শুক্রবার | ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৮:০৩
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বরেন্দ্র ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজের ইতিহাস, কুলপঞ্জি ও অভিলিখনের সমন্বয়ে একটি পুনঃপাঠ : অত্রি ভট্টাচার্য ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘ছেঁড়া জামার ঈশ্বর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অশুভ শক্তির বিনাশ ও ভক্তের সুরক্ষায় নৃসিংহ চতুর্দশী : রিঙ্কি সামন্ত বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পেট্রোডলারের ডানা ছাঁটা যুদ্ধ : বিশ্বেন্দু নন্দ

বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৭৭ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

পেট্রোডলারের ডানা ছাঁটা যুদ্ধ — ইরান কীভাবে সেটলার কলোনির অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভাঙছে

দুই সেটলার কলোনির যুদ্ধ প্রচেষ্টার উপনিবেশ বিরোধী বয়ান

যুদ্ধের পেছনের যুদ্ধ

পেট্রোডলার কি ও কেন

পেট্রোডলার ব্যবস্থা মূলত মার্কিন ডলারের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম এবং দীর্ঘতম সেটলার কলোনি আমেরিকার ভূআর্থরাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার বৈশ্বিক ব্যবস্থা। ১৯৪৪-এর ব্রেটন উডস চুক্তিতে মার্কিন ডলারকে সরাসরি সোনার সাথে যুক্ত করা হয়। এই ব্যবস্থায় বিশ্বের অন্য দেশের মুদ্রা মার্কিন ডলারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি আউন্স সোনার দাম হল পঁয়ত্রিশ ডলার। যেকোনো সময় সে ডলারের বিনিময়ে সমপরিমাণ সোনা দিতে বাধ্য ছিল। ১৯৭১-এ বিশ্বজুড়ে ডলারের ব্যপ্তি বাড়লে আমেরিকাকে ডলারের বিনিময়ে প্রচুর সোনা মজুত রাখতে হচ্ছিল। ফ্রান্স, অন্য ইওরোপিয় দেশ ডলারের বিনিময়ে সোনা নিজেরদের দেশে মজুদ করছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারের সাথে সোনা বিনিময় প্রথা বাতিল করতে বাধ্য হলেন – যার নাম নিক্সন শক।

এর পরে ডলারের দাম বিপুলভাবে কমতে থাকে। ডলারকে বিশ্ব বাণিজ্য মুদ্রা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে ১৯৭৪-এ আমেরিকা-সৌদি আরবের পেট্রোডলার চুক্তি হয়। চুক্তির ফলে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো (ওপেক) অপরিশোধিত তেল বিক্রি করতে বাধ্য হল শুধুমাত্র মার্কিন ডলারের বিনিময়ে। বিশ্বের প্রতিটি দেশকে তেল কেনার জন্য মার্কিন ডলার সংগ্রহ করতে হতো। ফলে বিশ্বব্যাপী ডলারের অনন্ত চাহিদা তৈরি হয়। চুক্তি অনুযায়ী তেল বিক্রির বিশাল অর্থ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো — যার নাম জিসিসি [গালফ কোওপারেশন কাউন্সিল] দেশগুলো মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ও আর্থিক বাজারে বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয় চুক্তির বাধ্যবাধকতায়। এর নাম পেট্রোডলার রিসাইক্লিং। অর্থাৎ এই বিপুল অর্থ দিয়ে আমেরিকা তার দেশের ভদ্রবিত্তদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, তার বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ, ইচ্ছে হলেই বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়া, হলিউডের আধিপত্য এবং সার্বিকভাবে বৈশ্বিক রাজনীতি-অর্থনীতিতে একক আধিপত্য বজায় রেখেছে।

বিশ্বজুড়ে আমেরিকার আধিপত্য তৈরি করার ব্যবস্থা তৈরি করার অংশিদার হওয়ার বিনিময়ে জিসিসি দেশগুলো পেল আমেরিকার সামরিক নিরাপত্তা। পশ্চিম এশিয়ার তেল উৎপাদক দেশগুলোয় আমেরিকা সব থেকে বড় সেনা শিবির তৈরি করল — কোনও কোনও শিবিরে ৩৫-৪০ হাজার সেনা এবং বিপুল বড় যুদ্ধ সরঞ্জাম মজুদ থাকত।

এই ডলার আধিপত্য রুখতে প্রথমে সৌদি রাজা ফয়জল, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, শেষে লিবিয়ার মুয়াম্মার গদ্দাফি চেষ্টা করেও প্রাণ হারান। অন্যরা সম্মুখ সমরে নেমে সমঝতা করতে বাধ্য হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার ৪০ বছর আমেরিকার নানান ধরণের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ইরাকি যুদ্ধ, ইজরায়েলি আধিপত্য, নিজেদের দেশে প্রতিরোধ সত্ত্বেও ইরান, দুই সেটলার কলোনিয়াল স্টেট, বিশ্বের সমর ইতিহাসে দুই সব থেকে বড় সমর বাহিনীর মালিক আমেরিকা-ইজরায়েলকে তিন মাসের যুদ্ধে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করল কি করে? গত তিন মাস ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি তারা ইরানি নিরাপত্তা, নেভি, নেতৃত্ব ইত্যাদি ধ্বংস করেছে – এবং সেটা অনেকটাই সত্য। তারপরেও দুই সেটলার কলোনির ইরান বিজয় সম্পন্ন হয় না কেন?

অস্ত্র যখন অর্থনীতি

মাথায় রাখতে হবে আমরা যখন সংবাদমাধ্যমে বিস্ফোরণ, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক কৌশলের ছবি দেখি — সেই দৃশ্য যুদ্ধের পিছনে একটা ভীষণ অদৃশ্য যুদ্ধ চলতে থাকে। এটা এমন যুদ্ধ, যেখানে মিসাইল নয় — অর্থনীতিই প্রধান অস্ত্র। আর এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালী আর আমাদের আলোচ্য পেট্রোডলার ব্যবস্থা। ১৯৭০-এর দশকে পেট্রোডলার ব্যবস্থা তৈরির সময় নিক্সন-কিসিঞ্জার কল্পনাও করেনি, সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক হুমকি না বরং অর্থনৈতিকভাবে টালমাটাল করে চলতে থাকা দেশ শুধু অর্থনৈতিক হুমকিতে পুরো ডলার আধিপত্য চক্র ভেঙে দিতে পারে। তারা ভেবেছিল ডলারের আধিপত্য চিরস্থায়ী। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ — কোনও ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। ইরান আজ প্রমাণ করছে, অর্থনৈতিক যুদ্ধ, সামরিক যুদ্ধের চেয়েও বেশি কার্যকর। আর সেই যুদ্ধে অস্ত্র ভূগোল, ধৈর্য [ডেটারেন্স], এবং একটি আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক ব্যবস্থার দুর্বলতা বোঝার ক্ষমতা। উপনিবেশিক শক্তিরা যখন বিশ্বের সম্পদ লুটে নেওয়ার জন্য তেল-ডলার চক্র তৈরি করেছিল, তারা ভেবেছিল এর ভরকেন্দ্র চিরকাল আমেরিকাতেই টিকে থাকবে। আজ ইরান তাদের সেই ভুল ভাঙিয়ে দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর মতো একটি সংকীর্ণ জলপথ — মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া — একাই পুরো পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে। এই রণকৌশল প্রমাণ করে, উপনিবেশিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের নিজেদের তৈরি পরিকাঠামোর ওপর অতিনির্ভরশীলতা। সেই পরিকাঠামোর যে কোনো একটি চোক পয়েন্ট আটকে দিলেই পুরো চক্র ঝুরঝুর হয়ে ভেঙে পড়ে।

পেট্রোডলার কাঠামোর তিন স্তম্ভ

১৯৭০-এর দশকে রিচার্ড নিক্সন-হেনরি কিসিঞ্জারের পেট্রোডলার ব্যবস্থার নির্ভরতা প্রধান তিনটি স্তম্ভে ১। উপসাগরীয় তেল ডলারে বিক্রি হবে। সারা পৃথিবী যেহেতু কারখানা, জীবনযাত্রা চালায় শস্তার তেলে তাই ডলার কিনতে সারা বিশ্ব ঝাঁপিয়ে পড়বে; ডলার হবে বিশ্ব অর্থনীতির অক্ষদণ্ড; ২। সেই তেল নির্বিঘ্ন জলপথে পরিবহন হবে সারা বিশ্বে আমেরিকার দেওয়া নিরাপত্তার ছত্রছায়ায়। আমেরিকার নিরাপত্তায় থাকা ওপেকের ব্যাঙ্ক একাউন্টে বিশ্ব্বর প্রতিটা দেশ ডলার জমা করে তেল কিনলে সেই ডলার, পেট্রোডলার চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকিয় অর্থনীতিতে ফিরে আসছে আমেরিকান সম্পদে বিনিয়োজিত হয়ে।

ইরান এখন সেই তিনটি স্তম্ভকেই লক্ষ্য করে আঘাত হানছে। কিন্তু কীভাবে? আর কেন এটি ইজরায়েলের জন্য এত ভয়ঙ্কর?

ইরানের কৌশল — ‘বন্ধ’ না করে ‘বিপজ্জনক’ করা — ইরান এখানে অসাধারণ সূক্ষ্ম কৌশল গ্রহণ করেছে। তার লক্ষ্য হরমুজ ‘বন্ধ’ না করে ‘বিপজ্জনক’ করে তোলা। কেন ‘বন্ধ’ না করে বিপজ্জনক? কারণ লয়েডস অব লন্ডন বা বিশ্বের প্রধান সামুদ্রিক বীমা সংস্থা হরমুজ জলপথকে ‘যুদ্ধাঞ্চল’ ঘোষণা করে, তখন যে ধাপগুলো ঘটতে থাকে সে সব লিপিবদ্ধ করা গেল –

১। ইরান হরমুজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উপস্থিতি বাড়াতে থাকে; ২। জাহাজ মালিকরা ড্রেনের আঘাতে জাহাজ ক্ষতির ঝুঁকি নিতে রাজি হয় না; ৩। বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায় ১০-২০ গুণ; ৪। তেল কোম্পানিগুলো তেল পাঠানোর বিকল্প পথ খোঁজে, কিন্তু সে রাস্তা অনেক লম্বা; ফলে তেল পরিবহনে খরচ বেড়ে দু’গুণ তিনগুণ হয়, আর সময়ও বাড়ে। আরও বড় সমস্যা হয় গ্যাস, ন্যাপথা ইত্যাদি পরিবহনে — সে সব খুব তাড়াতাড়ি পরিবহন করে ব্যবহার করে ফেলতে হয়; ৫। জিসিসি দেশগুলোর তেল বিক্রি কমে; ৬। সার্বভৌম তহবিলে (ওয়েলথ ফান্ড — রাষ্ট্রের মালিকানার বিনিয়োগ তহবিল। দেশের উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রা, প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রির আয় বা বাজেট উদ্বৃত্ত থেকে গঠন করা হয়। এই তহবিলের মূল লক্ষ্য দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সম্পদ সংরক্ষণ করা। তেল উদ্বৃত্ত সভেরন ফান্ড সব থেকে বড় তহবিল) সংকট দেখা দেয়।

কেন এই ইরানী কৌশল চরম মারাত্মক রূপ ধারণ করল? উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌম তহবিল (সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড) তেল বিক্রির উদ্বৃত্ত ডলারে গড়ে ওঠা। তেল বিক্রি কমে গেলে ১। তহবিলগুলোর নতুন বিনিয়োগের ক্ষমতা শেষ হয়; ২। উল্টো দিকে দেশীয় বাজেট ঘাটতি মেটাতে আমেরিকার সম্পদ — যেমন বন্ড বিক্রি করতে শুরু করে; ৩। এই ব্যাপক বিক্রি ডলারের মূল্য কমিয়ে দেয়; ৪। দুর্বল ডলার আমেরিকায় আমদানি মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়; ফলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে — যা এখন আমেরিকায় প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে; ৫। মুদ্রাস্ফীতি কমাতে ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার বাড়ায় যার ফলে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা দেখা যায়।

আমেরিকার সমস্যা হল হরমুজ ভূরাজনীতি প্ররোচিত আর্থিক সংকট। এই সংকটের সমাধান ফেডারেল রিজার্ভের হাতে নেই।

ইজরায়েলে বাড়তে থাকা আতঙ্ক — ভৌগোলিক বাস্তবতা

আমেরিকার ভয় পদ্ধতিগত। আমেরিকা ভয় পায় তার ৭০ বছরের অর্থনৈতিক স্থাপত্যের পতনের। কিন্তু ইজরায়েলের ভয় অনেক বেশি অস্তিত্বগত আর তাৎক্ষণিক — ইরান তার এক্সিস্টেনসিয়াল ক্রাইসিস। তাই ইজরায়েলের দুর্বলতা হল

১। তার ছোট্ট আয়তন। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তুলনা করা যাক। পশ্চিমবঙ্গের মোট আয়তন ৮৮,৭৫২ বর্গকিলোমিটার। ইজরায়েলের মোট আয়তন ২০,৭৭০ থেকে ২২,০৭২ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ, আয়তনের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ ইজরায়েলের চেয়ে প্রায় ৪.৩ গুণ বড়। ইজরায়েল আয়তনে পশ্চিমবঙ্গের কোনো একটি জেলার যেমন — দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাছাকাছি বা তার চেয়েও ছোট। ফলে ইরান থেকে ছোঁড়া মিসাইলের খবর ইজরায়েলি [প্রতিরক্ষা কাঠ্যামো প্রসেস করে তার যোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরির ভাবনা ভাবার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিনা বাধায় ইজরায়েলে ঢুকেপড়ে — ইজরায়েলের পক্ষে সব মিসাইলের প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করা সম্ভব হয় না।

২। সমর কৌশলে ঘাটতি — ২০২৫এর ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধে পরিষ্কার ইজরায়েলের আয়রন ডোম, ডেভিড স্লিং দিয়ে ইরান থেকে ধেয়ে আসা বিপুল পরিমান মিসাইলের সব কটা আটকানো সম্ভব হয় নি। শত শত মিসাইল একসাথে আটকানোর ক্ষমতা নেই তার। ইজরায়েল যদি ৭৫% মিসাইলও আটকায়, তার সুরক্ষাকে ফাঁকি দিয়ে ঢুকে আসা বাকি ২৫% মিসাইলের বিধ্বংসী প্রভাব মিডিয়া ছড়িয়ে পড়ে তার আসল ক্ষতিকে কয়েকগুণ বেড়ে যায় দর্শকের মনে। ঠিক যেভাবে দুবাইতে কয়েকটা ইরানি মিসাইলের প্রভাবে গোটা দুবাই জনশূন্য হয়ে গিয়েছে।

ইরানি কৌশল

১। ইরান গত ২০ বছরে ধৈর্য ধরে, নিঃশব্দে এই কাজগুলো করেছে — ১। মাটির তলায় বিশাল বিশাল মিসাইল শহর বানিয়েছে গোটা ইরানজুড়ে। শোনা যায় এর সংখ্যা ৩৫ — ইরানের প্রদেশের সংখ্যা কিন্তু ৩১।

২। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা-ইজরায়েলের সাম্রাজ্যের ধাক্কায় ক্ষইতে থাকা দেশের প্রতিরোধী স্বাধীনতা বাহিনী — ইয়েমেনের হুতি, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাক আর সিরিয়ার বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছে ইরান। তার ফল তারা পাচ্ছে ২০২৬এর যুদ্ধে। প্রত্যেকেই হয় ইজরায়েলকে ব্যতিব্যস্ত রাখছে না হয় ইরানের অর্থনৈতিক যুদ্ধের সঙ্গী হয়েছে।

ইরানের লক্ষ্য একটাই — একাধিক ফ্রন্ট থেকে একসঙ্গে আক্রমণের সক্ষমতা তৈরি করা। উত্তর থেকে হিজবুল্লাহ, দক্ষিণ থেকে হুতিরা, পূর্ব থেকে ইরাকি মিলিশিয়া — একসঙ্গে আক্রমণ চালালে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।

দুটি ফ্রন্টের সমন্বয় – ইরানের পূর্ণ কৌশল

ইরান একইসঙ্গে দুটি ফ্রন্টে আঘাত করছে — একটি অর্থনৈতিক, অন্যটি সামরিক। নিচের সারণিটি দেখায় কীভাবে এই দুটি ফ্রন্ট পরস্পরকে শক্তিশালী করে:

ফ্রন্ট কৌশল প্রত্যাশিত ফলাফল
অর্থনৈতিক ফ্রন্ট হরমুজে ‘বিপজ্জনক’ পরিবেশ তৈরি → বীমা ও শিপিং খরচ বৃদ্ধি → উপসাগরীয় তেল বিক্রি হ্রাস → সার্বভৌম তহবিল আমেরিকান সম্পদ বিক্রি করে → ডলার দুর্বল, আমেরিকায় মুদ্রাস্ফীতি আমেরিকার মনোযোগ অর্থনৈতিক সংকটে বিভ্রান্ত হয়
সামরিক ফ্রন্ট হিজবুল্লাহ + হুতি + ইরাকি মিলিশিয়া → একাধিক ফ্রন্ট থেকে একসঙ্গে আক্রমণ → আয়রন ডোম অভিভূত → ইজরায়েলের শহরগুলো অরক্ষিত ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত

এই দুই ফ্রন্টের সমন্বিত ফলাফল হলো: আমেরিকা যখন অর্থনৈতিক সংকটে ব্যস্ত, তখন ইজরায়েল সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইরানের জন্য এটি একটি কৌশলগত সুযোগ। আমেরিকা ছাড়া ইজরায়েলের অস্তিত্ব অসার।

৫. কেন ইরান ‘জিততে’ পারে কোনো যুদ্ধ না করেই? — ইরানকে সামরিক যুদ্ধ জিততে হবে না। হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ না করে, শুধু ‘বিপজ্জনক’ করে তোলাই যথেষ্ট। বীমা বাজার বাকি কাজ করবে।”

ইরানের সুবিধা কেন এটি কার্যকর
নিম্ন বিনিয়োগ, উচ্চ রিটার্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উপস্থিতি বজায় রাখা তুলনামূলকভাবে সস্তা
বীমা বাজার স্বয়ংক্রিয় লয়েডস অব লন্ডন একবার ‘যুদ্ধাঞ্চল’ ঘোষণা করলে, জাহাজ মালিকরা নিজেরাই পথ বদলায়
আমেরিকার হাত খালি ফেডারেল রিজার্ভের কাছে এই সংকট মোকাবিলার কোনো সরঞ্জাম নেই। এটি ২০০৮-এর মতো আর্থিক সংকট নয় — এটি ভূরাজনৈতিক
ইজরায়েলের সীমাবদ্ধতা আয়রন ডোম শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল একসঙ্গে আটকাতে পারেনা। আর ইরানের হাতে এখন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে

উপনিবেশিক ব্যবস্থার দুর্বলতা উন্মোচন

আমাদের প্রশ্ন করতে শিখতে হবে। পর্দার আড়ালে কী ঘটছে তা দেখার চেষ্টা করতে হবে। আর স্মরণ রাখতে হবে আজ ইরান হরমুজ বন্ধ করছে, আগামীকাল অন্য কেউ অন্য কোনো চোক পয়েন্ট বন্ধ করবে। উপনিবেশিক ব্যবস্থা যতদিন থাকবে, প্রতিরোধও ততদিন থাকবে। ১৪৯২-এ কলম্বাস যখন ‘নতুন বিশ্ব’ আবিষ্কার করেছিল, তারপর থেকে ৫৩২ বছর ধরে উপনিবেশবাদ তার রং বদলিয়েছে — মশলা থেকে তেল, দাস থেকে ডলার, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে IMEC (ক্রুসেডের এক্সটেনশন। ক্রুসেডের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ করে আধিপত্য আর বর্তমানের উদ্দেশ্য আইনি বৈধতা তৈরি করে লুঠ। ২০২৩-এ দিল্লির জি২০ সম্মেলনে করিডোরের ঘোষণা হয়। করিডোরের মূল কাঠামো এবং বৈশিষ্ট্য। রুট- সংযোগ – মূলত দুটো করিডোর—পূর্ব করিডোর — ভারতকে আরব উপসাগরের সাথে সংযুক্ত করবে – এবং উত্তর করিডোর উপসাগরকে ইউরোপের সাথে যুক্ত করবে। সমুদ্রপথে ভারতের বন্দরগুলো সংযুক্ত হবে আরব আমিরাতের (UAE) সাথে। সেখান থেকে রেল নেটওয়ার্কে পণ্য সৌদি আরব, জর্ডন, ইজরায়েলের হাইফা বন্দর পৌঁছাবে এবং পরে জলপথে ইওরোপে পাঠানো হবে। এটা রেলপথ বা সমুদ্রপথ নয়, বরং এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ গ্রিড, হাইড্রোজেন পাইপলাইন এবং সাবমেরিন ডিজিটাল কেবল স্থাপনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এই নেটওয়ার্ক চালু হলে লজিস্টিক খরচ প্রায় ৩০% এবং পরিবহনের সময় প্রায় ৪০% পর্যন্ত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে) — কিন্তু তার সারাংশ কখনও বদলায়নি — দুর্বলের সম্পদ জোর করে লুঠ করা, আর সেই লুণ্ঠনকে ‘সভ্যতার বিস্তার’ নামে আখ্যায়িত করা। আজ পশ্চিম এশিয়ায় যা ঘটছে, ফিলিস্তিনে যা ঘটছে, লেবানন ও ইয়েমেনে যা ঘটছে — তা সেই পাঁচশো বছরের পুরোনো উপনিবেশিক মানসিকতারই সর্বশেষ নৃশংস অভিব্যক্তি। কিন্তু ইতিহাস আরেকটি সত্য আমাদের দেখায় – প্রতিটি উপনিবেশের একটা পতনদিন আছে।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ওপর অচলা সূর্য অস্ত গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে। পেট্রোডলার ব্যবস্থার পতনও অনিবার্য। হরমুজ প্রণালী আজ সেই পতনের সূচনাক্ষর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে — ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এক জলপথ, যার ‘বিপজ্জনক’ হয়ে ওঠাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে। এটাই ইতিহাসের দ্বান্দ্বিকতা। যারা শৃঙ্খল বানায়, সেই শৃঙ্খল একদিন তাদের নিজেদের পায়েই বাজে। যুবাদের জন্য আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো এই ঐতিহাসিক সত্য বুঝে নেওয়া : উপনিবেশবাদীরা ভয় দেখাতে পারে, বোমা বর্ষণ করতে পারে, নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে — কিন্তু তারা ইতিহাসের ধারাকে থামাতে পারে না। কারণ ইতিহাস সবসময় এগিয়ে যায়, মুক্তির দিকে, স্বাধীনতার দিকে।

প্রতিটি উপনিবেশের একটা পতনদিন আছে। উপনিবেশের পতন হোক।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন