আজ গুরুপূর্ণিমা। অনেকেই ফেসবুকে তাঁর গুরুদেবকে শতকোটি প্রণাম জানাচ্ছেন। তেত্রিশ কোটি দেবতার গাঁজাখুরি ব্যাখ্যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরলেও শতকোটি প্রণামের কোনও ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেননি। অগত্যা একটু চেষ্টা করতেই হয়।
প্রচলিত বয়ানে যা ৩৩ কোটি দেবতা, তা আসলে হচ্ছে ৩৩ ‘কোটিদেবতা’৷ ঋগ্বেদে ৩৩ প্রধান দেবতার নাম পাওয়া যায়৷ এঁরা হলেন দ্বাদশ আদিত্য, একাদশ রুদ্র, অষ্ট বসু, ইন্দ্র ও প্রজাপতি (মতান্তরে অশ্বিনীকুমারদ্বয়)৷ ‘কোটি’ শব্দটি যখন বিশেষ্য, তখন এর অর্থ অগ্র বা শীর্ষ৷ কোটি মানে ধনুকের অগ্রদেশ বা প্রান্তবিন্দুও হয়। কিংবা ভাগ, প্রান্তও বোঝানো যায় ‘কোটি’ শব্দটি দিয়ে। কোটি-র অর্থ উৎকর্ষও হয়। কোটি-র মানে কোনওদিন প্রকার বা রকম নয়, অভিধানে ছিলও না। যদিও ইদানীং মিডিয়ায় ‘প্রকার’ অর্থটি জোর করে চালানো হচ্ছে। বামন শিবরাম আপ্তের Practical Sanskrit-English Dictionary তে কোটির মানে Zenith বা শীর্ষবিন্দু বলা হয়েছে। অগ্রগণ্য বা শীর্ষস্থানীয় দেবতা তথা বৈদিক দেবতাকে তাই ‘কোটিদেবতা’ বলা যাবে৷
ঊনকোটি চৌষট্টি দেবতার যে উল্লেখ হিন্দুশাস্ত্রে তথা লোকপ্রবচনে পাই, তার মানে বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়৷ শীর্ষস্থানের ঠিক নীচেই যে সমস্ত দেবতার অবস্থান, তাঁদের ‘ঊনকোটিদেবতা’ বলা যাবে৷ সমস্ত পৌরাণিক এবং লৌকিক দেবতার মিলিত সংখ্যা ৬৪৷ দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কালী, কার্তিক, মনসা প্রমুখ সমস্ত দেবদেবী এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত৷ ত্রিলোকের তিন প্রধান দেবতা হলেন, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর।
হিন্দুদের মোট দেবদেবীর সংখ্যা তাই মাত্র একশত৷ এই জন্যেই হিন্দুশাস্ত্রে শত কোটি প্রণামের উল্লেখ আছে, যা আসলে শত ‘কোটিপ্রণাম’৷ সুতরাং ‘কোটি’ শব্দকে বিশেষ্য না ধরে বিশেষণ (সংখ্যাবাচক) ধরে আমাদের শাস্ত্রকারগণ বিরাট ভুল করে এসেছেন৷ অভিধানে ‘কোটিদেবতা’ শব্দটির জায়গায় আছে ‘কোটীশ্বর’৷ যেখানে এর অর্থ দেবতা বা ঈশ্বর হওয়ার কথা, সেখানে এর অর্থ করা হয়েছে নৃপতি। এটা কোন পণ্ডিতের কাজ, তা জানার আগ্রহ জাগে মনে। আমার মনে হয় ঈশ্বর এখানে দেবতা-অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷
এবার তেত্রিশ কোটি দেবতার রহস্য ফাঁস করা যাক।
তেত্রিশ ‘কোটিদেবতা’ : —
দ্বাদশ আদিত্য :
(১) ধাতা, (২) অর্য্যমা, (৩) মিত্র, (৪) বরুণ, (৫) অংশ, (৬) ভগ, (৭) বিবস্বান, (৮) ইন্দ্র, (৯) পূষা, (১০) পর্জ্জন্য, (১১) ত্বষ্টা, (১২) বিষ্ণু
একাদশ রুদ্র :
(১) অজ, (২) একপাৎ, (৩) অহিব্রধ্ন, (৪) বিরূপাক্ষ, (৫) রৈবত, (৬) হর, (৭) বহুরূপ, (৮) ত্র্যম্বক, (৯) সাবিত্র, (১০) জয়ন্ত, (১১) পিনাকী
অষ্টবসু :
(১) ধর, (২) ধ্রুব, (৩) সোম, (৪) অহ, (৫) অনিল, (৬) অনল, (৭) প্রত্যূষ, (৮) প্রভাস
ইন্দ্র ও প্রজাপতি বা, অশ্বিনীকুমারদ্বয় = ২
মোট = ১২+১১+৮+২=৩৩
অর্থাৎ হিন্দুদের কোটিদেবতা বা মূল দেবতার সংখ্যা মাত্রই তেত্রিশ। তাকেই সুকুমারী ভট্টাচার্য থেকে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, সবাই কেমন তেত্রিশ কোটি ভেবে নিয়েছেন!
ঊনকোটি চৌষট্টি দেবতা : —
কোটিদেবতা বা বৈদিক দেবতাদের (সংখ্যা ৩৩) ঠিক নীচে ঊনকোটি দেবতা বা পৌরাণিক দেবতাদের স্থান৷ ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘উনকুটি চৌকুটি উপচার’-এর অর্থ দিতে গিয়ে ‘ঊনকোটি চৌষট্টি দেবতা’ লব্জটির উল্লেখ করেছেন। লৌকিক দেবদেবীও এই গোত্রে পড়েন৷ দ্বিতীয় পর্যায়ের এই দেবতার নামগুলি হল,-
১) দুর্গা, ২) কালী, ৩) লক্ষ্মী, ৪) সরস্বতী, ৫) ইন্দ্র, ৬) শ্রীকৃষ্ণ, ৭) কার্তিক, ৮) গণেশ, ৯) মদন, ১০) যম, ১১) শনি, ১২) বরুণ, ১৩) অগ্নিদেব, ১৪) পবনদেব, ১৫) বলরাম, ১৬) রাধা, ১৭) জগন্নাথ, ১৮) কুবের, ১৯) বিশ্বকর্মা, ২০) মনসা, ২১) শীতলা, ২২) ষষ্ঠীদেবী, ২৩) গন্ধেশ্বরী, ২৪) দক্ষিণরায়, ২৫) ধর্মঠাকুর, ২৬) বিশালাক্ষী, ২৭) সিদ্ধেশ্বরী, ২৮) সুবচনা বা শুভচণ্ডী, ২৯) ওলাদেবী, ৩০) বনদেবী বা বনবিবি, ৩১) ঘন্টকর্ণ বা ঘেঁটু, ৩২) ইতুলক্ষ্মী, ৩৩) অদিতি, ৩৪) পদ্মা,৩৫) শচী, ৩৬) মেধা, ৩৭) সাবিত্রী, ৩৮) বিজয়া, ৩৯) জয়া, ৪০) দেবসেনা, ৪১) স্বধা, ৪২) স্বাহা, ৪৩) শান্তি, ৪৪) পুষ্টি, ৪৫) ধৃতি, ৪৬) তুষ্টি, ৪৭) কুলদেবতা, ৪৮) আত্মদেবতা, ৪৯) রাম, ৫০) লক্ষ্মণ, ৫১) সুগ্রীব, ৫২) হারীথ, ৫৩) গরুড়, ৫৪) চণ্ডক বা চণ্ডার্ক, ৫৫) চন্দ্রদেব, ৫৬) ধন্তন্তরী, ৫৭) ক্ষেত্রপাল, ৫৮) বৃহস্পতি, ৫৯) গঙ্গা, ৬০) জগদ্ধাত্রী, ৬১) বাসন্তী, ৬২) অঙ্গদ, ৬৩) সন্তোষী, ৬৪) তুলসী।
এর সঙ্গে ত্রিলোকের তিন প্রধান দেবতাকে যোগ করতে হবে। অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর।
তাহলে হিসেবটা দাঁড়ায়,-
কোটিদেবতা — ৩৩
ঊনকোটি চৌষট্টি দেবতা — ৬৪
ত্রিদেব (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর) — ৩
মোট — ৩৩ + ৬৪ + ৩ = ১০০।
১০০ জন শীর্ষস্থানীয় বা তদ্রূপ দেবতার উদ্দেশে যে প্রণাম নিবেদিত হয়, তাকেই বলে শতকোটি প্রণাম। জানি না, কোনও শাস্ত্রে এই ব্যাখ্যা আছে কিনা। জানার আগ্রহ রইল।
নিবন্ধটি অত্যন্ত তথ্যবহুল, গবেষণাধর্মী এবং চিন্তা-উদ্রেককারী। ‘শতকোটি প্রণাম’ এবং ‘তেত্রিশ কোটি দেবতা’—এই বহুল প্রচলিত ধারণাগুলির ব্যুৎপত্তিগত ও শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে লেখক একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন, যা পাঠককে নতুনভাবে বিষয়টি ভাবতে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে ‘কোটি’ শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ নিয়ে তাঁর আলোচনা ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকেও আগ্রহ জাগায়। প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য এই নিবন্ধটি বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। লেখককে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।