
কথিত আছে, রাজসূয় যজ্ঞের সময় শ্রীকৃষ্ণ শিশুপাল বধ করতে উদ্যত হলে তাঁরই সুদর্শন চক্রে আঙুল কেটে রক্ত পরতে থাকে। সেটা দেখে দ্রৌপদী ছুটে এসে নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে শ্রীকৃষ্ণের আঙুলে বেঁধে দেন। রক্তপাত বন্ধ হয়। দ্রৌপদীর স্নেহময়ী রূপে শ্রীকৃষ্ণ অভিভূত হয়ে প্রতিশ্রুতি দেন আজীবন তাকে রক্ষা করবেন। পরবর্তীতে দ্রৌপদীকে কৌরব রাজসভায় চরম কলঙ্ক থেকে শ্রীকৃষ্ণ রক্ষা করেছিলেন।
সেই থেকেই বাঙালি অবাঙালি নির্বিশেষে সারা ভারতবর্ষেই ভাইবোনের সম্পর্কের মাধুর্য ও দৃঢ়তা বজায় রাখার পারিবারিক সংস্কৃতি হয়ে ওঠে রাখী বন্ধন। এরই প্রবাহিত ধারায় একসময় মনুষ্যত্বের প্রতি আস্থা হারানো কুতুবুদ্দিন আনসারিকে রাখীর বন্ধনের সৌভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ করেছিলেন রূপা গাঙ্গুলী তথা আমাদের সকলের দ্রৌপদী।
রামানন্দ সাগরের বিখ্যাত টিভি সিরিয়াল মহাভারতের দ্রৌপদী খ্যাত রূপার তখন বাংলা হিন্দি দুই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেই জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। প্রসঙ্গত বলি অনেকেই হয়তো জানেন না, শুধু অভিনয় নয় রূপা কিন্তু ভীষণ ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। ওর অ্যালবামও আছে। কিন্তু রূপার সবচেয়ে বড়ো গুণ যে রীতিমত স্টার হয়েও ওর ভিতরে কখনও সেই নিয়ে অহংবোধ দেখিনি। এখন আবার সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক নেত্রী হয়েও দেখি সেই একইরকম আছে, ভীষণভাবে সাধারণ। মানুষ হিসেবে বরাবর আবেগী হলেও রূপা স্পষ্টবক্তা ও সহজ মনের। আমার সঙ্গে তার পরিচয় হওয়া সেই দ্রৌপদী সময়কার বন্ধুত্ব এখনও অটুট রয়েছে।
সাল তারিখ আজ আর মনে নেই। আমি তখন আনন্দবাজারে, একটা বিশেষ বিভাগের দায়িত্বভার নিয়ে আমি ছবির জন্য তখন ঘুরে বেড়াতাম শহরের আনাচে কানাচে। সেরকমই এক রাখী বন্ধনের দিনে রুপার সঙ্গে হাজির হয়েছিলাম কুতুবুদ্দিনের তৎকালীন কলকাতার আস্তানায়। স্ত্রী কন্যার সঙ্গে এক চিলতে ঘরে তার সংসার। তখনও সেভাবে বাংলার সঙ্গে পরিচিতি তৈরি হয় নি।
সেদিন ফুল দিয়ে গাঁথা সুন্দর একটা রাখী কুতুবুদ্দিনের হাতে বেঁধে দেওয়ার সময় ও রূপার কাছে জানতে চায় বিষয়টা…. “আজকে আমাদের এখানে বোন বা দিদি তার ভাইকে রাখী পরায় যাতে সে সকল আঘাত থেকে রক্ষা পায় ও তাদের ভাইবোনের সম্পর্ক দৃঢ় হয়”….রূপার এহেন কথায় কেঁদে ফেলেছিলো কুতুবুদ্দিন। ঘরে উপস্থিত ওর ছোট্ট মেয়ে ও স্ত্রীও অবাক….নিজেদের দুর্ভাগ্যের কথা স্মরণ করে হয়তো ভাবছিলো ‘এমনও হয়’!
আসলে প্রবাসে অচেনা মানুষের কাছে তার আপন জায়গার পরিচিত মানুষদের কাছ থেকে হারানো মানবিক মূল্যবোধের উপর যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিলো তাতে সেদিন রূপা স্নেহের প্রলেপ দিয়েছিলো।
জানিনা এই দিনের কথা রূপার মনে আছে কিনা! কারণ সময়ের চাকা গড়িয়েছে অনেকটাই। জনপ্রতিনিধি হিসেবে আজ তার চূড়ান্ত ব্যস্ততার দিন কাটে। রূপা সেদিন তার শিক্ষায়, রুচিতে, আতিথেয়তার মাধ্যমে ধর্ম জাতির বেড়াজালে নয় বরং বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থানই যে বাংলার মানুষকে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছে সেটার সঙ্গেই কুতুবুদ্দিনের পরিচয় ঘটিয়েছিলো।
রাখী বন্ধন পারিবারিক উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশজুড়ে ব্যাপকতা লাভ করে ব্রিটিশ আমলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলার সকল মানুষকে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রাখি পরিয়ে সম্প্রীতি ও ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। সেই একতার অনন্য বার্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমগ্র বাঙালি জাতি একজোট হয়ে “বাংলার মাটি বাংলার জল” গান গাইতে গাইতে পথে নেমে রুখে দিয়েছিলো বঙ্গভঙ্গ।
সেই থেকেই রাখী বন্ধন উৎসব হয়ে ওঠে বিশ্বমানবতা বোধের মিলনমেলা। যার রেশ ধরেই কুতুবুদ্দিনকে ভরসা ও বিশ্বাসের সূত্রে বেঁধে রাখাটা বাঙালির কাছে নতুন কিছু নয়। বরং এটাই স্বাভাবিক যে যুগ কাল ছাপিয়ে পশ্চিমবঙ্গে মানবতাই সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার একমাত্র শর্ত…. আমার তোলা এই ছবিদুটো সেই চিরন্তন শর্তেরই দাবীদার। বাংলার এই চিরকালীন সম্প্রীতির রূপটাই কুতুবুদ্দিনকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে দিয়েছিলো জীবনের প্রতি ভরসা। ছবি দুটো আমাদের সেই স্নেহ করুণায় গাঁথা বাংলার প্রতীক যা ভারতবর্ষকে বারবার একতার পথ দেখায়।
আচ্ছা এই যে কুতুবুদ্দিন আনসারির কথা বলছি আপনাদের কি ওকে মনে আছে?
২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গার সময় ভয়ে ও আতঙ্কে হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা চাওয়া যে ছেলেটির ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলো এ সেই কুতুবুদ্দিন আনসারি। দাঙ্গা বিধ্বস্ত তখন গোটা আহমেদাবাদ শহর। কুতুবুদ্দিন ও তার পরিবার তখন প্রাণভয়ে দিশেহারা। বাড়িতে দরজা জানলা বন্ধ করে দমবন্ধ আতঙ্কের দিনরাত কাটছে। হঠাৎই একদিন জানলা দিয়ে সে আর্মির গাড়ি দেখতে পায়। কাতর আর্জিতে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলে ওঠে, “সাব মুঝে বাঁচা লিজিয়ে….”
কুতুবুদ্দিনকে ওই অবস্থায় দেখে দূর থেকেই ছুটতে ছুটতেই ছবিটা ক্লিক করে আমাদের বাংলারই ফটোগ্রাফার অর্ক দত্ত। অন্য ফটোগ্রাফাররাও ছিলো কিন্তু অর্কর তোলা ওই বিশেষ মুহূর্তের ছবিটাই পৃথিবীতে এতবার ছাপা হয়েছে ও ডিজিট্যাল সংগ্রহে আছে যা বিশ্বরেকর্ড বলা যায়।
অত্যন্ত মেধাবী অর্ক একসময় টেলিগ্রাফ কাগজে কাজ করেছে। পরে রয়টার্স এজেন্সিতে চলে যায়। বাঙালি হিসাবে আমার গর্ব হয় যে অর্কর তোলা সুনামির ছবি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোগ্রাফি অফ দা ইয়ার হয়েছিলো। এটা প্রেস ফটোগ্রাফির সর্বোচ্চ সম্মান আমাদের কাছে নোবেলের মত।
আমার এই লেখার কিছু তথ্য জানতে অর্ককে ফোন করেছিলাম, এখন ও মুম্বাইতে থাকে। উড়ান নামের একটা ফটোগ্রাফি স্কুল খুলেছিলো। শারীরিক অসুস্থতার কারণে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে বাড়িতেই থাকে। পড়াশোনা করেই সময় কাটায়। একবার কলকাতা আসার খুব ইচ্ছে। তবে ওর খুব আনন্দ যে উড়ানের ছাত্র ছাত্রীরা বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছে।
আজ ভাবলে বাঙালি হিসাবে সত্যিই খুব আনন্দ হয় যে, মনের মধ্যে দাঙ্গার ক্ষতের চিহ্ন ও প্রবল নিরাপত্তাহীনতার ভয় নিয়ে দেশের অন্য কোনো রাজ্য নয় আমাদের বাংলাতে এসেছিলো স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে কুতুবুদ্দিন। খুব ভুল না করলে তৎকালীন বাম সরকারই তাদের সুরক্ষা ও রুজি রোজগারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।
আমরা তাঁকে আগলে বেঁধে রেখেছিলাম সৌভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসায়, যার ফলশ্রুতিতে সে ধীরে ধীরে বেঁচে থাকার প্রতি আগ্রহ ফিরে পায়। কলকাতার সেই আপন করে নেওয়া মানবিক উদারতা কুতুবুদ্দিন অন্তরে লালন করে সযত্নে তাই সে আজ তার জন্মস্থান গুজরাটে ফিরে গিয়েও কৃতজ্ঞ চিত্তে বলে, “ জীবনের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিলো কলকাতা।”

এটাই তো আমাদের পশ্চিমবাংলার প্রকৃত সংস্কৃতি যা ভারতবর্ষকে বারবার শিক্ষা দিয়েছে চিরকালীন মানবধর্মের। বাংলার বাইরে এমন উদারতার উদাহরণ বিরল। তাইতো আমরা বেদবাক্যের মত সবসময় বলি, “হোয়াট বেঙ্গল থিংস টুডে …. ভারত থিঙ্কস টুমরো।”
এটাও বাস্তব যে, সময়ের পায়ে পায়ে আমাদের ভারতবর্ষে, আমাদের বাংলায় বহু ঘটনা ঘটেছে যা হয়তো কিছু সময়ের জন্য মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। ধর্মীয় উগ্রতা মানুষে মানুষে অবিশ্বাস তৈরি করেছে। কিন্তু বন্ধুবৎসল, আড্ডাবাজ ও খাদ্যরসিক বলে যে জনপদ খ্যাত সেখানে মানুষের সম্পর্কের শাশ্বত ধারাবাহিকতায় ভেদাভেদের স্থান বেশিদিন স্থায়ী হয় না। আর হয়না বলেই বাঙালি জীবনযাপনের স্বাভাবিক ছন্দকে কেউ থামাতে পারে না। সকল প্রকার কলুষতার ঊর্ধ্বে সাধারণ মানুষ নিত্যদিন ঠিক যেন খেয়া পারাপারের মত চলতেই থাকে।
বাংলার মানুষের এমন উদার মন তো এমনি এমনি হয়নি…. কেন তারা জাতি ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মিলেমিশে এক হয়ে বসবাস করে ? এর মূল কারণ এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাঙালির জীবনযাত্রায়। নদীমাতৃক উর্বর ভূমির কারণে এক সমৃদ্ধশালী রাজ্য হিসাবে বাংলার সুনাম ছিলো গোটা দেশে।
সংস্কৃতি চর্চাই বাঙালির অন্যতম যাপন। সেই চর্যাপদ থেকে শুরু করে বৈষ্ণব পদাবলী, বাউল ফকির থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস,বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুলের মতো মনীষীরা ধর্ম ও জাতিভেদের চেয়ে মানুষ বড় এই শিক্ষাতেই বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। সেই উদার ঐতিহ্যের ধারক বাহক হয়েই তো বাঙালি জাতি দুর্গাপূজা, ঈদ, বড়দিন, বাউল, ফকির, আদিবাসী মেলা ও নানা সামাজিক উৎসবে মিলেমিশে অংশ নেয়।
আমাদের পশ্চিমবঙ্গ কুতুবুদ্দিনকে নিদারুণ কষ্ট অসহায়তা থেকে যেমন মুক্তির খোলা আকাশ মিলেছিলো তেমনি মানুষে মানুষে ভালোবাসাই একমাত্র ধর্ম সেই ভাবনার পুনর্জন্মও তার এই মাটিতেই হয়েছিলো। কুতুবুদ্দিনের জীবনের এই ইতিবৃত্ত কবি নজরুল যেন মানসচক্ষে আমাদের দেখিয়ে গেছেন……
“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,
নহে কিছু মহীয়ান ,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ,
অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে,
ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।।”….এর বাইরে আর কোনো সত্য হয় কিনা আমার জানা নেই।
কুতুবুদ্দিনকে রাখী বন্ধনের মাধ্যমে আপন করে নেওয়ার সে এক অসামান্য আন্তরিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো রূপার সৌজন্যে। একজন ছবিওয়ালা হিসাবে কালের আবর্তে এইসব ছবির ভিতরে নিজের নামটুকু রেখে যাওয়া আমার চিরজীবনের প্রাপ্তি। এই ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষ হয়ে মানুষকে ভালোবাসার রাখী বেঁধে যাও নিরন্তর। এটাই প্রকৃত ধর্মের জয়গান গাওয়া হবে।