১৭৮১-তে হেস্টিংস প্রাদেশিক পরিষদগুলো বিলুপ্ত করার স্বাধীনতা লাভ করলেন। কিন্তু তাঁর অভিশংসনের [ইমপিচমেন্ট] সময়, এভাবে নিজের কাজ বাতিল করার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে অসংগতির অভিযোগ আনা হয়। তাই আমাদের এই বিষয়টা লক্ষ্য করা দরকার, পরিষদগুলো মূলত “ভবিষ্যৎ আর স্থায়ী ব্যবস্থা” তৈরি না হওয়া পর্যন্ত শুধুই অস্থায়ী আর সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করার জন্যই তৈরি করার পরিকল্পনা হয়েছিল। প্রেসিডেন্সির কমিটিকে প্রথমে কেবল স্থানীয় এখতিয়ার দেওয়া হলেও, আশা করা গিয়েছিল যে, কালক্রমে তারা প্রাদেশিক পরিষদগুলোর কাজকর্ম ইত্যদি আত্মস্থ করবে।
ডিভিশনের হিসাব ও ব্যবস্থাপনা এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত ও সম্পন্ন করতে হবে, যাতে এই ডিভিডশনের নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্সির হাতে আসে; তখনই প্রাদেশিক পরিষদ প্রত্যাহার করা হবে এবং তারপরে হয় তারা প্রেসিডেন্সি থেকে ডিভিশনের কাজকর্ম পরিচালনা চালু রাখবে, অথবা সেটা অনতিঅবিলম্বে কমিটির কাছে হস্তান্তর করবে। ১৭৮১-তে প্রাদেশিক পরিষদগুলো বিলুপ্ত করার কথা ঘোষণা করার সময় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, ১৭৭৩-এ পরিকল্পিত স্থায়ী ব্যবস্থা কার্যকর করার লক্ষ্যেই এই কাজটা করা হয়েছে, উদাহরণস্বরূপ, “প্রদেশগুলোর সমস্ত আদায় করা অর্থ প্রেসিডেন্সির নিয়ন্ত্রণে আসবে; এবং সে সব কাজ কোম্পানির চুক্তিবদ্ধ [কভেনান্টেড] কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে সক্ষম আর অভিজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি পরিচালনা করবে, এবং এই কাজকর্ম গভর্নর-জেনারেল আর কাউন্সিলের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং তাদের কাছে তাৎক্ষণিক বিচার-বিবেচনার সুযোগ থাকবে।” (হ্যারিংটন: অ্যানালাইসিস, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৩৯। ১৭৮১-র ৫ই মে কোর্ট অফ ডিরেক্টরসকে লেখা চিঠিতে হেস্টিংস লিখেছেন: “আমাদের অবশ্যই ঘোষণা করতে হবে, আমাদের প্রশাসনের কোনো কাজেই আমরা এর চেয়ে বেশি সঙ্গতি বা নির্দিষ্ট নীতির প্রতি এতটা নিবিড় আনুগত্য লক্ষ্য করিনি। যে ব্যবস্থা আমরা এভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছি, সেটা প্রথম ১৭৭৩-এ এই প্রেসিডেন্সির প্রেসিডেন্ট আর কাউন্সিলের উদ্ভাবন এবং সেই একই প্রস্তাবের অংশ হিসেবে সংগ্রহ করা অর্থের দায়িত্ব বন্টন করা হয়েছিল।” পূর্ববর্তী প্রাদেশিক পরিষদসমূহ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বেরটি প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে সুস্পষ্টভাবে গঠিত হয়েছিল; এবং কমিটিটি অবিলম্বে গঠিত হয়েছিল, এবং একে অধিকতর মর্যাদা দেওয়ার জন্য, এর তত্ত্বাবধানের জন্য সর্বোচ্চ পরিষদের দুজন সদস্যকে নিযুক্ত করা হয়েছিল, যদিও তখন এটি অন্য প্রাদেশিক পরিষদগুলো থেকে কেবল নামেই ভিন্ন ছিল, এবং এর নির্ধারিত কার্যাবলী ভবিষ্যতের কোনো ব্যবস্থার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল।)
এই পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে হেস্টিংসের কেবল রাজস্ব প্রশাসনের প্রয়োজনীয়তাই নয়, বরং বেসামরিক চাকরির প্রকৃত পরিস্থিতিও বিবেচনায় ছিল। কমিশনারদের উপর আরোপিত বিধিনিষেধগুলোই দেখিয়ে দেয় যে, এই ধরনের কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের অসুবিধাটি কোথায় ছিল। ১৭৭৪-র ১০ই মার্চ লরেন্স সুলিভানকে লেখা চিঠিতে গভর্নর এই অসুবিধাটি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে লিখলেন : —
“আমার একান্ত ইচ্ছা যে, রাজস্ব আদায়ের তত্ত্বাবধানের সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয় অবিলম্বে কলকাতায় এক ছাদের তলায় নিয়ে আসা; কিন্তু এটা সময় সাপেক্ষ। প্রদেশের বেশিরভাগ অংশের অবস্থা অনিয়মিত ও শিথিল; একটা পরগনায় বিভক্ত অসংখ্য ছোট ছোট খামার আর তালুক, যার প্রত্যেকটি তার নিজের খাজনা জমার জন্য আলাদাভাবে দায়ী; এবং প্রায় সব রাজস্ব আদায়কারীর আর্থিক সচ্ছলতার অভাব, জনগণকে নিপীড়ন থেকে এবং রাজস্ব আদায়কে আত্মসাৎ, অবহেলা ও অপচয় থেকে রক্ষা করার জন্য একটি নিবিড় ও সতর্ক নিয়ন্ত্রণ দাবি করে। এই বিপুল ক্ষমতার সম্ভাব্য অপব্যবহার রোধ করার জন্য প্রধানদের নির্বাচন করা সর্বোচ্চ পরিষদের সদস্যদের সরাসরি বাণিজ্য কাজে লিপ্ত থাকা থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে (তবে, ২৪ নং প্রবিধান অনুযায়ী, ইউরোপে রেমিট্যান্স বা অর্থ পাঠানোর জন্য হীরা, কলকাতা থেকে বিদেশে রপ্তানির জন্য কেনা পণ্য এবং কলকাতার বাজারে বিক্রির জন্য বিদেশ থেকে আনা পণ্যের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য নয়। এই নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা ভাতা মঞ্জুর করা হয়েছিল), এবং প্রাদেশিক পরিষদের অন্য সদস্যদের এমন সব সামগ্রী কেনাবেচা থেকে বিরত রাখা হবে যা দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর ও নিপীড়নমূলক বলে প্রমাণিত হতে পারে (বিধি XXVI. “প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও সহকারীগণ এবং কোম্পানির অন্যান্য চুক্তিবদ্ধ কর্মচারীগণ, যারা অধস্তন ফ্যাক্টরি ও প্রত্যন্ত জেলাগুলিতে বসবাস করেন, তাদের শস্য বা এমন কোনো সামগ্রীর জন্য অগ্রিম অর্থ প্রদান থেকে বিরত রাখা হবে যা স্থানীয়দের জীবনধারণে সহায়তা করে এবং যা তাদের উপর নিপীড়ন ছাড়া কেনাবেচা করা যায় না, যেমন ঘি, তেল, মাছ, পাট, মাদুর, খড়, বাঁশ, সুপারি এবং তামাক, এবং তারা শুধুমাত্র দেশের রাজধানীর বাজার থেকে নগদ টাকায় ক্রয় করবেন।” বিধি XXV অনুসারে, “কলকাতার রপ্তানি গুদাম রক্ষককে কোম্পানির বিনিয়োগ গঠনকারী সামগ্রীর ব্যবসা থেকে বিরত রাখা হবে, এবং বিভাগগুলির রপ্তানি গুদাম রক্ষকগণ, এবং বোলিয়া, কোমারকলি, মালদা, রেঙ্গুন, লখীপুর এবং কলিন্ডার বাসিন্দারা, একই ধারা অনুযায়ী, তাদের নিজ নিজ বিভাগ বা জেলার মধ্যে)। সুপিরিয়র কাউন্সিলের (Superior Council) প্রধানগণ এবং অন্যান্য সদস্যদের — নিম্নপদস্থ সদস্যদের ব্যক্তিগত বিষয়াদিতে তাদের প্রভাবের যেকোনো স্বেচ্ছাচারী প্রয়োগ রোধ করতে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে; তাদের নিজস্ব সংযমের ক্ষতিপূরণ হিসেবে; এবং তাদের সেই সংযম বিশ্বস্ততার সাথে মেনে চলার অঙ্গীকারস্বরূপ — একটি প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি হলো, তাঁদের প্রত্যেককে মাসিক ৩,০০০ টাকা করে একটি বিশেষ ভাতা প্রদান করা হবে। এই ভাতার অর্থ এমন একটি তহবিল থেকে সংগৃহীত হবে, যা আফিম বিক্রয়লব্ধ মুনাফা দিয়ে গঠন করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, প্রেসিডেন্সিতে আমার প্রত্যাবর্তনের পরপরই বিহার প্রদেশে আফিম বাণিজ্যের অবস্থা সম্পর্কে আমি বোর্ডের কাছে যে প্রতিবেদন পেশ করেছিলাম, তার ফলস্বরূপ আফিম বাণিজ্যকে কোম্পানির নিজস্ব সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছিল। যেহেতু রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়াবলির পরিচালনার জন্য ‘প্রাদেশিক কাউন্সিল’ (Provincial Councils) গঠনের বিষয়টি প্রায়শই একটি কার্যকর উপায় হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে, তাই আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে — এখানকার এবং স্বদেশের — উভয় জায়গাতেই এর অনেক সমর্থক বা প্রবক্তা তৈরি হবে। আমার নিজস্ব অভিমত হলো — যেমনটি আমি আগেই উল্লেখ করেছি — আমি এটিকে একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবেই গণ্য করি, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কার্যকর এবং প্রয়োজনীয় উভয়ই; কিন্তু একটি স্থায়ী ও প্রতিষ্ঠিত প্রবিধান হিসেবে এর প্রবর্তন হলে আমি আশঙ্কা করছি যে, এর পরিণতি হবে স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য পীড়াদায়ক, রাজস্বের জন্য ক্ষতিকর এবং কোম্পানির বাণিজ্যের জন্য অহিতকর। প্রতিটি বিভাগেই চরম স্বৈরাচারী প্রকৃতির এক স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠার আশঙ্কা থাকবে; কারণ — কলকাতায় অবস্থিত মূল কাউন্সিল ছাড়া — অন্য কোথাও তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সুযোগ থাকবে না। আর কলকাতার সেই কাউন্সিলের সদস্যরাও (কেবল প্রেসিডেন্ট বা সভাপতি ছাড়া) প্রতিটি মামলায় আপিলকারীদের বিপক্ষে একটি পক্ষ হিসেবেই অবস্থান নেবেন। তাছাড়া, সাধারণ মানুষ তাদের শাসকদের দয়ার ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়বে যে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কণ্ঠ তোলার সাহসটুকুও তারা হারিয়ে ফেলবে। দেশের বাণিজ্য হয় মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের একচেটিয়া দখলে চলে যাবে, অথবা তা জোর করে চাঁদা আদায়ের শিকার হবে; কারণ ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি এবং লাগামহীন ক্ষমতার সম্মিলিত প্রভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের ধনসম্পদ বা বাণিজ্যের ঝুঁকি নিতে কে-ই বা সাহস করবে? জমিদার ও ইজারাদারদের ওপর ব্যক্তিগত মুনাফার উদ্দেশ্যে যে কর বা চাঁদা ধার্য করা হবে, তার ফলে রাজস্ব আয়ের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হবে; আর সেই করের বোঝা শেষমেশ রায়তদের (প্রজাদের) ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হবে — যা তারা দেশের সামগ্রিক মঙ্গলের বা রাষ্ট্রের উপকারের পরিবর্তে, কেবল কিছু আংশিক ও গোপন স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যেই পরিশোধ করতে বাধ্য হবে। সর্বোপরি, প্রতিটি বিভাগেই শাসনব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করবে — যা নির্ভর করবে সেই বিভাগগুলোর দায়িত্বে নিয়োজিত শাসকদের ব্যক্তিগত স্বার্থ বা খেয়াল-খুশির ওপর। আমি সর্বদা কালেক্টরদের অত্যাচারী হিসেবে গণ্য করেছি; কারণ — তাদের হাতে থাকা স্থানীয় সুযোগ-সুবিধাগুলো এবং তার সাথে যুক্ত বাংলার অধিবাসীদের স্বভাবগত ভীরুতা ও অত্যাচার সহনশীলতা — তাদের অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখত। অন্যদিকে, তাদের কুখ্যাতিপূর্ণ শঠতা ও মিথ্যাচার — তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যেকোনো অভিযোগকেই অবিশ্বস্ত করে তুলত। ফলে কাউন্সিলের পক্ষে তাদের কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত; বিশেষত এই কারণে যে, যে স্বার্থের জোরে তারা এই পদগুলো লাভ করেছিল, সেই একই স্বার্থ সর্বদা কম-বেশি তাদের রক্ষা করার কাজেই নিয়োজিত থাকত। তথাপি, তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করার একটি সুযোগ অন্তত ছিল; আর চরম মাত্রার জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে, তাদের পৃষ্ঠপোষকদের পক্ষেও তাদের রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু, যদি কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পরিবর্তে বোর্ডের সদস্যরাই স্বয়ং কালেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন, তবে তারা আর কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণের অধীন থাকবেন না। তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যেকোনো অভিযোগের বিচারক হিসেবে থাকবেন কেবল তাদেরই সমকক্ষ ব্যক্তিরা — যারা নিজেরাও একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভের প্রত্যাশী। প্রেসিডেন্ট — যার ওপর জনগণের দুঃখ-দুর্দশা শোনা ও তার প্রতিকার করার বিশেষ দায়িত্ব ন্যস্ত থাকার কথা — তিনি কাউন্সিলের বাকি সদস্যদের কাছে ঘৃণা ও ঈর্ষার সাধারণ পাত্রে পরিণত হবেন; কারণ তিনি তাদের সম্মিলিত স্বার্থের অংশীদার হবেন না। সুতরাং, এই শাসনব্যবস্থাটি কেবল সরকারের নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের দ্বারা নিকৃষ্টতম স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার পথই উন্মুক্ত করবে না, বরং খোদ শাসনযন্ত্রের শীর্ষস্তরেই চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ