১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাস। সিন্ধুদেশের লাড়কানা জেলার মহেঞ্জোদারোয় তখন সন্ধে নামছে। একটি ঢিবির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কোট প্যান্টালুন টাই পড়া বিশালাকার এক পুরুষ— নাম রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। অদূরে একটি স্তূপের ধ্বংসাবশেষ। সেখানে সূর্যাস্তের শেষ আভা।

থেকে থেকেই রাখালদাস অন্যমনস্ক হয়ে যান। এই জীর্ণ ইটের মধ্যে যেন তিনি বৌদ্ধ যুগ পেরিয়ে আরও অনেক দূর অতীতের তীর দেখতে পাচ্ছেন। হঠাৎ তিনি তাঁর সহকারী বিষ্ণু সীতারাম সুখঠঙ্করের দিকে ফিরে তাকান। লাঠি দিয়ে মাটি ঠুকে বলেন, ‘এখনই এই জায়গাটা খনন করতে হবে’। বিষ্ণু সীতারাম জানালেন ১৯১২ সালে দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর এই জায়গা পরিদর্শন করে গেছেন। তাঁর মতে পুরাতত্ত্বের দিক থেকে এই জায়গাটা তেমন কিছু পুরনো নয়।
সে বছর মহেঞ্জোদারো খোঁড়া হলো না। পরের বছর মহেঞ্জোদারোর কাছেই গৈচিডেরো পরিদর্শনে গিয়ে রাখালদাস সেখানে অতি প্রাচীন সভ্যতার হদিশ পেলেন। তার পরের বছরই অর্থাৎ ১৯২২ সালে রাখালদাসের পরিচালনায় মহেঞ্জোদারোর বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষের খনন কাজ আরম্ভ হয়। অর্থাৎ কালের স্রোতের বিপরীত দিকে গেলে আজ থেকে ১০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল মহেঞ্জোদারোর ইতিহাস সন্ধান। খননের প্রথম পর্যায়ে কিছু শীলমোহর পাওয়া গিয়েছিল। রাখালদাস সেগুলিকে পরীক্ষা করে বুঝতে পারলেন বেশ কিছু বছর আগে হরপ্পায় পাওয়া শীলমোহরের সঙ্গে এগুলির বিশেষ সাদৃশ্য আছে। তৎক্ষনাৎ তিনি খনিত অংশের পূর্বাংশে আরও গভীরে খোঁড়া আরম্ভ করে একই সঙ্গে দুটি ঢিবি খননের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু সেই কাজ বেশি দূর এগোয় নি। ভারতে পুরাতত্ত্বের খোঁড়াখুড়ির কাজ সাধারণত শীত ও বসন্তকালেই হয়ে থাকে। তখন গীষ্ণ আগতপ্রায়। খাওয়া-থাকা ও পানীয় জলের প্রচণ্ড অসুবিধা। তৎকালীন সময় সেখানে উটের শুকনো নোনা মাংস ছাড়া কোনো খাদ্য জোটে না— আর পানীয় বলতে অল্প পরিমাণে বিস্বাদ জল। এত কষ্ট করেও হয়তো বা কাজ চালানো যেত, কিন্তু খনন চালিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার তেমন কোনো টাকা মঞ্জুর করেনি। ফলে রাখালদাস তাঁর কাজ স্থগিত রাখলেন। প্রতিবেদনে তিনি লিখলেন, ‘বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষের তারিখ আনুমানিক প্রথম শতাব্দীর, কিন্তু তার দু-এক ফুট নীচে যে ভগ্নাবশেষ আছে, তার বয়স আরও তিন হাজার বছর আগেকার অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের’।

প্রচণ্ড পরিশ্রমে ও থাকা খাওয়ার অনিয়মে এই সময় রাখালদাসের শরীর একেবারে ভেঙে যায়। চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়স থেকেই তিনি ডায়েবিটিস ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। এই সময় Brights Disease নামে এক রোগে আক্রান্ত হন। ফলে তাঁকে ছুটি নিতে হলো। এর পর খননের ভার নেন এস ভাটস, তার পরে কাশীনাথ দীক্ষিত। ১৯২৫ সাল থেকে Sir John Marshall এই কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই অধ্যায়ে রাখালদাসের কোনও ভূমিকা ছিল না। কিন্তু এই কথা স্বীকার করতেই হবে যে, প্রথমে তিনিই মহেঞ্জোদারোর গুরুত্ব বুঝে খনন কাজ আরম্ভ করেছিলেন বলেই ভারতীয় নাগরিক সভ্যতার পাথুরে প্রমাণ এক লাফে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে পৌঁছে গিয়েছিল। ভারত সেদিন থেকে সভ্যতার জগতে মিশর, মেসোপটিমিয়া, ব্যাবিলন, চিন প্রভৃতি দেশের সঙ্গে এক পঙতিতে বসার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে প্রত্নক্ষেত্রের চিহ্ন বা ধ্বংসাবশেষের গুরুত্ব সম্পর্কে রাখালদাসের এক অতীন্দ্রিয় অন্তর্দৃষ্টি ছিল। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার ছাড়াও আমরা বারে বারেই তাঁকে দেখেছি যে অতী ক্ষীণ সূত্রের ওপর নির্ভর করে তিনি যে মত প্রকাশ করেছেন, উত্তরকালের আবিষ্কার তাকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রাখালদাস মহেঞ্জোদারোর প্রাচীনতা আবিষ্কার করেছিলেন বটে কিন্তু তার প্রতিবেদন ও পত্রপত্রিকায় দু-একটা প্রবন্ধ ব্যতীত সে সম্বন্ধে তাঁর লেখা নেই বললেই চলে। শোনা যায় সরকারী লালফিতের বাঁধনে তাঁর লেখা পুরো ছাপা হয় নি। এই কারণেই হয়তো তিনি তাঁর বন্ধু সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও সুরেন্দ্রনাথ কুমারকে তথ্য সরবরাহ করে অনুরোধ করেছিলেন মহেঞ্জোদারো সম্বন্ধে কিছু লিখতে। তাঁরা পরবর্ত্তীকালে লিখেও ছিলেন।

মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কর্তা সেই আবিষ্কার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু লিখলেন না বটে — কিন্তু তিনি ছিলেন দুর্দমনীয়। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে যে সব শীলমোহর পাওয়া গিয়েছিল তার পাঠোদ্ধারের জন্য তিনি চেষ্টা শুরু করেন। পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা সেই সময় জানা গেছে। বহু অর্থব্যয়ে পশ্চিম এশিয়ার প্রাচীন ও অপ্রাচীন লিপি সম্পর্কিত বিভিন্ন বই আনিয়ে রাখালদাস সেই সব লিপির চর্চা শুরু করে দিয়েছিলেন। এই সময় একদিন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে তিনি বলেছিলেন— ‘ওরে, আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, ৪৭ বছর বয়সে পড়েই আমি মহেঞ্জোদারোর মুদ্রার লিপি পড়তে পারবো’। রাখালদাসের জীবনে সেই আকাঙ্খিত সাতচল্লিশ-তম বছর আসেনি। ১৯৩০ সালের মে মাসে ইউরেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় তাঁর কালীঘাটের বাসভবনে ৪৫ বছর বয়সে তিনি প্রাণত্যাগ করেন।তাঁর শেষ জীবন প্রচণ্ড অর্থকষ্টে কেটেছিল। কে জানে এই সঙ্কটময় পরিস্থিতির দুঃসহ অবস্থা তাঁর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছিল কিনা! এই সময় বন্ধু-বৎসল রাখালদাসের পাশে তাঁর বন্ধুদের অনেকেই ছিলেন না। তবে এত দিন পরে আজ পরীক্ষিত সত্য যে, ভারতবাসী সকৃতজ্ঞচিত্তে এই মনীষীকে মনে রেখেছে। ভবিষ্যতে মহেঞ্জোদারো সম্পর্কে চর্চা যত বাড়বে রাখালদাসের কৃতিত্ব ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।