
নকশালবাড়ি নামটি শুনলেই নকশাল আন্দোলনের কথা মনে পড়ে যাবে। অথচ উত্তরবঙ্গের এই জনপদটির নামটি কোথা থেকে এল, তার কোনও সদুত্তর কোথাও পাইনি। এটিমোলজি তো লোকে সিরিয়াসলি নেয় না আজকাল।
নকশালবাড়ির নকশাল শব্দটির ব্যুৎপত্তি কী হতে পারে, তা নিয়ে কোনও আলোচনা কোথাও নেই। তবে ডুয়ার্স, তরাই অঞ্চলের শাল গাছের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতেই পারে। আমাদের জানা আছে, নৌকা তৈরিতে শাল কাঠের ব্যবহার খুব প্রাচীন। নৌকার কাঠামো নির্মাণে এর ব্যবহার হয়, যেহেতু শাল কাঠ খুবই শক্তপোক্ত।বিশেষ করে জলে নিমজ্জিত অংশের নির্মাণে এর ব্যবহার বহুলপ্রচলিত। নৌকা তৈরির শাল কাঠই তাই ‘নৌকাশাল’ তথা ‘নৌকশাল’ তথা নকশাল বলে অভিহিত হত।
নৌকা তৈরির শাল কাঠের বাড়ি বা গুদাম ও তৎসংলগ্ন শালবাগান, — এই থেকেই নকশালবাড়ি নামটির সৃষ্টি হয় বলে আমার বিশ্বাস।
পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার অন্তর্গত তরাই অঞ্চলের নকশালবাড়ি ব্লকে ঘন প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও চা বাগানের পাশাপাশি বিস্তীর্ণ শালবন রয়েছে। এখানকার তারাবাড়ি এবং চেঙ্গা নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে ঐতিহাসিকভাবেই এই শালবন বা শালগাছের জঙ্গল বিস্তৃত। উত্তরবঙ্গের এই তরাই অঞ্চলটি সাধারণত ঘন শালবনের জন্যই বিশেষভাবে পরিচিত।
দেবেশ রায়ের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’-এ শালবাগানের বিবরণ উত্তরবঙ্গের আদিম ও অকৃত্রিম প্রকৃতির এক জীবন্ত দলিল হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বাঘারুর জীবন ও চেতনার সঙ্গে এই অরণ্য বা শালবাগান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
উপন্যাসে শালবাগানের বিবরণ মনোমুগ্ধকর। দেবেশ রায় শালবাগানকে কোনো কৃত্রিম বা সাজানো বন হিসেবে দেখাননি। এটি উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলের এক গভীর, আদিম এবং রহস্যময় অরণ্যভূমি। শালগাছগুলোর দীর্ঘ ও সোজা অবয়ব, তাদের ঘন পাতার আচ্ছাদন এবং বনের ভেতরের অন্ধকার ও আলোর খেলা এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে।
উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র বাঘারুর জন্ম ও বেড়ে ওঠার সঙ্গে এই জঙ্গল জড়িয়ে আছে। শালবাগান তার কাছে কেবল গাছপালার সমাহার নয়, এটি তার আশ্রয়স্থল এবং তার অস্তিত্বের অংশ। সভ্য সমাজের জটিলতা, শোষণ ও জোতদারদের অত্যাচার থেকে দূরে বাঘারু এই অরণ্যের বুকেই শান্তি খুঁজে পায়।
‘বাঘারুর বৃক্ষকর্তন’ পর্বের বিবরণ, — “বাঘারু ডান দিকে ঘুরে পাড় দিয়ে জঙ্গলের আরো ভেতরে চলে যায। সেখানে একটা মাঝারি সাইজের শালগাছ জলের মধ্যে পড়ে গেছে কিন্তু তার শেকড়টা এখনো মাটিতে। বাঘারু বাঁ-হাত দিয়ে কুড়ালটা তার নেংটির পেছনে গুজে নেয়, কুড়ালের কাঠটা তার মেরুদণ্ডে খাঁজের সঙ্গে মিশে যায় আর কুড়ালটা একটু আলগা হয়ে থাকে। নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলটার মাঝখানের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে সে বাণ্ডিলটাকে বাঁ কাঁধে তুলে নেয়; কাঁধে পুরোটা ওঠে না, বাহুতে ঝুলে থাকে। তারপর সে শালগাছটার উৎপাটিত শেকড়টা ধরে টেনে একবার আন্দাজ নিয়ে গাছটার কাণ্ডে পা দেয়- সেই কাণ্ডের নীচেই তিস্তার জল। বাঘারু বাঁ-পাটা কাণ্ডের ওপর দেয় কিন্তু ডান পা-টা মাটি থেকে তুলতে গিয়ে বোঝে শরীরের পুরো ওজনটা এক ধাক্কায় সে বাঁ-পায়ের ওপর নাও তুলতে পারে। সে বাঁ-পাটা নামিয়ে নেয়।”
‘বাঘারুর বিষাদ’ পর্বে পাই, — “সকাল আরো কিছুটা বাড়তেই বাঘারু মাচানে বসে দেখতে পায়, তার ডান হাতের, মানে তিস্তার পশ্চিম দিকের, পাড়। বাঘারু বিমর্ষ হয়ে বসে ছিল তার মাচানে — দুই হাঁটু দুই হাতে জড়িয়ে, তার লাঠিটাকে পাশে শুইয়ে। গলায় নাইলনের দড়ির বাণ্ডিল আর পেছনে কুড়ালিয়াখানও ছিল — কিন্তু বাঘারুর বসার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল সে-সব আর সে কখনোই ব্যবহার করবে না। না বুঝে, না ভেবে অতগুলো পাখিকে গাছ থেকে ঝড়ের বাতাসের ভেতর উড়িয়ে দিয়ে যে সে মেরে ফেলল, তারপর থেকে বাঘারুর আর নডাচড়া করে না। প্রথমে ত তার মনে হয়েছিল গাছের সবগুলো পাখিকেই সে উড়িয়ে দিয়েছে। পাখিগুলো এ বাতাসে ভেসে যেতেও পারল না, গাছগুলোর ওপর ফিরে আসতেও পারল না। তারপর অবিশ্যি বাঘারুর খানিকটা সান্ত্বনা জুটেছে — এই শালগাছটাতে ও আরো তিন-তিনটি গাছে আরো পাখি থেকে গেছে দেখে। একটা ঝাঁকই অমন আচমকা উড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আর বাঘারু পাখিদের সঙ্গে নেই। পাখিরা ডালপালার ভেতর দিয়ে-দিয়ে ওড়াউড়ি করতে-করতে যদি জলে পড়ে ভেসে যায়, যাক। তাদের বাঁচানোর চেষ্টা বাঘারু আর করতে যাচ্ছে না। এমন-কি, তাকে যদি এ গাছ থেকে ও গাছে যাতায়াত করতে হয় — তাহলেও সে পাখিদের দিকে ফিরে তাকাবে না। সে না-তাকালেই পাখিগুলো তাদেব মত উড়বে, থাকবে, ভাসলে ভাসবে, মরলে মরবে। বাঘারু তাই তার মাচানের ওপর স্রোতের দিকে মুখ করে দুই হাতে দুই হাঁটু জড়িয়ে দেখে তার ডান হাতে তিস্তার পশ্চিমপাড়ের ফরেস্টটা দেখা যাচ্ছে আর মাঝেমধ্যে বাঁধ, মাঝেমধ্যে বাড়িঘর।”
লেখক দেবেশ রায় শালবাগানের নীরবতা এবং সেই নীরবতার ভেতরের নিজস্ব শব্দ বা ধ্বনিকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, শুকনো পাতার মড়মড় আওয়াজ, বন্য জীবজন্তুর ডাক এবং তিস্তা নদীর দূরবর্তী গর্জন — সব মিলিয়ে শালবাগান যেন এক জীবন্ত সত্তা, যা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে।
উপন্যাসে শালবাগান কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হিসেবে থাকেনি, তা সময়ের পরিবর্তনেরও প্রতীক। একদিকে রয়েছে আদিম বন্যতা ও রাজবংশী লোকজীবনের সহজ-সরল ধারা, অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক তথাকথিত ‘উন্নয়ন’, যা এই অরণ্যকে কেটে ধ্বংস করতে চায়। শালবাগানের ক্রমসংকোচন ও তার ওপর সভ্যতার আগ্রাসন উপন্যাসে এক গভীর ট্র্যাজেডি হিসেবে ধরা দিয়েছে।
দেবেশ রায়ের আকাদেমিপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’-এ শালজঙ্গলের উপস্থিতি, শাল ও অন্যান্য গাছকে কেন্দ্র করে বাঘারুর জীবনযাত্রা, নকশাল শব্দটির ব্যুৎপত্তিতে নৌকা তৈরির শাল কাঠ তথা শাল গাছের তত্ত্ব জোরদার করে। শালগাছের ঐতিহ্য আজকের নয়, পৌরাণিক যুগে শালকে অশোকবৃক্ষও বলা হয়েছে। পৌরাণিক অশোক হোক বা শালই হোক, উত্তরবঙ্গের নদীমাতৃক জীবনে নৌকানির্মাণের কাঠ এই গাছ থেকেই পাওয়া যেত। সঙ্গে অন্য কাঠও থাকত। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। ‘দিমাগী নকশাল’ দরজায়, জানালায়, খাটে, আসবাবপত্রে, খুঁটিতে, তার অহংকারী অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে।