প্রায় আঠারো বছরের অজ্ঞাতবাস কাটিয়ে পুনরায় ফিরে এলেন যীশু—শুরু করলেন ধর্মপ্রচার। তার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিভিন্ন ‘চমৎকার’ বা ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ দেখানো শুরু করলেন। যেমন কুষ্ঠরোগীকে কেবলমাত্র স্পর্শের মাধ্যমে সুস্থ করা, মৃতব্যাক্তিকে জীবিত করা, জলকে স্পর্শের মাধ্যমে মদে পরিণত করা, জলের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, ভূতপ্রেতকে বশীভূত করা (exorcism) ইত্যাদি।
আমি পুনরায় থামবো। একটু চিন্তা করে দেখুন তো—আপনি বর্তমানে যে প্রফেশনে আছেন, সেই প্রফেশনে যুক্ত হওয়ার আগের তেরো থেকে পনেরো বছর আপনি কি করতেন? উত্তর হলো, আপনার বর্তমান প্রফেশনের যোগ্যতা অর্জন করতেন। প্রথমে মাধ্যমিক, তারপরে উচ্চমাধ্যমিক, তারপর গ্র্যাজুয়েশন, তারপরে হয়তো আরও উচ্চশিক্ষা। এইভাবেই নিজেকে নিজের প্রফেশনের জন্য তৈরী করতে হয়। ধর্মপ্রচার করাটাও একটা প্রফেশনের মতো। কেউ মা’র পেট থেকে পড়েই ধর্মপ্রচারক হয়ে উঠতে পারে না; তার জন্য চাই যথেষ্ঠ পড়াশুনা, চাই সাধনা, চাই যথেষ্ঠ প্ল্যানিং। স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, যোগানন্দ, শ্যামাচরণ লাহিড়ীর মতো আরও অনেককেই ধর্মপ্রচার করবার আগে নিজেদেরকে অনেক সময় ধরে যথেষ্ঠ পরিমাণে তৈরী করতে হয়েছিল—তাঁদের এক বা একাধিক গুরু ছিলেন। সুতরাং যীশুকেও ধর্ম বা ঈশ্বর সম্বন্ধে এই পড়াশুনা এবং সাধনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল বলেই আমার বিশ্বাস এবং আমি নিশ্চিত, অজ্ঞাতবাসের তেরোটি বছর তিনি ঈশ্বর সংক্রান্ত পড়াশুনা এবং সাধনার মধ্যে ডুবে ছিলেন। কিন্তু তিনি এই শিক্ষা কোথায় নিয়েছিলেন—সেই কথা অনুমান করবার সময় এখনও আসেনি।

যাই হোক, বছর তিনেক ধরে ধর্মপ্রচার করবার পরে যীশু ইহুদীদের দ্বারা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কথা বলবার দায়ে দোষী সাব্যস্ত এবং প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হলেন। ‘গুড ফ্রাইডে’র দিন সকালবেলায় গলগোথায় যীশুকে অন্য দু’জন চোরের সঙ্গে ক্রুশবিদ্ধ করা হলো। তিনজন প্রায় ঘণ্টা ছয়েক ক্রুশবিদ্ধ হয়ে থাকবার পরে সেখানে হাজির হলেন ইহুদী সৈন্যরা। মৃত্যু ত্বরান্বিত করবার জন্য তাঁরা মুগুর বা গদা জাতীয় কিছু একটা দিয়ে আঘাত করে দু-জন চোরের উরুর হাড়গুলো ভেঙ্গে দিলেন। কিন্তু যীশুর উরু ভাঙ্গতে গিয়ে তাঁরা দেখলেন—ক্রুশবিদ্ধ অবস্থাতে এর মধ্যেই যীশু মারা গেছেন! যীশুর মৃত্যু সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্য একজন সৈন্য একটি বল্লম দিয়ে যীশুর পাঁজরে আঘাত করলেন। আঘাতের স্থান থেকে রক্ত বেরিয়ে এলো—কিন্তু যীশুর শরীরের মধ্যে কোনোরকম নড়াচড়া বা প্রাণের স্পন্দন লক্ষ্য করা গেলো না। যীশুর মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার পরে সৈন্যরা যীশুকে ক্রুশ থেকে নামিয়ে আনলেন—যদিও বাকি দু-জন উরু ভাঙ্গা এবং ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে নিজেদের শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। সৈন্যদের তাড়া ছিল—কারণ ইহুদীদের একটি উৎসব ‘সাবাথ’ এর জন্য তাঁদের প্রস্তুতি নিতে যেতে হতো। মৃত যীশুকে ইহুদী সৈন্যদের তত্ত্বাবধানে আলোভেরা মাখানো হলো—একটি রেশমী কাপড়ের মধ্যে তাঁর শরীরকে জড়িয়ে কবর দেওয়া হলো। এরপর যীশুর অনুগামীরা বিলাপ করতে করতে নিজেদের বাড়ি চলে গেলেন—কবরের মধ্যে পড়ে রইল যীশুর মৃতদেহ।
এখানে আমরা পুনরায় থামবো। তৎকালীন সময়ে, প্রাণদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের ক্রুশবিদ্ধ করে মেরে ফেলাটাই ছিলো রীতি। কিন্তু ক্রুশবিদ্ধ ব্যাক্তির মৃত্যুর কারণ কি? কারণ হলো ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণ এবং ডিহাইড্রেশন। এই অবস্থায় মৃত্যু অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক—দীর্ঘস্থায়ী। এইজন্য, ক্রুশবিদ্ধ ব্যাক্তির মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করবার জন্য তার দুটি উরুর হাড় অর্থাৎ ফিমারকে ভেঙ্গে দেওয়া হতো। ফিমার ভেঙ্গে গেলে পায়ের মাংসপেশীর মধ্যে অত্যন্ত দ্রুত প্রায় এক লিটার রক্তক্ষরণ ঘটে—ফলে ক্রুশবিদ্ধ ব্যাক্তির মৃত্যু অনেক তাড়াতাড়ি ঘটে। এটা এক ধরণের mercy killing। লক্ষ্য করে দেখুন—যীশুর সঙ্গে যে দু-জন চোরকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, তাদের ফিমার ভাঙ্গা হলো কিন্তু যীশুর ফিমার ভাঙ্গা হলো না—কারণ সৈন্যদের মনে হয়েছিল যে যীশু ইতমধ্যেই মারা গেছেন! নাকি তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবেই যীশুর ফিমার ভাঙ্গেননি?
যীশুর পাঁজরে সৈন্যরা বল্লম দিয়ে আঘাত করেছিলেন এবং তার ফলে সেই ক্ষতস্থান থেকে রক্ত বেরিয়ে এসেছিলো। কিন্তু সেই রক্তের ধারা কেমন ছিলো—তা কোথাও বলা নেই। রক্ত কি ফিনকি দিয়ে বেরিয়েছিল? নাকি ধীরে ধীরে বেরিয়েছিল? কোনো উত্তর নেই। যদি ধীরে ধীরে বেরিয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যাক্তি জীবিত থাকতেও পারেন আবার মাত্র কিছুক্ষণ আগে তাঁর মৃত্যু ঘটেছে—এমনটাও হতে পারে। কিন্তু যদি রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে থাকে, তবে সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়—যীশু অবশ্যই জীবিত ছিলেন!
ক্রুশবিদ্ধ করবার তিন ঘণ্টা পরে যখন সৈন্যরা ফিরে এসেছিলেন, তখন যীশুর অবস্থা সম্পর্কে তিনটি সম্ভাবনার কথা আমার মাথায় আসে। প্রথম সম্ভাবনা—যীশু মারা গিয়েছিলেন। সেই ক্ষেত্রে গল্প এখানেই শেষ। তার কারণ, মৃত ব্যাক্তি কখনোই পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠতে পারে না এবং সেক্ষেত্রে রিসারেকসনের গল্পটা পুরোটাই ভাঁওতা বলেই আমার মনে হয়।
সম্ভাবনা দুই—প্রচণ্ড যন্ত্রণায় যীশু অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন এবং সেইজন্য বল্লম দিয়ে খোঁচা দেওয়ার পরেও তাঁর মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় নি। কিন্তু ভেবে দেখুন, এর অব্যবহিত পরেই যীশুকে কবর দেওয়া হয়েছিলো এবং সেই কবরের সামনে পাহাড়া বসানো হয়েছিলো। একজন অজ্ঞান, ডিহাইড্রেটেড ব্যক্তিকে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হলে অক্সিজেনের অভাবে তিনি কতক্ষণ জীবিত থাকতে পারেন? পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, আধ ঘণ্টা, বড় জোর এক ঘণ্টা—তার চাইতে বেশী কখনোই নয়। কিন্তু আমরা জানি যীশু পুনরুজ্জীবিত হয়েছিলেন সোমবার—প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা পরে। সুতরাং—যীশু যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন—এই যুক্তিও আমার অসাড় বলেই মনে হয়।
তৃতীয় সম্ভাবনা সম্বন্ধে আলোচনা করবার আগে আমি আপনাদের একটি কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই। আশা করি আপনারা জানেন, কোনো ব্যাক্তির মৃত্যুর সময়ের প্রায় তিন ঘণ্টা পরে তাঁকে ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হয় (যদিও এই টাইম গ্যাপ সম্বন্ধে মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার কোনো নির্দিষ্ট আইন আছে বলে আমার জানা নেই)। কেন একজন চিকিৎসক ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার আগে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেন? তার কারণ, জীবন এবং মৃত্যুর মাঝামাঝি একটি অবস্থা চিকিৎসা শাস্ত্রে বর্ণিত আছে, যার নাম ‘সাসপেণ্ডেড অ্যানিমেশন’ (suspended animation)। সাসপেণ্ডেড অ্যানিমেশন সংক্রান্ত কিছু কথা যা চিকিৎসা শাস্ত্রের ফরেনসিক মেডিসিনের ডা. অপূর্ব নন্দী দ্বারা লিখিত পাঠ্য বইতে বর্ণিত আছে—হুবহু তুলে দিলাম।
‘It sometimes so happens that due to some reasons a person may appear to be dead because of very feeble or minimum functions of his body systems. Even, the functions of nervous system, circulatory system or the respiratory system may not be perceived by conventional methods, though the person may actually not be dead and the functions of these systems ‘return’ after sometime, either as such or after proper resuscitation. Such a death-like state is known as suspended animation or apparent death. This may occur due to drowning or electrocution. The state of suspended animation or apparent death is said to be practicable. Its practice is popular among Indian ‘Yogies’ (persons who follow lives of strict principles with physical and mental exercises and restraint). Such people demonstrate their outfit even by being voluntarily buried alive, under the earth for hours. Actually the circulation etc do not completely stop but is being maintained in their minimum. When it is practised voluntarily as by yogies, it is called voluntary suspended animation and when it occurs spontaneously as in cases of drowning or electrocution, it is called involuntary suspended animation.’—Principles of Forensic Medicine by Prof. Apurba Nandy (M.D) Former head of the department of Forensic and state medicine and Vice Principal of Medical College Kolkata (First edition, second reprint, page no 134).
ডা. অপূর্ব নন্দীর মতে, সাসপেণ্ডেড অ্যানিমেশন হলো মানবদেহের সেই বিশেষ অবস্থা, যাতে দেহের সমস্ত সিস্টেম নিজেদের কার্যাবলী এতোটাই কমিয়ে দেয় যে সেই ব্যাক্তিকে মৃত বলেই মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে সেই ব্যাক্তি জীবিত থাকেন, কিন্তু কোনরকম বাহ্যিক পরীক্ষার দ্বারা সেই ব্যক্তি যে জীবিত, তা প্রমাণ করা সম্ভবপর হয় না। কোনো মানুষের যদি বৈদ্যুতিক শক লাগে কিংবা তিনি যদি আকস্মিকভাবে জলে ডুবে যান, তবে সেই ব্যক্তির মধ্যে এই ধরণের অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। অপরদিকে ভারতীয় যোগীগণ এই বিশেষ অবস্থাকে নিজের শরীরের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ে আসতে সক্ষম। এই অবস্থায় যোগীরা মাটিতে প্রোথিত অবস্থায় জীবিত থাকবার মতো আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব ব্যাপারও সম্ভব করতে পারেন।
ডা. অপূর্ব নন্দী অনেক বড় মাপের মানুষ—তিনি আমাদের শিক্ষক ছিলেন। স্যার অসাধারণভাবে সাসপেণ্ডেড অ্যানিমেশনকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি যে কথাটা বইতে লেখেননি, এবার আমি সেই কথাটাই আপনাদের সামনে বলতে চাই। কথাটি হলো—ভারতীয় যোগীদের দ্বারা এই ইচ্ছাকৃত সাসপেণ্ডেড অ্যানিমেশনকেই ভারতীয় দর্শনে ‘নির্বিকল্প সমাধি’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে—যে অবস্থায় যোগীর শরীরে প্রাণের চিহ্নমাত্র থাকে না—কিন্তু তিনি জীবিত থাকেন!
কিন্তু কেন বা কিভাবে ঘটে এই সাসপেণ্ডেড অ্যানিমেশন? আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আধুনিক বিজ্ঞান এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অবধি খুঁজে বার করতে পারেনি। এই বিষয়টি এখনও অবধি মানুষের মস্তিষ্কের অসংখ্য অজানা রহস্যের মধ্যে একটি হয়ে রয়ে গেছে।
ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় প্রাণহীন যীশুর অবস্থা এবং বাহাত্তর ঘণ্টা পরে তার পুনর্জীবনলাভ—এই ঘটনার একমাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে মানবদেহের এই বিশেষ অবস্থা—সাসপেণ্ডেড অ্যানিমেশন বা নির্বিকল্প সমাধি। কিন্তু সাসপেণ্ডেড অ্যানিমেশনে নিজেকে পাঠানোর টেকনিক তিনি কোথায় বা কখন শিখলেন? সম্ভাবনা একটাই। যীশুর যৌবনের সেই আঠারোটি বছর—যে সময়ে তিনি কোথায় ছিলেন—কি করছিলেন—কেউ জানে না। আরেকটা কথা মনে রাখবেন। সাসপেণ্ডেড অ্যানিমেশনের টেকনিক কিন্তু কেবলমাত্র ভারতীয় যোগীরাই জানতেন—অন্তত সেই সময়ে। আরেকটা কথা—যীশুর জন্মের পর কিন্তু প্রাচ্যের ‘জ্ঞানী ব্যাক্তি’রাই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।
গুড ফ্রাইডের দিন যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করবার পরে, সেইদিনই সন্ধ্যা ছ-টার সময় তাঁকে সমাহিত করা হয়। এই ঘটনার পর প্রায় ছত্রিশ ঘণ্টা পরে অর্থাৎ রবিবার সকালে মেরী ম্যাগডালেন নামক যীশুর একজন শিষ্যা যীশুর সমাধি উন্মুক্ত করে দেখেন—সমাধি সম্পূর্ণ ফাঁকা! সমাধির পাহাড়ায় নিযুক্ত প্রহরীরা বলেন, তাঁরা নিজের চোখে দেখেছেন যে স্বর্গের দেবদূতেরা যীশুকে সশরীরে স্বর্গে নিয়ে গেছেন। এই ঘটনা যে দিন ঘটেছিলো, সেই দিনটিই ‘ইস্টার রবিবার’ বা Easter Sunday নামে খ্যাত।
এর ১ম পর্বটি পড়তে চাই।
কীভাবে পাবো?