সোমবার | ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:০০
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটির অনবদ্য সুরঞ্জলি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী : ফারজানা নাজ শম্পা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলা চলচ্চিত্রের সৃষ্টি লগ্ন থেকে ক্রমবিকাশের ধারা : মনোজিৎকুমার দাস

মনোজিৎকুমার দাস / ১১৭৭ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২ নভেম্বর, ২০২৩

চলচ্চিত্র বিনোদনের শক্তিশালী মাধ্যম। বিনোদন ছাড়াও চলচ্চিত্র শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ সামাজিকতার উন্নতি করতে বিশেষ অবদান রেখে থাকে। ভাল মানের চলচ্চিত্র মানুষের চিন্তা চেতনা বিকাশে সহায়তা করে। চলচ্চিত্র আমাদের ভাবায়, ভাবতে বাধ্য করে, ভাবতে শেখায়। বদলে দেয় জীবনযাত্রার দৃশ্যপট।

চলচ্চিত্র বা সিনেমা নির্মানের ইতিবৃত্ত জানার জন্য আমাদেরকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়। একটা যুগ ছিল চলচ্চিত্র ছিল নির্বাক। তখন একে বলা হতো বায়োস্কোপ। বায়োস্কোপের ছবি ছিল নির্বাক। তারপর এক সময় নির্বাক বায়োাস্কোপ সবাক হয়ে চলচ্চিত্র বা সিনেমায় রূপান্তরিত হল। সে কথায় আমরা পরে আসবো।

কলকাতায় যে বায়োাস্কোপ কোম্পানি গঠিত হয়, তার মূল ভূমিকায় বাঙালিরা ছিল। ঢাকা জেলার বর্তমানের মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরী গ্রামের হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭) দ্য রয়েল কোম্পানি গঠন করে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনী শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে সালে প্রতিষ্ঠিত এই দ্য রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানিই বাঙালির প্রথম চলচ্চিত্র-প্রচেষ্টা। অবিভক্ত বাংলার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও হীরালাল সেনের নাম স্বীকৃত। বিভিন্ন স্থানে অভিনীত নাটকের খন্ডিত অংশের চিত্রায়ণ করে ১৯০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ক্ল্যাসিক থিয়েটারে প্রদর্শন করেন। সেই সময়ের ‘সীতারাম’, ‘আলীবাবা’, ‘দোললীলা’, ‘ভ্রমর’, ‘হরিরাজ বুদ্ধ’ প্রভৃতি জনপ্রিয় নাটক পরিবেশনার গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ বিশেষ অংশ ক্যামেরায় ধারণ ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রদর্শন করে তিনি বাঙালির চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রবল সম্ভাবনার দরজা খুলে দেন।

ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন পূর্ববঙ্গে প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয় কলকাতার ব্রেডফোর্ড বায়োস্কোপ কোম্পানির উদ্যোগে ১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল বর্তমান ভোলা জেলার তৎকালীন এসডিওর বাংলোতে। ১৭ এপ্রিল বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয় ঢাকায় পাটুয়াটুলীর ক্রাউন থিয়েটার হলে। এই সব চলচ্চিত্রের মধ্যে ছিল মহারানী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি মিছিল, গ্রিস ও তুরস্কের যুদ্ধ, রাশিয়ার সম্রাট জারের অভিষেক, পাগলা নাপিতের ক্ষৌরকর্ম, সিংহ ও মাহুতের খেলা, ইংল্যান্ডের তুষারপাতে ক্রীড়াইত্যাদি ইত্যাদি। নির্বাক যুগেও এই চলচ্চিত্র দেখার জন্য সাধারণ দর্শকের টিকেটের ব্যবস্থা ছিল। নির্বাক যুগের সিনেমা বায়োস্কোপ প্রদর্শনের হিড়িক পড়ে যায় ঢাকা সহ ঢাকার আশপাশে। তৎকালীন দর্শকদের নির্বাক বায়োস্কোপ দেখার আগ্রহের প্রমাণ তুলে ধরার জন্য কোথায় কোথায় বাংদেশের প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয়েছিল তার একটা ফিরিস্তি তুলে ধরলে বর্তমানের সিনেমার পূর্বতন সংস্করণ এর জনপ্রিয়তা প্রমাণ মেলে। ঢাকার পাটুয়াটুলী ছাড়াও বর্তমানের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যা ছিল সাবেক কালে জগন্নাথ কলেজ, ভিক্টোরিয়া পার্ক বা বাহাদুর শাহ পার্ক, আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার বাইরে বর্তমানের মানিকগঞ্জ জেলা আর তৎকালীন মানিকগঞ্জ মহকুমার বগজুরি গ্রামে, বর্তমানের গাজীপুর জেলা তৎকালীন জয়দেবপুরের ভাওয়াল এস্টেটের রাজপ্রাসাদে, বর্তমানের শরিয়তপুর জেলার পালং-এ প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শন হয়। অন্যদিকে, ১৯০০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে কয়েক দিন ব্যাপী রাজশাহী শহরের বোয়ালিয়া জমিদার শরৎকুমার রায়ের বাড়িতে বায়োস্কোপ দেখানো হয়। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা হল পিকচার হাউজের ইতিহাসের কথা ১৯১৩-১৪ সালে ঢাকার আরমানিটোলার পাটের গুদাম থেকে নিয়িমিতভাবে বায়োাস্কোপ প্রদর্শনীর শুরু হয় তাই এক সময় পিকচার হাউজে রূপান্তরিত হয়, পরে একে শাবিস্তান হল নামকরণ করা হয়।

উপমহাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মানের ক্ষেত্রে দাদাসাহেব গোবিন্দ ফালকে’র নাম করতে হয়। ১৯১৩ সালে তাঁর নির্বাক চিত্র‘ রাজা হরিশ্চন্দ্র’ মুক্তি পায়। দাদাসাহেব গোবিন্দ ফালকে হলেন উপমহাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের নির্মাতা হিসাবে ধরা হয়।

অন্যদিকে, পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মানের ক্ষেত্রে বাঙালিরাও পিছিয়ে ছিলেন না। ১৯১৬ সালে কলকাতায় ম্যাডান থিয়েটার্স কোম্পানির পক্ষ থেকে জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত প্রথম বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’ মুক্তি পায়। তবে তা ছিল নির্বাক চলচ্চিত্র। ১৯২১ সালে কলকাতায় ‘বিলাত ফেরত’ নামে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। ‘বিলাত ফেরত’ সবাক সিনেমার প্রযোজক ও অভিনেতা ছিলেন বাংলাদেশের বরিশাল জেলার ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

তৎকালীন পূর্ব বঙ্গ তথা বাংলাদেশ সে সময় চলচ্চিত্র নির্মাণে পিছিয়ে থাকে না। ১৯২৭-২৮ সালে ঢাকায় প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। নওয়াব পরিবারের কয়েকজন তরুণ সংস্কৃতিসেবী নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘সুকুমারী’। ‘সুকুমারী’’র পরিচালক ছিলেন জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন ক্রীড়াশিক্ষক অম্বুজপ্রসন্ন গুপ্ত। চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা ছিলেন খাজা নসরুল্লাহ ও সৈয়দ আবদুস সোবহান। উল্লেখ্য তখন নারীদের অভিনয়ের রেওয়াজ চালু হয়নি। নাট্যমঞ্চের নারীচরিত্রেও পুরুষেরাই অভিনয় করতেন। সে সময় নওয়াব পরিবারের উদ্যোগে ঢাকায় ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি স্থাপিত হয়। ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি’র প্রযোজনায় অম্বুজপ্রসন্ন গুপ্ত নির্মাণ করেন নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’। খাজা আদিল, খাজা আজমল, খাজা শাহেদ, খাজা নসরুল্লাহ, খাজা আকমল, শৈলেন রায় বা টোনা বাবু ছিলেন এই চলচ্চিত্রের অভিনেতা। তবে এবার এতে নারীচরিত্রে নারীরাই অংশ গ্রহণ করেন।। নায়য়িকা চরিত্রে ছিলেন লোলিটা বা বুড়ি নামের এক বাইজী।দেববালা বা দেবী, চারুবালা নামের আরও দুই বাইজী এতে অভিনয় করেন। হরিমতি নামে একজন অভিনেত্রীও এতে অভিনয় করেন। ১৯৩১ সালে ‘দ্য লাস্ট কিস’ চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। ঢাকার মুকুল হলে যা পরে আজাদ হল নামে খ্যাত হয়। ‘দ্য লাস্ট কিস’ এর প্রিমিয়ার শো উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার (১৮৮৮-১৯৮০)। তিনি ১৯৩৬ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ওবায়েদ-উল হক‘ দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ (১৯৪৬) প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন হিমাদ্রী চৌধুরী ছদ্মনামে। কলকাতায় চলচ্চিত্রটি নির্মিত হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাংলাদেশী কোনও মুসলিম পরিচালকের হাতে নির্মিত এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র। উদয়ন চৌধুরী ছদ্মনামে ইসমাইল মোহাম্মদ নির্মাণ করেন ‘মানুষের ভগবান’ (১৯৪৭) চলচ্চিত্রটিও। দেশভাগের পরে এঁরা ঢাকায় ফিরে আসেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ সৃষ্টি করেন। রাজধানী ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য প্রযোজনা-পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান এবং স্টুডিও নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয়। নাজীর আহমদ (১৯২৫-১৯৯০) ১৯৪৮ সালে ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন, যা বাংলাদেশ-ভূখন্ডের প্রথম নির্মিত তথ্যচিত্র।বায়ন্ন’র ভাষা আন্দোলনের পরের বছর বছর ১৯৫৩ সালে সরকারি প্রচারচিত্র নির্মাণের জন্য জনসংযোগ বিভাগের অধীনে চলচ্চিত্র ইউনিট গঠিত হয়। প্রামাণ্য চিত্র ‘সালামত’ ১৯৫৪ সালে ওখান থেকে নাজীর আহমদের পরিচালনায় নির্মিত হয়। নবারুণ (১৯৬০) নামের একটি প্রামাণ্য চিত্র। ‘নতুন দিগন্ত ’নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন নাজীর আহমদ।

উল্লেখ্য,নাজীর আহমদ ছিলেন একাধারে অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, বেতারকর্মী ও লেখক। বেতারকর্মী হিসাবে এক সময় বিবিসিতেও কর্মরত ছিলেন। ১৯৫৫ সালে নাজীর আহমদের উদ্যোগে ঢাকায় প্রথম ফিল্ম ল্যাবরেটরি এবং স্টুডিও চালু হয়।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা শুরু হলে ’৪৭-এর দেশবিভাগোত্তর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৬ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ঢাকায় ১৯৫৬ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়। আব্দুল জব্বার খান পরিচালিত মুখ ও মুখোশ বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম স্থানীয়ভাবে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র হিসাবে বিবেচিত হয়। ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৬ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।

১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আব্দুল জব্বার খান পরিচালিত মুখ ও মুখোশ বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম স্থানীয়ভাবে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র। ‘মুখ ও মুখোশ’ বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম স্থানীয়ভাবে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র। ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটি পরিচালনা করেন আব্দুল জব্বার খান। ইকবাল ফিল্মস্ এই ছবিটি অর্থায়ন ও চিত্রায়নে সহায়তা করে। চলচ্চিত্রটি ১৯৫৬ সালের আগস্ট ৩ তারিখে মুক্তি পায়। ছবিটির প্রথম প্রদর্শনী হয় মুকুল প্রেক্ষাগৃহে, যা পরে আজাদ প্রেক্ষাগৃহ। এটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ এবং খুলনায় একযোগে মুক্তি পায়। সেই অঞ্চলের প্রথম চলচ্চিত্র হিসাবে দর্শকমহলে এটি নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। ‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমার পরিচালক নিজেই নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। নায়িকার চরিত্রে ছিলেন চট্টগ্রামের পূর্ণিমা সেনগুপ্ত। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন ইনাম আহমেদ, জহরত আরা, পিয়ারী বেগম, রহিমা খাতুন, বিলকিস বারী, আমিনুল হক প্রমুখ। ‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমার চিত্রনাট্য — বিপ্রদাশ ঠাকুর চিত্র গ্রহণ — জামান, উপদেষ্টা কাজ করেছিলেন মুরারী মোহন, অঙ্গসজ্জা — শ্যাম বাবু ওরফে নাম শমসের আলী, সংগীতে কন্ঠ দেন আবদুল আলীম এবং মাহবুবা হাসনাত,সঙ্গীত পরিচালক — সমর দাস, সহকারী সঙ্গীত পরিচালক — ধীর আলী, শব্দ গ্রহণ — মইনুল ইসলাম প্রমুখ।

১৯৫৪ সালে ইকবাল ফিল্মস এবং কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স লিমিটেড গঠিত হয়। ইকবাল ফিল্মস-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আবদুল জব্বার খান, মোহাম্মদ মোদাব্বের, মহিউদ্দিন, কাজী নুরুজ্জামান, শহীদুল আলম প্রমুখ। অন্যদিকে, কবি জসীমউদ্দীন, ড. আবদুস সাদেক, দলিল আহমদ, আজিজুল হক, দুদু মিয়া, সারওয়ার হোসেন, কাজী খালেক, প্রমুখ ছিলেন কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স লিমিটেডের সঙ্গে। এখানে উল্লেখ্য দলিল আহমেদের পুত্র বুলবুল আহমেদ এবং দুদু মিয়ার পুত্র আলমগীর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে এক সময় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। প্রসঙ্গত, ১৯৫৪ সালে ইকবাল ফিল্মসের ব্যানারে এই ভূখন্ডের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কাজ শুরু করেন আবদুল জব্বার খান। সিনেমা শিল্পে আবদুল জব্বার খান পরিচালিত ‘মুখ ও মুখোশ’ হিসাবে বিবেচিত। উল্লেখ্য বাংলাদেশের পূর্বপাকিস্তান কালপর্বে আবদুল জব্বার খান পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর চিত্রনাট্য তৈরি হয় আবদুল জব্বার খান লেখা ‘ডাকাতের কাহিনী’ অবলম্বনে। ‘মুখ ও মুখোশ’-এর চলচ্চিত্রে পেশাদারিত্বের ছাপ না থাকালেও কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কাহিনী দু’এক কথায় তুলে ধরা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলে মনে করি। কাহিনীটি এমন: গ্রামের এক জোতদার বাবার এক সন্তান ঘটনাক্রমে ডাকাতদলের খপ্পরে পড়ে তাদের মতো বেড়ে উঠে। আরেক ছেলে পড়ালেখা করে পুলিশ হয়। কিন্তু ডাকাতদলের সঙ্গে পুলিশের সখ্য ছিল। ভাই-ভাই পরিচয় না জানলেও ডাকাত-পুলিশ সম্পর্ক ছিল। এক পর্যায়ে ডাকাত ছেলে তার সর্দারকে খুন করে। গ্রেফতার হয় অসৎ পুলিশ। কাহিনীর পরিণতি বাবার কাছে দুই ছেলেকে ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে।

১৯৫৭ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নযয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি) প্রতিষ্ঠিত হলে এর সহযোগিতায় ১৯৫৯ সালে থেকে প্রতিবছর চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে। এফডিসি ছাড়াও পপুলার স্টুডিও, বারী স্টুডিও এবং বেঙ্গল স্টুডিও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পরিস্ফুটনে বিরাট ভূমিকা পালন করে। প্রসঙ্গত বলতে হয় তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের সিনেমাহলগুলোতে ভারতীয় ও পশ্চিম পাকিস্তানের বাংলা, উর্দু ছবি প্রদর্শিত হতো।

ঢাকায় এফডিসি স্থাপিত হলে চলচ্চিত্র নির্মাণের দ্বার উন্মোচিত হয়। সে সময় একদল সিনেমা নির্মাতা ঢাকার নবনির্মিত এফডিসি ভাল মানের চলচ্চিত্র নির্মানে আগ্রহী হন। ফতেহ লোহানী, এহতেশাম, মহিউদ্দিন প্রমুখ সে সময়ের চলচ্ছিত্র ব্যক্তিত্ব হিসাবে বিশেষভাবে খ্যাতিমান হন। ১৯৫৯ সালে ফতেহ লোহানীর ‘আকাশ আর মাটি’, এহতেশামের ‘এদেশ তোমার আমার’ মহিউদ্দিনের ‘মাটির পাহাড়’ এই তিনটি বাংলা চলচ্চিত্র বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়।

ঢাকার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ মুখ ও মুখোশ ’এর পরিচালক আবদুল জব্বার খান ‘জোয়ার এলো’ (১৯৬২), ‘নাচঘর’ (উর্দু ১৯৬৩), ‘বাঁশরী’ (১৯৬৮), ‘কাচ কাটা হীরা’ (১৯৭০) ও ‘খেলারাম’ (১৯৭৩) নির্মাণ করে চলচ্চিত্রশিল্পে তাঁর অবদানের স্বাক্ষর রাখেন। তিনি ‘উজালা’ নামে একটি চলচ্চিত্রও প্রযোজনা করেন। ষাটের দশকে সালাহ্উদ্দিনের ‘য নদী মরূপথে’ (১৯৬১), ‘সূর্যস্নান’ (১৯৬২) ও ‘ধারাপাত’ (১৯৬৩) প্রভৃতি সামাজিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।

ঢাকার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পরিচালক আবদুল জব্বার খানের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি নানা সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর পাওয়া সম্মান ও পুরস্কারের বিবরণ এখানে তুলে ধরা অপ্রসঙ্গিক হবে না বলে মনে করি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান হিসেবে আবদুল জব্বার খান কাজ করেন। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য তিনি বাচসাস পুরস্কার, এফডিসি রজত জয়ন্তী পদক, উত্তরণ পদক, হীরালাল সেন স্মৃতি পদক, বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সম্মান পদক, ফিল্ম আর্কাইভ সম্মান প্রতীক ও রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি সম্মান পদক লাভ করেন। বাংলাদেশে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের এই পথিকৃৎ সম্মানার্থে এফডিসি-তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আবদুল জব্বার খান পাঠাগার।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় যে কয়েকজন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিমান অভিনেতা ও চিত্রপরিচালক সে সময় সিনেমা নির্মানে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন তাদের মধ্যে ফতেহ লোহানী (১৯২০-১৯৭৫) এর নাম করতে হয়। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তিনি অগ্রণী অভিনেতা ও চিত্রপরিচালক। ঢাকা থেকে ১৯৪৯-এ মাসিক সাহিত্য পত্রিকা অগত্যা প্রকাশে তিনি প্রধান ভূমিকা রাখেন। ওই বছরই তিনি যোগ দেন করাচি বেতারে, পরে বিবিসি-তে যোগদান করেন ১৯৫৪ সালে ঢাকায় ফিরে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িত হন, পাশাপাশি বেতার অনুষ্ঠান, অভিনয় এবং লেখালেখিতেও অংশ নেন। পরিচালনা ছাড়াও তিনি বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র‘ রাজা এলো শহরে’ (১৯৬৪)। ওই বছর তিনি সৈয়দ শামসুল হক পরিচালিত ‘ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো’ উর্দু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।

১৯৬০ সালের ৪ নভেম্বর আসিয়া চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রতে সুমিতা দেবী-প্রবীর কুমার জুটি অভিনয় করেন। এ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ১৯৬০ সালে শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ও পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সম্মানজনক নিগার পুরস্কার লাভ করেন।

ফতেহ লোহানী অভিনীত অন্যান্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘মুক্তির বন্ধন’ (১৯৪৭), ‘তানহা’ (১৯৬৪), ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘ফির মিলেন্দে হাম দোনো’ (১৯৬৬), ‘আগুন নিয়ে খেলা ’(১৯৬৭), ‘দরশন’ (১৯৬৭), ‘জুলেখা’ (১৯৬৭), ‘এতটুকু আশা’ (১৯৬৮) ‘মোমের আলো’ (১৯৬৮), ‘মায়ার সংসার’ (১৯৬৯), ‘মিশর কুমারী’ (১৯৭০), ‘তানসেন’ (১৯৭০) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, বেতারকর্মী ও লেখক নাজীর আহমদের কথা আগেই বলা হয়েছে। নাজীর আহমদের কাহিনী থেকেই ফতেহ লোহানী নির্মাণ করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘আসিয়া’ ছবিটি তৈরি করেন। ১৯৫৯ সালে আখতার জং কারদার পরিচালিত উর্দুচলচ্চিত্র জাগো হুয়া সাভেরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরপদ্মানদীর মাঝির কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত। এটি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পুরস্কৃত ও আলোচিত হলেও বাণিজ্যিকভাবে এটি সাফল্য অর্জন করেনি। এই চলচ্চিত্রের প্রধান সহাকারী হিসেবে কাজ করেন জহির রায়হান।

ঢাকাই সিনেমায় ষাটের দশকের মাঝামাঝি লোককাহিনী নিয়ে ছবি করার হিড়িক পড়ে। বাংলা চলচ্চিত্রের দুর্দিনের কান্ডারী হিসেবে আবির্ভুত পরিচালক ও প্রযোজক সালাহউদ্দিনের প্রথম লোককাহিনী ভিত্তিক সিনেমা ‘রূপবান’ ১৯৬৫ সালের ৫ নভেম্বর মুক্তি পায়। ‘রূপবান’ সিনেমা মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সময়ের বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। কুষ্টিয়ার মেয়ে তন্দ্রা মজুমদার এই সিনেমার মাধ্যমে সুজাতা নামে আত্মপ্রকাশ করে ‘রূপবান’ নাম ভুমিকায় অভিনয় করেন। রূপবান এ অভিনয় করে নায়িকা সুজাতা রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে উঠেন এবং রূপবান কন্যা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সত্য সাহা’র সংঙ্গীতায়নে আব্দুল আলীম ও নীনা হামিদের দরদী কন্ঠে গাওয়া ‘রূপবান’ সিনেমার গান মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। ফলে ‘রূপবান’ হয়ে উঠে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে সর্বপ্রথম ‘সুপার হিট’ সিনেমা। ‘রূপবান’ এ অভিনয় করেন সুজাতা, মনসুর, চন্দনা, সিরাজুল ইসলাম, ইনাম আহাম্মদ, আনোয়ার হোসেন, সুভাষ দত্ত ও অন্যান্য, কন্ঠশিল্পীঃ নীনা হামিদ, আব্দুল আলীম, ইসমত আরা, কুসুম হক, নজমুল হোসেন। সঙ্গীত পরিচালকঃ সত্য সাহা। চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনাঃ সালাহউদ্দিন।

রূপবান সিনেমার দর্শকপ্রিয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক চিত্রপরিচালকই লোক কাহিনীর সিনেমা তৈরী শুরু করেন। একে একে তৈরী হয় মধুমালা, গুনাই বিবি, মহুয়া, কাঞ্চনমালা, সাত ভাই চম্পা, বেহুলা, আলোমতি, অরুন বরুন কিরনমালা, রাখাল বন্ধু ইত্যাদি।। ‘রূপবান’ সিনেমার শিল্পমান নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও বাংলা চলচ্চিত্রের উত্থানকে বেগবান করতে এর ভুমিকা অনস্বীকার্য। সেইযুগে ‘রূপবান’কে যেমন ত্রাতা হিসেবে পেয়েছি, আজও হয়তো সিনেমা হল বিমুখ গ্রামীন জনগনকে হলমুখী করতে ত্রাতা হিসেবে প্রয়োজন আরেকটি ‘রূপবান’ দরকার বলে মনে করি।

ষাটের দশকে জহির রায়হান খ্যাতিমান পরিচালক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৬৬ সালে জহির রায়হান বাংলার প্রচলিত লোককাহিনী ও হিন্দু পুরাণ মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনী অবলম্বনে বেহুলা চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। এতে তিনি চাঁদ সওদাগরের ভূমিকায় অভিনয় করেন।

জহির রায়হান আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে জয়বাংলা ধ্বানিতে উদ্দীপ্ত ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে সাধারণ জনমানসকে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭০ সালে ছাত্রাবস্থায় রাজশাহীর বর্ণালী সিনেমা হলে জহির রায়হান ‘জীবন থেকে নেয়া’ জ্বালাময়ী বইটি দেখার স্মৃতি আজও আমার চিরজাগরুক হয়ে আছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানী সরকার ‘ জীবন থেকে নেয়া’ ছাড়পত্র দিতে নারাজ হলেও সংগ্রামী জনতার চাপে এক পর্যায়ে বইটি রিলিজ করতে বাধ্য হয়। বর্ণালীর প্রখম শোতেই ‘ জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি সৌভাগ্য হয়। তখন রাজশাহী শিক্ষা নগরী। বইটি চলাকালে দর্শকের বসা সব ছাত্রছাত্রী মুহুর্মুহু জয়বাংলা স্লোগানে পুরো হলটিকে স্বাধীনতার গক্ষে উদ্দীপ্ত করে তোলে।

উল্লেখযোগ্য, ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমা শেষ হয়েছিল ‘মুক্তি’ নামের এক নবজাতকের জন্মের মধ্য দিয়ে এবং সিনেমার মুক্তির মাত্র এক বছরের মধ্যেই পাকিস্তানিদের শৃঙ্খল থেকে আমরাও মুক্তি পেয়েছিলাম; সেটা ছিল বহু ত্যাগের, বহু রক্তের, বহু সংগ্রামের মাধ্যমে প্রাপ্ত মুক্তি। জহির রায়হান ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো’ গানটি জহির রায়হান সরাসরি একুশের প্রভাত ফেরি থেকে ধারন করেন। ১৯৬৯-৭০ সালের আইয়ুব বিরোধী তথা স্বৈরাচারী শাসন বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ, সাংস্কৃতিক কর্মক বিভিন্ন বেড়াজালে আবদ্ধ — এমন পরিবেশে একনায়কের শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, সাংস্কৃতিক অধিকারের কথা বলছেন। প্রতিবাদস্বরূপ, ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাতে ব্যবহার করছেন রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি প্রথমবারের মত কোন ছবিতে দেখানো হয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) এর পর জহির রায়হান একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর বহির্বিশ্বের চলচিত্রের সাথে প্রতিযোগীতা করার মত ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ (১৯৭০) (অসমাপ্ত), ‘স্টপ জেনোসাইড’ (১৯৭১) ও ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ (১৯৭১) নির্মাণ করেন।

জহির রায়হান কত বড় শক্তিমান পরিচালক ছিলেন তার প্রমাণ মেলে ‘স্টপ জেনোসাইড’ (অসমাপ্ত) তৈরির সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে। একাত্তরের মে মাসের শেষ দিকে জহির রায়হান ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। আবার ওই সময়েই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর স্বল্প-দৈর্ঘ্যের প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করা হবে। এদেরকে ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের চলচ্চিত্র’ নামে অভিহিত করা হবে। উপরোক্ত ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছিল সেই সিরিজের প্রথম পর্ব। জহির রায়হান যে শুধু গণহত্যা কিংবা নির্যাতিত মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখিয়েছেন তা না, তিনি মুক্তিকামী মানুষের মুক্তি জন্যে প্রতিরোধ যুদ্ধটাকেও তুলে এনেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এর দৃশ্য নিয়েছেন, অবশ্যই সেটা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের, কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে এই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে তিনি পৃথিবীর আপামর মুক্তিকামী মানুষ ও তাদের আন্দোলন থেকে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেন নি। আমাদের এই মুক্তিসংগ্রামকে তিনি দেখেছিলেন দুনিয়া জুড়ে সব মুক্তিসংগ্রামের অংশ হিসেবে। এ সিনেমা সম্পর্কে একজন সমালোচকের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য, ‘স্টপ জেনোসাইড’ গণহত্যা বিরোধী, মানবাধিকারের পক্ষে এক সুতীব্র, শিল্পিত দলিল।’ এ সিনেমা সম্পর্কে একজন সমালোচকের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য, ‘স্টপ জেনোসাইড’ গণহত্যা বিরোধী, মানবাধিকারের পক্ষে এক সুতীব্র, শিল্পিত দলিল।’

‘যে নদী মরু পথে ও কখনো আসেনি’ (১৯৬১), ‘সোনার কাজল’ (১৯৬২, কলিম শরাফী সহযোগে), ‘কাচের দেয়াল’ (১৯৬৩), ‘সঙ্গম’ (উর্দু ১৯৬৪), ‘বাহানা’ (উর্দু, ১৯৬৫) এই সময়েরর উজ্জ্বল সৃষ্টি। উর্দু চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকেও তিনি আবার চোখ ফেরালেন লোকজ কাহিনীর দিকে। এরপর তিনি আনোয়ারা (১৯৬৭) নির্মাণ করেন।

ষাটের দশকের অপর একজন খ্যাতিমান পরিচালকের নাম করা যায়, তিনি হচ্ছেন খান আতাউর রহমান (১৯২৯-১৯৯৭)। তিনি ছিলেন একাধারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পরিচালক, অভিনেতা, কাহিনীকার, কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার। তাঁর পরিচালিত ‘রাজ সন্ন্যাসী’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘সুজন সখী’, ‘দিন যায়’ ‘কথা থাকে’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘এখনও অনেক রাত’ প্রভৃতি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃত-স্বরূপ তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও পাকিস্তান, মস্কো এবং তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার লাভ করে।

সুভাষ দত্ত বাংলাদেশের সিনেমা জগতের খ্যাতিমান পরিচালক। তাঁর পরিচালিত ‘সুতরাং’ মিষ্টি প্রেমের সুপার হিট ছবি। ‘সুতরাং’ ১৯৬৪ সালের ২৩শে এপ্রিল সারাদেশে মুক্তি পায়। এই হিট ছবির নায়িকা হিসাবে কবরী আত্মপ্রকাশ।

সুভাষ দত্ত অভিনীত উল্লেখযোগ্য অন্যান্য ছবিগুলো হল ‘রাজধানীর বুকে’, ‘সূর্যস্নান’, ‘চান্দা’, ‘তালাশ’, ‘নতুন সুর’, ‘রূপবান’, ‘মিলন’, ‘নদী ও নারী’,‘ ভাইয়া’ ইত্যাদি। অন্যদিকে তার পরিচালিত ছবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল — ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘আবির্ভাব’, ‘বলাকা মন’, ‘সবুজ সাথী’, ‘বসুন্ধরা’, ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘ডুমুরের ফুল’ ইত্যাদি।, তার হাত ধরেই চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে কবরী, সুচন্দা, উজ্জল, শর্মিলী আহমেদ, ইলিয়াস কাঞ্চন প্রমুখের। ১৯৭৭ সালে ‘বসুন্ধরা’ ছবিটির জন্য পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান সুভাষ দত্ত। তিনি ১৯৯৯ সালে একুশে পদক লাভ করেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের সৃষ্টি লগ্ন থেকে ক্রমবিকাশের ধারা এক সময় মুখ থুবড়ে পড়ে। কালের পরিক্রমায় এক সময় সিনেমায় সংকট দেখা দেয়। সে কথা অন্য একটা লেখায় আলোচনা করবো।

মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন