নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা কে বলা হয় বিদ্রোহের বজ্রনির্ঘোষ, বিদ্রোহীর ম্যাণিফেস্টো। আবুল আহসান চৌধুরীর লেখা থেকে জানা যায় সম্ভবত বিদ্রোহী কবিতাটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় কার্তিক ১৩২৮ বঙ্গাব্দে! তবে সর্বাদিক প্রচলিত মত অনুসারে কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২২ পৌষ তারিখে সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায়। প্রথম প্রকাশনা নিয়ে ধন্ধের কারণ হল ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার প্রকাশনা ছিল অনিয়মিত এবং এর প্রকাশনা তারিখ ও প্রকৃত প্রকাশকালের মধ্যে পার্থক্য থাকতো। কবিতাটি প্রকাশের পর এর তুমুল জনপ্রিয়তার কারনে অন্যান্য পত্রপত্রিকায় যেমন প্রবাসী (মাঘ ১৩২৮), সাধনা (বৈশাখ ১৩২৯), ধূমকেতু (২২ আগস্ট ১৯২২), দৈনিক বসুমতী তে ক্রমান্বয়ে পুনর্মুদ্রিত হতে থাকে। একজন কবির একটি কবিতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পুনর্মুদ্রণ অবশ্যই শ্লাঘার কারণ। এমন ঘটনা বিরলতমও বটে।
অজস্র প্রশংসা ও অভিনন্দনের পাশাপাশি কবি নজরুল কে তাঁর বিদ্রোহী কবিতার জন্য বিস্তর সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। পত্রপত্রিকা ও ব্যক্তিগত স্তরে তিনি তীব্র কটাক্ষ এবং নিন্দামন্দের মুখোমুখি হন। বিদ্রোহী কবিতার প্যারডি রচনা করে কবি ও তাঁর কবিতাকে বিদ্ধ করা হয়। ‘ইসলাম দর্শন’, ‘ছোলতান’ প্রভৃতি পত্রপত্রিকা ছাড়াও সজনীকান্ত দাস শনিবারের চিঠিতে ‘ব্যাঙ’ (১৮ আশ্বিন ১৩৩১) এবং ‘সওগাত’ পত্রিকায় গোলাম মুস্তাফা কবি ও কবিতাকে কৌতুক ব্যঙ্গবাণে বিদ্ধ করেন।
তবে বিদ্রোহী কবিতা বিষয়ে বেশ বড় রকমের বিতর্ক ওঠে কবি মোহিতলাল মজুমদারের লেখা ‘আমি’ নামক এক গদ্য রচনাকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ ওঠে বিদ্রোহী কবিতাটি ‘আমি’ গদ্যাংশের হুবুহু অনুকরণ! ‘আমি’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘মানসী’ পত্রিকার পৌষ ১৩২১ সংখ্যায়। মোহিতলালের ভক্তবৃন্দ প্রচার করতে থাকেন নজরুলের কবিতাটি ‘আমি’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও তিনি এর ঋণস্বীকার করেননি। এ সম্পর্কে মুজফফর আহমেদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথায়’ লেখেন, “শুরুতে তিনি ‘আমি’-র ভাব নিয়ে ‘বিদ্রোহী’ রচনার কথাই বলে বেড়াচ্ছিলেন। সম্ভবত তাতে তেমন কাজ না হওয়ায় অনেক পরে তিনি বলা শুরু করেছিলেন যে নজরুল তাঁর লেখার ‘ভাব’ চুরি করেছে”। এ প্রসঙ্গে মুজফফর আহমেদ আরো বলেন, বিদ্রোহী কবিতা লেখার একবছর আগে নজরুল ‘আমি’ গদ্যাংশটি শুনেছিলেন বন্ধু মোহিতলালের কাছ থেকে। এমন হতে পারে মোহিতলালের লেখা শুনে নজরুলের মনে হয়েছিল যে এই ধরনের একটি কবিতা লেখা যায়।
বিদ্রোহী কবিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এর পরও সক্রিয় ছিল। এ প্রসঙ্গে আবুল আহসান মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়-এর একটি প্রয়াসের কথা উল্লেখ করেছেন। মণিলাল ছিলেন ‘ভারতী’ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক ও বিভিন্ন গ্রন্থের লেখক। তিনি বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পরপরই ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার সম্পাদকের কাছে একটি চিঠি পাঠান এবং ‘আমি’ গদ্যাংশের একটি অনুলিপি, নানা সাদৃশ্য স্থানগুলোর নিচে দাগিয়ে চিঠির সঙ্গে যুক্ত করে দেন। বিদ্রোহী কবিতার অকুন্ঠ প্রশংসা করেও তিনি ‘আমি’ প্রসঙ্গ তোলেন এবং ‘বিদ্রোহীর বন্ধুস্বরুপ’ এই রচনাটি পুনর্মুদ্রণের অনুরোধ জানান। উপরিউক্ত রচনাদুটির “ভাব ও ভাষার এমন একটি আশ্চর্য মূলগত সাদৃশ্য আছে যাহা পাঠককে সন্দিহান করে” এ কথা বলে তিনি মন্তব্য করেন “কিন্তু তাহাতে কোনোটিরই রসভোগের ব্যাঘাত জন্মায় না”। মণিলালের বক্তব্য আপাত নিরপেক্ষ হলেও চিঠিটিতে তাঁর উদ্দেশ্য ও মনোভাব নিরপেক্ষ ছিলনা। মোসলেম ভারত পত্রিকায় শেষ পর্যন্ত মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি এবং ‘আমি’ রচনাটি প্রকাশিত হয়নি। নজরুল-এর বিদ্রোহী কবিতা নিয়ে আর কোন বিতর্ক হোক এমনটা হয়তো চাননি পত্রিকার সম্পাদক।
এভাবেই বিতর্কিত-নামার অংশ হয়ে থেকে যায় অগ্নিক্ষরা এক লেখনী যা পরাধীন জাতির জীবনকে স্পন্দিত করে, অসাম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে প্রেরণা দেয় আজও।
তথ্য সূত্র : সাহিত্যের রূপকার পুনর্বিচারের অবলোকন, আবুল আহসান চৌধুরী, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।