বাঘা যতীন (১৮৭৯-১৯১৫) ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম জীবনদানকারী স্বাধীনতা সংগ্রামী। বাবা-মায়ের দেয়া নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, আর ডাক নাম জ্যোতি। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার সাধুহাটির রিশখালি গ্রামে। বাবার নাম উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আর মায়ের নাম শরৎশশী দেবী। তাঁর জন্ম কুষ্টিয়া জেলার গড়াই নদীর তীরের মাতুলালয় কয়া গ্রামে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে যতীন্দ্রনাথের পিতার মৃত্যু হলে তাঁর বিধবা মা শরৎশশী দেবী যতীনকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য মামার বাড়ি কয়াতে পাঠিয়ে দেন। পরে তিনিও যতীনের বড়দিদি বিনোদবালাকে নিয়ে কয়া চলে আসেন।
যতীন্দ্রনাথের শৈশব ও কৈশোর কাটে গড়াই নদীর তীরের মনোরম পরিবেশে। তাঁর বড় মামা আইনজীবী বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অভিভাবকত্বে যতীন বড় হতে থাকেন। কয়াতে থাকাকালে যতীন্দ্রনাথ ব্যায়াম, খেলাধুলো, গড়াই নদীতে সাঁতার কাটা, ঘোড়ায় চড়া এবং সমাজসেবা মূলক কাজে পারদর্শি হয়ে উঠেন। তিনি তাঁর মায়ের প্রেরণায় ভয়কে জয় করার সাহস লাভ করেন।
যতীন্দ্রনাথ থেকে বাঘা যতীন হবার ঘটনার মধ্যে তাঁর সাহসিকতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর পাওয়া যায়। জানা যায়, ১৯০৬ সালের মার্চ মাসে যতীন কয়া গ্রামে মানুষ খেকো বাঘের অত্যাচারের হাত থেকে গ্রামবাসীদের রক্ষা করতে গিয়ে প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় তিনি বাঘটির মুখোমুখি পড়ে যান। দীর্ঘক্ষণ বাঘে মানুষে লড়াইয়ের শেষে একটা ছোড়া (ভোজালি) দিয়ে বাঘটিকে মেরে ফেলেন। নরখাদক একটা বাঘকে প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় মেরে ফেলার খবরে দেশবাসী তাকে বাঘা যতীন নামে অভিহিত করে।

তিনি লেখাপড়া করেন কৃষ্ণনগরের এ ডি স্কুলে। ১৮৯৮ সালে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজে ভর্তি হন। কলকাতায় এস তাঁর লেখাপড়ায় যতটা আকর্ষণ ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণ ছিল দেশের কাজে।
পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশের শৃঙ্খল মোচনের জন্য বাঘা যতীন এক পর্যয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তিনি বিপ্লবী কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর সমিতি, অনুশীলন সমিতি ইত্যাদির সক্রিয় কর্মকন্ডে নিজেকে জড়িত করেন, আর এই সূত্র ধরেই শ্রী অরবিন্দ ঘোষ, রামবিহারী বসু এম.এন. রায়-সহ অনেক বিপ্লবীর সাথে সংযুক্ত হন। ব্রিটিশ সৈনিকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের অংশ হিসাবে জার্মানি থেকে ম্যাভেরিক নামের একটি জাহাজে অস্ত্র আসছিল। সেই অস্ত্র জাহাজ থেকে নামিয়ে আনতে বাঘা যতীন তাঁর চারজন বিশ্বস্ত সহকর্মী চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, জ্যোতিস পাল, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত ও নীরেন্দ্র দাশগুপ্তকে সাথে নিয়ে ওড়িশার বালেশ্বরের দিকে যাত্রা করেন। জার্মানি থেকে ম্যাভেরিক জাহাজে আসার খবর বিশ্বাসঘাতকতার ফলে ব্রিটিশদের কাছে পৌঁছে যায়।
১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর যতীন্দ্র সদলবলে যখন বুড়িবালাম নদী পার হন, তখন পুলিশের বিরাট বাহিনী সারা এলাকাটি ঘিরে ফেলে। একদিকে পাঁচজন অসমসাহসী বঙ্গ সন্তান, আর অন্যদিকে ব্রিটিশের বিশাল পুলিশ বাহিনী। বিশ্বের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এমন অসম যুদ্ধের তুলনা বিরল। একটানা কয়েক ঘন্টা ধরে যুদ্ধ চালিয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ দেন চিত্তপ্রিয়, পরদিন হাসপাতালে প্রাণ দেন মহাবিপ্লবী বাঘাযতীন। অন্যদের পরে ফাঁসি হয়।
ভারতবর্যের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যতীন্দ্রনাথের আত্মবলিদান সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেন— ‘এতকালের পরাধীন দেশে এ মুত্যু ছোট নয়। কিন্তু যতীনের সাধনা—। কাজী নজরুল ইসলাম বলেন — ‘অয়ি যতীন্দ্র— রণোন্মত্ত— শনির সহিত অশনি রণ।
বিপ্লবী বাঘা যতীনের এই স্বর্ণোজ্জ্বল আত্মদান স্বর্ণক্ষরে লিখিত থাকবে ইতিহাসের পাতায়।
মনোজিৎকুমার দাস, মাগুরা, বাংলাদেশ।