেয়েছিলেন বিবেকানন্দ-সহ নানা ত্যাগব্ৰতী মানুষদের কাছ থেকে—বিবেকানন্দের কাছে থেকেই সমধিক।—

“Life under existing conditions is intolerable for me. To purchase one’s continued existence by compromising with illegality and injustice goes against my very grain. I would throw up life itself, rather than pay this price. Government are determined to hold me in prison by brute force. I say in reply, ‘Release me or shall I refuse to live—and it is for me to decide whether I choose to live or to die.

“Though there may be no immediate, tangible gain—no suffering, no sacrifice is ever futile. It is through suffering and sacrifice that a cause can flourish and prosper and in every age and clime the eternal law prevails—‘the blood of the martyr is the seed of the church.’

“In this mortal world, everything perishes and will perish—but ideas, ideals and dreams do not. One individual may die for an idea, but that idea will, after his death, incarnate itself in a thousand lives. This is how the wheels of evolution move on and the ideas, ideals and dreams of one generation are bequeathed to the next. No idea has ever fulfilled itself in this world except through ordeal of suffering and sacrifice.

“What greater solace can there be than the feeling that one has lived and died for a principle? What higher satisfaction can a man possess than the knowledge that his spirit will beget kindred spirits to carry on his unfinished task? What better reward can a soul desire than the certainty that his message will be wafted over hills and dales and over the broad plains of every corner of his land and across the seas to distant lands? What higher consummation can life attain than peaceful self-immolation at the altar of one’s Cause?

“Hence it is evident that nobody can lose throughsuffering and sacrifice. If he does lose anything of the earth earthy, he will gain much more is return by becoming the heir to a life immortal.

“This is the technique of the soul. The individual must die, so that the nation may live. Today I must die, so that India may live and may win freedom and glory.

“To my countrymen I say, ‘Forget not that the greatest curse for a man is to remain a slave. Forget not that the grossest crime is to compromise with injustice and wrong. Remember the eternal law : You must give life, if you want to get it. And remember that the highest virtue is to battle against inequity, no matter what the cost may be.”

[“বর্তমান অবস্থায় জীবন অসহনীয় আমার কাছে। নীতিহীন, ন্যায়হীন শাসনের সঙ্গে আপসের মূল্যে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী আমার সমস্ত রক্তবিন্দু। সে মূল্য দেওয়ার চেয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেব এই জীবনকে।

“পাশব শক্তিতে এই সরকার আমাকে কারাগারে আবদ্ধ রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমার উত্তর—মুক্ত করো আমাকে, নচেৎ বাঁচতে চাইনা আমি। আমিই স্থির করব-আমি বাঁচব কি মরব?

“কোনো ত্যাগ, কোনো সহন, কোনোদিন বিফল হয়না—অবিলম্বে যদি কোনো ফললাভ নাও ঘটে। দুঃখবহন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই অভীষ্ট লক্ষ্যের পথে অগ্রগতি সম্ভবপর। প্রতি দেশে ও কালে এই চিরনীতির সার্থকতা দেখা যায়— ‘শহীদের রক্তবিন্দুতেই নির্মিত ধর্মের বেদীপীঠ’।

“এই নশ্বর পৃথিবীতে বিনষ্ট হবে সবকিছুই—কেবল নষ্ট হবেনা ভাব, আদর্শ ও স্বপ্ন। কোনো একটি ভাবের সাধনায় ব্যক্তিমানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে—কিন্তু সেই ভাবটি তাঁর মৃত্যুর পরে পুনর্জন্ম নেবে সহস্র জীবনে। এই রূপেই আবর্তিত বিবর্তনের চক্র—এক প্রজন্মের ভাব, আদর্শ ও স্বপ্ন বাহিত হয় পরবর্তী প্রজন্মে। যন্ত্রণা ও ত্যাগের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে কোনো ভাবাদর্শই ফলপ্রসূ হয়নি এই পৃথিবীতে।

‘‘আদর্শকে ধারণ করেছি জীবনে—আদর্শের জন্য বরণ করেছি মৃত্যুকে’—আদর্শবাদীর জীবনে এই অনুভূতির অপেক্ষা কোন মহত্তর অনুভূতি সম্ভবপর? মানুষ আর কোন উচ্চতর অনুভূতি লাভ করতে পারে যদি সে অনুভব করতে পারে যে, তার অসমাপ্ত কর্মভার গ্রহণ করবার মতো সমপ্রাণ মানুষ ভবিষ্যতে এগিয়ে আসবে? কোন অধিকতর উচ্চাঙ্গের পুরস্কার মানবপ্রাণ আকাঙক্ষা করতে পারে যদি সে এই নিশ্চয়তা লাভ করতে পারে যে, তার জীবন-বার্তা সুনিশ্চিতভাবে তার দেশের পর্বত, উপত্যকা ও সমতল প্রান্তরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পৌছে যাবে রন্ধ্রে রন্ধ্রে—এবং প্রসারিত হবে সমুদ্রপারে সুদূর দেশসমূহে? আদর্শের বেদীমূলে প্রশান্ত আত্মদানের অপেক্ষা আর কোন সমুচ্চ সিদ্ধি অর্জন করতে পারে মানবজীবন?

“তাই স্বতঃস্পষ্ট এই সত্য—দুঃখ ও ত্যাগরণের দ্বারা মানুষ হারায় না কিছুই। পার্থিব বস্তু হারালেও বিনিময়ে লাভ করবে অনেক বড় বস্তু—অমর জীবনের উত্তরাধিকার।

“এই হলো মানবাত্মার মহানীতি—ব্যক্তিমানুষকে জীবন দিতে হবে, যাতে তার দেশ জীবিত থাকতে পারে। আমাকে আজ মরতে হবে—যাতে আমার ভারতবর্ষ বাঁচতে পারে—অর্জন করতে পারে স্বাধীনতা—ভূষিত হতে পারে বিশাল গৌরবে।

“দেশবাসীকে এই কথাই আমি বলব : একথা ভুলো না যে, মানবজীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ—দাসত্ব। ভুলোনা—অন্যায় ও অবিচারের সঙ্গে আপস করার চেয়ে বড় অপরাধ আর নেই। স্মরণ রেখো এই শাশ্বত সত্য—তোমাকে জীবন দিতে হবে, যদি ফিরে পেতে চাও জীবন। আর স্মরণ রেখো—মহত্তম শ্রেয়কর্ম হলো অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম—যে-কোনো মূল্যেই হোক।”

শিরায়, ধমনীতে, প্রতি রক্তবিন্দুতে, বিবেকানন্দ গাঁথা থাকলেই তবে ওহেন ইচ্ছাপত্র রচনা করা সম্ভব। সুভাষচন্দ্রের জন্মের মাত্র কয়েকদিন পরে স্বামী বিবেকানন্দ আদর্শ দেশপ্রেমিকের প্রকৃতি নির্ধারণ করে, তার দ্বারা সুভাষের জন্মপত্রিকা রচনা করে দিয়েছিলেন, তা আগেই জেনেছি। বহু বৎসর পরে, সুভাষচন্দ্র মরণপণ অনশনব্রত গ্রহণ করে, তার সেই জন্মপত্রিকার তলায় নিজের স্বাক্ষর এঁকে দিয়েছেন।

এখানে স্বামীজির ‘Hold On Yet A While Brave Heart’কবিতার একটি স্তবক উদ্ধৃত করতেই হচ্ছে :

“Not a work will be lost, no struggle vain,

Though hopes be blighted, powers gone :

Of thy loins shall come the heirs to all,

Then hold on yet a while, brave soul,

No good is e’er undone.”

যে ত্যাগের জীবন সুভাষচন্দ্র বরণ করেছিলেন, সেই ত্যাগের মন্ত্র গ্রহণ করবার জন্য বজ্রধ্বনিত আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন তাঁর সৈন্যবাহিনীকে :

“Comrades! You are today the custodian of India’s national honour and the embodiment of India’s hopes and aspirations…I assure you that I shall be with you in darkness and in sunshine, in sorrow and in joy, in suffering and in victory. For the present I can offer you nothing except hunger, thirst, suffering, forced narches and death. It does not matter who among us will live to see India free. It is enough that India shall be free and that we shall give our all to make her free.”

[“বন্ধুগণ! তোমরাই আজ ভারতের মর্যাদার প্রহরী—তোমরাই আজ ভারতের আশা ও আকাঙক্ষা প্রতিভূ।…. এইআশ্বাস তোমাদের আমি দিতে পারি—তোমাদের সঙ্গেই আমি থাকব—কি আলোকে কি অন্ধকারে, কি আনন্দে কি দুঃখে, কি জয়ে কি যন্ত্রণায়। এই মুহূর্তে তোমাদের দিতে পারব এমন আমার কিছু নেই—দিতে পারি শুধু ক্ষুধা, শুধু তৃষ্ণা, শুধু কঠিন যুদ্ধযাত্রা—শুধু মৃত্যু। আমাদের মধ্যে কেউ স্বাধীন ভারত দেখতে পেল কি পেল না কী এসে যায় তাতে? এটাই কি যথেষ্ট নয় যে, ভারত স্বাধীন হবে—এবং আমরা আমাদের সর্বস্ব দেব ভারতকে স্বাধীন করবার জন্য?”

বিবেকানন্দের রণধ্বনি দিয়েই প্রসঙ্গ শেষ করা যাক :

“যুদ্ধে নেমে পড়ো। পিছু হটো না। আকাশ থেকে নক্ষত্র খসে পড়তে পারে, জগৎ বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, তবু যুদ্ধ করতে হবে। পশ্চাদ্‌অপসরণ করে বিপদ এড়ানো যায় না।”

“সমগ্র জগৎ যদি তরবারি হাতে তোমার বিরুদ্ধে দাড়ায়, তাহলেও কি যাকে সত্য বলে বুঝেছ, তার অনুসরণ করে যেতে পারবে? যদি স্ত্রী-পুত্র তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যদি ধন-মান সব যায়, তবু কি সত্যকে ধরে থাকতে পারবে?”

“সংগ্রাম সংগ্রাম—যতক্ষণ না আলো দেখছ, ততক্ষণ সংগ্রাম। এগিয়ে যাও!”

“যুদ্ধে যদি লক্ষ লক্ষ লোকের পতন হয়, তাতেই-বা ক্ষতি কি—যদি জয়ী হয়ে দু-একজনও ফিরে আসে! যে লক্ষ লক্ষ সৈন্যের মৃত্যু হলো তারা ধন্য—কারণ তাদের রক্তমূল্যেই জয় হয়েছে।”

“বড় লোক তাঁরা, যাঁরা আপনার বুকের রক্ত দিয়ে রাস্তা তৈরী করেন। এই হয়ে আসছে চিরকাল। একজন আপনার শরীর দিয়ে সেতু বানায়, আর হাজার হাজার লোক তার উপর দিয়ে নদী পার হয়।”

“আমার ভিতরে যে আগুন জ্বলছে, তোমাদের ভিতরে সেই আগুন জ্বলে উঠুক। তোমরা যেন জগতের যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো মরতে পারো—এ-ই চাই।”

“আমরা সিদ্ধিলাভ করবই করব। শত শত লোক এই চেষ্টায় প্রাণত্যাগ করবে। আবার শত শত লোক উঠবে। বিশ্বাস, বিশ্বাস—সহানুভূতি। অগ্নিময় বিশ্বাস—অগ্নিময় সহানুভূতি। তুচ্ছ জীবন, তুচ্ছ মরণ, তুচ্ছ ক্ষুধা, তুচ্ছ শীত। এগিয়ে যাও, প্রভু আমাদের নেতা। কে পড়ল ফিরে দেখো না। একজন পড়বে, আর একজন তার স্থান গ্রহণ করবে।”


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন