
দক্ষিণ ভারত আমাকে বারবার কেন টানে জানি না। সেকি নারকেলসুপুরি গাছের ছায়া, মন্দিরে চন্দনগুগ্গুলের সুগন্ধ, বেলাভূমিতে আছড়ে পড়া সমুদ্রের ঢেউ নাকি কৈশোরে পড়া শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’-র মায়াময় জগৎ!
তা বলে কি ছন্দপতন হয় না! ট্যাক্সি ড্রাইভার সুযোগ বুঝে চালাকি করে। মন্দিরের মৃদঙ্গবাদক মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে দুটো পয়সার আশায়। কালো পাথরের সুরসুন্দরীর ভাঙা নাক বীভৎস দেখায়! আমি ভাবি এহ বাহ্য।
“এই বুঝি তল পেলে, ফের হারালে,
প্রয়োজনে ডুবে যাও।
গভীরে যাও, আরো গভীরে যাও”।

সাতশ সিঁড়ি ভেঙে কর্ণাটকের শ্রবণবেলগোলার গোমতেশ্বরের মূর্তির সামনে পৌঁছে দেখি পুরোহিত কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা গুনছে। মন আর চোখ দুইই আহত। তবে সাতান্ন ফুট উঁচু, আনুমানিক ১০৪৫ বছরের পুরোনো গোমতেশ্বরের অটুট একশিলা মূর্তিটির বিশালত্বের পাশে এসব যেন তুচ্ছ। সময়ের ঊর্দ্ধে দাঁড়ানো মূর্তিটি এক প্রতীক। যেন সদ্য সেটি পাথর কুঁদে তৈরি হয়েছে। বিন্ধ্যগিরির পাথর কেটে বাহুবলী গোমতেশ্বরের কাছে পৌঁছানোর যে পথ, তাতে যুগের পর যুগ ধরে খালি পায়ে চলেছে গোটা ভারতবর্ষ। পায়ে পায়ে মসৃণ হয়েছে সে সিঁড়ি। আমি একবার হড়কালাম। পড়তে পড়তে আমাকে যে ছেলেটি ধরে নিল, সে কোলাপুরের। গোটা পরিবার নিয়ে এসেছে গোমতেশ্বরকে দর্শন করতে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তোমরা জৈন?
— না তো! আমরা খটিক। মাংস বেচি।
কি আশ্চর্য। মুখে কাপড় বাঁধা অহিংস জৈন সন্ন্যাসীদের তীর্থঙ্করকে দেখতে এসেছে এক কসাই পরিবার!

শ্রবণবেলগোলায় বিন্ধ্যগিরি থেকে ঢিল ছেঁড়া দূরত্বে চন্দ্রগিরি। গোমতেশ্বরের মূর্তি দেখার জন্যে ১৪০০ সিঁড়ি ওঠানামা করে অনেকেরই চন্দ্রগিরিতে যাওয়ার উৎসাহ থাকে না। দেড়শ দু’শ সিঁড়ি পেরিয়ে জঙ্গল পাহাড়ের মধ্যে সেখানে আছে জৈন সন্ন্যাসীদের অতীত বসদি বা গুহা। স্বয়ং চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নাকি চন্দ্রগিরিতেই জীবনের শেষ সময়ে সমস্ত পার্থিব আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি, অন্নজল ত্যাগ করে ধীরে ধীরে মুক্তি বা মৃত্যুর পথে এগিয়ে ছিলেন। কতকাল আগে ভারত দেখিয়েছিল দেহের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে মৃত্যুকে স্বীকার করার এক ভিন্ন সাধনার পথ।
চন্দ্রগিরি পাহাড় থেকে কলকল করতে করতে নামছিল কলেজে পড়া কয়েকটি স্থানীয় মেয়ে। আমি জিজ্ঞেস করলাম
— ওপরে কেউ আছে!
— না ম্যাডাম, কেউ নেই। আপনি একলা যাবেন না জংলি জানোয়ার থাকতে পারে।
আমি প্রায় একশ সিঁড়ি উঠে ভয়ে ক্ষান্ত দিলাম। জৈন সাধুদের সাহস, সততা আমার নেই। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শেষ জীবনের স্মৃতিচিহ্নকে ছুঁয়ে দেখা অধরাই রয়ে গেল।

এমন অধরা থাকে অনেক কিছু, অনেক প্রশ্নের উত্তর। কর্ণাটকে বেলুড়ের চেন্নাকেশব মন্দিরের মদনিকার দেহ বিভঙ্গে জড়ানো পোশাকে সূক্ষ্ম লতাপাতার নক্সা। শালভঞ্জিকার অলংকারে কত না বাহার! এই গহনা, অলংকার তিলে তিলে খোদাই করে, পরম যত্নে শিল্পীরা এই সুর সুন্দরীদের, দেবদেবীদের সাজিয়েছেন। তাঁরা কি কোনোদিন তাঁর স্ত্রী বা প্রেয়সীর জন্যে এমন অপূর্ব গহনা, উত্তরীয় কিনে এনেছেন? দীর্ঘদিন মন্দিরে কাজ করে বাড়ি ফেরার সময় এই উপহারে তাঁদের বিরহিণী স্ত্রী কতটা খুশি হয়েছিলেন সে খবর ইতিহাস দেয় না। যদিও প্রায় তিনশ বছর ধরে তৈরি হওয়া এ মন্দিরে প্রধান শিল্পীদের নাম খোদিত আছে। ভেলাপুরী ততদিনে লোকমুখে বেলুড় হয়েছে। চেন্নাকেশবস্বামী বা বিষ্ণু মন্দিরে দশ অবতার রয়েছেন বিভিন্ন ভঙ্গিমায়। সেখানে নৃসিংহ অবতারের পাশে তাঁর অর্ধাঙ্গিনী। আমি অবাক হতে আমার ভ্রমণসঙ্গিনী বললেন নৃসিংহ অবতার বলে কি তাঁর গার্হস্থ্য জীবন হতে পারেনা? হতেই পারে! তবে এমন ভয়ঙ্কর মূর্তির পাশে তাঁর সঙ্গিনীটি বড়ই শ্রীমন্ডিত, সুন্দর। একি শুধুই শিল্পীর কল্পনা না রাজার আদেশ?

শিল্পীর স্বাধীনতা না থাকলে বেলুড় এবং হ্যালেবিদুর মন্দিরে দেবদেবী, রাজার যুদ্ধযাত্রা, পশুপাখির সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অনুপুঙ্খ প্রতিরূপ দেখা যেত না। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের চার পুরুষার্থ দেবালয়ের পাথরে এসে মিশেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনবোধের সঙ্গে।

এই বেলুড়, হ্যালেবিদু, শ্রবণবেলগোলা মিলিয়ে কর্ণাটকের হাসান বা হোয়েসাম্মাদেবীর জেলাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। হাসানের জেলা শহরে
১৮৬০ সালে নির্মিত একটি পুরনো চার্চ আছে। সকাল সকাল আমাদের চালক দর্শন সেটি দেখাতে নিয়ে গেল। বর্ষায় হেমাবতী নদীর ব্যাক ওয়াটারে আধো ডুবন্ত গথিক গীর্জার ইতিহাস জানায় একসময় এখানে ফরাসীরা এসেছিল। এখন দক্ষিণী সিনেমাওলারা এই দৃশ্যকে তাদের কাজে লাগায়।

সন্ধ্যেয় হাসান শহরে দেখলাম মহাবরলক্ষ্মী পুজোর ব্যস্ততা। বাজার সরগরম। মন্দির সেজেছে আলোকমালায়। কলাগাছ আরো কত কি পুজোর উপকরণ কিনে দু-চাকার বাহনে চলেছেন স্বামী-স্ত্রী। হায়দ্রাবাদের গায়ত্রী বলেছিল এই ব্রতে শাশুড়ি তার পুত্রবধূকে একটি গয়না নিদেনপক্ষে একটি শাড়ি দেয়। কর্ণাটকে এ নিয়ম আছে কিনা বলতে পারব না। তবে শাশুড়ি বৌয়ের সম্পর্কের জটিলতা কাটাতে এ এক ভালো উদ্যোগ। একটি গয়না বা শাড়ি, সম্পর্কের কত অদৃশ্য ভাঁজই না কখনও এমন উপহারে মসৃণ হয়ে যায়!