| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার গিরমিটিয়া ভারতীয়দের ইতিহাস — কলকাতা বন্দর থেকে বিশ্বজুড়ে এক সংগ্রামের কাহিনী : কমল ব্যানার্জী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সৃজন-মানসের অন্তর্বয়ন ও লেখাজীবনের প্রেক্ষিত : আনন্দগোপাল হালদার কেতকী কুশারী ডাইসন, রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা ও আমাদের রক্ষণশীল সমাজ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাষ্ট্রের বিধি বনাম মায়ের শেষ ইচ্ছে — চিন্ময়কৃষ্ণের ঘটনা যে প্রশ্ন রেখে গেল : যশোবন্ত রায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার নেপালের পর কি কলকাতা জলের তলায় চলে যাবে — চিন্তায় বিশেষজ্ঞরা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বৈশ্বিক অস্থিরতায় জাতিসংঘের ছয় অগ্রাধিকার : নিকোলাস বিশ্বাস বাম-ব্যানারে শারদোৎসব না দুর্গোৎসব : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ গুরুবাবাদের প্রবঞ্চনা-শোষণ-যৌনতা ও রাজনীতির জম-জমাট রঙ্গ : দিলীপ মজুমদার সিরাত : জীবন খুঁজে দেয় : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘টেবিলের নিচে একটি দেশ’ বানভাসি এলাকায় মানুষ ও সাপের সহাবস্থান, দংশনে বাড়ছে মৃত্যু : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘সংকোচ’ পাখণ্ডী শব্দটির অর্থ যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ লাইন অব প্যাসেজ — সংগ্রামী জীবনের দর্পণ : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কেন উত্তম মহানায়ক : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ রাখি পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৪৯ Views জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

১০। জমা-পাছৌত্রা — মুঘল আমলের রাজস্ব বা কর ব্যবস্থার ইতিহাসে ‘জমা’ (Jama) এবং ‘পাছৌত্রা’ (Pachotra/Panchotra) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি পরিভাষা বা শব্দ। সহজ ভাষায় এই দুটি শব্দ দিয়ে মুঘলদের কর ব্যবস্থার দুটি ভিন্ন দিক বোঝানো হতো। জমা (Jama)মুঘল আমলে ‘জমা’ বলতে বোঝাত কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা জমি থেকে সরকারের পাওনা আনুমানিক বা নির্ধারিত মোট রাজস্বের পরিমাণ। এক ধরণের বাজেট বা ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট। সম্রাট আকবরের বিখ্যাত অর্থমন্ত্রী রাজা টোডরমল যখন জমি মেপে প্রতি ১০ বছরের গড় উৎপাদন দেখে কর নির্ধারণ করার নিয়ম বা ‘দহশালা ব্যবস্থা’ চালু করেন, তখন এই ‘জমা’ বা ধার্যকৃত করের হিসাব রাখা হতো। মুঘল রাজকোষে বাস্তবে কত টাকা জমা পড়ল (যাকে বলা হতো ‘হাসিল’ বা Hasil), তার সাথে কাগজের এই ‘জমা’-র বা নির্ধারিত করের অনেক সময় অমিল দেখা দিত। এবারে পাছৌত্রা — ছৌত্রা (হিন্দি বা ফার্সি শব্দ ‘পাঁচ’ থেকে এসেছে) শব্দের মূল অর্থ হলো শতকরা ৫ ভাগ কর বা কমিশন। মুঘল ও পরবর্তী নবাবী আমলে এর মূলত দুটি ব্যবহার ছিল — অভ্যন্তরীণ শুল্ক বা সাইর (Sair) কর : দেশের ভেতরে বিভিন্ন নদী বা স্থলপথে পণ্য আনা-নেওয়ার সময় যে শুল্ক বা ট্রানজিট ট্যাক্স নেওয়া হতো, তাকে অনেক সময় ‘পাছৌত্রা’ বলা হতো। তৎকালীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে ‘পাছৌত্রা দারোগা’ নামে একটি পদ ছিল, যিনি এই অভ্যন্তরীণ শুল্ক বা কর আদায়ের তদারকি করতেন। রাজস্ব আদায়ের কমিশন : গ্রামীণ অঞ্চল থেকে যখন চৌধুরী, মুকাদ্দম বা পরবর্তীকালে লম্বরদাররা প্রজাদের কাছ থেকে ভূমি রাজস্ব বা খাজনা আদায় করে সরকারি তহবিলে জমা দিতেন, তখন তারা পারিশ্রমিক বা কমিশন হিসেবে সংগৃহীত এককথায় বলতে গেলে, ‘জমা’ ছিল মুঘল সরকারের নির্ধারিত মোট করের খতিয়ান বা হিসাব এবং ‘পাছৌত্রা’ ছিল শুল্ক বা কর আদায়ের জন্য নির্ধারিত ৫ শতাংশের একটি বিশেষ ভাগহীত করের মোট পরিমাণের ওপর এই শতকরা ৫ ভাগ (৫%) বা ‘পাছৌত্রা’ নিজেদের কাছে রাখার অধিকার পেতেন।

১১। জমা-মহাল-বদরকি — মুঘল আমলের রাজস্ব বা ভূমিনীতি সংক্রান্ত প্রশাসনিক পরিভাষা। মুঘল শাসনামলে বিশেষ করে বাংলা, বিহার ও ওড়িশা অঞ্চলের জমিদারি, হিসাব-নিকাশ এবং কর আদায়ের ক্ষেত্রে এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হতো।নিচে সহজ ভাষায় প্রতিটি শব্দের অর্থ ও মুঘল আমলের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা হলো :

১. জমা (Jama)সহজ অর্থ : নির্ধারিত মোট কর বা রাজস্ব। মুঘল প্রেক্ষাপট : মুঘল আমলে কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা জমি থেকে বছরে মোট কত টাকা কর বা রাজস্ব (Revenue) আদায় করা হবে, তা সরকার আগে থেকেই নির্ধারণ করে দিত। এই পূর্ব-নির্ধারিত বা ধার্যকৃত মোট করের পরিমাণকে বলা হতো ‘জমা’।

২. মহাল (Mahal) সহজ অর্থ : কর আদায়ের একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা বিভাগ। মুঘল প্রেক্ষাপট : রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য মুঘল প্রশাসন জমি বা পরগনাগুলোকে ছোট ছোট ভাগে বা ইউনিটে ভাগ করত। কর আদায়ের এমন প্রতিটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক এলাকা, জেলা বা সম্পত্তিকে বলা হতো ‘মহাল’। যেমন : লবণের মহাল, বনের মহাল ইত্যাদি। ৩. বদরকি (Badarki / Badarka) সহজ অর্থ : পথ খরচ, পাহারা বা কুলি খরচ বাবদ অতিরিক্ত কর। মুঘল প্রেক্ষাপট : এটি ছিল এক ধরনের ‘আবছাব’ বা অতিরিক্ত কর। মুঘল আমলে যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পণ্য বা ধনসম্পদ নিয়ে যাওয়া হতো, তখন রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা (পাহারা) এবং মালামাল বহনের খরচ হিসেবে ব্যবসায়ীদের ওপর এই বিশেষ কর বা ফি ধার্য করা হতো।এক নজরে পুরো বিষয়টি : মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থায় “জমা-মহাল-বদরকি” বলতে বোঝাত — কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজস্ব এলাকা (মহাল) থেকে সরকারের ধার্যকৃত মোট করের হিসাব (জমা) এবং সেই সাথে পণ্য বা সম্পদ পরিবহনের জন্য প্রযোজ্য অতিরিক্ত পথ-শুল্ক বা পাহারা খরচ (বদরকি)। মুঘল দেওয়ান বা রাজস্ব কর্মকর্তারা এই হিসাবগুলোর ওপর ভিত্তি করে রাজকোষের খাতা বজায় রাখতেন।

১২। ইস্ম-নভিসি-জমিদারান (Ism-navisi Zamindaran) হলো মুঘল আমলের রাজস্ব প্রশাসনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দলিল বা নথি, যার সহজ অর্থ হলো “জমিদারদের নামের তালিকা”। মুঘল যুগে এটি ছিল একটি আনুষ্ঠানিক রেজিস্টার বা খাতা, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের বা পরগনার সমস্ত জমিদারের নাম, তাদের আওতাধীন এলাকা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিবরণ লিপিবদ্ধ করা থাকত। ফার্সি শব্দভাণ্ডার থেকে এই শব্দটির উৎপত্তি : ইস্ম (Ism) : নাম। নভিসি (Navisi) : লিখন বা তালিকাভুক্তকরণ। জমিদারান (Zamindaran) : জমিদারগণ (জমিদারের বহুবচন)। এই দলিলের মূল কাজ ও গুরুত্ব : মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থাকে সুসংগঠিত রাখতে এই নথিটি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হতো : জমিদারদের হিসাব রাখা : কোনো নির্দিষ্ট পরগনা বা সুবায় (প্রদেশে) কতজন জমিদার আছেন এবং তাদের সীমানা কতটুকু, তার নিখুঁত হিসাব সরকারের কাছে থাকত। রাজস্ব আদায়ের তদারকি: কোন জমিদারের কাছ থেকে কত টাকা বা শস্য কর (Land Revenue) আদায় করতে হবে, তা নির্ধারণে এই তালিকা সাহায্য করত। সামরিক বাধ্যবাধকতা : অনেক জমিদারকে মুঘল দরবারে সৈন্য বা ঘোড়া সরবরাহ করতে হতো। কার কত সৈন্য দেওয়ার কথা, তা এই তালিকার মাধ্যমে যাচাই করা হতো। উত্তরাধিকার ও মালিকানা বদল : কোনো জমিদারের মৃত্যু হলে তার জায়গায় কে নতুন জমিদার হলেন, তা এই রেজিস্টারে আপডেট বা পরিবর্তন করা হতো। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ‘ইস্ম-নভিসি-জমিদারান’ নথিটি বিশ্লেষণ করে আধুনিক ঐতিহাসিকগণ (যেমন অধ্যাপক এস. নুরুল হাসান) মুঘল আমলের গ্রামীণ সমাজ, জমিদারি প্রথার কাঠামো এবং তৎকালীন অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পেরেছেন

১৩। হকিকত-বাজি-জমিন — হকিকত-বাজি-জমিন। মুঘল সাম্রাজ্যের কর ও রাজস্ব ব্যবস্থার আলোকে এই তিনটি শব্দের সমন্বিত অর্থ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো : হকিকত (Haqiqat) : এটি একটি আরবি শব্দ যার অর্থ ‘প্রকৃত অবস্থা’, ‘সত্য’ বা ‘বাস্তব বিবরণ’। মুঘল রাজস্ব দপ্তরে কোনো জমি বা রাজস্বের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য নথিপত্রকে ‘হকিকত’ বলা হতো। বাজি জমিন (Bazi Zamin) : মুঘল আমলে যে সমস্ত জমি থেকে রাষ্ট্র কোনো রাজস্ব বা খাজনা আদায় করত না, সেগুলোকে ‘বাজি জমিন’ বা ‘বাজে জমিন’ বলা হতো। সাধারণত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, ব্রাহ্মণ বা সুফি সাধকদের দান করা জমি (যেমন: মদদ-ই-মাশ, ইনাম বা ওয়াকফ জমি) এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুঘল প্রেক্ষাপট : সম্রাট আকবরের অর্থমন্ত্রী রাজা টোডরমল যখন জাবতি প্রথা (Zabt System) ও ভূমি জরিপ ব্যবস্থা চালু করেন, তখন করযোগ্য জমির পাশাপাশি কর-মুক্ত জমির হিসাব রাখার জন্যও আলাদা রেজিস্টার বা খাতা তৈরি করা হয়। মূল তাৎপর্য:মুঘল প্রশাসনিক পরিভাষায়, “হকিকত-বাজি-জমিন” বলতে বোঝাত এমন একটি রাজকীয় সরকারি নথি বা রেজিস্টার, যেখানে সাম্রাজ্যের বা কোনো নির্দিষ্ট পরগনার সমস্ত কর-মুক্ত বা দান করা জমির পরিমাণ, মালিকানার বিবরণ এবং তার বৈধতার সত্যতা লিপিবদ্ধ থাকত। এর মাধ্যমে বাদশাহী দপ্তর নিশ্চিত করত যে কোন কোন জমি থেকে রাজস্ব আদায় করা যাবে না এবং কারা এই রাজকীয় অনুদান ভোগ করছেন।

১৪। জমা-মুকাররি ও ইস্তিমরারি। – জমা-মুকাররি (Jama-Mukarari) এবং ইস্তিমরারি (Istimrari) হলো মুঘল আমলে (এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলে) প্রচলিত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমি-রাজস্ব বা খাজনা সংক্রান্ত পরিভাষা। এই দুটি ব্যবস্থার মূল কথাই ছিল জমির খাজনা বা রাজস্ব চিরস্থায়ীভাবে নির্দিষ্ট বা অপরিবর্তিত রাখা। জমা-মুকাররি (Jama-Mukarari) সহজ অর্থ : ‘জমা’ মানে নির্ধারিত খাজনা বা রাজস্ব, আর ‘মুকাররি’ শব্দের অর্থ হলো স্থায়ী, নির্দিষ্ট বা স্থিরীকৃত। অর্থাৎ, যে ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো জমি বা এলাকার খাজনা স্থায়ীভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো, তাকে ‘জমা-মুকাররি’ বলা হতো। মূল বৈশিষ্ট্য : মুঘল শাসনামলে সম্রাট, সুবাদার বা স্থানীয় হাকিম কোনো ব্যক্তি বা জমিদারকে পুরস্কৃত করতে বা বিশেষ অনুগ্রহ দেখাতে এই অধিকার দিতেন। একবার এই চুক্তি হয়ে গেলে, বছরের পর বছর জমির ফলন কম বা বেশি হলেও সরকার বা জমিদার সেই নির্দিষ্ট খাজনার চেয়ে বেশি দাবি করতে পারত না।

২. ইস্তিমরারি (Istimrari) সহজ অর্থ : ‘ইস্তিমরারি’ একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ হলো চিরস্থায়ী, ধারাবাহিক বা বংশানুক্রমিক।মূল বৈশিষ্ট্য: এই ব্যবস্থার অধীনে কোনো জমিদার বা মধ্যস্বত্বভোগীকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক রাজস্বের বিনিময়ে কোনো একটি অঞ্চলের রাজস্ব সংগ্রহের স্থায়ী অধিকার দেওয়া হতো। এটি সাধারণত বংশানুক্রমিক বা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তরিত হতো। মুঘল সাম্রাজ্যের শেষের দিকে (যেমন সম্রাট ফাররুখশিয়ারের আমলে) এবং রাজস্থানের আজমির-মেওয়ার অঞ্চলে এই ‘ইস্তিমরারি এস্টেট’ বা জায়গিরের ব্যাপক প্রচলন ছিল ।জমা-মুকাররি ও ইস্তিমরারি-র মধ্যে সম্পর্কমুঘল যুগের শেষভাগে এবং পরবর্তীকালে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) চালুর সময়ে এই দুটি শব্দকে প্রায়ই একসাথে যুক্ত করে “ইস্তিমরারি মুকারররি” (Istimrari-Mukarari) হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সহজ কথায় এর অর্থ দাঁড়ায় : এটি এমন এক ধরণের ভূমি ব্যবস্থা বা পাট্টা (চুক্তিপত্র), যা একই সাথে চিরস্থায়ী (ইস্তিমরারি) এবং যার খাজনার পরিমাণও নির্দিষ্ট বা অপরিবর্তিত (মুকাররি)।এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা জমিদাররা বংশপরম্পরায় ওই জমি ভোগদখল করার এবং নির্দিষ্ট খাজনা দিয়ে রাজস্ব আদায়ের আইনি অধিকার লাভ করতেন ।

১৫। উসুল-বাকি — উসুল-বাকি (বা উসুল-ই-বাকী) হলো মুঘল আমলের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শব্দ। সহজ কথায়, এর অর্থ হলো বকেয়া রাজস্ব বা খাজনা আদায় করা। মুঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব নীতিতে দুটি প্রধান দিক ছিল : ‘জমা’ (ধার্য করা মোট রাজস্বের পরিমাণ) এবং ‘হাসিল’ (প্রকৃতপক্ষে আদায় হওয়া রাজস্বের পরিমাণ)। যখন ধার্য করা খাজনার পুরোটা আদায় হতো না, তখন যে অংশটি বাকি থেকে যেত তাকে বলা হতো ‘বাকি’। আর সেই বকেয়া পাওনা টাকা বা খাজনা আদায় করার প্রক্রিয়াকেই বলা হতো উসুল-বাকি।মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থায় উসুল-বাকি সংক্রান্ত মূল বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো : বকেয়া জমার কারণ : খরা, বন্যা বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চাষিরা অনেক সময় সময়মতো পুরো খাজনা দিতে পারতেন না। ফলে প্রতি বছরই কিছু না কিছু রাজস্ব বকেয়া বা বাকি থেকে যেত। আদায়ের দায়িত্ব : সম্রাট আকবরের আমলে তৈরি আইন-ই-আহমদী বা দহসালা ব্যবস্থার অধীনে স্থানীয় রাজস্ব কর্মকর্তা, যেমন — আমিল, করোড়ি, এবং চৌধুরী বা জমিদারদের ওপর এই বকেয়া বা ‘উসুল-বাকি’ আদায়ের কঠোর দায়িত্ব থাকত। নথিপত্র রক্ষণাবেক্ষণ : মুঘল হিসাবরক্ষক বা পাটোয়ারী ও কানুনগোরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খতিয়ান বা রেজিস্টার খাতায় হিসাব রাখতেন যে কার কত টাকা ‘উসুল’ (আদায়) হয়েছে এবং কার কত টাকা ‘বাকি’ রয়েছে। ছাড় বা মওকুফ : যদি পরিস্থিতি সত্যিই খুব খারাপ হতো (যেমন চরম দুর্ভিক্ষ), তবে প্রজাদের কষ্টের কথা চিন্তা করে সম্রাটরা কখনো কখনো এই ‘বাকি’ বা বকেয়া খাজনা সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিতেন।

১৬। হকিকত-রোজিনাদারান — মুঘল প্রশাসনিক ইতিহাসে ‘হকিকত-ই-রোজিনাদারান’ (Haqiqat-i-Rozinadaran) বা ‘হকিকত-এ-রোজিনাদারান’ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ফার্সি দলিল বা নথিপত্র। সহজ কথায়, এটি ছিল মুঘল দরবারে দৈনিক ভাতা বা দৈনিক মজুরি পাওয়া কর্মচারীদের বেতনের হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত অফিশিয়াল রেকর্ড বা খতিয়ান। হকিকত (Haqiqat) : ফার্সি বা আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘প্রকৃত অবস্থা’, ‘বিবরণ’ বা ‘তথ্যবিবরণী’। রোজিনাদারান (Rozinadaran): এটি ‘রোজিনা’ (Rozina) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ দৈনিক ভাতা বা প্রতিদিনের মজুরি। ‘রোজিনাদারান’ বলতে বোঝাত যারা দৈনিক ভিত্তিতে টাকা বা ভাতা পেতেন। মুঘলদের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক অর্থ বিভাগ (দেওয়ানি বিভাগ) এই নথিটি রক্ষণাবেক্ষণ করত। হিসাব রাখা : মুঘল রাজপ্রাসাদ, সেনাবাহিনী বা বিভিন্ন সরকারি বিভাগে এমন অনেক কর্মচারী, রক্ষী, শিল্পী ও পণ্ডিত ছিলেন যারা স্থায়ী মনসবদার ছিলেন না। তাদের প্রতিদিনের হাজিরার ভিত্তিতে টাকা দেওয়া হতো। এই কর্মচারীদের কার কত টাকা পাওনা, তার চূড়ান্ত বিবরণী বা ‘হকিকত’ তৈরি করা হতো। অনুমোদন : এই হকিকত বা বিবরণীটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা উজিরের কাছে পেশ করা হতো এবং তাঁর সই বা সিলমোহরের পর দৈনিক মজুরি বা ভাতা সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হতো। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা : এর মাধ্যমে বোঝা যায় মুঘলদের শাসনব্যবস্থা কতটা পদ্ধতিগত বা নিয়মতান্ত্রিক ছিল। ক্ষুদ্রতম খরচেরও লিখিত হিসাব রাখা হতো। ঐতিহাসিক দলিল : বর্তমান গবেষক ও ইতিহাসবিদদের কাছে এই নথিগুলো মুঘল আমলের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং মুদ্রার মান বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev