সৌম্য সিংহ
মুখেচোখে একটা অদ্ভুত সরলতা। হাসির মধ্যেও কেমন যেন উঁকি দিয়ে যেতো অনেক পেছনে ফেলে আসা সেই শৈশব। কথাবার্তাও খোলামেলা, ছিল না কোনও আরোপিত ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন। এই গুণই এক বিশেষ মাত্রা দিয়েছিল তাঁর অভিনয়-শিল্পকে। বাঁধাধরা ছকের বাইরে বেরিয়ে এসে নিজস্ব স্টাইলে সহজ-সরলভাবে ক্যামেরার মুখোমুখি হতে পছন্দ করতেন তিনি। রোমান্টিক নায়ক থেকে শুরু করে হি-ম্যান, সব চরিত্রেই সমান স্বচ্ছন্দ, সাবলীল। রোমান্টিক চরিত্রে এক সময়ে তো তাঁকে মহানায়ক উত্তমকুমারের যোগ্য উত্তরসূরি বলে বর্ণনা করতেন অনেকেই। মঙ্গলবার ভোররাতে আচমকাই অতীত হয়ে গেলেন সেই তাপস পাল। থেমে গেল হৃৎস্পন্দন। আরব সাগরের তীরে ফিল্মনগরী সুদূর মুম্বাইয়ের এক বেসরকারি হাসপাতালে অবিশ্বাস্যভাবে ঘনিয়ে এলো তাঁর জীবনের অন্তিম মুহূর্ত। বড্ড তাড়াতাড়ি,মাত্র ৬১ বছর বয়সে। মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সোমবার কলকাতায় ফেরার সময়ই অস্বস্তিবোধ করছিলেন তিনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ।
শোকাহত মুখ্যমন্ত্রী
শুধু সিনেমা বা যাত্রায় অভিনয় নয়, তার বাইরেও তাপস পালের ছিল এক সফল রাজনৈতিক জীবন, জনপ্রতিনিধির জীবন। প্রেরণা অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরই আগ্রহে ২০০১ এবং ২০০৬-তে আলিপুর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যানারে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ২০০৯ আর ২০১৪-র পরপর দু’বার কৃষ্ণনগর কেন্দ্রের মানুষ তাঁকে লোকসভাতেও নির্বাচিত করেছিলেন। তাপস পালের মৃত্যুতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোকাহত। তাঁর ভাষায়, ‘তাপসের প্রয়াণে অভিনয় এবং রাজনৈতিক জগতের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।’ তাঁর আত্মীয় পরিজনদের সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে রাজ্য সরকার বিশেষ চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত করেছিল তাপস পালকে। এ ছাড়া ফিল্ম ফেয়ার এবং কলাকার পুরস্কারও পেয়েছিলেন তিনি।

বাকরুদ্ধ স্টুডিও পাড়া
প্রিয় নায়কের অকাল প্রয়াণে কার্যত বাকরুদ্ধ স্টুডিও পাড়া। চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর প্রতিক্রিয়া, ‘ভাইকে হারালাম’। কান্নায় গলা বুজে আসছে দেবশ্রী রায়ের। ঋতুপর্ণার ভাষায়, ‘ঐ হাসি ভোলা যায় না’। রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন,উত্তম কুমারের পরে অন্যতম সেরা অভিনেতা তাপসদা। দেব বলেছেন, আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে তাপসদার অভিনয় দেখে। ‘উত্তরা’ এবং ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’-এর কথা উল্লেখ করে পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বলেছেন, এ যুগের অন্যতম সেরা অভিনেতা তাপস পাল। তাঁকে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যেতে পারতো।

হারানো সেই দিন
ডা. গজেন্দ্র পাল। চাকরি সূত্রে কখনও বর্ধমানের উখড়া-লাউদোহায়, কখনও আবার হুগলির চন্দননগরে। ডাক্তার বাবার হাত ধরে তাই নায়কেরও শৈশব কেটেছে এই দু’জায়গাতেই। মাঝে কিছুদিনের জন্য থাকতে হয়েছিল দিল্লিতেও। ডিফেন্স কলোনির কাছে ওয়াজির নগরে মাসির বাড়িতে। চন্দননগর থেকে হুগলি মহসিন কলেজে সাইকেলে যাতায়াতের পথেই মানুষের নজর কাড়তো তাঁর হাসিমাখা মুখটা। কীভাবে যেন একদিন নজরে পড়ে গেলেন পরিচালক তরুণ মজুমদারেরও। জন্ম নিল মিষ্টি প্রেমের ছবি ‘দাদার কীর্তি’। প্রথম আবির্ভাবেই সুপার হিট প্রচলিত ধারণার বাইরে একটু অন্য ঘরানার নায়ক তাপস পাল। সহজ, সরল, নিষ্পাপ এক চরিত্র। নায়িকার ভূমিকায় মহুয়া রায়চৌধুরী, ছিলেন দেবশ্রীও। ১৯৮০-র শেষের দিকে মুক্তি পাওয়া এই ছবি ৩/৪ মাস ধরে চলেছিল বেশ কিছু হলে। কিছুদিনের মধ্যেই তাপস-মহুয়া জুটির মনমাতানো ছবি ‘সাহেব’। ফুটবলারের ভূমিকায় নায়ক। দু’জনে অবশ্য এবারে ভাইবোনের ভূমিকায়। না, আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাপসদাকে। ‘অনুরাগের ছোঁয়া’, ‘পারাবত প্রিয়া’-সবেতেই উপচে পড়া ভিড়। ৮০-র দশকেরই মাঝামাঝি তরুণ মজুমদারের ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’র অকল্পনীয় সাফল্য আবারও প্রমাণ করলো প্রতিভা বাছতে মোটেই ভুল করেননি পরিচালক। নায়িকার ভূমিকায় অবশ্যই দেবশ্রী রায়। মহুয়ার অকাল মৃত্যুর পরে জুটি বলতে তখন যেন শুধু তাপস-দেবশ্রীই। ‘সুরের আকাশে’ ছবিতে ‘কথা দিলাম আমি কথা দিলাম’ গানের সঙ্গে তাপস-দেবশ্রীর সেই দৃষ্টি বিনিময়ের মুহূর্তগুলো সত্যিই ভোলা যায় না। যেমন ভোলা যায় না ‘গুন গুন সুরে মৌমাছি গানে ছন্দ দোলায়’ গানে তাপস-মহুয়ার প্রেমের দৃশ্য। ‘আশীর্বাদ’ ছবিতে। মনে পড়ে ‘গুরুদক্ষিণা’র কথা? পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী সদর্পে বলতেন, ‘আমার জীবনের সব থেকে সফল বাণিজ্যিক ছবি গুরুদক্ষিণা।’ যাকে বলে সুপার-ডুপার হিট তাপস পাল-শতাব্দী রায় জুটি। অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে মাধুরী দীক্ষিতের অভিনয় জীবনে প্রথম নায়ক কিন্তু তাপস পালই। এই হিন্দি ছবির নাম ‘অবোধ’। কিন্তু শোনা যায়, তরুণ মজুমদারের কথায় বলিউডের মায়া ছেড়ে তাপস ফিরে এসেছিলেন টালিগঞ্জেই। পুরোপুরি মন দেন এখানেই। সফল ছবির সংখ্যা ১০০ পার হয়ে ১৫০ না তারও বেশি, হিসেব রাখতেন না নায়ক নিজেই।
দিদির ডাকে
ব্যাপারটা শুনেছিলাম তাপসদার মুখেই। দিনটা ছিল ৩১ ডিসেম্বর, সালটা সম্ভবত ২০০০। তাপসদা তখন থাকতেন রাসবিহারীর ফ্ল্যাটে। মেয়ে সোহিনীর জন্মদিনে তাঁকে আশীর্বাদ করতে এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এসেছিলেন সস্ত্রীক সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও। গল্পগুজবের মাঝে হঠাৎ দিদি বললেন, সামনের বিধানসভা ভোটে কিন্তু তোমাকে দাঁড়াতে হবে তাপস, জিতে এমএলএ হতে হবে। মানসিকভাবে তখন প্রস্তুত না থাকলেও দিদির আদেশ মাথা পেতে নিলেন সেই সময়ের বাংলা ছবির সবথেকে সফল নায়ক। তাপসদা বারবারই বলতেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত সৈনিক হিসেবে মা-মাটি-মানুষের সেবাতেই কাটিয়ে দিতে চাই বাকি জীবনটা।’
আনন্দের স্রোতে
খুব হৈ হুল্লোড়-আড্ডা পছন্দ ছিল তাপসদার। গলফ ক্লাব রোডে নিজের আবাসন চত্বরে রঙ খেলার দৃশ্য দেখলে মনে হতো বুঝি কোনও শিশুর দোলের আনন্দ-উল্লাস। কখনও হাজির শতাব্দী আবার কখনও দেবশ্রী। নাচ-গান, ফ্ল্যাটে সত্যনারায়ণ পুজো তো আছেই। একবার তো দোলের আগের রাতে এলেন মিঠুন চক্রবর্তী। দুর্গাপুজো এলে নায়ককে পায় কে। পাড়ার পুজো, আবাসনের পুজো সবেতেই মধ্যমণি। সম্প্রতি দেবী আরাধনা শুরু করেছিলেন নিজের ফ্ল্যাটেও। গল্প-আড্ডায় পৌঁছে যেতেন শৈশবে। লাউদোহা গ্রামে জীবনের প্রথম পুজোর স্মৃতি, বাবার কাছে বাজি কেনার বায়না,দিল্লির পুজোয় ষষ্ঠীতে জমজমাট আনন্দমেলা আরও কতো কি এসে ভিড় জমাতো নায়কের আড্ডায়। শুধু পুজোর সময় কেন, সময় পেলেই আড্ডা বসাতেন বাড়িতে। সঙ্গে ডান হাতের আয়োজনও। ২৯ সেপ্টেম্বর জন্মদিনেও ঘরোয়া আয়োজন। চন্দননগরের ছোটোবেলার বন্ধু স্কুলের সহপাঠী অধ্যাপক ডা. গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় বিশিষ্ট স্নায়ুরোগ-বিশেষজ্ঞ। তাঁকে কাছে পেলে ছাড়তেই চাইতেন না তাপস। ফোনেও কথার যেন কোনও শেষ নেই। বন্ধুর মৃত্যু সংবাদে চোখের জল লুকোতে পারেননি বিশিষ্ট এই চিকিৎসকও। বললেন, ‘বড় হয়ে এতো কাছের এক বন্ধুকে হারালাম এই প্রথম।’

নরম মানুষ, ভালোবাসার মানুষ
একদিকে যেমন খুব নরম মনের মানুষ ছিলেন তাপস পাল, তেমনি অভিমানীও ছিলেন বেশ। একবার এক বেসরকারি চ্যানেলের নববর্ষ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিপর্বে তিনি গাইছিলেন, ‘চরণ ধরিতে দিওগো আমারে’। চোখ দিয়ে হঠাৎ জল গড়িয়ে পড়লো তাঁর। পরে কারণ জানতে চাইলে ম্লান হেসে বললেন,আসলে মহুয়ার কথা মনে পড়ে গেল। একান্ত আড্ডায় একবার বলেছিলেন, ‘মান-অভিমান আমারও আছে কিন্তু ভুলে যেতে চাই সে সব। আসলে ভালোবাসাটাই শেষ কথা।’
শেষ ফোন
এই তো সেদিন সকালে। ফোনে কথা হলো তাপসদার সঙ্গে। অনেক দূরে। তবুও গলায় সেই ভালোবাসা, সেই আন্তরিকতার ছোঁয়া। বললেন, ‘মুম্বইতে আছি। দশদিন পরে ফিরবো। গিয়ে দেখা হবে।’ তখনও কি জানতাম, এ কথাই আমার সঙ্গে শেষ কথা!