সোমবার | ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৭:৩৮
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটির অনবদ্য সুরঞ্জলি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী : ফারজানা নাজ শম্পা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সমরেশ মজুমদার-এর ছোটগল্প ‘ভ্রমণ বৃত্তান্ত’

সমরেশ মজুমদার / ৫০৩ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৭ মে, ২০২২

সেই যে, কে যেন বলেছিলেন, অনেক হল, এবার মরণের পাশে শুতে চাই নিশ্চিন্তে!

কেউ জবাব দিয়েছিল, এখনই! তাহলে যে মরণও গর্ভবতী হবে।

চমকে উঠেছিলেন তিনি। ভোঁ—কাটা ঘুড়ির সুতোটাকে গুটিয়ে নেওয়ার মতো মুখ করে নিজের মনেই বলেছিলেন, হায়, তাহলে যে আর একটি সন্তান জন্ম নেবে। এবং নিঃসন্দেহে জানি তার নাম শয়তান।

তিনি ঠিক জানতেন না, মরণের কাছেই তো সবাই জীবনকে গচ্ছিত রেখে যায় এবং সেই অর্থে তো মরণের বিরাট বন্ধকি কারবার। যে জানে সে জানে মরণই পারে জীবনকে ফিরিয়ে দিতে। শুধু তার কাছ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসাটা জানতে হয়। যেমন, এই শহর যে কিনা সেই অর্থে মৃত (যদি পাশাপাশি কোনও ঝকমকে নগরকে রাখা যায়), তার কাছে আসুন। দেখবেন ফিরে যাওয়ার সময় একটা জীবনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরছেন যদি ঠিক চাবি ঠিকঠাক ঠিক তালায় পড়ে।

সব দেশ ঘুরে যখন পকেট আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না তখন এইরকম আহ্বান এল। পড়েই মনে হল, বাহ চমৎকার! এরকম ডাক তো অন্যদেশের ট্যুরিস্ট ব্যুরো দেয়নি কখনও। কাজের তাগিদে আমাকে পৃথিবীটাকে ঘুরে দেখতে হয়। পাঁচ বছরে একবার। অথচ এই বিজ্ঞাপনটা নজরে পড়েনি কখনও যদিও কতবার ওই শহরের পাশ দিয়ে চলে গিয়েছি। পকেটে যা আছে কুড়িয়ে বাড়িয়ে তা দিয়ে দুটো রাত কোনও হোটেলে থাকা যায়। তার মানে একটা বিরাট দিন হাতে থাকার দেখবার এবং ওই যে বলেছে ঠিকঠাক তালাটা যদি খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে তাকে নিয়ে ফিরে যাওয়া হলেও হতে পারে।

কাল রাতে এই শহরে পা দিয়েছি। রাতের বেলায় সব আকাশের মোটামুটি দুই চেহারা, মেঘ। থাকলে এবং না থাকলে। ঘুমোলে যেমন বেঁচে থাকা কিংবা মরে যাওয়া সমান—সমান। কথাটা কথায় জড়িয়ে হোঁচট খেল, বোধহয়, সমান—সমান হয়েও সমান নয়। ঘুম তো স্বপ্ন দেখায়, এইটুকুও ওর বাড়তি অহংকার।

হিসেবে দেখা গেল দু—রাতের হোটেল খরচ চালিয়ে সামান্যই থাকবে আমার। কী আছে এই শহরে যা আমি কোথাও দেখিনি তাই দেখে নিতে পারি। হোটেলের রিসেপশনে নামলাম ব্রেকফাস্ট খেয়ে। ঝকঝকে তকতকে আয়নায় মোড়া চারধার। যে দিকেই তাকাই নিজের পঁয়ত্রিশ বছরের মুখটাকে দেখি। মানুষের শুনেছি অনেক মুখ থাকে, আমার কটা?

এখানে শীত নেই এবং গরম পড়ে না বলেই নেই। এতদিন বাদে একটু হালকা হয়েছি পোশাকে। চোস্ত পাজামা আর চাপা পাঞ্জাবিতে বোধহয় এখানে আমি একক। কারণ বুঝতে অসুবিধে হয় না, নজর কেড়েছি এর মধ্যেই অনেকের। হোটেলের অভ্যর্থনাকারীরা এত হাসি কোত্থেকে সংগ্রহ করে কে জানে! কাল রাতেও দেখেছি, এখনও এদের বোধহয় হাসির পুঁজি ফুরোয় না।

বললাম, আপনাদের ট্যুরিস্ট ব্যুরোর বিজ্ঞাপন চোখে পড়ায় এই শহরে এসেছি।

কাউন্টারের ওপারে দাঁড়িয়ে ছেলেটি জবাব দিল, আমাদের সৌভাগ্য।

বললাম, বলুন তো কী—কী আছে এখানে দেখবার। আজ সারাদিনে সেসব ঘুরে দেখে নিতে হবে।

ছেলেটি হাসল, একদিনে দেখতে চান! তাহলে বেশ পরিশ্রম হবে।

বললাম, তা হোক। দেখবার জন্যেই তো এসেছি।

ছেলেটি জানাল, এত ছোট—বড় জিনিস চারধারে ছড়িয়ে আছে যে একদিনে একা—একা সব দেখে উঠতে পারবেন না। তা ছাড়া কোনও জিনিসকে এমনি দেখলে একরকম, আবার তার। গোপনকথা জানলে আর একরকম হয়ে যায়। তার জন্যে আপনার একজন গাইড নেওয়া দরকার।

গাইড! চমকার। জীবনের প্রতি পায়েই কেউ—না—কেউ আমায় গাইড করেছে। যখন করেনি তখনই হোঁচট খেয়েছি। বললাম, গাইড কোথায় পাব?

আপনি নেবেন?

হ্যাঁ।

ছেলেটি টেবিলের ওপর থেকে একটা কাগজে তুলে এনে আমায় দিল। পনেরোটা নাম পরপর, তাদের বয়স এবং দৈনিক দক্ষিণা। দক্ষিণার চেহারা দেখে আমার চোখ কপালে। এ যে আমার দু—রাতের হোটেল ভাড়ার সমান। পকেটে যা আছে তা দিয়ে এদের দু—ঘণ্টার বেশি পাওয়া যাবে না, দিন তো দূরের কথা! তারপরেই মনে হল, হয়তো এখানে লিখতে হয় বলে বেশি লেখা আছে, দর করলে হয়তো আমার সাধ্যের মধ্যেই পেয়ে যাব।

জিজ্ঞাসা করলাম, এদের যে—কোনও একজনকে পাওয়া যাবে?

চেষ্টা করতে পারি।

কত দিতে হবে?

মানে?

নিশ্চয়ই কম হবে!

ছেলেটি আমাকে বড়—বড় চোখে দেখল। যেন এরকম প্রস্তাব সে জীবনে শোনেনি। কথা বলছে না দেখে আমি বললাম, দক্ষিণাটা আমার পক্ষে বেশ বেশি।

দুঃখিত, এটাইন্যায্যমূল্য।

বেশ। এরা ছাড়া আর একটু সস্তা দরের গাইড পাওয়া যাবে না?

সস্তা গাইড! হায়! না, তাদের সন্ধান আমার জানা নেই। আপনি নিশ্চয়ই অন্ধ হয়ে থাকতে চান না!

মাথা নেড়ে হোটেল ছেড়ে বাইরে এলাম। পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছি হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এলেই একদল দালাল আর ট্যাক্সি ড্রাইভার এসে ছেকে ধরে। কিন্তু এখানে ওরা কেউ নেই। ট্যাক্সিওয়ালারা খুব নির্জীব চোখে আমাকে দেখল। রাস্তা ঝকঝকে নয় আবার নোংরাও বলা যাবে না। বাড়ি—ঘরদোর দেখলে মনে হচ্ছে আমি যেন হঠাৎ ভুল করে জুলিয়াস সিজারের আমলে চলে এসেছি। এমনকী রাস্তা দিয়ে যেসব মানুষ যাচ্ছে তাদের হাঁটাচলায় ব্যস্ততা নেই এবং পোশাকও মোটেই আধুনিক নয়। কিন্তু হোটেলওয়ালা অথবা ট্যাক্সিড্রাইভার তো আর পাঁচটা দেশের মতনই একই চেহারার।

চোখের সমানে অন্যরকম দৃশ্য তাই কৌতূহল বাড়াল। রাস্তায় নামলাম, ধুলো নেই কিন্তু লালচে ভাব আছে। একটা গাইডম্যাপ রিসেপশনিস্টের কাছ থেকে চেয়ে আনলে হত। কোনও অলস ছোঁকরাকে দেখছি না। পেশাদার গাইডের চেয়ে ওরা কম কাজের হয় না। দোকানপাটগুলো দেখে আরও অবাক হলাম। চেহারায় তো আধুনিক মোটেই নয়, এমনকী, যা সব জিনিস বিক্রি করছে তাদের এখন কোথাও বড় একটা দেখা যায় না। প্রাচীন রোম কিংবা মদিনায় এইসব। দোকান দেখা যেত। মনে হচ্ছিল আমি যেন একটা সিনেমার সেটে এসে পড়েছি এবং একটু পরেই এখান দিয়ে ক্লিওপেট্রা চলে যাবেন। তবে একটা কথা ঠিক, লোকেরা আমায় দেখছে। মুখ। নয় পোশাকটাকে। মেয়েরা কি এই সময় খুব কম বের হয়? কারণ খুব সুশ্রী অল্পবয়সি মেয়ে চোখে পড়ছে না।

একটু বাদেই আমি দিশেহারা এবং সেই সময়েই চোখে পড়ল। ওটা কি পানশালা? এই পরিবেশে রেস্তরাঁ শব্দটাকে কেমন বেমানান মনে হচ্ছে। ওপরের সাইনবোর্ডে কিছু একটা লেখা রয়েছে যার ভাষাটা আমার কাছে অবোধ্য। লম্বা কাউন্টার, তার ওপাশে দাঁড়িয়ে পাকা আমের মতো এক বৃদ্ধ…লিত চোখে আমাকে দেখলেন। তারপর আমার চেনা ভাষাটাকে ভেঙে—ভেঙে বললেন, কফি খাবেন?

তেমন দরকার ছিল না কিন্তু ওই যে লম্বা টুলটায় বসতে পারার লোভে মাথা নাড়লাম। ঘর নয়, কারণ তার তিনদিক খোলা। থামের ওপরে মাথার ছাদটা আটকানো। মাঝে—মাঝেই লম্বা—লম্বা। টুল রাখা আছে। এটা তাহলে কফির দোকান! মদের হলেই বরং বেশি মানাতো।

হুকুমটাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ এবার আমার পাঞ্জাবির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অনেক যত্ন করে আমার চেনা দর্জি সেখানে কাজ করেছে আকাশি সুতো দিয়ে। জিজ্ঞাসা করলেন, নতুন এসেছেন এই শহরে?

বললাম, হ্যাঁ। আজ একটু ঘুরে দেখতে চাই।

হাতটা ঈষৎ নেড়ে তিনি বললেন, দেখুন।

কফি এল। বড় ভালো স্বাদ। চুমুক দিয়ে বললাম, আপনি আমাকে সাহায্য করবেন?

বলুন।

বয়স হলে কি মানুষ এমন নিরাসক্ত হয়ে যায়?

আমার একজন ভালো গাইড চাই। কিন্তু বেশি টাকা দিতে পারব না।

তা কি হয়? যে আপনাকে পথ চেনাবে তাকে আপনি উপযুক্ত সম্মান দেবেন না? তাহলে সে ভুল পথ চেনাবে, ক্ষতি তো আপনারই।

তা ঠিক। তবে কিনা আমার পকেটে বেশি পয়সা নেই কিন্তু ইচ্ছে আছে শহরটা দেখবার। বলছিলাম কি, আপনার জানা কোনও বেকার ছেলে আছে যে এই শহরটাকে চেনে?

থাকবে না কেন? কিন্তু তারা যে ভাষায় কথা বলে সে ভাষা তো আপনি বুঝবেন না। ওকে ভাড়া করে কোনও লাভ হবে না।

ব্যাপারটা বুঝলাম। এখানকার খুব কম মানুষই অন্যভাষা শিখেছে। তাই যারা শিখেছে তারা তো মূল্যবান হবেই। এই সময় একটু খসখসে অথচ সুরেলা গলা কানে এল, আপনি কোত্থেকে। আসছেন?

আমি ঘাড় ঘুরিয়েই মুগ্ধ হলাম। এত সুন্দরী মেয়ে এই শহরে আছে? আহা, শহরটাই যেন সুন্দরতর হল। মেয়েটি আমার দিকে স্পষ্ট চোখে তাকিয়ে আছে। বিনীত গলায় বললাম, ভারতবর্ষ!

মেয়েটি এক মুহূর্ত চিন্তা করে নিল, তারপর খুব নিরাসক্ত গলায় বলল, যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আপনার সমস্যাটা জানতে পারি?

দেখলাম, মেয়েটির কথা বলার ভঙ্গিতে বেশশিষ্ট ভঙ্গি আছে। আমাকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে বৃদ্ধ বললেন, উনি একজন গাইড চাইছেন আমাদের শহরটাকে দেখবেন বলে। কিন্তু ওর পকেটে যা আছে, তাতে–। যেন এক টুকরো ভাঙা হাসি আমার সুতোটাকে কেটে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

গাইড আপনার পক্ষে খুব দামি হয়ে যাচ্ছে?

হ্যাঁ, এই মুহূর্তে। আমি অনেক জায়গা ঘুরে দেশে ফিরতে গিয়ে বিজ্ঞাপন দেখে এখানে এসে পড়েছি। আমাকে আবার পাঁচ বছর পরে এখানে আসতে হবে। তখন শুরু করব। এই শহর। দিয়েই, যাতে টাকাপয়সা কোনও সমস্যা না হয়ে দাঁড়ায়। আমি ঘোষণা করলাম।

মেয়েটি এবার চুপচাপ কফি শেষ করল। মাথায় একরাশ সোনালি চুল, চোখদুটো আশ্চর্যভাবে গভীর। মুখের আদলে একটা নরম আনন্দ। কিন্তু তার সঙ্গে কেমন একটা বিষণ্ণ ছায়া চিবুকে। এবং চোখে জড়ানো। পায়ের পাতা ঢাকা এক কাপড়ের ঢিলে পোশাক মেয়েটির শরীরকে। আড়াল করেছে। কোমরের কাছে একটা ফিতে সরু হয়ে এঁটে আছে, দুই কাঁধে পোশাক দুই বাঁধনে আটকানো। মেয়েটির বয়স বোঝা গেল না কিন্তু ও যে ভরা যুবতি তা বুঝতে অসুবিধে নেই।

কফি খাওয়া শেষ হলে মেয়েটি রুমালে ঠোঁট মুছল। সঙ্গের ঝুলি থেকে একটা আয়না বের করে ঘুরিয়ে—ঘুরিয়ে নিজের মুখ দেখে নিল, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, এই শহরে আমি পঁয়ত্রিশ বছর আছি। শেষবার শহরটাকে দেখেছিলাম কুড়ি বছর বয়সে। অনেকদিন এই শহরটাকে আমার দেখা হয়নি।

আমি একটু অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম। সেটা লক্ষ্য করেই সে বলল, পঁয়ত্রিশ বছর আগে এখানে আমি জন্মেছিলাম।

ও। মেয়েটি আমার সমবয়সি, অথচ কত ছোট দেখাচ্ছে ওকে।

দেখুন, আজ আমার সারাদিনে তেমন কোনও কাজ নেই। আমি যদি গাইড করি তাহলে কেমন হয়? মেয়েটি মিটিমিটি হাসছিল।

আপনি?

না, না, ভয় পাবেন না। আমি যখন পেশাদার গাইড নই তখন আমাকে কিছু দিতে হবে না। আপনার কথা শুনে মনে পড়ে গেল অনেকদিন এই শহরটাকে দেখা হয়নি, পনেরো বছর কম। সময় নয়। আমি বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আপনাকে সময় দেব, আপনার কোনও আপত্তি নেই তো? মেয়েটি এবার কফির দাম দিচ্ছিল।

আমি বাধা দিলাম, দয়া করে ওটা আমাকে দিতে দিন। তাড়াতাড়ি দুটো কফির দাম মিটিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। লক্ষ্য করলাম, আমার হোটেলের কফির দাম আর এই সাধারণ দোকানের কফির একই দাম।

দাম দিতে হয়নি বলে মেয়েটি কিন্তু একটুও বিমর্ষ হয়নি। বলল, আজ সারাদিন যা খরচ হবে তা তাহলে আপনিই মেটাবেন?

সাধ্যমতো চেষ্টা করব।

ব্যাস, তাহলে একটা ভদ্রলোকের চুক্তি হয়ে গেল।

এইরকম সুন্দরী মহিলার সঙ্গে আজ আমার সারাটা দিন কাটবে আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। কখন যে কার ভাগ্যে কী ঘটবে তা আগাম জানা যায় না বলেই জীবনটা এত সুন্দর রহস্যময়। ঢিলে আলখাল্লায় শরীর ঢাকা সত্বেও বুঝতে পারছি ওর সম্পদ সাধারণের ঈর্ষার বস্তু। লক্ষ্য করলাম ওর অনেক কুচি দেওয়া পোশাকের বাঁ—দিকটা হাঁটু অবধি কাটা, বোধহয় হাঁটাচলার সুবিধার জন্যেই।

চৌমাথায় এসে মেয়েটি দাঁড়াল, প্রথমে আমরা ঠিক করে নিই কোথায়—কোথায় যাব! উম, হ্যাঁ। চলুন, শেষ থেকে শুরু করি। তার আগে বলুন তো এই বাবদ আপনি কত ব্যয় করতে পারবেন?

এই প্রথম আমি একটু সন্দেহের চোখে ওকে দেখলাম। সারা পৃথিবী ঘুরি আমি, ঠগ জোচ্চোরদের নানান ফন্দির কথা আমার জানা আছে। যা পারি তা থেকে কমিয়ে ওকে বললাম। শুনে একটু চিন্তা করে ও রাস্তার পাশে গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়ার গাড়িকে কাছে আসতে বলল। গাড়িগুলো অদ্ভুত। ঘোড়া এবং তার সওয়ার আগে, গাড়িটা বেশ পিছনে। কোচোয়ানের সঙ্গে ওদের ভাষায় কথা শেষ করে মেয়েটি বলল, উঠুন।

খুবই ছোটগাড়ি, টু—সিটার। মুখোমুখি বসতেই হাঁটুতে হাঁটু ঠেকল। গাড়িগুলো ছোটে বেশ জোরে বোঝা যাচ্ছে। চ্যারিয়ট চ্যারিয়ট মনে হচ্ছে। এবার মেয়েটি বলল, আমি এই প্রথম ভারতবর্ষের মানুষকে দেখালাম।

বললাম, আপনি কিন্তু চমৎকার ইংরেজি বলতে পারেন।

মেয়েটি বড় চোখে তাকাল। তার ঠোঁটে টান—টান হাসি, নইলে আপনার কথা বুঝতেই পারতাম না।

এ চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। বুকের ভেতর কখন যে টলানি শুরু হয়েছে বুঝিনি, এই মুহূর্তে ধরা পড়ল। মুখ নামিয়ে বললাম, আমরা কিন্তু এখনও আমাদের নাম জানি না।

সে বলল, নাম? একদিনের জন্যেই তো আলাপ, বিকেল পাঁচটা অবধি, তারপর তো নাম স্মৃতি হয়ে যাবে। না মশাই, আমি আর স্মৃতির বোঝা ভারি করতে একটুও রাজি নই।

গাড়িটা থামল একটা ছোট্ট পাহাড়ের তলায়। এদিকের পাহাড় যেমন হয়, একটাও গাছ নেই। এত নেড়া যে চোখের আরাম হয় না। দুজনে সেই পাহাড় ভেঙে ওপরে উঠতে লাগলাম। মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে কী দেখার আছে?

দেখার কী কিছু থাকে, দেখে নিতে হয়। ও হাসল।

পাহাড়ি পথটায় মানুষের হাঁটার সুবিধে আছে কিন্তু কোনও মানুষ চোখে পড়ছে না। বেশ কয়েকটা বাঁক পেরিয়ে ওপরে উঠতেই গর্জন কানে এল। যত এগোচ্ছি তত সেটা বাড়ছে। এবার আর রাস্তা নেই। এ পাথর ডিঙিয়ে ওই পাথরের খাঁজ ধরে এগোতে হয়। কেউ পথ না দেখালে আমি কোনওকালেই এখানে আসতে পারতাম না। শেষ পাথরটার আড়াল সরতেই দৃশ্যটাকে। দেখতে পেলাম। পাহাড়ের একটা গহ্বর থেকে বিশাল জলরাশিরামধনুর মতো ছিটকে উঠে এসে আবার বেঁকে নিচের গহ্বরে ঢুকে গেছে। অর্ধবৃত্ত এই জলের ধারার তলায় স্বচ্ছন্দে দাঁড়ানো যায়। শব্দটি জলের ওঠাপড়ার জন্যেই হচ্ছে। এই বিশাল ধারার রং নীল।

আমি মুগ্ধ চোখে দৃশ্যটি দেখছিলাম। পৃথিবীর কোথাও এমন সাজানো ছবি আমি দেখিনি। সাজানো কারণ গহ্বর থেকে বেরিয়ে আর একটা গহ্বরে প্রবেশের সময় এই বিশাল ধারাটির ক্ষুদ্র অংশও বাইরে পড়ছে না। আবিষ্কার করলাম আমরা ছাড়া এখানে আর কেউ নেই।

মেয়েটি বলল, একজন মানুষ প্রতিজ্ঞা করেছিল সে মরবে না, দেবতারা যেমন মরেন না। অনেক সাধনার পর দেবতারা রাজি হলেন। তবে তাঁরা একটা শর্ত দিলেন, সুখ পেতে গেলে দুঃখকে আগে জানতে হবে। পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ যদি মানুষটির জানা হয়ে যায় তাহলে সে অমরত্ব পাবে। মানুষটি বলল, এ তো সোজা কথা, দুঃখ জানতে আর কষ্ট কীসের। সেদিন থেকেই সে দুঃখ। জানতে লেগে গেল। পৃথিবীর সব দুঃখ জানতে লোকটির শরীর নীল হয়ে গেল। এত বিষ ধারণ করার ক্ষমতা তার ছিল না। নিজের শরীরের জ্বালা নিবৃত্ত করতে সে এই পাহাড়ের গহ্বরে আশ্রয় নিল। কিন্তু পাতালও তো পৃথিবীর দুঃখ সইতে পারে না। সে মানুষটিকে ঠেলে ছুঁড়ে দিল শূন্যে। স্বর্গের দিকে চলে যাচ্ছে দেখে দেবতারা বিপদে পড়লেন। স্বর্গে দুঃখ যদি একবার প্রবেশ করে। –! তাঁরা তাড়াতাড়ি মানুষটাকে আবার পৃথিবীর তলায় ঢুকিয়ে দিলেন। সেই থেকে মানুষটি ওই জলের আকার নিয়ে পাতাল থেকে উঠে আসছে আবার ডুবে যাচ্ছে।

জিজ্ঞাসা করলাম, সব দুঃখ জেনেও মানুষটি অমর হল না কেন?

মেয়েটি হাসল, একটা দুঃখ তার জানতে বাকি ছিল। লক্ষ করে দেখুন একদম ওপরে অত নীলের মধ্যে একটা সাদা জলের রেখা বইছে। ওইটুকুই ওর অজানা। কিন্তু দেবতারা বললেন, তবু সে অমরত্ব পাবে। যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন এই জলের ধারা বেঁচে থাকবে।

জিজ্ঞাসা করলাম, না জানতে পারা দুঃখটি কী?

মেয়েটি বলল, দুটো মানুষের মন অবিকল হয়েও মেলে না কেন?

কেন?

মেয়েটি হাসল, ওটা তো আমিও জানি না। ভালোবাসা মানে যদি সুখ তবে তা থেকে এত দুঃখ পায় কেন মানুষ!

আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম নীল—জল স্পর্শ করতে কিন্তু মেয়েটি পেছন থেকে আমার হাত টেনে ধরল, কী করছেন?

ওই জলে হাত দেব।

পাগল! সাধ করে কি কেউ দুঃখকে ছোঁয়?

নিচে নেমে এলাম। কেন যে এমন ভারি হয়ে গেছে মন, কিছুই ভালো লাগছে না!

মেয়েটির হাঁটুতে আমার হাঁটু, চ্যারিয়ট ছুটছে। সে এখন শূন্য চোখে বাইরে তাকিয়ে। খুব নরম। এবং বিষণ্ণ দেখাচ্ছে ওকে। ইচ্ছে করছিল ওর একটা হাত দু—হাতে নিই। কিন্তু মেয়েটির শরীরের চারপাশে একটা ব্যক্তিত্বের বর্ম আছে যা ভেদ করে কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব নয়।

রথ যেখানে এসে থামল সেটা একটা উদ্যান। মেয়েটি বলল, আসুন, এবার আমরা অনন্ত যৌবন দেখব।

বিস্মিত এবং আগ্রহী হয়ে মেয়েটিকে অনুসরণ করলাম। চারধারে অজস্র ফুল। পৃথিবীর সব রং উজাড় করে তাদের সাজানো হয়েছে। এদের অনেককেই আমি চিনি না কিন্তু ফুল কি কখনও অনাত্মীয় হয়? মেয়েটি বলল, এদের কোনও গন্ধ নেই।

সেকি! এত সুন্দর তবু গন্ধ নেই? বলতে—বলতে অবিশ্বাসে গোলাপের বুকে নাক রাখলাম। না, মেয়েটি ঠিকই বলেছে।

বললাম, একটাও মৌমাছি কিংবা ভ্রমর দেখছি না কেন?

মেয়েটি জবাব দিল, কারণ এই সুন্দর ফুলেদের বুকে মধুও নেই।

যে ফুলের গন্ধ এবং মধু নেই সে কেমন ফুল? কিছুক্ষণ দেখলেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়, চোখ সরাতে হয়। মেয়েটি হাসল, এই হল অনন্ত যৌবন।

কী রকম?

স্বর্গের অপ্সরীরা লুকিয়ে—চুরিয়ে আসত পৃথিবীতে। হয়তো রক্তমাংসের মানুষের সঙ্গে প্রেম করতে তাদের ভালো লাগত। দেবতাদের তো সব আছে শুধু রক্তমাংস নেই। তাই বোধহয় মুখ বদলাতো অপ্সরীরা। একদিন তারা ধরা পড়ে গেল। দেবতারা বললেন, বেশ তাই হোক, তোমরা পৃথিবীতেই থেকে যাবে।

অপ্সরীরা বলল, তাই যদি হয় তাহলে আমাদের যৌবন কেড়ে নিও না।

দেবতারা বললেন, অবশ্যই। তোমরা অনন্ত যৌবন পাবে।

অপ্সরীরা এখানে এসে দেখল তাদের মানুষ—প্রেমিক প্রকৃতির নিয়মে বুড়ো হচ্ছে, মরে যাচ্ছে। কিন্তু তারা একই থেকে যাচ্ছে। আর আশ্চর্য, প্রেমিকের ছেলেরা যুবক হয়ে আবার তাদের সঙ্গে প্রেম করছে। তখন তাদের দেবতারা এখানে এই ফুলের চেহারায় সাজিয়ে দিল। যে যৌবন অনন্ত তাতে কোনও রহস্য নেই। অনেক বলেই দেওয়ার ক্ষমতা শূন্য। সে শুধুই শোভা, তাই ভ্রমর আসে না, সুবাস ছড়ায় না। এই যৌবনের অন্য নাম অভিশাপ।

আমি হাত বাড়িয়ে একটা ফুল তুলতে গেলাম, মেয়েটি বাধা দিল, কি করছেন! সাধ করে কি কেউ অভিশাপ নিয়ে যায়?

সারাদিন ধরে আমরা শহরটাকে দেখলাম। সারাদিন ধরে মনে হচ্ছিল আমি জুলিয়াস সিজারের রাজত্বে আছি। এত কিছু আমার অজানা ছিল। হায়, দেশলাই কাঠি জ্বলতে—জ্বলতে শেষপর্যন্ত। আগুনের স্পর্শ লাগল আঙুলে। সময় ফুরিয়ে আসছে। আজ আমি জীবনের অন্য এক আলো দেখতে পেলাম। এখানে না এলে এ দেখা হত না। এই মৃত শহরে এত জীবন গচ্ছিত ছিল।

মেয়েটিকে যত দেখছি তত মুগ্ধতা বাড়ছে। দুপুরে একসময় সে আলখাল্লা খুলেছিল স্বস্তি পাওয়ার জন্যে। তার তলায় পা—ঢাকা দিলে সিল্কের জামা। সুন্দর এবং রুচিময়।

কিন্তু তার যৌবন যে টলটলে তা বুঝে আমি ক্রমশ উত্তাল হচ্ছিলাম। কী করে মেয়েটিকে বলি আমি তাকে কামনা করছি! কী করে ওর মন পাওয়া যাবে? মন পেলেই শরীর সহজেই আসবে। যেহেতু আমার পকেটে কিছু নেই তাই আগামীকাল ফিরে যেতে হবেই। থাকলে নিশ্চয়ই ওকে পেতে চেষ্টা করতাম। মুখ ঘষছে বুকে। মেয়েটি কি আমার মনের কথা বুঝেছে? না হলে সে অমন করে মাঝে—মাঝে ঝুঁকে পড়ছে কেন? ওর বুকের ভাঁজ যে আমাকে দমবন্ধ করে দিচ্ছে। ওকি তা। বোঝে না? বোধহয় বোঝে বলেই এমন করে বোঝা চাপায়।

বিকেল নাগাদ আমরা শহরের মাঝখানে ফিরে এলাম। এখন বেশ ব্যস্ততা চারপাশে। কিন্তু আমি ছাড়া আরও বিদেশি দেখতে পাচ্ছি। বিদেশিরা যেমন হয়, দু—হাতে পৃথিবীটাকে কিনে নেওয়ার। মহড়া দিচ্ছে। একটা ছোট্ট পাঁচিলের আড়ালে ওটা কি কোনও মন্দির! মেয়েটি বলল, আর আমার সময় নেই। পাঁচটা বেজে এল। চলুন, এইটে দিয়ে আমাদের দেখা শেষ করি। ইচ্ছে করছিল না ওর কথা মানতে কিন্তু বুঝতে পেরেছি সে নির্মম।

চাতালের মধ্যে বিরাট একটা মুখ। এ মুখ মানুষেরও নয় আবার পশুরও নয়। একই সঙ্গে হিংসা, ভয়, আনন্দ এবং কান্না মেশানো রয়েছে অভিব্যক্তিতে। চমকে সরে আসতে হয় আবার সরেও যাওয়া যায় না। তিনমানুষ লম্বা একটা পাথরের চাঁই কেটে যেন মুখটাকে তৈরি করা হয়েছে। তার মুখের গহ্বরে অন্ধকার। মেয়েটি বলল, এর নাম মহাকাল।

আমি নীরবে মাথা নাড়লাম।

মেয়েটি বলল, আমরা বিশ্বাস করি ওর মুখের ভেতর হাত রেখে যদি কোনও কিছু প্রার্থনা করা যায় তাহলে অবশ্যই তা পূর্ণ হবে।

অবিশ্বাসে তাকালাম, সত্যি?

মেয়েটি ঘাড় নাড়ল, বিশ্বাসই তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

আমি শিহরিত হলাম। বেশ, এবার পরীক্ষা হয়ে যাক। এই মুহূর্তে আমি মেয়েটিকে ছাড়া তো আর কিছুই কামনা করতে পারি না। মেয়েটি বলল, অনেকদিন এখানে আসা হয়নি। আপনি কিছু প্রার্থনা করবেন?

নিঃশব্দে মাথা নেড়ে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে মহাকালের মুখে হাত রাখলাম। শীতলতম এ কোন স্পর্শ। প্রার্থনা সেরে ফিরে আসতেই মেয়েটি এগিয়ে গেল। তারপর চোখ বন্ধ করে হাত বাড়িয়ে সে তার প্রার্থনা সেরে নিল।

বাইরে বেরিয়ে মেয়েটি বলল, এবার আমাকে যেতে হবে, আপনি কি হোটেলে ফিরতে পারবেন?

আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

সে বলল, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে জানতে পারি কি আপনি কী প্রার্থনা করলেন?

আমি ঘাড় নাড়লাম, নিশ্চয়ই। আমি পাঁচ বছর পর এই শহরে আসব। প্রার্থনা করলাম, তখন যেন আমি একমাত্র আপনার দেখা পাই। কারণ সেই সময় আমি স্বচ্ছল থাকব।

মেয়েটি যেন কেঁপে উঠল। তারপর অদ্ভুত মায়াবী চোখে আমার দিকে একবার তাকিয়ে মুখ নামাল। তার ঠোঁট দাঁতের তলায়।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি প্রার্থনা করলেন জানব?

মেয়েটি মুখ ফেরালো। ওর বুক নড়ে উঠল। তারপর বলল, প্রার্থনা করলাম আজ থেকে যেন প্রতি রাত্রে তিনজন খদ্দের পাই।

চমকে উঠলাম।

মেয়েটি বলছিল, পাঁচ বছর পর যখন আপনি আসবেন তখন আপনার বয়স মাত্র পাঁচ বছর বাড়বে। কি আর এমন! কিন্তু আমার যে পনেরো বছর বেড়ে যাবে। আপনার একটা রাত মানে যে আমার তিনটে রাত।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন