বাবা আজ আবার সেই কৌটোটা খুলে বসেছে। কখনও কোনো চিন্তা হলে বা নিজেকে বিপন্ন মনে করলেই সে ওই টিনের কৌটোটা খুলে দেখে। ওর মধ্যে আছে বরিশালের মাটি। উনিশশো একাত্তরে, বাবা তখন বাইশের যুবক, পূর্ব পাকিস্তান থেকে এক কাপড়ে পালিয়ে এসেছিল। বাবা গ্র্যাজুয়েট, কিন্তু ওখান থেকে সার্টিফিকেট, মার্কশিট কিচ্ছু আনতে পারেনি। বাবা পালিয়ে আসার কয়েকদিনের মধ্যে খবর আসে ওখানকার বাড়িটা পুড়ে গেছে সেই সঙ্গে জ্বলে গেছে তার শিক্ষার সব প্রমাণপত্র। এদেশে বাবা উদ্বাস্তু ক্যাম্প, আত্মীয়বাড়ির যন্ত্রণা ও অপমান সহ্য করে কিছুদিন পর হাওড়ার ঘুসুড়ির একটা চটকলে কাজ পায় পেট ভরাতে। বাবা দেশ থেকে কিছুই আনতে পারেনি, শুধু পেটকাপড়ে করে লুকিয়ে এনেছিল ছোট্ট এক কৌটো বরিশালের মাটি। সময়ের সাথে সাথে সেই মাটিগুলো গুঁড়ো আর কালো হয়ে এসেছে। বাবা কাউকে ওই কৌটোটায় হাত দিতে দেয় না। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি একটা সস্তার ট্রাঙ্কে বাবা তালা দিয়ে ওই মাটিভরা কৌটোটা রাখে। মা বলে, “ওইডার মইদ্যে গুপ্তধন আছে, ওই দিয়া রাজা করব আমাদের তোমাগো বাবা।’’ বাবা উত্তর করে, “হেইডা তুমি বোঝবা না বিনীতার মা, ওইডা আমার দ্যাশের প্রতিরূপ। ওই মাটিটায় আমি দ্যাশ অনুভব করি।’’ বছর পনেরো হল স্ট্রোক হবার পর থেকে বাবা আর কাজে যেতে পারে না। এখন একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে আর বাঁ পাটাও খানিক কমজোরি হয়ে গেছে। বাবা দিনে এবেলা-ওবেলা দুটো প্রেশারের বড়ি খায়। টাকার অভাবে আর ডাক্তার দেখাতে পারি না মানুষটাকে, বাবার কখনও শরীর খারাপ লাগলে পাড়ার এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তারকে ডাকি প্রেশার মাপাতে। ব্লাড প্রেশার বেশি দেখলে কয়েকদিন প্রেশারের ওই বড়িটাই দিনে তিনটে করে বাবাকে খাইয়ে দিই।
বাবা ঝুরো মাটিগুলো খুব যত্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, “অনি, আবার আমরা উচ্ছেদ হইব, অ্যাঁ?’’
আমি বললাম, “তোমায় বারণ করসি না এইগুলান ভাবতে? জানো তো, বেশি ভাবলে প্রেশার বাইরা যায়। তোমার ভয় কিসে? কে কইসে এইসব তোমায়?’’
“ওই যে চারিদিকে শুনতাসি, লোকে কয় এইহানের বারির দলিল না থাকলে আমাগো ফের ক্যাম্পে যাইতে হইব? বারা বারিত থাকি ইন্ডিয়ায় আইস্যা অবধি, বারির দলিল পাই কোথায়? বি.কম. পাশও তো করছি ইস্ট পাকিস্থানের বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থিক্যা, স্যায়ও আগুনের প্যাটে গেছে গিয়া। সার্টিফিকেট থাকলেও অর কুনু দাম হইত না এহানে, এ দ্যাশের তো না।’’
বাবা মাঝে মাঝে লাঠি ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গলির মুখে যায়, দু-চারজনের সাথে গল্প করে। বুঝলাম খবরটা ওখানেই শুনেছে। বাবাকে সান্ত্বনা দিই, “ওসব বাজে কথা ছাড়, আমি তো কিছুই শুনি নাই।’’
তবু বাবার চোখ থেকে ভয়ের ছায়াটা যায় না। হয়ত আমার বকুনির ভয়ে চুপ যায়। কিন্তু বাবার চোখের সেই ভয় মেশানো আর্তি একটু একটু করে সঞ্চারিত হয় আমার মনেও। আমি চুপ করে থাকি। এইসব কথাগুলো বাজার-দোকানে গেলে কিছুদিন ধরে আমারও কানে আসছে। কেউ কেউ বুঝি আমাকে শুনিয়ে আমার সামনে বেশ জোরেই বলে। ভয় পাই, সরে আসি তখনকার মতো সেখান থেকে। এই জায়গাটা কলোনি এলাকা নয়, এখানে পূর্ববঙ্গের লোকজন বেশি নেই। বুঝতে পারি, এখানে অনেকেই আমাদের পছন্দ করে না।
আমি ভাবতে থাকি, আমি, আমরা আবার কোথায় যাব? আমি পূর্ব পাকিস্তান জানি না। আমার আঁকড়ে ধরার মতো মাটির সান্ত্বনাও নেই। বাবা হয়ত বরিশালের স্মৃতি বুকে নিয়েই মারা যাবে, সেখানে নাকি আমাদের দোতলা বাড়ি, সুপারি গাছ, পুকুর — সব ছিল। কিন্তু আমার তো এখন কম বয়স, জীবনের বাকি দিনগুলো কি ডিটেনশন ক্যাম্পে কাটবে! অথবা আমাদের খেদানো হবে প্রতিবেশী দেশে? তারা কেন আমাদের…তবে কি নদী সাঁতরে, পাহাড়ে লুকিয়ে বাকি জীবনটা…। আমি, আমরা আর এদেশে থাকতে পারব না? আমি বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি। বাবার গালভর্তি খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি, চোখে হলুদ পিঁচুটি, ছ্যাতলা পড়া দাঁত, একটু শীর্ণ হয়ে যাওয়া পা — এ সবই আমাকে তীব্রভাবে বিদ্ধ করে। আমার কাছে আমার বাবাই যেন আমার দেশ। মনে পড়ে, স্কুলে বাংলার স্যার বলতেন, “প্রকৃতি, দেশ সবই সুন্দর আর উর্বরা বলে কবিরা এদের নারী রূপে কল্পনা করেছেন।”
ভুল! দেশ কোনো নারীমূর্তি নয়। অন্তত আমার কাছে। আমার কাছে দেশ হল পুরুষ। ওই আমার বাবার মতো মায়াভরা। নারীদের জিনের মধ্যে গাঁথা আছে ঠাঁইনাড়া হবার প্রবণতা। সারা পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে বিয়ের পর মেয়েরা বাপের ঘর ছাড়ে। আপন পরিবার ভুলতে হয় তাদের, গোত্রান্তর ঘটে। তাই যেন নির্দিষ্ট ভূখন্ডের প্রতি তাদের মমত্ববোধ, অধিকারবোধ কম। ঐতিহ্য, বংশ, জমির মতোই নির্দিষ্ট ভূমির বাসনার আকুতি একান্তভাবে পুরুষের। দেশের ধারণার সঙ্গে পুরুষই অনেক বেশি একাত্ম। তাই দেশও পুরুষ।
বাবা ফের মাটি নাড়াচাড়া করতে করতে গুণগুণিয়ে উঠল-মাটিতে জন্ম নিলাম, মাটি তাই রক্তে মিশেছে/এ মাটির গান গেয়ে ভাই জীবন কেটেছে।’ আমার দিকে ফিরে বাবা বলল, “জানস, এইডা ধনঞ্জয় ভটচাজ গাইসিলা। ল্যাখা আর সুর প্রবীর মজুমদারের। আমাগো পোলাপান বয়সের গান। দ্যাখ অনি, আমি মরলে মন্তর পড়বা না, এই গানডা বাজাইবা।’’ কত তীব্র আবেগ এতদিন পরেও বাবা তার দেশ আর দেশের মাটির জন্য ধারণ করে আছে বুঝতে পারি।
মা আর দিদি ভেতরের ঘরে বসে গাউনে আঠা দিয়ে চুমকি লাগাচ্ছে। কুসুমপুরের মুসলিমদের এই পোশাকের ব্যাবসাটা আমাদের মতো গরিবদের বাঁচিয়ে রেখেছে। মহাজন বাইকে চেপে এসে মাল দিয়ে যায়, নির্দিষ্ট সময় অন্তর তৈরি মাল ফেরৎ নিয়ে যায়, হাতে হাতে নগদ বিদায়।
মা বাবার কথাগুলো এতক্ষণ শুনতে পাচ্ছিল, এবার একটু ঝাঁঝের সুরে বলল, “তুমি অত চিন্তা কর ক্যান, অরা ত কইসে হিন্দুগো কিছু অইব না।’’
বাবা গর্জে ওঠে, “ক্যান, মুসলমানগো মানুষ না? অগো কথা কেও ভাবুম না? আমরা বাচলেই হইল!’’ তারপর কিছুটা আপনমনে বলে, “আমার জিলা বরিশাল, আমার দ্যাশ রহমৎপুর, মামাবারি উজিরপুর। কত বন্ধু ছিল-কাদের, সাদেক, জিন্না। সাদেকের বোন দরিয়া এমুন নজরুলসঙ্গীত গাইত! আহা-হা। দ্যাশ ছারার আগে মইনুদ্দিন চাচা, মতিয়ার সায়েব আইছিলা আমাগো বারিত। আমার বাপেরে কইসিলা, যাইয়েন না দাদা, বাংলাদ্যাশ এইবার হইব, সব ঠিক হইয়া যাইব। আমরা আছি, আমাগো দ্যাহে এক ফোঁটা রক্ত থাইকতে আপনাগো কেউ কিস্যু কইরতে পারুম না। হেই ভরসায় ছিল আমার বাবা, কিন্তু খান সেনা আর রাজাকাররা আমার বুনরে…। বুনডা কতবার কইসিল, ‘দাদা, আমারে একটা অগ্নিপাট শাড়ি কিন্যা দিবি?’ যেইদিন স্যায় মারা যায়, সেদিনই লাল টুকটুক অগ্নিপাট শাড়ি কিন্যা ঘরত ফিরছি। হেই শাড়ি তার আর পরা হয় নাই। শ্মশানে নেওয়ার কালে তার দ্যাহের উপুর বিছাইয়া দিছিলাম হেই শাড়িখান।” একটু থামে বাবা, আবার শ্লেষ্মা জড়ানো গলায় বলে, “এক কাপড়ে পলাইয়া আইসি আমরা। রিফুজ্যি ক্যাম্পে কলেরা হইয়া বাবা গেল। না হয় দ্যাশে থাইকাই মরত। তবু তো দ্যাশের মাটি।”
বাবা এবার সামলে নিয়ে মাকে দৃঢ়স্বরে বলে, “তুমি কও হিন্দুগো কিস্যু হইব না, যদি ধইর্যা ই নিই তোমার কথা ঠিক, তবু কও দেহি, যে দ্যাশে বারবার দরখাস্ত দিয়াও র্যা শন কার্ড, আধার কার্ড, ভোটার কার্ডে ভুল থাইক্যাই যায়, সেহানে তুমি-আমি লিস্ট থিক্যা বাদ যাউম না তুমি বুকে হাত দিয়া কইতে পার? আর এ দ্যাশের নাগরিক হিন্দু, মুসলিম, শিখ, জৈন যত মানুষ আছে সকলা। কেও বাদ যাইব ক্যান?’’
বাবা যেভাবে যুক্তিজাল সাজিয়েছে তাতে মায়ের চুপ করে যাওয়া ছাড়া উপায় নাই। এখন গোটা ঘরে নিস্তব্ধতা। শুধু মেলা থেকে আমার কিনে আনা খেলনা পাখিটার ডানা সমানে একবার খোলে আবার বন্ধ হয়। বাবা গুনগুনিয়ে গান ধরল, ‘আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে, অকূল দরিয়ার মাঝে কূল নাই রে।’ আমার দিকে ফিরে বলল, “বরিশালে ছিল আড়িয়াল খাঁ নদী। বর্ষায় কী ভীষণ ঢেউ তার। এপার-ওপার দেখা যায় না। হ্যাঁ রে, যমুনাবতী নদী বাচানোর যে আন্দোলন চলছে তার কতদূর?’’
“বাবা, আর কিস্যু হইব না। নদী মইজ্যা গ্যাসে গিয়া। নদী বুজাইয়া বারি, দোকান ঘর উঠত্যাসে, কুসুমপুরের সে নদী আর নাই।’’
“কী কইলা অনি? স্রোত আর নাই? নদী বুইজ্যা যাইত্যাসে!” বাবার গলায় শুকনো আর্তি।
আমি এবার ছাদে উঠলাম। আজ বিশ্বকর্মা পূজা। ঘুড়ি ওড়াবার দিন। বছরে যে দু-একটা দিন আনন্দ করি এটা তার মধ্যে একটা। ঘুড়ি ভাসিয়ে দিলাম আকাশে। মাটি থেকে এখন অনেক উপরে আমার ঘুড়ি। ভালো লাগায় মনটা ছেয়ে গেল। তুচ্ছ মাটির লড়াইয়ে আমি থাকব না। আশেপাশে অনেক ঘুড়ি। কাটব, জিতব। হারব না। মাটিতে আমায় দমিয়ে রাখলেও আকাশে পারবা না। কেউ না। এই বিরাট আকাশটার দখল নেব আমি, গোটা আকাশটা আমার।
দুই
‘ভোকাট্টা, ভোকাট্টা, ধর, ধর…ওই ওই’, কোলাহলের উচ্চারণ বাড়তে বাড়তে ক্রমে স্তিমিত হয়ে গেল। কিছুটা গর্ব হয় আমার। আজ তিনটে ঘুড়ি কেটেছি। অনেক যত্নে তৈরি মাঞ্জা। ছাদ থেকে নেমে ঘুড়ি, লাটাই সাজিয়ে রাখি ঘরের এক কোণে। এতদিন অন্যে আমার ঘুড়ি কাটত, আজ আমিও কুসুমপুরের আকাশের দখল নিয়েছি। “শাল্লা!’’ আপনমনে আক্রোশভরে বলি আমি।
দরজায় কে কড়া নাড়ছে? যাই দেখি। এই ভরতি দুপুরবেলা কে আবার এল! সম্মিলিত কয়েকটা কণ্ঠের কথাবার্তা কানে আসছে। চাঁদা? না, এখনও ক’দিন পর দুর্গাপুজোর চাঁদা নিতে আসবে। সবে তো কাল বিশ্বকর্মা পুজো গেল। তবে? দেখি দরজা খুলে!
“এই শালা অনি, তুই আমাদের ঘুড়ি কাটলি কেন? শালা বাঙাল।’’
সামনে জনা পাঁচ- ছয় দাঁড়িয়ে। দু-এক জনকে চিনিও না। ওদের চোখে দ্বেষ। আমি বললাম, “বাঙাল বলার কী আছে? ঘুড়ি যে কেউ কাটতে পারে।’’
“শালা, পোঙায় লাথ মেরে ঘুড়ি কাটা বার করব। ঘুড়িগুলোর দাম জানিস? শালা বিদেশী। আমরা এলাকার ছেলে, আমাদের সঙ্গে পাঙ্গা নিবি না।’’
আমার একই সঙ্গে রাগ আর ভয়ের মিশ্র অনুভূতি হল। রুখে উঠতে গিয়েও থিতিয়ে গেলাম। কী বলব, কী বলব না, কতদূর কী বলা উচিত বা উচিত নয় — এসব ভাবতে ভাবতেই ওদের রাগী মুখগুলোর সামনে আমার পেটের ভিতর গুরগুরানি শুরু হল। সেটা দমন করার চেষ্টা করে আপাতত শান্ত ভাব দেখিয়ে ওদের বললাম, “ঠিক আছে, এখন তোমরা যাও। মা, বাবা, দিদি ঘুমোচ্ছে।’’
“ওঃ, ঘুমোচ্ছে। আমরা কি ঘুম ভাঙাচ্ছি নাকি? এই বলে রাখছি, আমাদের ঘুড়ি ওড়ানোর মাঝে এলে না, বুঝিয়ে দেব কত ধানে কত চাল। কোথাকার ‘কাল কা যোগী’ এলেন রে!”
ছেলেগুলো সদর্পে চলে গেল। যাবার সময়ও ওদের ছেঁড়া-ছেঁড়া, টুকরো-টাকরা কথা কানে ভেসে আসছে-“শালা বাইরের লোক, এখানে রোয়াব দেখাতে এসেছে। বাঙাল, শালারা হা-ঘরের বাচ্চা… আরে আমরা হলুম এখানকার বনেদি লোক…ফের যদি দেখি এরকম, দোব গান্ডুর বিচিতে একদিন এক লাথ। এবার দেশ থেকে তাড়াব শালাদের” — মশার অপস্রিয়মান গুঞ্জনধ্বনির মতো ওদের কথা বলার শব্দ ক্রমশ ফিকে হয়ে এল।
সদর দরজা বন্ধ করে ঘরের ভিতর ফিরছি, বাবার গলা কানে এল, “কেডা রে অনি, কারা আইসিল?”
“কেউ না বাবা।’’ গলাটা বুজে আসে আমার — “ঘুম যাও তুমি।’’
“তয় য্যান হল্লা শুনছিলাম।’’
“ও কিস্যু না।’’
চোখে জল আসে আমার। মা আর দিদি হয়ত সব শুনেও আমাকে জানতে দিতে চায় না বলে চুপ করে চোখ বুজে শুয়ে আছে। চোখে জল আসে আমার। আমার আঠাশ বছরের স্পর্ধিত যৌবন আজ এক টুকরো ছেঁড়া কাগজের মতো দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে দিয়ে গেল ওরা। আজ ওরা আমাকে ভয় পাওয়াতে পেরেছে। দু’বছর আগেও পাড়ার মুদি-দোকানি বিধুবাবু আমাকে বলেছিলেন, “আপনারা এখানে বাইরে থেকে এসেছেন। এখানকার ঐতিহ্য-সংস্কৃতি কিছুই জানেন না।’’ তখন আমিও সপাটে জবাব দিয়েছিলাম, “ভারতে পাঠান, মোগল, ইংরেজ রাজত্বের পর ভারত স্বাধীন হয়েছে। ইতিহাস মাত্রই পালটায়। কুসুমপুরে হয়তো আমরা এই বাইরের লোকেরাই একদিন রাজ করব।’’ আমার যুক্তির সামনে সেদিন বিধুবাবু কিছু বলতে পারেননি। কিন্তু আজ ওই আগ্রাসী ছেলেগুলো আমাকে ভয় পাওয়াতে পেরেছে। কিছুদিন ধরে আমার মনে এ ধরণের একটা ভয় ঘাঁটি গাড়ছে। তবে কি আমরা পুরুষাণুক্রমে উদ্বাস্তু হয়েই থাকব?
আমার বাবা ইস্ট পাকিস্থান থেকে পালিয়ে ভারতে এসেছিল বাঁচবে বলে। অনেক ঘাটের জল খেয়ে আমরা আজ এখানে থিতু হয়েছি। আমি তাহলে এবার কোথায় যাব? ঘরে একা লুটিয়ে পড়ে গোপনে কাঁদছি। চোখ থেকে অবিরল জল নেমে ঘরের মেঝের মাটি ভিজিয়ে দিচ্ছে। হাত দিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরার ব্যর্থ চেষ্টায় নখে ঢুকে গেল মাটির কণা।
তিন
বি.ডি.ও. অফিসে কাগজপত্র জমা দিয়ে বেরিয়ে দেখা অমিয়বাবুর সঙ্গে। উনি বললেন, “কী অনিকেত, নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র জমা করলে? আমিও এসেছি। কী ঝামেলা বল তো!’’ তারপর প্রসঙ্গ পালটে বললেন, “জানো তো, যমুনাবতী নদীটাকে বোধহয় আর বাঁচানো গেল না। তবু ভাবছি শেষ চেষ্টা একটা করব। আমার এক সাংবাদিক বন্ধু কলকাতার কাগজে আছে, ওর সঙ্গে কথা বলেছি। তা কাল এ ব্যাপারে মহামিছিলের ডাক দিয়েছি। তারপর সভা। ওই বন্ধু আসবে কথা দিয়েছে। ও কাগজে ছাপাবে বলেছে। তুমিও এসো। তুমিও তো এই আন্দোলনে আছ।’’
গা-বাঁচানো উত্তর দিয়ে বেরিয়ে এলাম। অমিয়বাবু রিটায়ার্ড প্রফেসর। বহু টাকা পেনশন পান। ওঁর এসব সাজে। আমার এসব করে সময় অপচয়ের বিলাসিতা দেখানো মুশকিল। আমিও একসময় এসব নিয়ে ভেবেছি, কাজ করেছি। এও জানি, পরিবেশ ঠিক রাখতে গেলে নদীটাকে বাঁচানো দরকার। কিন্তু আমার জীবনের স্রোত যে রুদ্ধপ্রায়। কিছুদিন আগে এই আন্দোলনের সভায় এসে একদিন টিউশন কামাই করেছিলাম। পরের দিন যেতেই আমার ছাত্রের বাবা গম্ভীরভাবে বললেন, “মাস্টারমশাই, কাল এলেন না! সামনে সন্তুর পরীক্ষা। ও তো পিছিয়ে পড়ল। দেখুন, পারেন তো’’…যে কথাটা উহ্য রইল তা হচ্ছে — ‘কামাইটা পুষিয়ে দিন।’ অথচ আমাকে ছটা বাড়িতে হপ্তায় তিনদিন করে যেতে হয়। তার পর বাড়ির বাজার, দোকান, রেশন… ওদিকে স্কুল মাস্টাররা ওঁৎ পেতেই আছে। রেজাল্ট খারাপ হলেই গার্জেনকে বলবে, “কাদের কাছে পড়তে যে দেন!’’ আমি বুঝি না স্কুল মাস্টাররা ভালো মাইনে পেয়েও আবার কেন টিউশন করতে চায়! আমাদের ক্ষতি তো। যাক গে, প্রতিযোগিতার বাজার।
তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরি। বাবা, মা, দিদি অপেক্ষা করছে।
বাড়ি ঢুকতেই বাবা কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করে, “অনি, কাগজ জমা দিছস? বিডিওর লগে দেখা করছিলা? সায়েবে কী কয়?’’
বিডিও! বাবা জানে না, জানলেও বুঝতে চায় না অফিসাররা কত দূরের মানুষ। আমার মতো ছেলেরা কোনো অফিসে পাত্তা পাবে কেন! তাই আমি একটু বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিই, “কাগজ জমা করসি কেরানিবাবুদের কাছে।’’
মা এবার বলে উঠল, “বিডিও সাহেবের লগে সাক্ষাইত করলি না ক্যান? যদি মানুষটা শুইন্যা কিছু বেবস্তা…’’
এই জন্যই রাগ হয়। তেতেপুড়ে এলাম, এখন যত আটভাট কথা। অফিসে একে প্রচন্ড ভিড়, ধাক্কাধাক্কি করে কোনোমতে কাগজগুলো জমা করতে পেরেছি। এ সময় বিডিওর সঙ্গে দেখা করাই যাবে না। দেখা করে লাভও নেই। দিল্লি থেকে নাকি কোন কমিটির লোকেরা আসবে, তারা সব দরখাস্ত বিবেচনা করবে। পঞ্চায়েত থেকে প্রধান সাহেব নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট দিয়েছেন, ওটাই সম্বল। এখন ভগবান ভরসা।
চার
দু’মাস আগে নাগরিকত্বের প্রমানপত্র জমা করেছিলাম। আজ যাচ্ছি ফল জানতে। মানে লিস্টে নাম আছে কিনা দেখতে। একাত্তর সালের আগেই আমরা ভারতে এসেছি, কিন্তু সেটা কি যথেষ্ট? পাড়ার পার্টির এক দাদাকে বলেছি, সে তো বলেছে দেখবে! কতজন ওকে ধরছে, ওকে সবাইকেই আশ্বাস দিতে হচ্ছে। আসামে নাকি বহু মানুষ ক্যাম্পে আছে! সত্যি-মিথ্যে জানিনা। বড় ভয় হয়। এলাকার অনেকে অবশ্য এই ব্যাপারটা হচ্ছে বলে খুশি!
সকালে উঠেই বাবা বলেছে, “অনি, আইজ তর মবাইলে ধনঞ্জয়ের সেই গানডা চালা তো দেহি।’’ উৎসাহে বাবার চোখমুখ ঝকঝকে। আমিও শুনলাম গানটা, হয়ত এই প্রথম এত মনোযোগ দিয়ে। গানটা শুনছিলাম — ‘এ মাটি ছিনিয়ে নিতে কতবার ঝড় এসেছে/এ মাটি ভাসিয়ে দিতে কতবার বান ডেকেছে।/কত যে বুকের পাঁজর আড়াল করে রুখল সে ঝড়/ কত যে শোণিত ঢেলে উষর মাটি প্রাণ পেয়েছে।’ শুনলে বুকে মাতন লাগে, রক্তে আগুন ধরে। মাটির প্রতি ভালোবাসা, টান আরও বেড়ে যায়।
যেতে যেতে ভাবছি লিস্টে যদি নাম না থাকে তাহলে বাড়ি ফিরে কী বলব! পাগুলো কাঁপছে। স্কুলে ফিজিক্যাল এডুকেশনের স্যার বলতেন, “শোন, কখনো রাস্তায় ভয় লাগলে দুই ভ্রু-র মাঝে মন রেখে হাঁটবি। কিচ্ছু মনে হবে না। ব্যাপারটা কেমন জানিস, কচ্ছপ যেমন শত্রুর সামনে…’’ দূর, কিচ্ছু হয় না ওসবে, যত সব বোগাস। ধরা যাক, হতাশ হয়ে চোরের মতো নিঃশব্দে বাড়ি ফিরলাম! বাবা বলে উঠল, “নাম নাই না! জানতাম। আরে কথা কইস না ক্যান? হা রে ভগমান, এইবার কী যে হইব! একবার তো দ্যাশ থিক্যা খেদাইসে। এইবার বুঝি ক্যাম্পে পাঠাইব!” মা খনখনিয়ে বেজে ওঠে-“কী কইরা নাম থাকব? হা রে কপাল, বারির দুই-দুইডা পুরুষ নিকম্মার ঢেঁকি। একজনা টোক হইয়া বিছানায় পইর্যা আছে, আরজনা মা-বুনের পয়সায় নবাবি কইরা বেরায়। এইবার আমি যাউম। দেহি, সরকার কেমুন কইরা আমাগো তারায়।’’ দিদির ফোঁপানির শব্দ কানে আসে। আমি অভিমন্যুর মতো এই অবস্থা থেকে পালাবার পথ খুঁজি।
আচ্ছা, যদি লিস্টে নাম থাকে? ধরা যাক, লিস্টে নাম আছে। বাসায় ঢোকার আগে থেকেই চেঁচাচ্ছি-“কইসিলাম না, লিস্টে আমাগো নাম থাকবই থাকব। আমাগো সক্কলার নাম আছে।’’
বাবা জোরে জোরে মাকে ডাকছে-“কই গো, কই গেলা? ও অনির মা, অনি ফিরসে। লিস্টে আমাগো সক্কলার নাম আছে। কোথাও যাইতে হইব না। আরে কই গেলা, এদিকে আস তো।’’
মা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে তাড়াতাড়ি আসে-“যাই যাই। আমি তো জানতামই, কই নাই? হইব না ক্যান, পিরতলায় সিন্নি মানত করসিলাম না! অনি, কাইল বাতাসা আর ধূপ আনবা তো, পিরতলায় যামু সান কইরা। চা খাবি? অনেকটা পথ গেছস এসছস। চা কইরা আনি।” দিদি আস্তে করে বলে, “ভাই, পায়খানা ঘরের সামনের চটটা অনেক পুরনো, জায়গায় জায়গায় ছিড়্যা গেছে, সামনের মাসে তুই টিউশনের টাকা পাইলে নতুন একখান আনবি?’’ আমার দিদির স্তিমিত হয়ে আসা চোখেও আজ সামান্য জ্যোতি। হঠাৎ আমার বুকের মধ্যেটা কেমন করে উঠল। দিদি জানে ওর যা বয়স এবাড়ির মেয়ে হিসেবে আর ওর কোনোদিন বিয়ে হবে না। সারা জীবন ওর কাটবে জামাকাপড়ে চুমকি লাগাতে লাগাতে। না না, আমি সামনের মাসে ওর জন্য একটা লাল শাড়ি নিয়ে আসব। ছোটবেলায় ও লাল পোশাক পরতে খুব ভালোবাসত।
এই তো, বিডিও অফিস এসে গেছে প্রায়। বড় গেটের সামনে কয়েকজন জওয়ান পাহারায়। ভিড় নিয়ন্ত্রণ করছে। ভেতরে জনসমুদ্র। আমার বন্ধু তপন, দেবব্রত, অমৃত, জিয়ারুল, সাবির–-ওরাও দাঁড়িয়ে। আমি ওদের কারও কারও দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলাম। সকলের মুখ শুকনো। এখন কেউ কাউকে চেনে না। প্রত্যেকেই সন্দেহের চোখে প্রত্যেককে দেখছে। ওর কি নাম আছে? ওদের? আর আমি বাদ? আমরা বাদ? তাহলে কোথায় ঠাঁই হবে? কেমন হিংস্রতা মানুষগুলোর চোখেমুখে। গেটের সামনে আমি। ভেতরে যাবার সাহস যেন হারিয়ে ফেলেছি। যা দেখব তার মুখোমুখি হবার শক্তি আমার আছে? ভেতরে যাব, পা ওঠে না যে!
প্রকাশিত: সৃষ্টির একুশ শতক, জুলাই, ২০২২
একটি চমৎকার গল্প।
অনেক ধন্যবাদ।
আপনার ভালো লেগেছে জেনে আমি আনন্দিত।
আপনার ভালো লেগেছে জেনে আমি আনন্দিত