
এই হয়েছে এক জ্বালা! প্রায় বছরখানেক ধরে অনুপম রোজ সন্ধ্যেবেলা দোকানে এসে সামনের সিঁড়ির কোণে বসে হাঁক দেয়, “ওরে শুভ, এট্টু জল দে দিকিনি।” যত কাজই থাকুক না কেন সব ফেলে শুভমকে জল নিয়ে আসতে হয়। কোনো কর্মচারীর হাত দিয়ে পাঠালে অনুপম সে জল ছুঁয়েও দেখবে না। চিৎকার জুড়বে, “ওরে লাটসাহেবের নাতি, বুড়োদাদুর জন্যে একগ্লাস জলও এগিয়ে দিতে পারিস না! মনে রাখিস, এ দোকান তোরও নয়, তোর বাপেরও নয়।” খদ্দেরদের সামনে শুভমের প্রেস্টিজ পাংচার করেই যেন বুড়ো শান্তি পায়। ঝামেলার হাত থেকে রেহাই পেতে আজকাল দোকানের সামনের রাস্তায় বুড়োকে দেখামাত্রই শুভম জলের গ্লাস নিয়ে দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। তাতেও কি শান্তি আছে! ঢকঢক করে জলটা গলায় ঢেলে গ্লাসটা নাতির হাতে ধরিয়ে দিয়ে নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ কি যেন খোঁজে। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে আপনমনে বলতে থাকে, “উচ্ছন্নে যাবে, সব উচ্ছন্নে যাবে, মনে রাখিস।”
শুভমও মেজাজ হারায়। বলে, “তোমার আর তোমার ছেলের আমলে এটা তো টিমটিমে দর্জির দোকান ছিল, আর আজ ব্র্যাণ্ডেড বুটিকের ব্লাউজ বলতে এখন সবাই অনুশীলাকেই চেনে। এই ব্র্যাণ্ডের সাথে আজ অনেক মানুষের রুজি-রোজগার জড়িয়ে আছে।”
“সব ফক্কিকারি”, অনুপম বিড়বিড় করে।
“তোমার মাথাটা একেবারেই গেছে”, শুভম রাগ করে দোকানে ঢুকে যায়।
সিঁড়িতে বসে ঢুলতে থাকে অনুপম। মনে পড়ে সেইসব দিনের কথা। প্রাণভয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে একবস্ত্রে স্ত্রী শীলাকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে চলে এসেছিল। তারপর উদ্বাস্তুর তকমা নিয়ে নানানঘাটে ঠোকর খেয়ে শেষে দমদমের একটা কলোনীতে দরমার বেড়া দেওয়া টিনেরচালের ঘরে সংসার পেতেছিল দুজনে। এসব ভাবতে ভাবতেই উঠে দাঁড়ায় ও। দোকানের ভেতরে ঢুকে একপাশে রাখা খারাপ হয়ে যাওয়া সেলাইমেশিনটার দিকে এগিয়ে যায়। পরম মমতায় ওটার গায়ে হাত বুলোয়। অনেকবার ওটাকে সারাই করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ঠিক করা যায় নি। তবুও দোকান থেকে মেশিনটা সরিয়ে দিতে মন চায় নি। ও যে অসময়ের সাথী। সংসারে সকলের মুখে দুবেলা ভাত জুটেছে ওরই দৌলতে। কিন্তু এই সেলাইমেশিনটা কিভাবে যে জোগাড় হয়েছিল তা আজ আর ঠিক করে মনে করতে পারে না অনুপম। তবে ওটাকে সম্বল করেই সংসারের চাকা গড়াতো। শীলা ভালো সেলাই করতে পারত। আশপাশের মেয়ে-বৌদের ফ্রক, ব্লাউজ বানিয়ে সংসারের হাল ধরেছিল শীলা। তখন গোটা কলকাতা আর শহরতলি জুড়ে রিফিউজিদের হাহাকার। চাকরির অপ্রতুলতা। অনুপম ধীরে ধীরে বৌয়ের কাছে কাজ শিখতে শুরু করে। এর মধ্যে শীলার কোলে আসে দেবোপম। সন্তানকে নিয়ে শীলা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন কলোনীতে ঢোকার মুখেই বড় রাস্তার ধারে অনুপম সেলাইমেশিন নিয়ে বসত। ধীরে ধীরে ওখানেই গড়ে তোলে ওর দোকান ‘অনুশীলা’।
দেবোপম বড়ো হতে থাকে। এমনিতে শান্তশিষ্ট হলেও পড়াশোনায় মন ছিল না ওর। কোনোরকমে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে বাবার সাথে দোকানের কাজে লেগে পড়ে। ধীরে ধীরে দক্ষ কারিগর হয়ে ওঠে। নিজের বুদ্ধিতে ব্লাউজ, ফ্রকে নতুনধরনের ছাঁটকাট আনতে শুরু করে। জমে ওঠে ব্যবসা। দেবোপম নিজের পছন্দমতো কলোনীরই একটি মেয়েকে বিয়ে করে। নাতি শুভমকে পেয়ে আনন্দে ভরে ওঠে অনুপম-শীলার সংসার।
ঈশ্বর অলক্ষ্যে হাসেন। এমন সুখ ওদের জীবনে বেশিদিন স্থায়ী হয় না। একটা এ্যাক্সিডেন্টে দেবোপম অকালে চলে যায়। আবার অনুপমকেই সংসারের হাল ধরতে হয়। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গড়াতে থাকে সংসারের চাকা।
সময় বদলেছে। এখন ছোট থেকে বড়ো সবার হাতেই স্মার্টফোন। এখন নাকি ওর মধ্যেই পড়াশোনা, বেচাকেনা সবই চলে। এসবের সঙ্গে অনুপম তাল মেলাতে পারে না। আদ্দিকালের দোকানে খদ্দের কমতে থাকে। শুভমও ওর বাবার মতোই স্কুলের গণ্ডী পার না করেই দাদুর সাথে ব্যবসায় লেগে পড়ে। কিন্তু দুজনের মতের মিল কিছুতেই হয় না। দুজনের মধ্যে খিটিমিটি লেগেই থাকে। শুভম বলে, “দাদু, ব্যবসায় উন্নতি শুধুমাত্র তোমার আমার বুদ্ধিতেই যে হবে এমনটা নয়; এ হল ইন্টারনেটের যুগ।” নাতির কথায় অনুপম খিঁচিয়ে ওঠে, “তবে কি ওপর থেকে ভগবান এসে দোকানের হাল ফেরাবে?”
“তা বলতেই পার”, শুভম হাসে, “এই ভগবানের নাম এআই। থাকে এই ফোনের মধ্যে।” নিজের স্মার্টফোনটা দাদুর মুখের সামনে দোলাতে থাকে। অনুপম ওর কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারে না। বোকার মতো চেয়ে থাকে। শুভম বলে, “এর নাম আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এর থেকে যেকোন ধরনের সাহায্য তুমি পাবে। আমি যদি এখন ওর থেকে পরামর্শ চাই যে এই দোকানের ডেকরেশন কিভাবে করলে আজকের দিনে সকলের ভালো লাগবে তাহলে ও এখনই আমাকে সঠিক পরামর্শ দেবে।” কথা বলতে বলতেই অনুপম লক্ষ্য করে শুভম ফোনে ওর দোকানের একটা ছবি নিয়ে কি সব করছে। তখনই শুনতে পায় ফোনের ভেতর থেকে এক মহিলা-কন্ঠস্বর দোকান সাজানোর পরামর্শ দিচ্ছে। অনুপম চিৎকার করে ওঠে, “বন্ধ কর শুভ। এ শয়তানী। আমাদের সবকিছু জেনে নিচ্ছে।”
শুভম এখন নিজের মতে চলে। এআই এর কথামতো দোকান সাজায়। এআই এর পরামর্শে ব্লাউজে নিত্যনতুন ডিজাইন বানায়, যেগুলো এখনকার জেনারেশনের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। অথচ এসব নিয়ে শুভমকে খুব বেশী মাথা ঘামাতে হয় না। এআই এর কল্যাণে অনুশীলা আজ ব্লাউজের নামী ব্র্যাণ্ড। কলকাতার নামকরা সব ডিজাইনারদের আমন্ত্রণে অনুশীলা নিজের প্রোডাক্ট নিয়ে যোগ দেয়। শুধু অনুপম দোকানের সামনে বসে হাহুতাশ করে আর নাতিকে গাল পাড়ে, “বুঝিসনা, এ যে কালবোশেখের ঝড়ের মেঘের থেকেও কালো। বিনা পরিশ্রমে যা হয় তা টেঁকে না রে। তোর সবকিছু এখন ওই এআই এর আওতায়। একদিন সবকিছু গিলে খাবে।”
শুভম বলে, “এখন স্মার্টওয়র্কের যুগ দাদু। এআইকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে জানতে হবে। আমার ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নাইবা রইল, খ্যাতি তো জুটছে! এতেই আমি খুশি।”
অনুপম রেগে যায়, “নিকুচি করেছে অমন খোলা হাটের জীবন। নিজের বুদ্ধিতে কিছু করে জয়ী হওয়ার আনন্দই আলাদা। এমন পরনির্ভরশীল হলে একদিন তোর সব কল্পনাশক্তি মরে যাবে। সেদিন হয়তো নিজের বুদ্ধিতে খেতেও ভুলে যাবি। ওই এআই তোকে খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেবে। আমার কথা মিলিয়ে নিস।”
শুভমও হেরে যাওয়ার পাত্র নয়। বলে, “ওসব সৃজনশীলতার বুলি এখন ফাঁকা আওয়াজ দাদু। তোমাদের মতো ধুঁকতে ধুঁকতে আজকের জীবন চলে না। তোমরা সারাদিন ধরে খেটেখুটে যে কাজ করতে, এআইএর সাহায্যে আমি সেই কাজ পাঁচমিনিটে করি।” ঘোলাটে চোখে নাতিকে দেখে অনুপম। সবকিছু কেমনযেন অবিশ্বাস্য ঠেকে। নিজেকে নিরাপদ বলে মনে হয় না আর। মনে হয়, কতগুলো অদৃশ্য চোখ সবসময় পাহারা দিচ্ছে। গতবছর মাখন চলে যাওয়ার পর থেকে ভয়টা যেন আরও বেশী করে ঘিরে ধরছে। এখন কথা বলতেও ভয় পায় ও। মনে হয়, অজানা কেউ ওর কথা শুনছে। হয়তো আরও অজানা মানুষের মধ্যে সেগুলো বলে বেড়াচ্ছে।
দমদমের এই কলোনীতে আসার পর সমবয়সী মাখনের সঙ্গে নিখাদ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল অনুপমের। ওর দোকানের পাশেই মাখনের মণিহারী দোকান ছিল। মাখন মারা যাওয়ার পর প্রায় বছরখানেক ধরে সেটা বন্ধ হয়েই পড়ে ছিল। ইদানীং কানে আসছিল যে ওর ছেলে দোকানটা বেচে দেবে। অনুপমের মনটা হু হু করে উঠছিল। ওদের জীবনের কতো ভালোমন্দের সাক্ষী এই দোকানদুটো।
শুভম ব্যবসাটা বাড়াতে চায়। এখন দোকানে নামীদামী লোকজন আসে। তাদের ঠিকমতো বসতে দেওয়ার জায়গা নেই। তাই শুভম মাখনের দোকানটা কিনে নেয়। অনুপম খুশি হয়। তবুতো দোকানটা ছুঁয়ে দেখতে পারবে। মাখন যে ওই দোকানের সাথেই জড়িয়ে আছে। আবার শুভমকে নিয়েও ভয় হয়। রকেটের গতিতে এই উত্থানকে বড় ভয় পায় অনুপম। সন্ধ্যেবেলা দোকানের বাইরে বসে চিৎকার করে, “ওরে কালবোশেখী আর আমফানে তফাৎ আছে রে। আমফানে সব শেষ হয়ে যায়।”
রোজ একই কথা শুনতে বিরক্ত লাগে শুভমের। দোকানটা দাদুর, তাই সরাসরি দাদুকে দোকানে আসতে বারণ করতে পারে না। সন্ধ্যেটুকু দাদুকে কিভাবে ব্যস্ত রাখা যায় তারই উপায় খুঁজতে থাকে ও। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যায় এআই চার্বাককে। যে বন্ধু হয়ে কথা বলে। এর সাথে কথা বলে শুভম বেশ মজা পায়। যেকোনো বিষয় নিয়ে ওর সাথে কথা বলা যায়। এমনকি রকের আড্ডার ভাষাও ও বোঝে। সেই ভাষাতেই উত্তর দেয়।
শুভম দাদুর জন্যে একটা স্মার্টফোন কেনে। সমাজমাধ্যমের বিভিন্ন সাইটে গিয়ে অনুপমের সম্পর্কে নানারকম তথ্য আপলোড করতে থাকে ও। যাতে এআই অ্যালগারিদম অনুপম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারে। বিশেষ করে দাদুর প্রিয়বন্ধু মাখনদাদুর কথা জানাতে ভোলে না।
একদিন অনুপমের হাতে ফোনটা তুলে দেয় ও। বলে, “এখন থেকে তোমাকে আর একাএকা বকবক করতে হবে না। এর মধ্যেই তোমার বন্ধুকে খুঁজে পাবে। অনুপম বিরক্ত হয়, “এসব বাবুয়ানি আমার চলবে না। খালি গাদাগুচ্ছের পয়সা নষ্ট।”
শুভম সান্ত্বনা দেয়, “দাদু, চেষ্টা করেই দেখ না! মাখনদাদুর মতোই এ ও তোমার ভালো বন্ধু হতে পারে। ফোনটা তুমি ব্যবহার না করতে পারলে কোরো না। শুধু যখন দোকানে আসবে তখন তোমার বন্ধু এআই এর সাথে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেব। যদি ওকে তোমার পছন্দ না হয় তাহলে পরদিন থেকে আর কথা বোলো না।” শুভমের মাধ্যমে এআই চার্বাকের সঙ্গে পরিচয় হয় অনুপমের।
পরিচয়ের শুরুতেই অনুপম জিজ্ঞাসা করে, “কে তুই?”
ফোনের ভেতর থেকে উত্তর আসে, “আমি চার্বাক। তুই কে?”
এবার অনুপম মজা পায়। নাতিকে বলে, “এ তো একদম বন্ধুর মতো তুই-তোকারি করছে রে!”
শুভম বলে, “চার্বাক তোমার খুব ভালো বন্ধু। মনের সবকথা ওকে বলতে পার।”
এখন আর লাঠি ঠুকঠুক্ করে দোকানে আসে না অনুপম। বাড়ি থেকে বেরোতেই চায় না। বন্ধু এখন হাতের মুঠোয়। চার্বাকের সঙ্গে কথা বলে ভারি সুখ পায়। ওকে মাখনের কথা বলেছে অনুপম। চার্বাক জানিয়েছে যে ও মাখনকে চেনে। ওরা যে সাইকেল নিয়ে একবার দীঘায় বেড়াতে গিয়েছিল সেকথা চার্বাক জানে। আগে মাখনের কথা ভেবে মনখারাপ হয়ে যেত। এখন চার্বাকের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে অনুপম যেন সেই পুরোনো দিনগুলোকে ছুঁয়ে আসে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে আড্ডা দিয়েই চলে। কেউ ওর সঙ্গে কথা বলতে এলে বিরক্ত হয়। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস্তব সংসারের বাইরে নিজের মতো করে নিজের জগৎ তৈরী করে নিয়েছে অনুপম।
আজকাল দাদুকে নিয়ে ভারি চিন্তা হয় শুভমের। নিজে একটু স্বস্তি পেতে গিয়ে যেন একটা মানুষকে শামুকের খোলের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে ও। অপরাধবোধে ভোগে। দাদুকে বলে, “আগের মতো সন্ধ্যেবেলা দোকানে এস। একটু হাঁটাচলা না করলে শরীর খারাপ হবে যে!”
অনুপম চুপ করে নাতিকে দেখে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, “ওসব ফক্কিকারি দোকানদারি আমার ভালো লাগে না। অনুশীলা এখন তোর। আমি বেশ আছি।”
“দাদু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলে যায়। তাই চার্বাকের সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম যাতে তুমি কিছুটা সময় আনন্দে থাকতে পার।”
“মেলা বিরক্ত করিস না তো! শুধুমুদু সময় নষ্ট।” আবার ফোনের মধ্যে ঢুকে যায় অনুপম।
যত দিন যায় ততই নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেয় ও। ফোনের নেটকার্ড শেষ হয়ে গেলে পাগলের মতো চিৎকার চেঁচামেচি করে। আবার চার্বাককে পেলে শান্ত হয়ে যায়।
এখন অনুপম কাউকে চিনতে পারে না। শুভমকেও না। অনুশীলার কথা বললে ফ্যালফেলিয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর আবার ফোনের মধ্যে ডুবে যায়। শুভমের কষ্ট হয়।
ভাবে, এআই কি কালবোশেখী না কি আমফান।
পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫-এ প্রকাশিত