৪২. ঢেঁকিকলের আবিষ্কর্তা নরেন্দ্রনাথ দেব
জলের ভিন্ন নাম জীবন। সেই জীবন লুকিয়ে আছে মাটির তলায়। মাটির তলা থেকে জল তোলার জন্য চাই যন্ত্র। ১৮৬১ সালে সেই যন্ত্র আবিষ্কার করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে কর্মরত কর্নেল নেলসন গ্রিন। পরবর্তীকালে, ১৮৬৭ সালে লণ্ডনে জেমস লি নর্টন এর পেটেন্ট করেন এবং এটি ‘আবিসিনিয়ান ওয়েল’ নামে পরিচিত হয়।
আমাদের এই বাংলায় নেলসন গ্রিন হলেন নরেন্দ্রনাথ দেব।
তিনি আবিষ্কার করেন ঢেঁকিকল।
তবে তাঁর আবিষ্কারের কথা বলার আগে মানুষটির পরিচয় নেওয়া যাক। এখন এই মানুষটিকে আমরা ভুলেই গেছি। তাঁর জীবনীও কেউ লিখে রেখে যান নি। নরেন্দ্রনাথ দেব (১৯২৬-২০১৭) কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার তবকপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেছিলেন নরেন্দ্রনাথ। কাশিমবাজার মহারাজা এস্টেটে চাকুরিতে নিযুক্ত হন। কিন্তু তাঁর মনের ভেতরে ছিল এক কৌতূহলী বিজ্ঞানী। ফটোগ্রাফির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তারপরে বিড়ির ব্যবসা। বিড়ির লেবেল ছাপানোর জন্য তৈরি করে নেন পা দিয়ে চালিত কাঠের ছাপাখানা। কাঠের উন্নত ট্রেডল প্রেসও তৈরি করেন। উলিপুর বাজারে ছোট লেদ মেশিন বসিয়ে শুরু করেন নতুন ব্যবসা।
এর পরে স্টিম এঞ্জিনের আবিষ্কার। সৌরশক্তি ব্যবহার করে এঞ্জিনটি চালাবার কথা ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু সে কাজে সাফল্য আসেনি। দোতলায় জল তোলার জন্য মোটরচালিত টিউবওয়েল, হুইল ও টিন দিয়ে বার্লি তৈরির মেশিন, ডাল ভাঙার অটোমিল তাঁর আবিষ্কার।
এবার আসা যাক পা-চালিত ঢেঁকিকল বা ট্রেডল পাম্পের কথায়।
আজকের মানুষ এই ঢেঁকিকলের কথা শুনলে অবাক হবেন। আজকে কালের বিবর্তনে নতুন প্রযুক্তি এসেছে। এসেছে টিউবওয়েল, ডিজেলচালিত স্যালো, ডিপটিউবওয়েল, বৈদ্যুতিক পাম্প। কিন্তু আগেকার দিন ছিল না সেসব যন্ত্র। ছিল শুধু মাটির কুয়ো।
নরেন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন মাটির কুয়ো খনন ছিল দারুণ পরিশ্রমের কাজ। এর থেকে গ্রামের কৃষকদের রেহাই দেওয়ার চিন্তা তাঁকে আচ্ছন্ন করে। ১৯৭৭ সাল। তিনি আবিষ্কার করলেন পা-চালিত ঢেঁকিকল বা সাকশন পাম্প। এটির যন্ত্রকৌশল অনেকটা টিউবওয়েলের মতো। ২০ থেকে ২৫ মিটার বা তার কম গভীরতা থেকে জল তোলার জন্য এই ষন্ত্র উপযুক্ত। ৫ ফিট লম্বা মোটা বাঁশের দুটি পাদানি ওঠা-নামার মাধ্যমে জল তোলা হয়। দুটি বাঁশের শক্ত খুঁটি সমান দূরত্বে মাটিতে পুঁতে তার সঙ্গে সংযুক্ত পাদানি লিভারের কাজ করে; যা একটি পাইপের মধ্যে থাকা দু-মুখ পিস্টন চালায়।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় দুর্গাপুরের বি সি রায় এঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকদের একটি আবিষ্কারের কথা।
কলেজের মেকানিক্যাল বিভাগের ১১ জন ছাত্র ও কয়েকজন শিক্ষক তৈরি করেছেন এমন এক টিউবওয়েল যার হাতলে চাপ না দিয়েও জল তোলা যায়। স্পোক, চেনসহ সাইকেলের একটি রিম অন্যদিকে একটি পেণ্ডুলাম-সহ লোহার কাঠামো ও মোটর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব ও সাধারণ মানুষের পক্ষে উপকারী যন্ত্রটি।
অধ্যাপক চন্দন সেনের কথায়, ‘মেকানিক্যাল বিভাগের ১১ জন ছাত্র ও শিক্ষকরা মিলে এই যন্ত্র তৈরি করেছেন। এটি পরিবেশবান্ধব। কম খরচে এই যন্ত্র গ্রামীণ এলাকায় চাপাকলের সঙ্গে লাগিয়ে ব্যবহার করা যাবে। শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে না। বিশেষ করে নলকূপ থেকে জল তুলতে যাঁদের কষ্ট হয়, তাঁদের কথা ভেবে আমরা এই যন্ত্র তৈরি করেছি। বিশেষ করে বয়স্ক ও গর্ভবতী মহিলা, যাঁদের চাপাকলের হাতলে প্রেসার দিয়ে জল তুলতে হত, তাঁদের সুবিধা হবে।’