Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবি ধনঞ্জয় সাহার মুক্তছন্দে লেখা কাব্যগ্রন্থ বহুমাত্রিক স্বর : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তারাশঙ্করের উপন্যাসে সমাজগতির ধারা : ড. অলোক রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিউরাল কারেন্সি’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কালীঘাট পটচিত্রের ইতিকথা : মনোজিৎকুমার দাস খোলাখাম : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জামা, জামি, জামাইষষ্ঠী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আবশ্যক : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (শেষ পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (প্রথম পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজুরিকা চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘একাকিনী’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ এক অভিনব ঐতিহাসিক উপন্যাস : স্বপনকুমার মণ্ডল

স্বপনকুমার মণ্ডল / ২২৩২ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৪ জুলাই, ২০২২

সাধারণত ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসের প্রতি ঔপন্যাসিকের দায়বদ্ধতা প্রাধান্য লাভ করে। সেক্ষেত্রে ইতিহাসের সত্যে তার ঘটনাপ্রবাহের যথাযথ অনুসরণ জরুরি হয়ে ওঠে। আর সেখানেই সাহিত্যের কল্পনাসত্যের সঙ্গে ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠতার দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে পড়ে। সেই দ্বন্দ্ব অচিরেই সংঘাতে পরিণত হয়। শুধু তাই নয়, সেক্ষেত্রে ইতিহাসের দেহের দিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে তার প্রাণের হদিস মেলানো দায়। সেখানে উপন্যাসে ইতিহাসের পাঠ নিবিড় হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু তার প্রাণের পরশের অভাব অন্তরায় সৃষ্টি করে। সেই প্রাণের রসকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘ইতিহাস রস’। তার অভাবে ঐতিহাসিক উপন্যাস নীরস প্রাণহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ যেহেতু তথ্যের সমন্বয়ে সময়ের অনুবাদ, তাতে শুধু যা কিছু পরিদৃশ্যমান ও প্রমাণসাপেক্ষ, তাই সেক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠ মনে হয়। সেই দেখাও যেমন আপেক্ষিক, তেমনই তার প্রকাশও ব্যক্তিনিরপেক্ষ নয়। অন্যদিকে সে দেখার বাইরেও অনেককিছুই অদেখা থেকে যায় যা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। সেক্ষেত্রে তথ্যের দিক থেকে ঐতিহাসিক উপন্যাস মনে হলেও তার মধ্যে সেই অদৃশ্য ঘটনাপ্রবাহ সংযোগের অভাবে উপেক্ষিত থাকে। আবার আপাত ভাবে উপন্যাসে যা অনৈতিহাসিক মনে হয়, বাস্তবে তাই অন্তঃশীলা ফল্গু নদীর মতো গভীর সত্যকে তূলে ধরে। বাংলাদেশের উপন্যাসের ধারায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৬) তারই পরিচয়বাহী অভিনব উপন্যাস। সেখানে ঐতিহাসিক কালখণ্ডের মধ্যে প্রবহমান ইতিহাসচেতনার অপূর্ব শিল্পরূপ তীব্র আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, সময়ের অনুবাদে ইতিহাসের আধারে দেশের মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতি ঔপন্যাসিকের নির্লিপ্ত অন্তর্দৃষ্টি শেষ অবধি সচল থেকেছে। অথচ সেক্ষেত্রে ইতিহাসের প্রতি দাসত্ব নয়, রাজত্ব করার চেতনাই সেখানে সক্রিয়তা লাভ করেছে। এজন্য প্রথমে উপন্যাসটির ঐতিহাসিক যোগসূত্রটি দেখা নেওয়া জরুরি।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসটির পরিকল্পনার ছক কষেছিলেন অনেকদিন পূর্বেই। ১৯৬৮-এর ডিসেম্বরে দেশে প্রবহমান গণআন্দোলনের প্রয়োজনীয় তথ্যাদি তিনি ডায়েরিতে গুছিয়ে লিখে রাখতেন। তাঁর মৃত্যুর পর শাহাদুজ্জামান গ্রন্থিত ও সম্পাদিত সেই ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ডায়েরি’তে (২০১৩) তার পরিচয় বর্তমান। উপন্যাসের সঙ্গে ডায়েরির তথ্যও মিলে যায়। শুধু তাই নয়, উপন্যাস লেখার ছকেও ডায়েরিতে লিখিত ঘটনাপ্রবাহের তথ্যাদির যোগসূত্র বর্তমান। সেখানে তথ্যের সন্নিবেশ যাতে যথাযথ হয়, সেদিকে তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। এজন্য প্রয়োজনে আখতারুজ্জামান তথ্যাদি ক্রমানুযায়ী গুছিয়ে রাখায় সক্রিয় ছিলেন। সেগুলো যে তিনি ভবিষ্যতে পরিকল্পনামাফিক ব্যবহার করবেন, ডায়েরিতে বাছাই করা ঘটনাপ্রবাহের তথ্য গুছিয়ে রাখাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানীর ডাকে পূর্ব পাকিস্তান ব্যাপী স্ট্রাইকের প্রতিরোধে পাকিস্তান সরকারের পুলিশের রাইফেলের গুলিতে নিহত যুবককে কবরস্থ করার পরিসরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেই অস্থির সময়ের কথাও ঔপন্যাসিক সেই উত্তেজনার মুহূর্তে তূলে ধরেছেন। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে নিহতের সেবায় আগত রিয়াজউদ্দীন বিপর্যস্ত সময়ের কথা স্মরণ করে উষ্মা প্রকাশ করেন, ‘কি যে শুরু হইলো, ডেলি ডেলি হরতাল, ডেলি ডেলি স্ট্রাইক’। নিহতের পরিচয় ক্রমশ বেরিয়ে আসে। শ্যামবর্ণ রোগাটে চেহারা, বয়স ২০/২১ বছর। নাম আবুতালেব। হাতিরপুল পাওয়ার স্টেশনের কর্মী। অন্যদিকে সময় যত গড়িয়ে যায়, পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন ততই ঘনিয়ে ওঠে। অন্যদিকে আবুতালেবের মৃত্যুকে নিয়েও রাজনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়ে যায়। ঔপন্যাসিকের সতর্ক দৃষ্টিতে তার পরিচয় নিবিড় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে মিছিলমুখরিত জমায়েতে, জনকোলাহল পূর্ণ প্রতিবাদসভা বা বিক্ষোভ অবস্থানে পাকিস্তান সরকারের শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে আবেগমথিত বক্তৃতায় তীব্র জনরোষ ঝরে পড়ে, ঘটনাস্রোতে ইতিহাসও ভেসে ওঠে.। একাদশ পরিচ্ছেদে এমনই বক্তৃতার প্রবাহ লক্ষণীয়। ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে জনৈক বক্তা বলে চলে : ‘ভাইসব, তেইশ বছর থেকে সোনার বাঙলার সম্পদে ফুলে ফেঁপে ওঠে পশ্চিম পাকিস্তান। বাঙলাকে শোষণ করে গড়ে তোলা হয় করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ। …আমাদের কৃষক আজ পাটের দাম পায় না, বাঙলার ছাত্রসমাজ আমাদের এখানে তৈরি কাগজ কিনতে বাধ্য হয় বেশি দামে, বাঙালি বলে ভালো চাকরি থেকে আমরা বঞ্চিত। আমাদের অধিকার আদায়ের কথা বলার জন্য আমাদের নেতাকে কারাবন্দি হতে হয়। ষড়যন্ত্রের মামলা চাপিয়ে তাঁকে নিঃশেষ করে দেওয়ার ফন্দি আঁটে আয়ুব খান। ভাইসব, আমরা বাহান্ন সালে রক্ত দিয়েছি, বাষট্টিতে রক্ত দিয়েছি, উনসত্তুরের সূত্রপাত রক্তপাতের ভেতর …।‘

সেদিক থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত গণআন্দোলনের ধারা ক্রমশ গণঅভ্যুত্থানের পথে ধাবিত হয়েছিল, তা উক্ত বক্তৃতাতেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ভিক্টোরিয়া পার্কের শহীদ মিনারের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের  নেতা ও কর্মীদের সভাতেই ‘মহান শহীদ ভাইয়ের মহান পিতা’ উপস্থিত হওয়ার কথা ঘোষণা মুহূর্তেই উত্তেজনা ছড়ায়। আর তার অব্যবহিত পরিসরেই ঘোষণা হয়,’গত ৮ই ডিসেম্বর পুলিশের গুলিতে নিহত ওয়াপদার তরুণ কর্মচারী শহীদ আবুতালেবের পিতা এখন আপনাদের সামনে কিছু বলবেন।‘ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ডায়েরিতে সেদিনের ঘটনা লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। সেখানে শহীদের নামটিই উপন্যাসে পরিবর্তিত হয়েছে, বাকি পরিচয় একই। ডায়েরিতে ১৯৬৮-এর ৮ ডিসেম্বরে আখতারুজ্জামান নোট লিখে রেখেছিলেন : ‘ভাসানী ন্যাপ আহূত হরতাল সফল। পুলিশের গুলিবর্ষণ। সকালবেলা ১১টায় জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য নীলক্ষেতের কাছে পুলিশ প্রথম লাঠিচার্জ করে। জনতা ছত্রভঙ্গ হয়। কিছুক্ষণ পর আবার মিলিত হয়ে পুলিশের প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে আবদুল মজিদ নামে ওয়াপদার একজন কর্মচারী মারা যায়। হাতীরপুর পাওয়ার হাউজের কেরানী। কিছুক্ষণ পর সাইকেল রিপেয়ারিং দোকানের কর্মচারী কুমিল্লা নিবাসী ১৫ বৎসর বয়সী আবু মিয়াও মারা যায়। ৩০ জন আহত এবং ৩০০ জন গ্রেফতার।‘  সেদিক থেকে একথা অনায়াসেই বোঝা যায় যে, আখতারুজ্জামান প্রথম থেকেই সময়ের ইতিহাসের আধারেই তাঁর ‘চিলেকোঠার সেপাই’কে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন এবং এজন্য তাঁর পরিকল্পনায় তথ্যসংগ্রহই শুধু নয়, কোন কোন বিষয়গুলি তাতে প্রাধান্য পাবে, তা নিয়েও তাঁর ভাবনাচিন্তা সক্রিয় হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তাঁর ডায়েরিতেই সেই ছক বর্তমান। সেখানে ১৯৬৮-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৬৯-এর ৭ মার্চ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহের নোটে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসের অস্থির ঘটনাস্রোতের অনেক তথ্যই বর্তমান। সেক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে হরতাল, কার্ফু, টিয়ার গ্যাস,লাটিচার্জ, ১৪৪ ধারা জারি, গুলিবর্ষণে নিহত-আহত, মিটিং মিছিল, জনসভা ও বিক্ষোভ সমাবেশ, জনতার অগ্নিসংযোগ প্রভৃতির সবকিছুর খুটিনাটি তথ্যই শুধু নেই, সেইসঙ্গে নোটবুকের মধ্যে মূল ঘটনাক্রমকে সূত্রাকারে পুনরায় লেখাও রয়েছে। সেদিক থেকে আখতারুজ্জামানের  তথ্যের প্রতি সযত্ন সচেতনতাই তাঁর পূর্ব পরিকল্পনাকে স্পষ্ট করে তোলে।

১৯৬৯-এর ২ মার্চ দৈনিক আজাদ-এ প্রকাশিত ‘এ পর্যন্ত আন্দোলনের একটি সচিত্র প্রতিবেদন’-এ ৭ ডিসেম্বর ১৯৬৮ মওলানা ভাসানীর হরতাল আহবান থেকে ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের মৃত্যু পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাক্রমের বিবরণ ফিরে এসেছে। তার মাঝে রয়েছে, ১৯৬৯-এর ২০ জানুয়ারি ছাত্রসমাজের আয়োজনে সর্বাত্মক হরতালে পুলিশ ও জনতার সংঘর্ষ ও আসাদুজ্জামানের মৃত্যু, ২৪ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে ৪জন মৃত্যু ও সান্ধ্য আইন জারি, ২৬ জানুয়ারি ২৬-৩১ তারিখ পর্যন্ত সান্ধ্য আইন ও ঢাকার রাজপথে গোরু চরে বেড়ানো, ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে পুলিশের গুলিতে ডক্টর  জোহার মৃত্যু ও ১৬ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানীর জনসভার পরেও সান্ধ্য আইন অব্যাহত থাকার কথা। সেদিক থেকে বোঝা যায়, আখতারুজ্জামান ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসটি রচনার জন্য সময়ের প্রবাহকে বিশেষ বিশেষ ঘটনার মাধ্যমে তুলে ধরায় সচেষ্ট হয়েছিলেন। স্মৃতি যে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তা থেকেই নানাভাবে নোট রাখার প্রয়াস স্বাভাবিক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উপন্যাসটিতে এসব ঘটনাই উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, ঘটনাক্রমের ধারাবাহিকতায় তারই পরিচয় বর্তমান। অবশ্য উপন্যাসে তাঁর লেখা দিনলিপি অনুসারে মওলানা ভাসানীর ডাকা বন্ধের তারিখ ৮ হলেও দৈনিক আজাদের তথ্যে ৭ ডিসেম্বর। অন্যদিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও শেখ মুজিবের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা বাঙালির পরিচয় যেভাবে উঠে এসেছে, তাতে তার স্বতঃস্ফূর্ততা প্রকাশে আখতারুজ্জমানের বাস্তব অভিজ্ঞতাই মূলধন হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে তাঁর মহৎ শিল্পীসুলভ আঁচড়ের সূক্ষ্মতায় যেমন গোটা ছবিটাই তূলে ধরেছেন, তেমনই রাজহাঁসের জল থেকে দুধ খাওয়ার মতো ইতিহাসের স্বাক্ষরবাহী মূল ঘটনাক্রমের মাধ্যমে সময়ের গতিপ্রবাহকে তূলে এনেছেন। ভিক্টোরিয়া পার্কের জনসভায় আবুতালেবের বাবার নাম ঘোষণার অব্যবহিত পরিসরেই শ্লোগানমুখর আমজনতার উত্তেজনা, শোরগোল ও প্রতিবাদের ভাষ্য চোখের সামনে ফুটে ওঠে। লেখকের কথায় : ‘তার কথা শেষ হওয়ার আগেই দক্ষিণ দিকের গেটের পামগাছের নিচে জটলা থেকে শ্লোগান ওঠে, ‘সাম্রজ্যবাদের দালালেরা’—‘হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার!,’ ‘দুনিয়ার মজদুর’—এক হও।‘, ‘কেউ খাবে, কেউ খাবে না’—‘তা হবে না, তা হবে না!’, ‘জোতদার গদিতে’—‘আগুন জ্বালো এক সাথে।‘ ‘মিল মালিকের গদিতে’—‘আগুন জ্বালো এক সাথে।‘

এইসব শ্লোগান চলছে, তখন আবার বেদীর নিচে সেই জটলা থেকে দক্ষিণ দিকে মুখ করে কয়েকজন শ্লোগান দেয়, ‘বাঙলার মজদুর’—এক হও!’, ‘ছয় দফা ছয় দফা’—‘মানতে হবে মানতে হবে’, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’—মানি না মানি না’, ‘শেখ মুজিবের শেখ মুজিবের’—‘মুক্তি চাই, মুক্তি চাই।‘ পরস্পর অবিন্যস্ত শ্লোগান ছোঁড়াছুড়ির মধ্যেই আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ যেমন আন্তরিক হয়ে ওঠে, তেমনই সময়ের স্বরলিপি সুস্পষ্টতা লাভ করে।

অন্যদিকে তখনও ছাত্রদলের ‘এগারো দফা’ দাবি সক্রিয় হয়ে ওঠেনি। ১৯৬৯-এর ৬ জানুয়ারি তা প্রদান করা হয়। তখনও তা জনগণের মুখে সচল হয়নি। সেক্ষেত্রে ঔপন্যাসিকের ইতিহাসচেতনায় সতর্ক দৃষ্টি লক্ষণীয়। ইতিপূর্বে ‘এগারো দফা’র কথা লিফলেটের মাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি ওসমান ও আনোয়ারের কথাবার্তায় উঠে এসেছে। এরপর মাসদুয়েকের সরকারবিরোধী ঘটনাবহুল তীব্র গণআন্দোলনকে যত কঠোর ভাবে দমনপীড়নের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা হয়, ততই তা আরও বেপরোয়াভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে জনরোষের ধবংসাত্মক রূপ লাভ করে। আইন অমান্য, আগুন ধরিয়ে দেওয়া, ভেঙে ফেলা প্রভৃতির মধ্যেও বেপরোয়া প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। তাতে শুধু সরকারি সম্পত্তিই নয়, সরকারের ধারক-বাহক সুবিধাভোগী বড়লোক মালিকশ্রেণির ধনসম্পদের প্রতিও শাসিত-শোষিত মানুষের তীব্র আক্রোশের আগুন জ্বলে ওঠে। গণআন্দোলন তীব্র গতিতে গণঅভ্যুত্থানের রূপ লাভ করে। বিশেষ করে ছাত্রআন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ডাকা হরতাল সাধারণের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। আর তাতে ইউনির্ভারসিটির ছাত্র আসাদুজ্জামান নিহত হয়। নিহত শহীদের শোকসভা পালন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আরও দুজনের মৃত্যু ঘটে। এজন্য জনৈক তরুণ নেতার কণ্ঠে তার প্রতিবাদও মর্মান্তিক হয়ে ওঠে : ‘ভাইসব, স্বৈরাচারী আয়ুব-মোনেমের লেলিয়ে দেওয়া কুকুরের গুলিতে আজ নিহত হয়েছে আমাদের দুজন ভাই। ভাইসব, আমাদের শহীদ মকবুলার রহমান ও রুস্তম আলির লাশ এক্ষুনি এসে পড়বে। শহীদ আসাদুজ্জামানের শোক-সভা আজ জানাজায় পরিণত হলো কেন ? কার জন্য ? ভাইসব—।‘ বর্ষার আকাশের মতো দ্রুত ঘটে চলা দুর্যোগের মেঘ চারদিকে আঁধারে আচ্ছন্ন করে তোলে। একের পর এক দুর্ঘটনার আকস্মিকতায় বিদ্যুৎ চমক ও প্রাণহানির চাপা আতঙ্ক জনমানসে অস্তিত্বের লড়াইকে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। তার ফলে জনরোষের আগুনের সেই ক্ষিপ্ত জনগণকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকারি উদ্যোগে কঠোরতার পরাকাষ্ঠা নেমে আসে। তাতেই মুহুর্মুহু কার্ফু, ১৪৪ ধারা, লাগাতার সান্ধ্য আইন ও নির্বিচারে পুলিশের গুলিচালনা প্রভৃতির ভয়ঙ্কর তাণ্ডব শুরু হয়। এতে আমজনতার মধ্যে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার প্রবণতা সক্রিয় হয়ে ওঠে ও পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির সংখ্যা নিরন্তর বেড়ে চলে। সেক্ষেত্রে ইতিহাসকে হুবুহু অনুসরণ না করেও সময়ের স্রোতকে অব্যাহত রাখায় আখতারুজ্জামানের স্বকীয় শিল্পীসত্তার প্রকাশ স্বাভাবিক ভাবেই স্বতন্ত্রতা লাভ করে। সেখানে সময়ের অনুবাদ না করে তার প্রভাবকে শিল্পরূপ দিতে গিয়ে তাঁর ইতিহাসচেতনা ইতিহাসবোধ হয়ে উঠে। দেখা ইতিহাসের সঙ্গে দেখানো ইতিহাসের পার্থক্যেই তাঁর উপন্যাসের শিল্পরূপ অভিনবত্ব লাভ করে।

আখতারুজ্জামানের নোটবুকে রয়েছে ১৯৬৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড জোহাসহ দুইজনের মৃত্যু হয়। ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এ ঔপন্যাসিক জোহার মৃত্যুকেই স্বল্প পরিসরে অস্থির সময়ের আবর্তে আবেদনক্ষম করে তুলেছেন। বাস্তবে জোহার আসল নাম ড সামসুজ্জোহা। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও প্রক্টর। পাকহানাদার বাহিনী তাঁকে নির্মম ভাবে হত্যা করে। উপন্যাসে বামপন্থী ছাত্রদলের কর্মী আনোয়ার কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ করে ওসমানের ঘরে ফিরে এসে উত্তেজিত ভাবে জানায় ‘আরে রাজশাহীতে জোহা ভাইকে মেরে ফেলেছে। আর্মি নাকি বেয়নেট খুঁচিয়ে মেরেছে। ‘ওসমানকে জোহার আরও পরিচয় দেওয়ার সুযোগে আনোয়ার তার ব্যক্তিগত পরিচয়কে আরও নিবিড় করে তোলে : ‘……আমাদের গাণ্ডোরিয়া পাড়ার ছেলে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার। খুব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলো ! ছেলেবেলায় মিল ব্যারাকের পাড়ার মাঠে আমরা ক্রিকেট খেলতাম, জোহা ভাইও আমাদের সঙ্গে খেলতো। ফার্স্ট ক্লাস ব্যাটসম্যান….। ‘শওকত হঠাৎ চুপ করে থাকার পর ওসমানের বিছানায় শুয়ে জোহার কথা স্মৃতিচারণ করে। আর তার পরেই ‘কিছুক্ষণের মধ্যে তার নাক ডাকার আওয়াজ শোনা যায়।‘ সেদিক থেকে সরকারি নির্মম দমনপীড়নের পাশবিক অত্যাচারের ইতিহাসকে তূলে ধরে আবেগের আতিশয্যে স্বৈরাচারী শাসকের প্রতি বিদ্বেষ বা স্বদেশের প্রতি আত্মনিবেদিত প্রাণের পরশ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচলিত পথে না হেঁটে ঔপন্যাসিক তাঁর স্বকীয় পথে নির্মোহ নিরাসক্ত ভাবে মানুষের বেঁচে থাকার স্বাভাবিকতায় উত্তরণের প্রয়াসকেই সজীব করে তুলেছেন। এজন্য তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সার্বিক বিস্তারে শহর থেকে শহরতলী, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সর্বত্রগামী প্রতিবাদী গণকণ্ঠের  আলোড়িত প্রকাশ লক্ষ করা যায়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সরকারবিরোধী অভূতপূর্ব গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে পাকিস্তান সরকারের সুবিধাভোগী ফুলে ফেঁপে ওঠা মহাজন, জোতদারদের শোষণে-শাসনে জর্জরিত গ্রামের ভূমিহীন বর্গাদার কৃষিজীবী মানুষের জীবন-সংগ্রামের ইতিহাসও নিবিড় হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে গ্রামের প্রান্তিক মানুষের লড়াই কীভাবে সেই গণঅভ্যুত্থানে একাত্ম হয়ে ওঠে তার পরিচয়েও উপন্যাসটির ঐতিহাসিক আভিজাত্য তীব্র আবেদনক্ষম মনে হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান যে অভূতপূর্ব, ঔপন্যাসিক উপন্যাসের মধ্যেই তা প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন।

আসলে অসংখ্য খাল-বিল, নালা-নদীর প্রবাহিত জলের মিলিত রূপে সমুদ্রের প্রকাশের মতো পূর্ব পাকিস্তানের শোষিত-শাসিত বাঙালির বাঁধনহারা জনস্রোতে আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ততাই তখন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তখন ক্ষুব্ধ দেশ, বিক্ষুব্ধ জনস্রোত।  ঔপন্যাসিকও উপন্যাসের প্রথমদিকে চতুর্থ পরিচ্ছেদে তার অভিনব গণআন্দোলনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ঢাকার আমজাদিয়া রেস্টুরেন্টে আলোচনারত কলেজের তরুণ অধ্যাপক তথা দেশের চেয়ে বৈষম্যপীড়িত সমাজের পরিবর্তনপন্থী আনোয়ার তাঁর পরিচিত বন্ধু শওকত, আলতাফ, চিত্ত, ফরিদ,ইফতিখার ও ওসমানদের উদ্দেশ্য করে জানায় : ‘এর আগে পিপল যেসব মুভমেন্টে এ্যাক্টিভ্লি পার্টিসিপেট করেছে সেগুলো হয়েছে এক একটি এলাকা জুড়ে। ধরো তেভাগা, ধরো হাজং কিংবা সাঁওতাল বিদ্রোহ—এগুলো বিশেষ এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিলো, তাই না? কিন্তু এরকম সমস্ত প্রভিন্স জুড়ে—।‘ ইফতিখার তার আরও ব্যাপকতা বুঝিয়ে বলে :‘প্রভিন্স কেন ? এবার কান্ট্রিওয়াইড মুভমেন্ট চলছে, ওয়েস্ট পাকিস্তানী পিপল আর অলসো পার্টিসিপেটিং ভেরি স্পন্টেনিয়াসলি।‘ আর তাতে সম্মতি জানিয়েই আনোয়ার তার লক্ষ্যে পৌছাতে চেয়ে বলে, ‘এই ব্যাপক আন্দোলন কি কেবল এ্যাডাল্ট ফ্র্যাঞ্চাইজ আর পার্লামেন্টেরি ফর্ম আর অটোনমির জন্যে ? আর কিছু না ?’ এই ‘আর কিছু’র পরিচয় কত বিস্তৃত ও ব্যাপক, তার হদিশে উপন্যাসটির বিস্তার ঢাকার রাজপথ ও অলিগলি ছেড়ে গ্রামগঞ্জ থেকে যমুনার চরের বসতিতে পৌঁছে যায়। সেখানে গোটিয়া, তালপোঁতা, ধারাবর্ষা, মূলাবাড়ি প্রভৃতি বিস্তৃর্ণ গ্রামাঞ্চল জুড়ে গরুচুরি ও সরকারি সুবিধাভোগী জোতদারদের দ্বারা সর্বস্বান্ত বর্গাদার ক্ষেতমজুদের শ্রেণিসংগ্রাম ও গণআদালত বসিয়ে বিচারের প্রয়াসে ইতিহাসের অনালোকিত পরিসর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ঢাকা শহরের সরকারপন্থী ব্যবসায়ী মহাজন ও তার ভাগ্নে ও পরে মেয়ের জামাই তথা সুবিধাবাদী আওয়ামলীগ নেতা আলাউদ্দিনের মতো গ্রামের জোতদার খায়বার হোসেন গাজী ও তার ভাইপো গাজী মহম্মদ আফসার আলী ও তার অধীনে যমুনার চরে গরুচুরির কারবারের চালক হোসেন আলীর সদম্ভ অস্তিত্ব সমান্তরাল ভাবে প্রবহমান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আখতারুজ্জামান তাঁর ১৯৬৮-র ১০ ডিসেম্বরে লেখা ডায়েরিতে খুলনা ও যশোরে গোরুচোরের উৎপাতের কথা লিখে রেখেছেন। তার প্রতিচ্ছবি উপন্যাসেও বর্তমান। চুরি হওয়া গোরু অনেক অনুনয়বিনয় করে দালালের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে ফিরে পাওয়া যেত। সেখানে শোষণে-শাসনে রিক্ত বর্গাচাষীদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জীবনকেই দেখানো হয়নি, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য মরীয়া লড়াইও উঠে এসেছে। কলেজে পড়া আলীবক্সের নেতৃত্বে চেংটু, করমালি, বান্দু শেখ, কানা মনতাজের দলের জীবন বাজি রেখে জোতদারের বিরুদ্ধে-সংবদ্ধ প্রতিবাদ ও গণআদালতে বিচার করার মধ্যে ১৯৬৭-এর ২৫ মে’র নকশালবাড়ি আন্দোলনের ছায়া কায়া বিস্তার করে।

শুধু শহর-নগরকেন্দ্রিক নয়, গ্রামগঞ্জের মধ্যেও উনসত্তরের গণআন্দোলন নানাভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে পাকিস্তান সরকারের চেয়ে স্থানীয় শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে সমাজের প্রান্তিক মানুষের সংবদ্ধ বলিষ্ঠ প্রতিবাদও গণআন্দোলনের রূপ লাভ করে। নিজে মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষ হয়েও সমাজবিপ্লবের প্রত্যাশা নিয়ে বামপন্থী রাজনীতির সক্রিয় কর্মী আনোয়ার গ্রামের গোরু চুরিকে কেন্দ্র করে অস্থির সংকটজনক পরিস্থিতিতে ফুপা জালাল মাস্টারের চিঠি পেয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে এসে সেও দীনহীন মানুষের পরিবর্তন লক্ষ করে। বৈরাগী ভিটায় জিনের অশনি সংকেত নিয়ে ঠাট্টা করতে গিয়ে তার সবাইকে খবর না দিলে সবার বিপদ হতে পারে’র কথায় চেংটু স্বমূর্তি ধারণ করে :’সোগলির বিপদ হবো কিসক ? হামাগোরে আবার বিপদ কি ? হামাগোরে জমি নাই, জিরাত নাই, ঘর নাই, ভিটা নাই, ধান নাই, মরিচ নাই,—বিপদ বিসম্বাদ হলে হামাগোরে নোকসান কি?’ চেংটুদের এই আত্মসচেতনতা ও উত্তরণের প্রয়াসও উপন্যাসের ঐতিহাসিকতাকে আন্তরিক করে তুলেছে। বৈষম্যপীড়িত সমাজে ভূমিহীন বর্গাদার ক্ষেতমজুরদের সহায়সম্বল হারিয়েও অভ্যাসের আবর্তের মধ্যে থেকেও বেঁচে থাকার শ্রেণিসংগ্রাম জারি থাকে। অন্যদিকে সেই লড়াইয়ের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে স্বদেশের মুক্তি কামনায় গণআন্দোলনও এগিয়ে চলে। বৈরাগী ভিটায় গণআদালতে খয়বার গাজীর বিচারের সময়ও সেই আন্দোলনের মিছিল সরবে এগিয়ে চলে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উপন্যাসের ৫৩টি পরিচ্ছেদের মধ্যে ১৪টি( ১৪-২০, ২৮-৩২.৩৯-৪০) পরিচ্ছেদ জুড়েই গ্রামের ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের শ্রেণিসংগ্রামের কথা বর্তমান। আবার ঢাকা শহরের বস্তিবাসী হতদরিদ্র হাড্ডি খিজিরের সরকারবিরোধী সংগ্রামে আপোষহীনতার সঙ্গে গ্রামের স্বাধীনচেতা তীব্র প্রতিবাদী চেংটুর অনমনীয় মনোভাব একাত্ম হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, তাদের দুজনের মৃত্যুও স্বাভাবিক মনে হয়। মৃত্যুকে সঙ্গী করেই তাদের জীবনসংগ্রাম। এজন্য তাদের বেঘোরে প্রাণ দেওয়ার মধ্যে পরাজয় নেই, আছে অপরাজেয় জীবনীশক্তি, হেরেও জয়ের হাতছানিতে এগিয়ে চলার আলো। এজন্য চেংটুর মৃত্যুতে গ্রামের অসহায় ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের শ্রেণিসংগ্রাম থেমে থাকে না। অন্যদিকে আনোয়ার-শওকত বা আলতাফ নয়, চিলেকোঠাবাসী ওসমানের মনে হাতছানি দিয়ে চলে হাড্ডি খিজির। ঘুমন্ত আনোয়ারকে বিছানায় রেখে তালা ভেঙে সেই বেরিয়ে আসে তার মধ্যবিত্তের সঙ্কীর্ণ ঘেরাটোপ ছেড়ে। সেদিক থেকে উপন্যাসের শেষে গণঅভ্যূত্থানের ব্যর্থতা ও ওসমান গণির অপ্রকৃতিস্থ পরিণতি স্বাভাবিক ভাবেই জনপ্রিয় অভিমুখ রচনা করেনি। উলটে অনেকের কাছে বিরূপ সমালোচনার অবকাশ তৈরি করেছে।

প্রচলিত মার্কসীয় সাহিত্যে শ্রেণিসংগ্রামে ইতিবাচক জয় দেখানো বা সোনালি সকালের প্রত্যাশা জাগানোর কোনো অবকাশ সেখানে নেই বলে উপন্যাসের পরিণতি অনেকের কাছেই আবেদনক্ষম হতে পারেনি। গাজী আজিজুর রহমান তাঁর ‘চিলেকোঠার সেপাই : উনসত্তরের অগ্নিকাব্য’ (‘কালি ও কলম’, এপ্রিল ২০০৬) প্রবন্ধে ‘উনসত্তরের মূল স্পিরিট বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ও ঐক্য’-এ উপন্যাসটির লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে বামপন্থী বুদ্ধিজীবী-লেখক বদরুদ্দীন উমর উপন্যাসটির শ্রেণিসংগ্রামের পরিচয়ে খুশি হয়েও তার উপসংহার তাঁকে বিরূপ করেছে। এজন্য আখতারুজ্জামানের ‘খোয়াবনামা’কেই তাঁর সুপরিণত উপন্যাস মনে হয়েছে। অন্যদিকে শুধু সেসবই নয়, সময়ের সব ক্ষতকে ঔপলন্যাসিক স্পষ্ট করেননি। সেই সময়ের ইসলামী মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদের পরিচয় সেখানে মেলে না। সেখানে সর্বত্র বাঙালি মুসলিমদেরই গণআন্দোলন ও শ্রেণিসংগ্রামের কথা নিবিড় হয়ে উঠেছে। আসলে আখতারুজ্জামান দেশভাগ চাননি। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভেদভাবের চেয়ে তাঁর কাছে ধর্মভেদে দেশভাগের করুণ পরিণতিই প্রাধান্য পেয়েছে। সেখানে জিন্নাটূপিতে শোভিত আয়ুবখানের মৌলিক গণতন্ত্রী রহমতউল্লার মুলসিমদের জন্যই পাকিস্তানের জন্মের অসার যুক্তি প্রকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সাতচল্লিশের দেশভাগের শিকারে পরিণত হওয়া চার বছর বয়সে ঢাকায় আসা চিলেকোঠাবাসী ওসমান গণির অস্তিত্বের শিকড়ে খুঁজেফেরার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষতবিক্ষত ইতিহাসকে ফিরে দেখার সঙ্গে তার উনসত্তরের গণআন্দোলনে একাত্ম হওয়ার ইতিবৃত্তে দেশের চেয়ে দশের কথাই বারে বারে ফিরে এসেছে। আহার-নিদ্রা-মৈথুনপীড়িত দীনহীন মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, অস্তিত্বের সংগ্রামী উত্তরণ প্রয়াসই সেখানে প্রাধান্য লাভ করেছে। সেখানে চলমান সময়ের পাশাপাশি মিথ, ইতিহাস অলৌকিকতা, কিংবদন্তি, লোককথা ও সংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস প্রভৃতিও সমান গুরুত্ব লাভ করে। শুধু তাই নয়, ঐতিহাসিকতার চেয়ে সমাজবাস্তবতার বিশ্বস্ততাই উপন্যাসটিতে অনেকবেশি প্রাধান্য লাভ করে। অথচ তাতে পাঠকমনে কোনো মহত্তম আশা, উজ্জীবন বা আর্তি অথবা হাহাকার কোনোটাই জেগে ওঠে না। সেখানে লেখকের নির্লিপ্ত লেখনীর চলনে নিরাবেগ প্রকৃতিতে আত্মসমীক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়ে পড়ে। এজন্য গণঅভ্যুত্থানের ব্যর্থতায় উপন্যাসটি নিঃস্ব হয়ে পড়েনি, বরং খিজিরের পথে ওসমানের স্বকীয় মধ্যবিত্তের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার বার্তায় তার আবেদন ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। সেক্ষেত্রে আখতারুজ্জামান সময়ের অনুবাদ করতে গিয়ে আদতে সময়কেই অভিনব শিল্পরূপ প্রদান করেছেন। তাঁর ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বাংলার সেই অভিনব ঐতিহাসিক উপন্যাস ।

প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন