হাওড়া জেলার বাগনান থানার অন্তর্গত কড়িয়া গ্রামে আফসার আমেদের জন্ম।
৪৭ এর দেশভাগ আফসার আমেদের পরিবারটাকেও খন্ডিত করে দিল।পিতা খলিলুর রহমানের প্রায় সবাই চলে গেলেন পূর্ব পাকিস্তান। খলিলুর রহমানও চলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্ত্রী আরফা বেগমের তীব্র প্রতিবাদ ও জেদ। খলিলুর রহমান আটকে গেলেন।
আরফা বেগম বলেছিলেন, এটা আমার দেশ।আমার জন্মভূমি।শ্বশুরের ভিটে। বাঁচতে হলে এখানেই বাঁচব। মরতে হলে এখানেই মরব।
অগত্যা। শুরু হল খলিলুর রহমানের লড়াই। খেতমজুর থেকে চাইবাসার চিনামাটির কারখানার খনি শ্রমিক। পরে খিদিরপুর ডকে শ্রমিকের স্থায়ী চাকরি।
প্রায় এক সর্বহারা মানুষ। খলিলুর রহমানের তিন কন্যা। দুই পুত্র সন্তান।
আফসার পুত্র সন্তানদের মধ্যে বড়।সাকুল্যে সাতজন মানুষের এক পরিবার। খিদে পরিবারের নিয়মিত সঙ্গী।
কড়িয়াগ্রাম মুসলমান অধ্যুষিত। ভিখারি। রাজমিস্ত্রী। রঙমিস্ত্রী। খেতমজুর। না- কাজ পাওয়া মানুষের গ্রাম। আর ধর্মপ্রিয় সংস্কার। যেখানে শিক্ষা এক অন্য গ্রহের প্রশ্ন।
এই প্রান্তিকতায় আফসার বেড়ে উঠলেন সহজ বৃক্ষের আদলে। পরিবেশ তাঁকে আলোবাতাস দিল।ঘনিষ্ঠ জীবন দেখার পর্যবেক্ষন দিল।ভাষা দিল।
পড়াশোনায় অত্যন্ত সাধারণ। দেখতে আরো সাধারণ। সহজাত হীনমন্যতাবোধ। জন্মগত। পরিবেশগত। দেশগত।
স্থানীয় এক ম্যাগাজিনে কবিতা লিখে আত্মপ্রকাশ। এবং আরও কয়েকটি ছোটগল্প লিখে গদ্য রচনার প্রস্তুতিপর্ব। কৈশোরে।
১৯৭৮। মুসলমান অন্দরে বিয়ের গীত। প্রবন্ধ। প্রকাশিত হয় পরিচয়ে। আফসার সবে মাধ্যমিক উত্তীর্ন।
১৯৭৯। জনস্রোত জলস্রোত। পরিচয়ে প্রকাশিত আফসার আমেদের প্রথম গল্প।
কলকাতার পাঠক মহল চমকে গেলেন। পরিচিত সাহিত্য ক্যানভাসের বিপ্রতীপে এক লেখা। আনকোরা ভাষা।অচেনা চরিত্র। প্রান্তিক মুসলমান সমাজের ভেতরে ঘাপটিমারা, সাঁতসেঁতে আলোঅন্ধকার, ধর্মবোধ, পাপবোধ, যৌনবোধ, অসহায়তা, চুলোচুলি, সর্বগ্রাসী পেটের খিদে এবং প্রানধারনের প্রবল আকুতি।
শরৎ চন্দ্র চট্যোপাধ্যায়, তিন বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সৈয়দ মোস্তফা সিরাজ, আব্দুল জব্বার লিখিত গ্রামজীবন পাঠক মহলে এক ধরনের অনুভূতিকল্প তৈরি করে ছিল। কিন্তু আফসার বাংলা সাহিত্যে অকস্মাৎ এক বিপরীত গ্রামজীবন উপস্থিত করলেন। যেটা পরবর্তীতে আরো অন্য মাত্রা পাবে।
পরিচয় এ প্রকাশিত, গোনাহ, জিন্নত বেগমের দিবস রজনী, জিন্নত বেগমের বিরহ মিলন, ডিপ টিউবওয়েলের দাম কত, আদিম, হাড়……. ইত্যাদি।
গুনীজন এবং পাঠকের পরিচিত রুচিবোধ ভেঙে চুরমার।
সম্পূর্ন নতুন গদ্যরীতি। ভাষা ভঙ্গিমা। থুতুধুলোকামগন্ধখিদেধর্ম মাখা প্রান্ত উলঙ্গ মানবজীবন। ভীষণ জ্যান্ত।দগদগে। যেন জীবন সরাসরি উঠে আসছে কথোপকথনে, আচরনে, গল্পের বিন্যাসে। অথচ কোথাও কোন গ্রামীনতা নেই।
বাংলা সাহিত্যের ক্যানভাসকে আরো অনেক দিগন্ত অব্দি টেনে দিলেন আফসার।
বিমল মিত্র। সমরেশ বসু। দেবেশ রায়। অমলেন্দু চক্রবর্তী । সুনীল। সুভাষ। সন্দীপন। শক্তি। প্রায় সবাই আফসার পড়ে মোহিত। সাগরময় ঘোষ দেশ এ আফসারকে লেখার আমন্ত্রণ জানালেন।
আফসারের লেখা প্রথাগত পাঠ্যরুচির ওপর এক চরম আঘাত। সে আঘাত সমর্থন পেল সুধী পাঠক মহলে। যদিও মূল ধারার সাহিত্যের সঙ্গে আফসারের আজীবন বিরোধ থেকে গেল। পরবর্তীকালে এই আপসহীনতা আফসারের দারিদ্র্যের মূল কারণ হয়ে উঠবে।
১৯৮১। ঘরগেরস্তি প্রকাশিত হয় কালান্তর শারদীয় সংখ্যায়।
আফসারের প্রথম উপন্যাস। তখনও আফসার বাগনান কলেজে বাংলা অনার্স পাঠরত।
আফসার আমেদ হয়ে উঠলেন বাংলা সাহিত্যের এক অনিবার্য উচ্চারণ।
ঘরগেরস্তি থেকে ব্যথা খুঁজে আনা। প্রায় বারোটি উপন্যাস। এবং অসংখ্য ছোট গল্প। ১৯৯৩ অব্দি। এই দীর্ঘ আখ্যান চর্চায় মুসলমান জীবন থেকে হিন্দু প্রান্তিক মানবজীবন আফসারের লেখায় বিভিন্ন ইঙ্গিতে ধরা পড়ল।
১৯৯৪। বিবির মিথ্যা তালাক তালাকের বিবি এবং হলুদ পাখির কিসসা। বাংলা সাহিত্যের আর একটা নতুন বাঁক। হঠাৎই। মধ্যপ্রাচ্যের আরব্য রজনীর আখ্যান রীতিকে আফসার এনে ফেললেন বর্তমান
বাংলার মুসলমান সমাজের প্রেক্ষিতে।
লেখার বাস্তবতা পাল্টে গেল। ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কার-নীতিবোধ-রাস্ট্রের ধারণা-যৌনতার ধারণা-নারীর মগজের রহস্যময়তা এবং প্রতিবাদ কিসসার অন্তর্গত মেজাজে একাকার।
ফ্যানটাসি। উদ্ভটত্ব। অতিবাস্তবতা। অলৌকিকতা। সব মিলিয়ে আখ্যানের এক নতুন রূপ।
আফসারের আখ্যান এই কিসসার মধ্যে ডানা মেলল। আখ্যানের এক কল্পনাবিদ। ধর্মীয় মৌলবাদ থেকে রাষ্ট্রীয় মৌলবাদ থেকে যৌনতার মৌলবাদকে প্রবল আক্রমণ করলেন কৌশলে। কিসসার আড়ালে। যেন কিছুই ঘটছে না। মামুলি। অথচ কি ভয়ানক সন্ত্রাস। কি প্রচন্ড রক্তাত্ব সমস্ত নীতিবোধ। ধর্মবোধ। রাষ্ট্রবোধ। মানবতা বিরোধী সমস্ত আকারবাদের বিরুদ্ধে এক গেরিলা আক্রমন তাঁর কিসসা সিরিজের ছটি উপন্যাসে।
আফসারের লেখার নব্বই শতাংশ জুড়ে বিপন্ন নারীর দৃষ্টিকোন। ধর্ম বনাম যৌনতা। রাষ্ট্র বনাম মানবিকতা। প্রান্তিক মানুষ বনাম ক্ষমতাবান।
আফসার গল্পের খুব অতলে, নিছক চোখ এড়িয়ে যাবার ভঙ্গিতে, ভাঁজে ভাঁজে গুঁজে রাখলেন ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে, মানবতার অসহায়তার বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র। জীবন্ত বারুদ। এটাই আফসারের লেখার অভিনবত্ব।
আফসার কিসসা সিরিজের মধ্যে যে বারুদ প্ল্যান্ট করলেন মৌলবাদীদের রেডারে সেটা ধরা পড়ল না।
আশ্চর্য। অথচ এরা সলমন রুশদি, তসলিমা নাসরিন, খলিল জিব্রানকে বুঝে ফেলে ছিলেন।
কিন্তু আফসার আমেদকে ধরতে পারলেন না।
ভাগ্যিস।
আফসারকে কোন মৌলবাদ বুঝতে পারল না। এই আরাম চুড়ান্তভাবে, নিশ্চেন্তে ব্যবহার করলেন। তাঁর প্রতিটি লেখার বাঁকে বাঁকে।
হয়তো স্কুল শিক্ষিত মৌলবাদীরা তখনও আফসারকে পড়ার মানে ধরতে পারেনি। বা পড়েনি। এখনো নিশ্চয় পারেনি।
আবার বাঁক নিলেন আফসার।
শুধু দগদগে বাস্তবতা, কিসসার মধ্যে আটকে থাকলেন না। নতুনতর ভঙ্গি তাঁর জরুরি হয়ে উঠছিল। কারণ তাঁর বেঁচে থাকার প্রাত্যহিকতা। তিনি বাঁচেন। খু্ঁটে খান। আজীবন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির একটা ক্যাজুয়াল কর্মচারী। সরকারি গ্রুপ ডি-র থেকে অর্ধেক মাইনে। নামজাদা লেখক। ভারতবর্ষের সমস্ত দামি পুরস্কার তাঁর হস্তগত। অথচ ছেলেমেয়ের শিক্ষা এবং সংসার চালাতে রক্তাত্ব।
তাঁর লেখা উপন্যাস নিয়ে ছবি করেন বিশ্ববন্দিত পরিচালক।
লোকটার খ্যাতি ছিল।
প্রবল কান্নাও ছিল অন্তরালে ।
বিভিন্ন চরিত্রের ছদ্মনামে বা নিজস্ব নামে, কখনো স্ত্রী’র নাম যথাযথ রেখে আফসার নিজের কথা লেখেন ননসেন্স স্টোরির মাধ্যমে। হেডমাস্টার চিংড়ি চানাচুর। আয়রে সোনা চাঁদের কোনা। অর্থহীন কথা বলার নির্ভরতা। আজ সভাগৃহে গাধার বিষয়ে কথকথা। ইত্যাদি।
এ রকম এক গল্পে যেখানে চরিত্র তার ক্যাজুয়াল সার্ভিস পার্মানেন্ট হবে এই আশায় রাশ ভারী বস-এর বহুতল ফ্ল্যাটে চাকরির সময়ের পরেও তাকে লুডো খেলতে যেতে হয়। তার বাড়ি মফস্বলে। সে বসকে খুশি করতে খেলে যায়। হয়তো লাস্ট ট্রেনটাও পাবে না। তবু আশা।
অনুমান করুন এভাবেই আফসার আমেদ বেঁচেছেন।
৪ আগস্ট, ২০১৮ সাহিত্যিক আফসার আমেদ মারা যান। পেজফোর অনলাইন পোর্টাল-এর পক্ষ থেকে তাঁকে শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই। অরূপ মিদ্যা আফসার আমেদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। তাঁরই একটা লেখা এখানে পাঠকের সামনে রাখলাম।