মঙ্গলবার | ৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:৪৪
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটির অনবদ্য সুরঞ্জলি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী : ফারজানা নাজ শম্পা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

একুশের উপন্যাস — নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি : মিল্টন বিশ্বাস

ড. মিল্টন বিশ্বাস / ২২৬৫ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০২৪

‘একুশের উপন্যাস’ বাংলাদেশের তিন ঔপন্যাসিকের তিনটি উপন্যাসের সংকলন গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে শওকত ওসমানের ‘আর্তনাদ’, জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ এবং সেলিনা হোসেনের ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একুশের ওপর লেখা প্রথম উপন্যাস জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ ১৯৬৯ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। ভাষা আন্দোলনের সময় ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত জহির রায়হান অমর একুশকে কিভাবে দেখেছিলেন তার পরিচয় এ উপন্যাসে পাওয়া যায়। অন্যদিকে শওকত ওসমান ও সেলিনা হোসেনের উপন্যাস দুটি উক্ত সংকলনের জন্য লিখিত। এখানে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা করা হলো।

‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ অমর একুশের ঘটনা ধারায় রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস। ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেন এ উপন্যাসে ঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেছেন — ‘এই উপন্যাসের নায়ক সোমেন চন্দ ও মুনীর চৌধুরী। আসলে এঁরাতো উপলক্ষ্য মাত্র। আমি এঁদের মধ্যে তাঁদেরকে খুঁজেছি যারা মানবতাবিরোধী শক্তির কাছে অসংখ্যবার নির্যাতিত হয়েও অনন্তকাল বেঁচে থাকে এবং পরবর্তী প্রজন্মের দিগদর্শন হয়ে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। যারা ব্যক্তি থেকে উত্তীর্ণ হয় প্রতীকে। এই প্রতীক হয়ে যাওয়াটুকু আমাদের ঐতিহ্য।’

বাঙালি জাতিসত্তা অন্বেষণে সেলিনা হোসেন ব্যক্তির রাজনৈতিক-সামাজিক অস্তিত্বকে গুরুত্ব দিয়েছেন। উপন্যাসে সময়ের বিস্তৃতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু পূর্ব থেকে বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী বছর পর্যন্ত। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান ঔপনিবেশিক শাসিত বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সংঘাত সংকটের দ্বার উন্মোচনে প্রসারিত এর কাহিনী। চরিত্রায়ণে শ্রেণি সচেতন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্বন্দ্ব জটিল বাস্তব সংগ্রামশীল পরিস্থিতিতে ব্যক্তির ক্রমবিকশিত রূপ প্রাধান্য পেয়েছে এখানে। উপন্যাসে ব্যক্তিগত আবেগ ও সংগ্রামের সমান্তরাল বিন্যাস লক্ষ করা যায়।

১১টি পরিচ্ছেদে ২টি পর্যায়ে কাহিনী ‘বৃত্ত’ অবলম্বন করা হয়েছে এ উপন্যাসে। প্রথম পর্যায়ে ১-৫ ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৬-১১ পরিচ্ছেদে যথাক্রমে সোমেন চন্দ ও মুনীর চৌধুরীর সমাজ রাজনীতির বহির্বাস্তবতার সঙ্গে দ্বন্দ্বময় ব্যক্তিসত্তার জীবন প্রক্রিয়া বিধৃত হয়েছে। তারই সঙ্গে লেখক অনুষঙ্গী চরিত্রপুঞ্জের ওপর রেখাপাত করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। এজন্য সোমেন চন্দ’র জীবন ব্যাখ্যানে স্বাভাবিক কারণেই তার বন্ধু ভূষণ, ভূষণের পরিবারের কাহিনী, স্কুল শিক্ষিকা বীণাদি ও পার্টিকর্মী জ্যোতিদার ব্যর্থ প্রেমের সম্পর্কের কাহিনী, আন্দামান ফেরত বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশি ও রণেশ দাশগুপ্তের রাজনৈতিক কর্মকা- এবং সোমেনের স্মৃতিময় মা, বাল্যসখী চন্দনার বিবরণ মূল কাহিনী সূত্রে সংযুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে মুনীর চৌধুরীর চরিত্র উন্মোচনে একই প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে।

পরিবার পরিজনহীন সোমেন ঢাকায় রেলের ড্রাইভার বন্ধু ভূষণের ব্যবস্থায় এক ঘুপচি ঘরে বাস করে, রেল কর্মী ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনের জন্য। পিতার আর্থিক সহায়তা প্রদানে ব্যর্থতার জন্য অসমাপ্ত পড়াশুনা ও বুকে অসুখের কষ্টকর ব্যথা নিয়ে সোমেন ভূষণের মা’র পাঠানো তিনবেলা খাবার খেয়ে কম্যুনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক কর্মী। যুবক সোমেন জানে — ‘সময় মতো শত্রুর গায়ে লাথি দিতে না পারলে; শত্রু ওর গলায় ফাঁস দেবে। ওর নিষ্ক্রিয়তাকে কম করে কাছে টানবে না। লাথি দিয়েই দাবিয়ে রাখতে চায়। শ্রমিকদের মধ্যে এই চেতনা ও ছড়িয়ে দিচ্ছে।’(পৃ ৫)

এই চেতনা ও আলোকরশ্মি ছড়ানোর জন্য সে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। তাই সে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষকে সজাগ করতেই ‘ইঁদুর’ গল্প রচনা করে। সতেরো বছর থেকে তার সাহিত্যচর্চার সূচনা। তারপর মার্ক্সীয় দর্শনে স্থিতধী সোমেন স্বপ্ন দেখে প্রকৃত সাহিত্যিক হওয়ার। গণমানুষের সাহিত্য রচনায় বিপ্লবের প্রসঙ্গ নিয়ে পত্র লেখে ‘সবুজ বাংলার কথা’র সম্পাদক নির্মল ঘোষকে। কিন্তু ইতোমধ্যে মানবসমাজের অভিশাপ ‘বিশ্বযুদ্ধ’ শুরু হয়। এর অভিঘাত এসে পৌঁছানোর পূর্বে সোমেন ব্যস্ত থাকে ‘প্রগতি পাঠাগার’ নিয়ে, কারণ — ‘প্রগতি পাঠাগার-এ নতুন লিখিয়েরা যোগদান করে বলে ওদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বদলে যাচ্ছে বিমল দা। ওরা বুঝতে পারছে যে শুধুমাত্র আত্মগত ভাবসৃষ্টি আর নয় এবার বস্তুগত সৃষ্টি করতে হবে। গণমানুষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। বঞ্চনা, শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। জানেন বিমল দা ওদের এই পরিবর্তন আমাকে ভীষণ আনন্দ দেয়।’(পৃ ২২) এই আনন্দের পিছনেও থাকে ‘বীণাদি’র জন্য কণ্ঠের কাছে আটকে থাকা ‘কান্নার দলা’।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গ উপন্যাসে প্রাধান্য পায় কারণ ঐ সময়ে উপমহাদেশের বামপন্থীরা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে ব্রিটিশদের সাহায্য না করায় বামদের কর্মকান্ড শিথিল হয়ে পড়ে। এ সময় তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকতে হয়। এজন্য উপন্যাসের ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ উদ্বোধন করার প্রসঙ্গ এসেছে। গণসাহিত্যে আগ্রহী সোমেনের উপন্যাসের প্লট বিবৃত থেকে তার সাহিত্যিক মানসের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে ৪র্থ পরিচ্ছেদে নির্মল ঘোষকে লিখিত দ্বিতীয় চিঠিতে। এ-কারণে বাস্তবে সে এক সাহেবের অত্যাচারের হাত থেকে রেলের কুলিকে বাঁচায় আর রচনা করে গল্প — ‘দাংগা’।

পঞ্চম পরিচ্ছেদে আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকার কম্যুনিস্ট পার্টির কর্মকাণ্ডের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। তাদের ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’ গঠন ও ‘ক্রান্তি’ সংকলন প্রকাশনা সোমেনের ক্রিয়াশীলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে জ্যোতিদা’র ক্ষয় রোগের জন্য বীণাদির জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হতে চাওয়া — তৎকালীন বামপন্থী কর্মীর মানবিক সম্পর্কের সঙ্গে আপস না করার মনোভাবটি প্রকাশিত। সে সূত্রে বীণার আত্মহত্যার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সোমেনের বিষণ্ণ প্রকাশভঙ্গি স্মরণীয়।

‘ঠাণ্ডা, ম্রিয়মান কণ্ঠে বলে। দ্প করে নিভে যায় ক্ষোভ। বাইরে যত কাজই করুক, ওর অন্তরটা বীণার ঘটনায় তোলপাড়। বুকের ভিতর একটা টগবগে ভাব অনবরত বুদ্বুদ তোলে। পুড়ে যায় শিরা উপশিরা।’ (পৃ ৫৩)

‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’র উদ্যোগে ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনের উদ্যোগ নেয়া হয়, শ্রমিকদের ঐকবদ্ধ প্রচেষ্টায় সর্বহারাদের বিপ্লবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্মের প্রত্যাশায়। কিন্তু এই প্রত্যাশায় সামিল হওয়া সত্ত্বেও ১৯৪২ সালের ৮ই মার্চ প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয় সোমেন। ‘নেমে আসে শোক, প্রতিটি মানুষের বুক এখন শোকার্ত পদাবলীর পংক্তি। সকলের চোখ অশ্রুসজল; সকলের কণ্ঠ নির্বাক, নিস্তব্ধ। প্রাঙ্গণজুড়ে বঙ্কিম বাবুর কণ্ঠ হা-হা করে।’ (পৃ ৫৭) মৃত্যু বর্ণনায় সেলিনা হোসেনের দক্ষতা লক্ষ করা যায়। তির্যক, ক্ষিপ্র গদ্যে সোমেনের মৃত্যু দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে। যে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে সোমেনের মৃত্যু হয়, তাদের প্রতিরোধ করার জন্য তার বন্ধু কিরণ, রণেশ প্রমুখের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ‘প্রতিরোধ’। কিন্তু সোমেন শূন্য রণেশের মুহূর্তগুলো নিঃসঙ্গ, শূন্য হয়ে পড়ে : ‘সোমেনের মৃত্যু ওকে ভিন্ন অভিধায় নিষিক্ত করেছে। ও এখন আর পিছু হটার কথা ভাবে না, চলা, এগিয়ে চলা। এখন থেকে কেবলই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে রাখা; কেবলই সবুজের উপাসনা।” (পৃ ৫৯)

এই এগিয়ে চলার মিছিলে একাত্ম হন মুনীর চৌধুরী। সোমেনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনে তরুণ মুনীর চৌধুরী প্রগতিশীল স্রোতে সংযুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যাহত প্রতিক্রিয়ায় বাংলায় দুর্ভিক্ষ শুরু হলে, জয়নুল আবেদিনের আঁকা ছবির প্রদর্শনী করা হয়। এতে মুনীর চৌধুরী নিজেকে আবিষ্কার করেন। ‘লাল নিশানের ঠিকানায়’ পৌঁছুতে চান তখন। তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলে তাঁকে নিজ হলের ছাত্রদের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়। অবশ্য একইসঙ্গে সন্ধ্যায় পার্টি অফিসে সত্যেন সেনের কাছে কৃষক আন্দোলনের কথা শুনে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন তিনি। অন্যদিকে নিঃসঙ্গ মুহূর্তে তাঁর অন্তরে স্মৃতিময় ‘লিলি’র মুখ ভেসে ওঠে। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাঁকে আবার জনতার মাঝে নিয়ে আসে। এজন্য সৃষ্টি হয় দাঙ্গাবিরোধী নাটক ‘মানুষ’। মুনীর চৌধুরীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণের সঙ্গেই সেলিনা হোসেন কালের গতির চিত্র অঙ্কন করেন। এজন্য পাকিস্তান সৃষ্টি ও ভাষা আন্দোলন উপন্যাসের উপাদান হয়ে যায়। অষ্টম পরিচ্ছেদে বাংলাদেশের মুনীর চৌধুরীর চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।

বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস — তেভাগা আন্দোলন, জয়নুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ মুনীরকে মানুষের অধিকার প্রশ্নে সচকিত করে তোলে যেমন, তেমনি নিরিবিলি গৃহকোণের জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠেন তিনি একইসঙ্গে। রাজশাহীর নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের ওপর তৎকালীন সরকারের পাশবিক অত্যাচার তাঁকে বিপর্যস্ত করে, সৃষ্টিশীল কাজের অনুপ্রাণনার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে তাঁর হৃদয়। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১মে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ২৬ তারিখে তাঁকে জেলে বন্দি করা হয়। রাজবন্দি মুনীর চৌধুরীর সংগ্রাম থেমে থাকে না। তিনি অজিত গুহের সাহচর্যে বাংলায় এম.এ পাস করেন। তিপান্নর একুশে পালনের জন্য রণেশ দাশগুপ্তের নাটক লেখার অনুরোধের প্রতিক্রিয়া সেলিনা হোসেন নিজেকে প্রত্যাহার করে এ চরিত্রের আন্তরক্ষরণে উন্মোচন করেছেন : ‘হ্যাঁ নাটক লিখতে হবে, অভিনয় করা যায় এমন ভাবেই পটভূমি তৈরি করতে হবে। বাহান্নোর ঘটনা নিয়েই তো লিখতে পারি? ও গরাদের শিকে মাথা ঠেকিয়ে ভাবতে থাকে।’ (পৃ ১২৭) শেষ বাক্যটিতে আবার সর্বজ্ঞ লেখকের প্রত্যাবর্তন সূচিত হয়।

ইতিহাসকে কালজয়ী করার জন্য মুনীর চৌধুরী ‘স্পষ্ট ছবিগুলো’ নিয়ে ‘কবর’ সৃষ্টি করেন। এই নাটকের সূচনাংশটুকু আলোচ্য উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়ে শেষ হয় ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’র দ্বিতীয় পর্ব। ‘এখনো শেষ হয়নি নাটক, মুনীর চৌধুরী লিখছে, আর অল্প বাকি। বাহান্নোর একুশের পটভূমিতে রচিত হচ্ছে নাটক। জেলখানার ঘণ্টা ঢং ঢং করে জানিয়ে যায় সময়। থেমে থেমে ঘণ্টা বাজে। লেখা থামে না, কলমে এখন যাদুর প্রদীপের ঘষা; একটা শিল্পিত দৈত্য বেরুচ্ছে। রচিত হচ্ছে মুনীরের কবর।’ (পৃ ১৩৩)

সোমেনের উত্তরসূরি মুনীর চৌধুরী এভাবে ইতিহাসে ঠাঁই নেন। সেলিনা হোসেন ইতিহাসে স্বীকৃত এই মানুষের জীবন চিত্রণে সচেতন, সত্যসন্ধানী ও আত্মসত্তা অন্বেষণে অন্বিষ্ট, রাজনৈতিক অভিজ্ঞানে সিদ্ধ। উপন্যাসের শিল্প উপকরণ যেমন আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তাঁদের কালপ্রবাহ, ঐ নির্দিষ্ট সময়। সরল প্লটে সংহত বর্ণনায় তীক্ষ্ণ সংলাপে সেলিনা হোসেন ব্যতিক্রমী শিল্প আঙ্গিকের জন্ম দিয়েছেন ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’তে। সোমেনের I will not rest I can মুনীর চৌধুরীর I am not what I am আবৃত্তি সোমেনের দাঙ্গা নিয়ে গল্প এবং দাঙ্গা নিয়ে মুনীর চৌধুরীর নাটক রচনা এভাবে মেলবন্ধনে এই উভয় চরিত্রকে উপস্থাপনে ঔপন্যাসিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’তে অনুসৃত হয়েছে দৃশ্যাত্মক, নাটকীয় ও সংলাপ নির্ভর পরিচর্যা। যেমন — ‘লাশকাটা ঘরে সোমেনের লাশ। পুরোনো ঘর রক্তে ভরে গেছে, রক্ত এসে জমেছে বাইরের সিঁড়ির ওপর। বাম বাহু এখনো আগের মতই সুডোল। নিটোল সুপুষ্ট শরীরটা ক্ষতবিক্ষত; বীভৎস।’(পৃ ৫৭) অন্যত্র :

‘আচ্ছা সরলা, বীণাদি মরলো কেন?

জানি না।

বেঁচে থাকা কি বীণাদি’র জন্য এতই কষ্টের ছিলো?

জানি না।

ভালোবাসা কি মানুষকে এমন পাগল করে দেয়?

জানি না।

কেবল জানি না, জানি না, শুয়োর কোথাকার।’(পৃ ৫৩)

অন্যদিকে এই উপন্যাসে ‘পত্র’ ব্যবহার এবং প্লটে গল্প ও নাটকের হুবহু উপস্থাপন ও ঐতিহাসিক তথ্যের সন তারিখের উল্লেখ বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মূলত ১৯৪৮ এর দেশবিভাগ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রত্যয়দৃপ্ত বাঙালি জাতির রাজনৈতিক সংগ্রাম ইতিহাসকে রূপায়ণ করেছেন সেলিনা হোসেন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে ইতিহাসের ঘণ্টাধ্বনিতে রূপায়িত করার দক্ষতা রয়েছে লেখকের। মৃত্যু ও নির্যাতনের মধ্যে ইতিহাসের এই ঘণ্টাধ্বনি অমর।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ email-drmiltonbiswas1971@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন