চতুর্দশ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের প্রথম পর্যায়
নয়
মির্জা রাজার ভাবগতিক দেখিয়া বাদশাহী ফৌজ নিরুৎসাহ হইয়া পড়িয়াছিল। কিন্তু বাহাদুরপুরের শিবিরে কনৌজের ফৌজদার বিখ্যাত যোদ্ধা দেলের খাঁ রোহিলা কয়েক হাজার দুর্ধর্ষ পাঠান সৈন্য লইয়া কুমার সুলেমানের সাহায্যার্থ মিলিত হওয়ায় তাহারা জয়ের আশায় আবার উৎফুল্ল হইয়া উঠিল; জয়সিংহ কিন্তু একাধিক কারণে অসোয়াস্তি বোধ করিতে লাগিলেন। দেলের খাঁর সহিত বয়সের কম পার্থক্য এবং পাঠানের সাহস ও সরলতার গুণে কুমার সুলেমান তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন, মির্জা রাজার সহিত কুমারের মনের ব্যবধান আরও দূরতর হইয়া গেল। বাহাদুরপুরে যুদ্ধ অচল অবস্থায় পৌঁছিয়াছিল, কোনও পক্ষের হাতেই যুদ্ধোদ্যম রহিল না। উভয় সেনার মধ্যে স্বল্প অথচ দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান। শাহশুজার শিবির একটি সুরক্ষিত বন-দুর্গ; উত্তরে গঙ্গা, দক্ষিণ-পশ্চিম হইতে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব ঘিরিয়া বহুদূর দীর্ঘ এবং অন্যূন আড়াই মাইল প্রস্থ অর্ধচন্দ্রাকৃতি অননুপ্রবেশ্য অরণ্যভূমি। বর্ষায় গঙ্গার প্লাবনে পাড় ভাঙিয়া এই জঙ্গল জলে ভরিয়া যায়, কাঁটা বাবুলগুলির মাথা শুধু দেখা যায়। বাহাদুরপুর হইতে বর্তমান আলীনগর ছাউনি এবং মোগলসরাই ছাড়াইয়া আরও পূর্ব পর্যন্ত গঙ্গার দক্ষিণে এই অনূপ ভূমি এখনও অনাবাদী কাঁটা বাবুল ও ঝোপে ভরা জঙ্গল। শীতকালে টানের সময় জঙ্গলের মাটিতে মাঝে মাঝে বড় বড় ফাটল ১০/১২ হাত গভীর স্বাভাবিক পরিখা সৃষ্টি করিয়া থাকে। জঙ্গল কাটিয়া নালা খাদ সমান করিয়া তোপখানা ও অশ্বারোহীর চলাচলের উপযুক্ত রাস্তা প্রস্তুত করিলেও শুজার বাহিনীকে নাগাল পাওয়া অসম্ভব; বাংলার নৌবহর অনায়াসে শুজার সৈন্যকে গঙ্গার অপর পারে সরাইয়া লইতে পারে। শুজার রসদের ভাবনাও নাই, নদীপথ সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত, বেনারস জেলা হইতে বাদশাহী ফৌজ রসদ সংগ্রহ বন্ধ করিলে গাজীপুর বালিয়া জেলা হইতে নৌকায় রসদ আসিয়া পড়িবে। সুতরাং শাহশুজাকে বেকায়দায় যুদ্ধে নামাইবার সাধ্য বাদশাহী ফৌজের নাই; লড়াই করা না করা অপর পক্ষের মর্জি। আপাতত জঙ্গল কাটা ছাড়া উপায় না দেখিয়া মির্জা রাজা গোকুল উঝাইয়া নামক স্থানীয় এক ভোজপুরিয়া জমিদারকে বাদশাহী মনসবের লোভ দেখাইলেন, জমিদারের লোকজন জঙ্গল কাটিতে লাগিল; কিন্তু ইহা “বাইশ মণ তেল” পোড়াইবার ব্যাপার।
বাহাদুরপুরে এইভাবে সময়ক্ষেপ হইতেছে দেখিয়া সম্রাট ও দারা অত্যন্ত বিচলিত হইয়া পড়িয়াছিলেন। দক্ষিণ হইতে সংবাদ আসিল যশোবন্ত নর্মদাতীরে পৌঁছিবার পূর্বেই আওরঙ্গজেব সসৈন্য নদী পার হইয়া শাহজাদা মোরাদের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছেন। বিহার সুবা পাইয়াও শাহশুজা বেইমানী করিল দেখিয়া সম্রাট আগুন হইয়াছিলেন। আগ্রার দরবার-ই-আমে তিনি কুমার রামসিংহকে বলিলেন, রাজার কাছে লিখিয়া দাও, ওই “বেয়াদবে”র মাথাটা আমি চাই। দারা এক চিঠিতে এই কথা মির্জা রাজাকে জানাইয়া লিখিলেন—আমার কথায় বিশ্বাস না হয় আপনি কুমার রামসিংহের নিকট লিখিতে পারেন। যুদ্ধ পরিচালনা লইয়া পূর্ববৎ কুমার সুলেমান এবং রাজার অভিযোগ ও পালটা অভিযোগ দরবারে পৌঁছিতেছিল। সেখান হইতে কুমার সুলেমান পাইলেন মৃদু তিরস্কার; রাজার উপর বর্ষিত হইল প্রশংসা ও খোশামোদের গোলাপজল। এক চিঠিতে দারা লিখিলেন, শাহানশার মুখে দৈববাণী হইয়াছে, রাজা মানসিংহ যেমন অল্প সময়ে মির্জা হাকিমকে দমন করিয়াছিলেন সেইরূপ মির্জা রাজাও এই “বেয়াদব বখত”কে নাস্তানাবুদ করিবেন। উহার পরের দিন শাহজাদা আর এক চিঠি ডাকা চৌকি মারফৎ ছাড়িয়া জানাইলেন—গত রাত্রিতে আমি সুফী-তরিকায় ধ্যানে বসিয়া জানিয়াছি এবং নজুমী কেতাবে পাইয়াছি, একটা বড় রকমের জয়লাভ আপনার ভাগ্যে আছে; এই প্রকার গায়েবী ব্যাপার আল্লার হেদায়তে (নির্দেশে) আমি সত্য বলিয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
দারার অন্যান্য চিঠি পড়িয়া মনে হয়, এই সময়ে আলাহজরতের মাথা খারাপ হইয়া গিয়াছিল; আগ্রায় বসিয়া একদিন বলিতেছেন রাজা হতভাগার (শুজার) মুণ্ড কাটিয়া ফেলিয়াছেন; পরের দিন বলিতেছেন কাটা মাথা দরবারে রওনা হইয়া গিয়াছে! দারা রাজাকে জানাইলেন, শাহানশাহ্ আদেশ করিয়াছেন যদি শত্রুকে স্থানচ্যুত করিবার কোনও উপায় সম্বন্ধে আপনি মনস্থির না করিয়া থাকেন, ওইখানকার অবস্থা বিশদভাবে লিখিবেন, দরবার হইতে শাহানশাহ একটা পরিকল্পনা পাঠাইয়া দিবেন। আর এক চিঠিতে মির্জা রাজাকে জরুরি আদেশ প্রেরিত হইল — সামনে তোপখানা রাখিয়া যেন অবিলম্বে জঙ্গলবেষ্টিত আশ্রয়স্থানের উপর আক্রমণ করা হয়।
কচ্ছবাহপতি যুদ্ধ করিয়া চুল পাকাইয়াছেন। তিনি জানিতেন — বাংলার ফৌজ টিয়া পাখির ঝাঁক নহে, ফাঁকা আওয়াজে পলাইবে না। মালা জপ করিলেও ধূর্ততা এবং স্বার্থবুদ্ধিতে মির্জা রাজা পাকা মোগল; তাঁহার এক চোখ সামনে শুজার উপর, অন্য চোখ মালবে যশোবন্ত-আওরঙ্গজেবের উপর। কুমার সুলেমান বুঝিতে পারিলেন যুদ্ধের গরজ তাঁহার পিতার, মির্জা রাজার নহে।
দশ
শাহশুজা বাহাদুরপুরের নিকট গঙ্গাতীরে ২৫শে জানুয়ারি হইতে একুশ দিন নিজের সুরক্ষিত শিবিরে নিশ্চিন্ত মনে অভ্যস্ত আরামেই দিন কাটাইতেছিলেন। তিনি বাংলা দেশ হইতে মশারি (পশাদান) লইয়া গিয়াছিলেন; তাঁহার আমীর ওমরাহ সিপাহী বরকন্দাজ কেহই বোধ হয় সফরে মশারি ফেলিয়া যায় নাই। মশারির ভিতর নাকি পাঞ্জাবী হিন্দুস্থানীর দম আটকাইয়া যায়; কিন্তু মোটা কম্বলে নাক মুখ গুঁজিয়া থাকিলে শ্বাসকষ্ট হয় না। শাহশুজার ফৌজে মোগল পাঠান খোট্টা বাংলা মুলুকে সতের বৎসর মশার কামড় খাইলে বাহাদুরপুরে যুদ্ধ করিতে আসিতে হইত না। বাংলার মাটির গুণে পেশওয়ারী পাঠান, দুবে চোবে খোট্টা ভোজপুরিয়া সাত বৎসরেই মোলায়েম “বঙ্গালী” হইয়া যায়, সতের বৎসরে শুজার সিপাহী নিশ্চয়ই “বাঙালি” হইয়া গিয়াছিল, বাঙালির “মশার মশারি” কি বস্তু তাহারা বুঝিয়াছিল; বিলাসী ও দরদী শাহজাদার দৌলতে তাঁহার অনুযাত্রীবর্গের কাছে ঢাকা-রাজমহল এবং লড়াইয়ের ডেরার মধ্যে গঙ্গাপারের কনকনে শীত ছাড়া আর কোনও তফাত মালুম হইবার কথা নয়। কয়েক দিন পরেই যুদ্ধের গরমে ঠাণ্ডা পড়িয়া গিয়াছিল, জঙ্গল কাটার আওয়াজ কান সহা হইয়া গেল। পাহারার ব্যবস্থায় শুজা কোনও ত্রুটি করেন নাই; জঙ্গলের আড়ালে তাঁহার অগ্রবর্তী ঘাঁটি হইতে সিপাহীগুলি শত্রুর গতিবিধির উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখিত, রাত জাগিয়া পাহারা দিত, যদিও কোনও নৈশ আক্রমণ সম্ভব ছিল না। যে স্থানে এখনও দিনের বেলায় ছাগল ছাড়া কোনও জন্তু পথ পায় না সেখানে রাতের মানুষ কি করিবে? শাহশুজা যুদ্ধ করিবার জন্য আদৌ ব্যস্ত ছিলেন না; সময় ও স্থান দুই তাঁহার অনুকূল। জঙ্গলের মধ্যে বাংলার পায়দল সিপাহী ও হাতি, জলে বিরাট রণতরী বহরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার শক্তি বাদশাহী ফৌজের ছিল না; সুতরাং জঙ্গল সাফ করিতে করিতে হয় বর্ষা নামিয়া আসিবে, না হয় আওরঙ্গজেব-মোরাদকে ঠেকাইবার জন্য জয়সিংহের ডাক পড়িবে—এই জন্য কোনও রকমে কালহরণ করাই ছিল শুজার উদ্দেশ্য; কিন্তু সময়ের সহিত না দৌড়াইয়া বিপক্ষের উপায় নাই।
বৃদ্ধ মির্জা রাজার অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকিবার কায়দা কুমার সুলেমানের আদৌ মনঃপূত ছিল না, অথচ তাঁহার অমতে কিছু করিবার উপায় নাই। এত দিন সুলেমান নিশ্চেষ্ট বসিয়া থাকেন নাই। তিনি বিশ্বাসী গুপ্তচরসমূহ শাহশুজার শিবিরে নিযুক্ত করিলেন এবং স্বয়ং তাঁহার অনুচরণগণকে লইয়া জঙ্গলের মধ্যে চোরা রাস্তা বাহির করিবার উদ্দেশ্যে ওই এলাকায় এখানে-সেখানে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। জঙ্গলে অসমসাহসিক চোরা হামলায় রোহিলা পাঠান ময়দানের হিন্দুস্থানী সওয়ার অপেক্ষা বেশি ওস্তাদ; এবং দেলের খাঁ রাজা অপেক্ষা বেশি নির্ভরযোগ্য—এইজন্য সুলেমানের যাহা কিছু পরামর্শ তাহা খুব সম্ভব দেলের খাঁর সঙ্গেই চলিত। সুলেমানের গুপ্তচর সংবাদ আনিল দিনদুপুর পর্যন্ত ঘুমাইয়া থাকাই শাহশুজার অভ্যাস, রাত্রে চৌকি পাহারার বন্দোবস্ত থাকিলেও কোনও উপরিস্থ সেনানী সান্ত্রী-সিপাহীর থানা ঘুরিয়া দেখেন না; প্রহরীরা ভোর হইলেই ঘুমাইয়া পড়ে।
বাদবাকি সহজেই অনুমেয়। শুজার সেনানায়ক ও দরবারী বাহাদুরগণ বোধ হয় হুজুরের সহিত তাল রাখিয়া ঘুমাইতেন; সিপাহীরা চব্বিশ ঘণ্টা কোমর বাঁধিয়া মশার সহিত যুদ্ধ করা বুদ্ধির কাজ মনে করিত না। বাহাদুরপুরের আশপাশ হইতে শুজার শিবির পর্যন্ত পায়ে হাঁটিয়া যাইবার পথ ছিল না; কয়েক মাইল পূর্বদিকে যেখানে জঙ্গল প্রায় শেষ এবং গঙ্গার গতি কিঞ্চিৎ উত্তরমুখী হইয়া বাঁক সৃষ্টি করিয়াছে ইহাই বোধ হয় শুজার শিবিরের পশ্চাদভাগের খিড়কি-দরজার মতো ছিল। দরবারের তাগিদ ও কুমার সুলেমানের অনুরোধে মির্জা রাজা বাহাদুরপুর হইতে আসন গুটাইয়া অন্যত্র ছাউনি করিতে রাজি হইলেন। ১৩ই ফেব্রুয়ারি (১৬৫৮ ইং) সন্ধ্যাবেলা বাদশাহী শিবিরে ঘোষণা করা হইল দিনভোরে সকলকে ডেরা উঠাইয়া কুচ করিবার জন্য প্রস্তুত থাকিতে হইবে। (চলবে)