বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নতুন যে জীবন
বাংলাদেশে লেঃ কর্ণেল আতিকের নতুন জীবন শুরু হলো। প্রথম কিছুদিন ঢাকাস্থ ষ্টেশন হেডকোয়াটার্সে কাটলো। এরপর ১৯৭৩ সালের ১৩ নভেম্বর পোস্টিং হলো সেনাবাহিনী সদরদপ্তরের আর্টিলারি পরিদপ্তরের স্থানাপন্ন পরিচালক হিসেবে।
ঢাকা সেনানিবাসস্থ পাকিস্তান আমলের ১৪ ডিভিশন সদর দপ্তরেই গড়ে উঠেছে স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদরদপ্তর। এখানে তখন নতুন পরিবেশ, পরিস্থিতি। সেনাবাহিনী প্রধান, উপ-সেনাপ্রধান, চিফ অব জেনারেল স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যথাক্রমে বিএ-৫১২১ মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ বীর উত্তম, বিএ-৬৯ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, (পরে লেঃ জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি) ও বিএ-৫৫৫৩ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তম। এরা সবাই মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীর সেনানায়ক। তবে চাকুরিতে সবাই লেঃ কর্ণেল আতিকের জুনিয়র। একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে বাস্তবতা মেনে তিনি সেনাবাহিনী তথা দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করলেন।
আর্টিলারি পরিদপ্তরের প্রথম পরিচালক
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘‘মুজিব ব্যাটারি’’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আর্টিলারি সংযুক্ত হয়। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে লেঃ কর্ণেল আতিক ১৯৭৩ সালের ১৩ নভেম্বর সেনাসদরে আর্টিলারি বা গোলন্দাজ পরিদপ্তরের প্রথম পরিচালক হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন। তাঁর পূর্বে আর্টিলারি পরিদপ্তর এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ছিলেন তৎকালীন মেজর আবু তাহের সালাউদ্দিন, বীর প্রতীক (পরে কর্ণেল)। ১৫ মে ১৯৭৪ সালে তিনি কর্ণেল পদে পদোন্নতি পান। নবগঠিত আর্টিলারি কোরের উন্নতির জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।
তিনি তাঁর পেশাগত দক্ষতা দিয়ে অত্যন্ত সীমিত সুযোগ-সুবিধা, স্বল্প বাজেট ও নানাবিধ জটিলতার মধ্যেও নতুন গড়ে ওঠা গোলন্দাজ বাহিনীকে পেশাগতভাবে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। গোলন্দাজ বাহিনীর প্রশিক্ষণ পুস্তিকা, প্রেসি-প্যামপ্লেট ছাপানো, ফিল্ড ফায়ারিং, প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রনয়ণ থেকে শুরু করে অস্ত্র-গোলাবারূদের সংস্থানসহ একে ঢেলে সাঁজানোর বিভিন্ন প্রকার কর্মকান্ড কর্ণেল আতিক পরিচালনা করেছিলেন। সেই সময় সেনাসদর নেতৃত্বও তাঁকে বিভিন্ন কাজে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন। একদিন চিফ অব জেনারেল ষ্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তম সেনাসদরে সকল পরিচালককে তাঁর অফিসে ডাকলেন। এই সময় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ অন্য পরিচালকদের সামনে আর্টিলারি পরিদপ্তরের পরিচালক (কর্ণেল আতিক) এর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা (বিশেষত নিজ উদ্যোগে আর্টিলারি প্যামপ্লেট ছাপানো) অন্য পরিচালকদের জানান এবং তাকে অনুসরন করে এরকম উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেন। জেনারেল আতিককে গোলন্দাজ বাহিনীর ভিত্তিস্থাপক বলা যেতে পারে। পরবর্তীতে তিনি ছিলেন গোলন্দাজ বাহিনীর প্রথম ‘‘কর্ণেল কম্যান্ডেন্ট’’।
চট্টগ্রামে নতুন পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা :
১৯৭৫ সালের ২৩ অক্টোবর তাঁর বদলী হয় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ৬৫ পদাতিক ব্রিগেডের ’’কমান্ডার’’ হিসেবে। ১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাই তারিখে তৎকালীন ৬৫ পদাতিক ব্রিগেডের অধীনস্থ কয়েকটি ইউনিট নিয়ে ব্রিগেডিয়ার আতিকের নেতৃত্বে “২৪ পদাতিক লাইট পদাতিক ডিভিশন’’ নামে ২৪ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তিনি ১৯ এপ্রিল ১৯৭৬ সালে কর্ণেল থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
উল্লেখ্য, ব্রিগেডিয়ার আতিক যখন চট্টগ্রামে ৬৫ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার, সেই সময়কালে পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য ১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই তারিখে রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি থানার তক্তানালার কাছে মালুমিয়া (পাংকুপাড়া) পাহাড়ে পুলিশ টহলের উপর শান্তিবাহিনীর একটি দল আক্রমন করে। এর বহু বছর পর বিলাইছড়ি এলাকায় চাকুরিকালে বিশদভাবে জানবো সে ঘটনা। ১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাইকে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রামের শুরু ধরা হয়। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (১৯৭২) সশস্ত্র শাখা ‘‘শান্তি বাহিনী’’ গঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারী। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৬ সালের ৬ আগষ্ট থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘‘কাউন্টার ইনসারজেন্সি অপারেশনে’’ মোতায়েন করে। উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধু- সরকারের সময়কালে ১৯৭৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৩ টি সেনাবাহিনী গ্যারিসন গড়ে ওঠে। বলা যায় যে, প্রথম জিওসি হিসেবে পাহাড়ে ইন্সারজেন্সির প্রাথমিক ধাক্কা তিনিই সামলে ছিলেন।
এরপর ব্রিগেডিয়ার আতিকের বদলী হয় সেনাসদরে কোয়ার্টার মাষ্টার জেনারেল (কিউএমজি) হিসেবে। এ পদে তিনি স্বল্প সময়ে দায়িত্বরত থেকেও দক্ষতার সাথে সকল পদবীর বাসস্থান সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ২৫ আগষ্ট ১৯৭৭ সালে মেজর জেনারেল পদে উন্নিত হন।
মহা-পরিচালক, বাংলাদেশ রাইফেলস্ (বিডিআর):
কিউএমজি পদ হতে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে অর্থাৎ ১৯৭৭ সালের ১৫ ডিসেম্বরে তাঁকে বাংলাদেশ রাইফেলস্ বা বিডিআর এর (বর্তমানে বিজিবি) মহাপরিচালক হিসেবে বদলী করা হয়। তিনি ব্যাপকভাবে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও উন্নয়ণ সাধনে কাজ করেন। তিনি চোরাকারবার দমন করতে খুবই সফলতার পরিচয় দেন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে নিজের দেশের স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম হন। তিনি বিডিআর সদস্যদের মনোবল উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন।
১৯৮৩ সালের ২৫শে মে বিডিআর হতে তাঁর বদলী হয় ‘‘সি ইন সি’স সেক্রেটারিয়েট’’ এ (বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ) প্রিন্সিপাল ষ্টাফ অফিসার হিসেবে। এর পর সিএমএলএ’স সেক্রেটারিয়েটে পিএসও ও সেনাসদরে অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল (১৯৮৬) হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন :
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চতুর্থ সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি চ্যালেঞ্জিং একটি সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এই যে, তিনি ছিলেন দেশের রাষ্ট্রপতি ও সর্বাধিনায়ক জেনারেল এরশাদের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন। উচ্চাভিলাষহীন ও পেশাদার জেনারেল আতিক তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা ও দূরদর্শিতা প্রয়োগ করে অত্যন্ত সফল ভাবে সেনাবাহিনীকে পরিচালনা করেন।
এ সময়ে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হতে হয় তাঁকে। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের যেমন — মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা-প্রত্যাবাসিত-রক্ষিবাহিনী ইত্যাদি অফিসারদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। তবে এই সময় মুক্তিযোদ্ধা-প্রত্যাবাসিত সেনাকর্মকর্তাদের মধ্যকার দুর্ভাগ্যজনক দ্বন্দ অনেকাংশে কমে আসে। সে এক অন্য ইতিহাস।
অন্যএকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দীর্ঘ সময় সামরিক শাসনের সাথে জড়িত থাকার কারণে অফিসার ও সকল পদবীর সদস্যদের মধ্যে যে সহজ ও আয়েশী জীবন কাটানোর প্রবণতা চলে এসেছিল, সেটাকে সঠিক পথে আনা। এছাড়াও তাঁর বিষয়ে কোন কোন মহলের অনুমিত কিছু নেগেটিভ ধারণাও ছিল। এসকল চ্যালেঞ্জসমূহ তিনি তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্ব দিয়ে অতিক্রম করতে সক্ষম হন।
দি প্রফাইল অব এন আর্মি চীফ
জেনারেল আতিক মনে করতেন সেনাবাহিনী শুধু পেশা বা সার্ভিস নয়। এটি একটি জীবন ধারা — ‘‘ওয়ে অব লাইফ’’। দেশের জন্য ত্যাগই হলো এর মৌলিক উপাদান। তিনি শৃংখলা বিষয়ে আপোষহীন, উচ্চাভিলাষহীন আপাদমস্তক একজন পেশাদার সৈনিক ছিলেন। জেঃ আতিক তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা ও দূরদর্শিতা প্রয়োগ করে অত্যন্ত সফলভাবে সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন স্বজনপ্রীতিহীন, ন্যায়পরায়ন নিরপেক্ষ, সৎ ও নির্লোভ ধরণের সামরিক ব্যক্তিত্ব। ফলে তিনি, উচু মনোবলের শক্তি দিয়ে সেনাবাহিনী কমান্ড করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে কোন গ্রুপিং বা দলাদলিতে মোটেই বিশ্বাস করতেন না।
সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়াও উন্নত ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতাবোধ ও চরিত্র শক্তি বলে বলিয়ান ছিলেন। বিচক্ষণ ও প্রবল নীতিবোধ সম্পন্ন এই জেনারেল কথা কম বলতেন কিন্তু কাজ বেশী করতেন। এই সময় কৃচ্ছতা, মিতব্যয়িতার এক ধরণের কালচার গড়ে ওঠে।
একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, ব্যাটালিয়ন, ব্রিগেড, ডিভিশন পর্যায়ে কমান্ড ও সেনাসদর পর্যায়ে (প্রিন্সিপাল ষ্টাফ অফিসার হিসেবে) চাকুরীর অভিজ্ঞতা জেঃ আতিককে সফল হতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলেন। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে অনেক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার দ্রুত পদোন্নতি ঘটে। ফলে সময় ও সুযোগের অভাবে অনেকেই সর্বোচ্চ পদের আগের পদ বা ধাপগুলোতে কাজ করার সুযোগ পাননি। জেনারেল আতিকের মিলিটারি বেয়ারিং, দৈহিক গঠন, দেখতে এবং বেশভূশায় স্মার্টনেস তাঁর ব্যক্তিত্বে আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল।
একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, তিনি জেনারেল এরশাদের মতো প্রতাপশালী প্রেসিডেন্টর সময়ে সেনাপ্রধান ছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট এরশাদের অত্যন্ত আস্থাভাজনও ছিলেন। কিন্তু সেনাপ্রধান হিসেবে নিজ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বগুনে জেনারেল ‘‘এরশাদের শ্যাডোর’’ বাইরে নিজের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরী করেছিলেন জেনারেল আতিক। তবে বেসামরিক পরিসরে এ বিষয়টি তেমন আলোচিত হয়নি। ১৯৮৬ ও ১৯৮৭ সালে বিভিন্ন কারণে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বহুমুখী প্রতিভার সামরিক ব্যক্তিত্ব তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার আমীন আহম্মেদ চৌধুরী, বীর বিক্রমকে (পরে মেজর জেনারেল) চাকুরী চ্যুতির নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ। কিন্তু সেনাপ্রধান আতিকের দৃঢ়তার জন্য তা শেষ পর্যন্ত কার্যকরী হয়নি। এ বিষয়ে জেনারেল আমিন আহম্মেদ চৌধুরী লেখেন ‘‘তিনি (প্রেসিডেন্ট এরশাদ) আবার আমাকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করতে আর্মি হেডকোয়ার্টারকে লেখেন। আমার সৌভাগ্য বলতে হয়. আর্মি হেড কোয়ার্টার তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় আদেশ কোনটাই মানেনি। যার জন্য তিনি (প্রেসিডেন্ট এরশাদ) আমার চাকুরী ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন’’। (১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন)।
এই সময় সেনাবাহিনীতে স্থিতি (স্টাবিলিটি) ফিরে আসে। সামরিক অভ্যুত্থান, সামরিক শাসন, সেনা বিদ্রোহ, রাজনীতি ও ভ্রাতৃঘাতি সংঘর্ষের বিভীষিকাময় দিন পেরিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যগণ যেন শুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিয়েছিল। [ক্রমশ]