৬৯. পূর্ববর্তী বছরগুলোর ৭৯,৭৪,০৬৫ টাকার বকেয়া পাওনার কথা মাথায় রেখেই কাসিম আলীর সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত তৈরি হয়েছিল; এই বন্দোবস্ত সূত্রে আদায় হয় মাত্র ১,০৪,৭৯৩ টাকা, ফলে তাঁর মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫,৬০,৯৯১ টাকা।
৭০. তবে এই বিবরণীতে ১১৬৯ সালের কেবল প্রথম সাড়ে নয় মাসের আদায়ের হিসাবই তুলে ধরা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু জেলার ক্ষেত্রে সম্বৎসরের আদায়ের হিসাব সংক্রান্ত বিচ্ছিন্ন নথিপত্র অবশ্যই সংরক্ষিত থাকবে; কিন্তু আমার মনে হয় না সমস্ত ‘দেওয়ানি’ এলাকার জন্য এমন পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র কোথাও আদৌ রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ হিসাব যে কটা জেলায় পাওয়া যায়, তার মধ্যে দিনাজপুর অন্যতম—দিনাজপুরের আদায়কে ভিত্তি ধরে ১১৬৯ সালে কাসিম আলীর বন্দোবস্ত অনুযায়ী সম্ভাব্য আদায়ের তুলনামূলক হিসাব করা সম্ভব হয়, তবে সেই অঙ্ক সারসংক্ষেপে উল্লিখিত অর্থের প্রায় দ্বিগুণ হওয়া উচিৎ; অর্থাৎ পুরো বছরের জন্য সেই পরিমান গিয়ে দাঁড়ানোর কথা ১,৩১,২১,৯০৩ টাকা। অবশ্য এই অনুমান আমাদের আলোচনায় খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
৭১. নন্দকুমারের আমলে ১১৭০ বঙ্গাব্দে নির্ধারিত বন্দোবস্ত একটা ‘আসল’ বা মূল আদর্শ হারের ওপর ভিত্তি করে এবং তার সাথে সুবাদারি ‘আবওয়াব’ বা করগুলো জুড়ে তৈরি করা হয়েছিল — মোট অর্থের পরিমাণ ছিল ১,২৮,৯১,৫০০ টাকা; মূল নথিপত্রে একে ‘জমা-ই-ইস্তিমরারি’ বা স্থায়ী নিরূপিত রাজস্ব বলা হয়েছে — এটা সম্ভবত মীর কাসিমের তদন্তে পাওয়া ‘কেফায়াত’ বা অতিরিক্ত মুনাফার বাইরে আলাদা সত্তা হিসেবে চিহ্নিত। কাসিম আলীর বন্দোবস্তের বিস্তারিত হিসাবে ‘সারফ-সিক্কা’ (মুদ্রা বিনিময়জনিত বাট্টা) বাবদ ১২,৩০,৫৬১ টাকা উল্লেখ ছিল; নন্দকুমার তাঁর তদন্তে পাওয়া সেই বাড়ানো রাজস্বের দাবি ত্যাগ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মিস্টার গ্রান্ট ‘সারফ-সিক্কা’ বাবদ শুধু ৪,৫৩,৪৮৮ টাকা হিসেব করেছেন—যে পরিমাণ অর্থ মোহাম্মদ রেজা খানের রাজস্ব নিরূপণের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৭২. সেই বছরের সরকারি হিসাবপত্র থেকে আমি দেখতে পাই যে, কাসিমের বন্দোবস্তে থাকা কয়েকটা খাত নিজামতের আমলারা আলাদা আলাদাভাবে আদায় করেছিলেন — এটা তারা করেছিলেন সম্ভবত ব্যক্তিগত উপার্জনের জন্য — এবং এগুলি দেওয়ানি এলাকার রাজস্ব-নির্ধারণের অংশ ছিল না। এই ক্ষেত্রে মোট অর্থের পরিমাণ ছিল ৫,৬৪,৫৭৫ টাকা; নন্দকুমারের নির্ধারিত রাজস্বের সাথে এই পরিমান যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ১,৮২,৬৯,৩৪৩ টাকা। (বিস্তারিত তথ্যের জন্য পরিশিষ্ট ৪ দ্রষ্টব্য)
কিস্তি ২২, ৭২ স্তবকে উল্লিখিত পরিশিষ্টের সারণী ৪


[ওপরের (নং ৪ সারণী)-১১৬৯-তে (১৭৬২-৬৩-র সমসাময়িক) মীর মোহাম্মদ কাসিম আলী খানের নবাবি আমলে বাংলার দেওয়ানি ভূমির বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ হিসাব-এর ব্যাখ্যা, আলোচনা টিকা ১-এ দেখুন]
৭৩. ১১৭১ সালের বন্দোবস্তটিও একই নীতির ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল; এবং এর অর্থের পরিমাণ প্রায় একই হওয়ায় এ বিষয়ে বিশেষ কোনো মন্তব্য করার আদৌ প্রয়োজন বোধ করছি না। পূর্বের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে এর সাথে অতিরিক্ত অর্থজুড়ে এর মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৮২,৬২,২৫৪ টাকা।
৭৪. কোম্পানি মোহাম্মদ রেজা খানকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব অর্পণ করলে তিনি নন্দকুমারের শাসনকালে নিজামতের কর্মকর্তাদের সাথে মিলে আলাদাভাবে আদায় করা বিভিন্ন খাত এবং ‘সারফ সিক্কা’র (মুদ্রা বিনিময়জনিত অতিরিক্ত শুল্ক) একটা অংশ নতুন করে মূল রাজস্ব তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। তবে, রাজস্ব হ্রাসের (বা মওকুফের) ফলে এই সংযোজনগুলোর প্রভাব পুষিয়ে নেওয়ার চেয়েও বেশি ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
৭৫. মিস্টার গ্রান্ট মোহাম্মদ রেজা খান ও নন্দকুমারের বন্দোবস্তের মধ্যে ৭৮ লক্ষ টাকার পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন। আমি আমার তথ্যের উৎসের ওপর নির্ভর করছি, যার ওপর আমি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর না করার কোনো কারণ দেকজি না। কাসিম আলীর বন্দোবস্ত থেকে মোহাম্মদ রেজা খানের বন্দোবস্ত পর্যন্ত রাজস্বের যে ক্রমহ্রাসমান ধারা দেখা গেছে, তার বিবরণ পরিশিষ্টে (নং ৮) দেওয়া হয়েছে এবং তার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:
পরিশিষ্ট ৮


বিশদ ব্যাখ্যার জন্য টিকা ২ দেখুন
৭৬. এই হ্রাসের যৌক্তিকতা যাচাই করার একমাত্র উপযুক্ত মাপকাঠি সংশ্লিষ্ট জেলার সে সময়ের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান; অন্য কোনো নীতির ওপর ভিত্তি করা হলে, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অস্পষ্ট আর অনির্দিষ্ট থেকে যাবে।
৭৭. রাজস্ব মওকুফের যৌক্তিকতা সম্পর্কে আমার মত প্রকাশ করতে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করছি না, কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে কাসিম আলীর রাজস্ব দাবি ছিল নিছক লুটতরাজ আর অত্যধিক করের বোঝা; এই দাবি খণ্ডন করার মতো সন্তোষজনক প্রমাণ এখনও পেশ করা হয়নি, অথচ এটি জোরালো পরোক্ষ প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাসিম আলী যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, ঠিক তেমন পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরাও হয়তো বর্তমান নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে এক-চতুর্থাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারতাম; কিন্তু তাতে পরবর্তীকালে জনস্বার্থ আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তি এমন পরামর্শ দিতেন না এবং মানবিকতাবোধসম্পন্ন কোনো মানুষ এমন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টাও করতেন না। [টিকা ২]
৭৮. এই অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম যদি বর্তমান সময়ে কোনো কার্যকর সুফল বয়ে আনত, তবে চার বছরের এই রাজস্ব হ্রাসের বিষয়টা বিস্তারিত খতিয়ে দেখা যেত। রাজশাহী, দিনাজপুর, নদীয়া ও বীরভূম — এই চার প্রধান জমিদারির ক্ষেত্রে মোট ৮০,০৯,৯০০ টাকার মধ্যে এই ছাড়ের পরিমাণ ছিল ৩৪,৭০,৫৬২ টাকা; পরবর্তী বছরগুলোয় এই ছাড়ের অংশবিশেষ নতুন করে ওই জমিদারদের কর-নির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এখানে মিস্টার গ্রান্টের মতের বিপরীতে আমি এটুকু বলব, আমার হাতে থাকা তথ্যমতে কাসিম আলীর আমলের বন্দোবস্তে রাজস্ব কমার ঘটনা দেওয়ানি হস্তান্তরের ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটেনি; ১৭৬৩-তে নন্দকুমার ৫৮,৪০৫ টাকার বিষয় স্বীকার করেছিলেন এবং এই দাবির সপক্ষে তিনি যেসব যুক্তি দেখিয়েছেন তা চাতুর্যপূর্ণ হলেও ভিত্তিহীন। আমি যেসব নথির ওপর নির্ভর করছি সেগুলোকে প্রামাণিক হিসেবে মেনে নিলে তাঁর যুক্তির ভিত্তিই ধসে পড়ে এবং তাঁর সিদ্ধান্তগুলোও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হয়ে যায়।
টিকা ১
অনুবাদকের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা — এটা ১৮শ শতকের মাঝের আমলে বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি – কেবল আর্থিক হিসাব নয়, বরং তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেরও দর্পণ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট — ১১৬৯ বঙ্গাব্দ (১৭৬২-৬৩ খ্রিস্টাব্দ) সময়কালে বাংলার নবাব ছিলেন মীর কাসিম (মীর মোহাম্মদ কাসিম আলি খান)। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সে সময়ের প্রধান পরিচালক ভ্যান্সিটার্ট, মীর জাফরকে উচ্ছেদ করে তাঁকে সিংহাসনে বসান কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই দু’পক্ষের মধ্যেই ব্যাপক দ্বন্দ্ব শুরু হয় কারন তিনি বাংলাজুড়ে কোম্পানির ক্রমবর্ধমান আধিপত্য রুখতে উদ্যত হচ্ছিলেন এবং নিজামতের ওপর চাপ প্রয়োগ করে কোম্পানির আমলাদের দিনের পর দিন বাড়তে থাকা অর্থ হাতবদলের দাবি অস্বীকার করতে করতেই বাংলায় চালু রাজস্ব ব্যবস্থা আর কাঠামোর হালৎ বুঝতে তদন্তের নির্দেশ দিলেন, তদন্তজাত তথ্য অবলম্বন করে শুরু করলেন রাজস্ব সংস্কার। এই নথি তার সেই তদন্ত আর পুনর্গঠনের ফল।
নথির মূল উপাদান আর ব্যাখ্যা — (ক) আসল বা মূল হার (Assul) হল খালসা জমি (যে জমিগুলোর রাজস্ব সরাসরি সরকারি কোষাগারে যেত) থেকে পাওয়া রাজস্বের মোট পরিমাণ। এর ভিত্তি স্থায়ী হার। (খ) জায়গির (Jagheer) : সরকারি কর্মচারী বা সামন্ত প্রভুদের বেতনের বিনিময়ে বরাদ্দ জমি। এগুলো থেকে পাওয়া রাজস্ব ব্যক্তিরা নিজেরা সংগ্রহ করতেন (বা স্থানীয় ক্ষমতাশালীরা দায়িত্ব নিয়ে আদায় করে দিতেন), তবে সরকারি হিসাবে সেগুলোর মূল্য উল্লেখ থাকত; এর চারটে ভাগ জায়গির সিরকার: সম্ভবত রাজকীয় বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জায়গির; জায়গির দেওয়ানি : দেওয়ানি বিভাগের (রাজস্ব ও বিচার) কর্মকর্তাদের জায়গির; জায়গির বকশি: সেনাবাহিনীর প্রধান (বকশি) বা অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তাদের জায়গির; জায়গির তনজাউত: সম্ভবত নিম্নপদস্থ বা বেতনভোগী কর্মচারীদের জায়গির।
মোট আসল হার (১,০১,৩৮,০০৬ টাকা) হলো খালসা আর সমস্ত জায়গিরের রাজস্ব সমষ্টি — বাংলার মোট সম্ভাব্য রাজস্বের ভিত্তি। আবওয়াব (Aboab) হল মূল ভূমি রাজস্বের সঙ্গে জুড়ে থাকা অতিরিক্ত খাজনা। এগুলো নানা ধরনের শুল্ক ও আরোপিত কর, প্রায়শই প্রজাদের উপর অতিরিক্ত বোঝা ছিল। ১৭২৮ থেকে চালু হওয়া এই করগুলো দেখায় যে মুঘল আর নবাবি আমলে রাজস্ব আয় কতটা বৈচিত্র্যময় ও জটিল হয়েউঠেছিল; চৌথ শব্দের সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত ১০ বছর ধরে আলিবর্দি খানের সময় নির্দয়, গণহত্যাকারী মারাঠাদের হাতে তুলে দেওয়া সুরক্ষা কর, পরে অন্য কর হিসেবে ধার্য করা হতো; ফিলখানা — হাতি পালনের জন্য ধার্য কর; আবওয়াব ফৌজদারি — ফৌজদারি প্রশাসনের খরচের জন্য স্থানীয় কর; কেফায়েত (Keyfayet) — এই অংশটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মীর কাসিম তদন্ত করে দেখেন যে তার পূর্বসূরিদের আমলে অনেক জায়গিরদার, কর্মকর্তা অত্যন্ত কম হারে জমি ভোগ করছেন (সম্ভবত অপব্যবহার বা প্রভাবের কারণে)। তিনি সেই ‘লাভ’ বা ‘অতিরিক্ত আয়ের’ পরিমাণ বের করেন এবং তা জনসাধারণের রাজস্বের (পাবলিক রেন্টাল) সাথে জুড়ে দেন — মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজস্বের ঘাটতি পূরণ করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা। এখানে রংপুর, পূর্ণিয়া, বীরভূমের মতো বিশাল জেলাগুলোর পরিমাণ উল্লেখ আছে; এই সব অঞ্চল বাংলার অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। পৃথক সংগৃহীত নিবন্ধ: এই অংশ দেওয়ানি (রাজস্ব) বিভাগের বাইরে অন্য বিষয় থেকে সংগৃহীত আয়। মূলত নিজামত (সুবাদারি বা প্রশাসনিক) বিভাগের অধীনে আসত, যেমন বিভিন্ন উপহার, চিরস্থায়ী কর, এবং অন্যান্য ফি।
তদন্তের ফলে বৃদ্ধি : নথির উল্লেখযোগ্যতম অংশ হলো “বৃদ্ধি” অংশটি। মীর কাসিম তদন্তে দেখতে পান, আগের বছরগুলোর হিসাব দূত্রে অনেক রাজস্ব হয় লুকানো হয়েছে না হয় কম করে দেখানো হয়েছে। তিনি আবারও তদন্ত চালিয়ে দিনাজপুর, নদীয়া, জলালপুর (ঢাকা), রাজশাহী, রংপুর-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৪৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব বৃদ্ধি করেন। এটি তার কঠোর প্রশাসনিক মনোভাব আর রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করার প্রচেষ্টা। মুর্শিদাবাদের টাকশাল থেকেও আয় বৃদ্ধি পায় — এর থেকে প্রমাণ হয় তিনি মুদ্রা আর অর্থনৈতিক লেনদেনের উপরও নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছিলেন।
মুদ্রা বিনিময় প্রিমিয়াম (Serf Sicca) : এটি ছিল পুরনো ও নতুন মুদ্রার বিনিময় হার থেকে পাওয়া লাভ। প্রতি টাকায় ১১ আনা প্রিমিয়াম ধার্য করে তিনি আরও রাজস্ব আয়ের পথ খুলে দেন।
মোট নিষ্পত্তি — সব কিছু যোগ করে বাংলার মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমান দাঁড়ায় ২,৪১,১৮,৯১২ টাকা — সে সময়ের জন্য খুব বিশাল অঙ্ক — অস্বীকার করার উপায় নেই। এই বিপুল অর্থ সংস্থানই ছিল মীর কাসিমের ইংরেজ কোম্পানির সাথে যুদ্ধে টিকে থাকার মূল চালিকা শক্তি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন শক্তিশালী সেনাবাহিনী রাখতে এবং কোম্পানির আধিপত্য রুখতে রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও সম্পদশালী করে গড়ে তুলতে হবে।
সামগ্রিক তাৎপর্য — আমাদের আলোচ্য নথি প্রমাণ করে নবাব মীর কাসিম ছিলেন দক্ষ প্রশাসক, পরিপক্ষ অর্থনীতিবিদ। তিনি জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং অপব্যবহারপ্রবণ রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কোম্পানির সাথে তার যুদ্ধ শুধুমাত্র সামরিক ছিল না, ছিল অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইও। এই রাজস্ব সংস্কার ছিল তার সেই লড়াইয়ের ভিত্তি।
আমরা যেন ভুলে না যাই উপনিবেশ-বিরোধী চর্চা মানে শুধু আবেগে উদ্দীপ্ত হওয়া নয়, বরং তথ্য-প্রমাণ হাতিয়ার করে ফাঁসানো ইতিহাসকে উন্মোচন করা। মীর কাসিমের এই রাজস্ব সংস্কারের নথিতে আমরা দেখি তিনি ইংরেজ বণিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য বাংলার প্রতিটি গ্রামের উৎপাদনশক্তিকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তার এই উদ্যম আমাদের শিক্ষা দেয় অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন অসম্ভব। ব্রিটিশরা ঠিক এটাই বুঝতে পেরেছিল, তাই তাঁরা আগে বাংলার রাজস্ব ও বাণিজ্য ব্যবস্থা দখল করে নিয়েছিল, তারপর ধীরে ধীরে উপমহাদেশকে গিলে ফেলেছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ