সূচনা সুকান্তকে দিয়ে
সুকান্ত ভট্টাচার্য (২০২৬-২০৪৭)। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। সাম্যবাদে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। যুক্ত ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। একজন একনিষ্ঠ পার্টিকর্মী যখন কবিতা লেখেন, তখন তা স্লোগান হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থেকে যায়। ব্যতিক্রম সুকান্ত। কবিতাই লিখেছেন তিনি। ছন্দে, উপমায়, চিত্রকল্পে নির্ভেজাল কবিতা লিখেছেন সুকান্ত। তাঁর জন্ম শতবর্ষে দেশে ষখন এক নতুন যুব বিদ্রোহের সূচনা হচ্ছে, তখন তাঁর কবিতা দিয়ে সেই বিদ্রোহের পূর্বাপর আলোচনা মানানসই হবে। ‘আঠারো বছর বয়েস’ –তাঁর একটি কবিতার শিরোনাম। আঠারো বছর কবিতায় কোন সংখ্যা নয়, একটা প্রতীক। যৌবনের প্রতীক। আটটি স্তবকে কবি সেই যৌবনের ধর্ম উল্লেখ করেছেন :
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ,
স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় উঁকি।
স্পর্ধিত যৌবনের কথা বলছেন কবি। যখন দুঃসাহসে ভর করে সে চলে এগিয়ে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে পৃথিবীর সভ্যতা মানুষের দুঃসাহসের সৃষ্টি –সে দুৎসাহস শক্তি ও বুদ্ধির।
আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়,
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়েসে কেউ মাথা নোয়াবার নয়,
আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।
অকুতোভয় যৌবন কোন প্রতিবন্ধকতাকে গ্রাহ্য করে না। নতি স্বীকার করে না শক্তিমান শাসকের কাছে। দুর্বলের অশ্রুজল যৌবনের নয়। শত্রুকে সে নির্মমভাবে আঘাত করতে পারে, মুক্তির মন্দির তলে বলিদান দিতে পারে নিজেকে।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য,
বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য,
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
যৌবনের বিদ্রোহ : তখন
এই পর্বে আমরা পৃথিবীর কয়েকটি বড় বড় যুব বিদ্রোহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেব। সব বিদ্রোহ যে সফল হয়েছে, তা নয়। কিন্তু সেইসব বিদ্রোহ শাসকশ্রেণিকে নাড়া দিয়েছে, মানুষের মনকে আন্দোলিত করেছে।
১৯৬৮, ফ্রান্স। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় দখল ও বন্ধ ঘোষণার মাধ্যমে এই বিদ্রোহ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন, কর্তৃত্ববাদী শিক্ষা কাঠামোর পরিবর্তন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সহজ সম্পর্ক। এই আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ৫০ দিনের ব্যবধানে ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে। না, ফরাসি বিপ্লবের মতো এটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না; সমাজ কাঠামো বদলে ফেলার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করার আন্দোলন ছিল এটি। নারী মুক্তির পথ দেখিয়ে, সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার স্থাপন করে, প্রাপ্তবয়স্কদের যৌন স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এই আন্দোলন বিরাট প্রভাব ফেলেছিল ফ্রান্সে। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল নিয়মতান্ত্রিক সরকারি কাজকর্ম, রাস্তায় নেমে এসেছিল সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, প্রায় এক কোটি শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে শুরু করেছিল ধর্মঘট। এই আন্দোলন বিশ্ব জুড়ে ‘কাউন্টার কালচার’ বা যুব সংস্কৃতির জন্ম দেয়।
১৯৭৬, দক্ষিণ আফ্রিকা। কৃষ্ণাঙ্গদের উপর জোর করে ‘আফ্রিকান্স’ ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ১৬ জুন হাজার হাজার তরুণ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিল বের করে। সেদিন পুলিশের সঙ্গে একটি প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পরে প্রাথমিক প্রতিবাদ দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের কর্তৃত্বের প্রতি একটি বৃহত্তর এবং সহিংস চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। পরবর্তী সপ্তাহগুলিতে আন্দোলন সোয়েটো ও অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। এই অভ্যুথ্থান দক্ষিণ আফ্রিকার অভ্যন্তরে বর্ণবাদী সরকারের বৈধতার সংকট সৃষ্টি করেছিল। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর ব্যর্থতা শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের চোখে সরকারের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এবং শিশুদের উপর আক্রমণ অ-শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের আরও বিচ্ছিন্ন করে তোলে।
১৯৮৯, চিন। বেইজিং এবং অন্যান্য স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয় এপ্রিল মাস থেকে। বাক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং সরকারি দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে সোচ্চার হয় যুব সমাজ। ৩-৪ জুন তারা জমায়েত হয় বেইজিংএর তিয়ানানমেন স্কোয়ারে। কিন্তু চিনা সামরিক বাহিনী ট্যাংক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সেই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা করে। বহু মানুষ আহত ও নিহত হয়। হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়, কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে এই ঘটনার স্মৃতিকে মুছে ফেলার চেষ্টাও করা হয়।
১৯৮৯, চেকোশ্লোভাকিয়া। চেকোশ্লোভাকিয়ার এই আন্দোলন ‘ভেলভেট রেভলিউশন’ বা ‘মখমল বিপ্লব’ নামে খ্যাত। ৪১ বছরেরও বেশি সময় ধরে চেকোশ্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর ও একদলীয় শাসন চলেছিল। এ ব্যাপারে ১৯৬৮ সালে যে আন্দোলন হয় তা সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপে দমিত হয়েছিল। ১৭ নভেম্বর রাজধানী প্রাগে নাৎসি দখলের বিরুদ্ধে নিহত এক ছাত্রের স্মরণসভাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু করে। এই বিক্ষোভে হামলা করে পুলিশ। পুলিশি হামলার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। দেশব্যাপী সাধারণ ধর্নঘট হয়। ২৪ নভেম্বর কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো পদত্যাগ করে। কোন রক্তপাত ছাড়া ৪১ বছরের কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটে।
২০০০, সার্বিয়া। ১৯৯৮ সালের মে মাসের শেষের দিকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আইন বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তসাশন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে। সেই সঙ্গে চলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপরে শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন। এর ফলে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা তৈরি করে ‘ওতপর” (‘প্রতিরোধ’) নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠন তার প্রধান লক্ষ্য (বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা) পরিবর্তন করে সার্বিয়ার স্বৈরশাসক মিলোশেভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করার দিকে মনোনিবেশ করে। ওতপর সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্রদিয়া পোপোভিচের ভাষায় : ‘আমাদের উচ্চাকাঙ্খা হল সার্বীয় জনগণের রাজনৈতিক চেতনা পরিবর্তন করা।’ ২ অক্টোবর সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। সরকার বিরোধীদের দমন করতে ব্যর্থ হয়। পুলিশ বাহিনীও বিদ্রোহ করে। স্লোবোদান মিলোশেভিচের পতন হয়।
যৌবনের বিদ্রোহ : একবিংশ শতক
২০১১, আরব বসন্ত। ২০১০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত এক গণবিক্ষোভ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিক্ষোভের মূলে ছিল ব্যাপক বেকারত্ব, চরম দারিদ্র্য, তীব্র দুর্নীতি, রাজনৈতিক ও বাক স্বাধীনতা হরণ। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর পুলিশি হবরানির প্রতিবাদে মোহাম্মদ বো্য়াজিজি আত্মহত্যা করেন। বোয়াজিজির এই আত্মহনন প্রতিবাদের আগুনে যেন ঘি ঢেলে দেয়। ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জাইন এল আবেদিন বেন, যিনি ২৩ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন, দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। মিশরে তিন দশক ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। লিবিয়ায় মুয়াম্মর গদ্দাফির ও ইয়েমেনের আলি আবদুল্লাহ সালেহরের পতন হয়। রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ শুরু হয় সিরিয়া, বাহরাইন প্রভৃতি দেশে।
২০১১, অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট। ১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সিটির ফাইন্যানশিয়াল ডিস্ট্রিক্টের জুকোতি পার্কে শুরু হয় এই আন্দোলন। অর্থনৈতিক বৈষম্য, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, রাজনীতিতে কর্পোরেটদের অতিরিক্ত প্রভাবের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। মূল স্লোগান ছিল : We are 99% — ‘আমরাই ৯৯%’। তার মানে ৯৯% হল সাধারণ মানুষ, যারা বঞ্চিত; আর মাত্র ১% ধনী মানুষ দেশের সম্পদ কুক্ষীগত করেছে। প্রায় ৫৯ দিন ধরে চলা এই আন্দোলন আমেরিকা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল লণ্ডন, ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রভৃতি দেশে।
অকুপাই ওয়ালস্ট্রিটের বিবরণ শুনেছিলাম এক বন্ধুপুত্রের মুখে। সে তখন ছিল নিউইয়র্কে। শুনেছিলাম কার্লো জিউলিয়ানি, স্লাভই জিজেক, পিট সিগারের কথা। উদ্দীপিত হয়ে লিখে ফেলেছিলাম একটা কবিতা – ‘রক্তবীজ’। আমি তো কবি নই, লজ্জায় কারোকে দেখাই নি সে কবিতা। আজ সে কবিতাটি তুলে ধরছি :
কার্লো? কার্লো জিউলিয়ানি? সে এখানে? জুকোতি পার্কের কোণে?
শীতবস্ত্র নেই তার, অথচ শীতার্ত নয়, যন্ত্রণার ছাপ নেই কোন।
এখন বয়েস কত? বত্রিশ? বত্রিশই হবে, কারণ ঠিক
দশ বছর আগে বাইশ চলছিল যখন তার, জেনোয়ার রাস্তায়
পুলিশ গুলি করে কর্পোরেট হাঙ্গরদের ইশারায় ……..
সেই কার্লো, স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করার শখ যার।
সে এখন ওয়ালস্ট্রিটে হেঁটে যায়, সমুদ্র পেছনে,
সে এখন স্লাভই জিজেকের কণ্ঠ, দুহাত তুলে বলে :
নিরানব্বুই শতাংশের এই সমাবেশে হাজার হাজার কার্লো
আসছে তো আসছেই, তার তপ্ত স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ছে
পীত দানবের শহরগুলিতে, সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে রকেটের মতো
ছুটে যাচ্ছে পুবে ও পশ্চিমে, স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল, কার্লো
এখন রাজসূয় যজ্ঞের ঘোড়া, পিট সিগারের সুরের মূর্চ্ছনা,
মিশরের তাহরির, মৃত্যুর অমৃতমন্ত্র, কার্লো এখন
ইতালি ব্রিটেন স্পেন আর গ্রিসের উদ্ভিন্নযৌবন।
মৃত কার্লোর এই জীবন্ত উচ্চারণ, এক থেকে বহু হওয়ার
ভাগবতী তনু কাঁপায় ওয়ালস্ট্রিট, ঘুম নেই ওবামার,
বিস্ফোরণের প্রহর গোণে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা, আস্তে আস্তে
কার্লো ঢুকে গেল সূর্যের গহ্বরে, ছুটে আসছে সেই সূর্য
পৃথিবীর দিকে, এক শতাংশ লুকোবে কোথায়, কারণ
পৃথিবীটাকে এখন দুগ্ধপোয্য শিশুও ধরতে পারে মুঠিতে।
২০১১, লণ্ডনের যুব অসন্তোষ। আগস্ট মাসে ২৯ বছর বয়েসী কৃষ্ণাঙ্গ যুবক মার্ক ডাগানকে বন্দুক সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার সন্দেহে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। পুলিশের আচরণের প্রতিবাদে লণ্ডনের টটেনহ্যামে একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ৬ আগস্ট অস্থিরতা শুরু হয়। সহিংস হয়ে ওঠে মানুষ। হিংসা ছড়িয়ে পড়ে বার্মিহাম, লিভারপুলেও। প্রধানমন্ত্রী ডেভিশ ক্যামেরন জরুরি অধিবেশনের জন্য সংসদ আহ্বান করেন।
২০১১, স্পেন। ১৫ মে স্পেনে শুরু হয় এক বিরাট গণা আন্দোলন। তার নাম ইন্দিগনাদোস। যুব সমাজের মধ্যে বেকারত্বের হার ৪০% ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তার জন্য সরকারের মাথাব্যথা ছিল না। ইউরোজোন ঋণ সংকট ও জীবনযাত্রার মান পতনেও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলির উপর মানুষের আস্থা ছিল না। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে তাঁবু গেড়ে প্রতিবাদ শুরু করে যুবকেরা। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে এই আন্দোলন। পরবর্তীকালে এটি বিশ্বব্যাপী Occupy Movement-এর অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা দেয়।
২০১১, ভারত। এপ্রিল মাসে সমাজকর্মী আন্না হাজারের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে আন্দোলনে। দুর্নীতিবন্ধের পাশাপাশি লোকপাল বিল পাসের দাবি ছিল। ৫ এপ্রিল আন্না হাজারে দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেন। এই প্রতিবাদ আন্দোলন মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, আহমেদাবাদ, চেন্নাইতে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রজন্মের নামকরণ ও জেন জি
জেন জি একটা প্রজন্মের নাম। একেবারে আধুনিক প্রজন্ম। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর অর্থাৎ দুই যুগের মতো সময় ধরে গড়ে ওঠে এক একটি প্রজন্ম। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে প্রযুক্তিগত ক্রমবিবর্তন, বিশ্বায়ন, সভ্যতার উন্নয়ন প্রভৃতি। বিভিন্ন প্রজন্মের নাম ও জন্মের সময়সীমা এই রকম :
ক] গ্রেটেস্ট জেনারেশন বা মহত্ত্ম প্রজন্ম : জন্মকাল আনুমানিক ১৯০১ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত। এঁদের বর্তমান বয়েস ৯৫ বছরের বেশি।
খ] সাইলেন্ট জেনারেশন বা নীরব প্রজন্ম : জন্মকাল আনুমানিক ১৯২৮ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। এঁদের বর্তমান বয়েস ৭৯ থেকে ৯৪ বছর।
গ] বেবি বুমার্স জেনারেশন : জন্মকাল আনুমানিক ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত। এঁদের বর্তমান বয়েস ৬০ থেকে ৭৮ বছর।
ঘ] জেনারেশন এক্স : জন্মকাল আনুমানিক ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। এঁদের বর্তমান বয়েস ৪৪ থেকে ৫৯ বছর।
ঙ] জেনারেশন ওয়াই বা মিলেনিয়ালস বা সহস্রাব্দ প্রজন্ম : জন্মকাল আনুমানিক ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। বর্তমান বয়েস ২৮ থেকে ৪৩। এই প্রজন্মে যাঁদের জন্ম ১৯৯০ সালের ভেতর অর্থাৎ যাঁরা শৈশব- কৈশোর পার করেছেন নব্বুই-এর দশকে, তাঁদের বলা হয় ‘নাইন্টিজ কিডস’।
চ] জেনারেশন জেড বা জেন জি : জন্মকাল ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সাল। বর্তমান বয়েস ১২ থেকে ২৭ বছর।
এর পরে একেবারে নতুন প্রজন্ম হল জেনারেশন আলফা। অবশ্য এই প্রজন্মের শেষ সময় এখনও নির্ধারিত হয় নি।
জেন জি বিক্ষোভের কারণ
জেন জি-দের বিক্ষোভের কারণ দেশভেদে ভিন্ন। তবে সাধারণত দেশের শাসকদের প্রতি অসন্তোষ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য ও বিভাজন, মৌলিক পরিষেবার অভাব ইত্যাদি কারণে তরুণ প্রজন্ম বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ব্লুমবার্গ ইকনোমিক্সের সমীক্ষায় জেন জি বিক্ষোভের কারণগুলি পরীক্ষা করা হয়েছে। যেমন পেরু ও মেক্সিকোয় আয় বৈষম্য, ফিলিপাইনে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতি, মাদাগাস্কারে চরম দারিদ্র্য- স্যানিটেশন- বিশুদ্ধ জলের অভাবকে বিক্ষোভের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কার্নেগির গ্লোবাল প্রোটেস্ট ট্যাকার রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিকে বিক্ষোভের প্রাথমিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে; তাদের মতে অগণতান্ত্রিক বাড়াবাড়ি ও অর্থনৈতিক অসুবিধেগুলি গৌণ কারণ।
ইন্টারনেটের যুগে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের সদস্যরা প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য সামাজিক মাধ্যম –ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ইত্যাদিকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে।
যৌবনের বিদ্রোহ (জেন জি) এখন
প্রথম নথিভুক্ত জেন জি আন্দোলন ছিল ‘মার্চ ফর আওয়ার লাইভস’। এটি হয়েছিল ২০১৮ সালের মার্চ মাসে। ২০১৮ সালের আগস্টে শুরু হয়েছিল ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’। ২০১৯-এ শুরু হয়েছিল ‘নোবাউন্ডারিজ৫’; যা ছিল মূলত এক যৌন আন্দোলন। ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর ‘ওকে বুমার’ প্রবন্ধে প্রথম ‘জেন জি প্রতিবাদে’র কথা প্রকাশ পায়। ২০২০-২১ সালে থাই বিক্ষোভ বর্ণনার সময়ে জেন জি কথাটি ব্যবহৃত হয়। ২০২১-এ মিয়ানামারে, ২০২২-এ আরাগোলায়, ২০২৪-এ দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক আইন ঘোষণার বিরুদ্ধে, ২০২৪-এ দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের কিছু অংশে জেন জি বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত প্রতিবাদকে বিশ্বের প্রথম সফল জেন জি বিপ্লব বলা হয়। বাংলাদেশের ঘটনা ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, তিমুর-লেস্তে, মালদ্বীপ প্রভৃতি দেশের জেন জি-দের অনুপ্রাণিত করে। ২০২৫ সালে জেন জি বিপ্লবে নেপালের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। মাদাগাস্কার ও মরক্কোতে একই ধরনের যুব বিক্ষোভের ঢেউ ওঠে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পেরুর লিমায় দেখা যায় বিক্ষোভ। এভাবে জেন জি বিক্ষোভের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতে।
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে
আমার এই লেখা শুরু করেছিলাম কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা দিয়ে, শেষও করব তাঁর সেই কবিতার একটি লাইন দিয়ে। ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতার একেবারে শেষ লাইনে ছিল কবির একটি প্রার্থনা : ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।’ পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করার জন্য কবি অকুতোভয়, দুঃসাহসী যৌবনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। স্বাধীনতার বহু বছর পরে নতুন করে স্বাধীনতার জন্য সেই দুঃসাহসী যৌবনের দেখা পাওয়া গেল দিল্লির যন্তর মন্তরে। তারপরে তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে।
তবে ভারতে জেন জির উৎপত্তি হয়েছে একটু অন্যভাবে।
একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট, কয়েক হাজার শেয়ার আর একটি নতুন প্রতীক — এভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পর্দা পেরিয়ে রাজপথের আন্দোলনে চলে আসেন ৩০- বছরের যুবক অভিজিৎ দীপকে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে মাস্টার্স কোর্সে অধ্যয়নরত ছিলেন।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার তরুণদের ককরোচ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন ( পরে অবশ্য বিচারপতি জানান যে তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে )। এই বক্তব্যটি পড়ে গত ১৬ মে অভিজিৎ দীপকে তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখলেন :
‘সব ককরোচ যদি এক হয়ে যায়?’
মাত্র ৬টি শব্দ। তাতেই গভীর গভীর গভীর প্রতিক্রিয়া। সাধে কি বলে শব্দ ব্রহ্ম! কিন্তু প্রতিক্রিয়া হল কেন? তার মানে যাদের প্রতিক্রিয়া হল তাদের মনের গভীরে চলছিল এক অব্যক্ত অনুরণন, দেশের শাসক-বিচারব্যবস্থা প্রভৃতি নিয়ে চলছিল এক বিরূপতার আলোড়ন। এর মধ্যে আগুনে ঘি দিল নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা, সেই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং বেকারত্ব। যার জন্য ক্ষতিগ্রস্থ ২০ লক্ষ পরীক্ষার্থী।
অভিজিতের পোস্ট থেকে তৈরি হয়ে গিয়েছিল প্রতিবাদের মঞ্চ। যার নাম ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP। এই প্রতিবাদ আন্দোলনকে অনলাইনে ছড়িয়ে দেবার ক্ষেত্র বড় ভূমিকা পালন করেন দিল্লিভিত্তিক ইউটিউবার মেঘনাদ এস। দিল্লির যন্তর মন্তরে জমা হল হাজার হাজার যুবক। ৬ জুন ভারতে ফিরে এসে অভিজিৎ যোগ দিলেন সমাবেশে। সোনাম ওয়াংচুক প্রতিবাদের সমর্থনে শুরু করলেন অনশন। পুলিশ দিয়েও রোখা গেল না আন্দোলন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির কাছে মাথা নোয়াতে হল সরকারের। এই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল কলকাতা, পাটনা, মুম্বাই, চেন্নাইতে। প্রাথমিক সাফল্য পেল ককরোচ জনতা পার্টি। কিন্তু একজন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে কি বদলে যাবে সিস্টেম?
সার্বিয়ার ‘ওতোপর’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা বলেছিলেন ‘জনগণের রাজনৈতিক চেতনার পরিবর্তনে’র কথা। আমাদের তরুণরা কি পারবে সেই দিকে অগ্রসর হতে?