| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সুমিত চট্টোপাধ্যায়

Reporter Default
রিপোর্টার / ৩৮৮ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২০

দেবাশিস ভট্টাচার্য

কবি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক সুমিত চট্টোপাধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন। ৪ জুন ২০২০ এসএসকেএম হাসপাতালে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি দক্ষ প্রুফ রিডার ছিলেন। ২০১১ থেকে ২০১৯ দীর্ঘ ৯ বছর সংবাদ সাপ্তাহিক সংগ্রামী ম-মাটি-মানুষ পত্রিকার প্রুফ রিডার ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী তিনি সেদিক থেকে সাংবাদিকও বটে। কোনও শব্দে বানান ভুল থাকলে তিনি শুধরে দিতেন। এ ব্যাপারে তিনি খুঁতখুঁতে ছিলেন। বাংলা বানান বিধি বই পাশেই রাখতেন। রাজনৈতিক লেখার কোনও বাক্যে সম্পাদকীয় লাইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্য দেখলে অথবা তথ্যে গরমিল মনে করলে তিনি সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। দেখা গেছে বহু ক্ষেত্রেই তাঁর ধারণা ছিল ঠিক।

সব কাজই তিনি নিখুঁতভাবে করতে চাইতেন। বহু অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পত্রের বয়ান তিনি লিখেছেন। সবাই তাঁর লেখা পছন্দ করতেন। বহু বন্ধুর বিয়ের কার্ডের বয়ান ও ডিজাইন তাঁর হাতে তৈরি হয়েছে। বহু সভার মঞ্চ সাজানো হয়েছে তাঁর পরিকল্পনায়। এ ব্যাপারে তাঁর পারদর্শিতা লেটার মার্কস পাবে।

কমরেড কথার অর্থ সমধর্মী ও সহকর্মী। সেদিক থেকে আমরা কমরেড। কারণ দুজনেরই ধর্ম এই মুহূর্তে মানবতাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বিপদে পড়া বন্ধুর পাশে থাকা।

তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালের ৮ অক্টোবর। বাবা ভূপেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, মা আভা চট্টোপাধ্যায়। কৈশোর কেটেছে ম্যাডক্স স্কোয়ারের কাছে সেবক বৈদ্য স্ট্রিটে। বাবা ছিলেন সেন্ট লরেন্স স্কুলের নামী শিক্ষক। তিন বোন দুই-ভাই। ১৯৬৫ সালে উঠে আসেন কালীঘাটে। ১৯৬৬ সালে তীর্থপতি ইনস্টিটিউট থেকে হায়ার সেকেন্ডারী পাশ করেন। বঙ্গবাসী কলেজে বিএসসিতে ভর্তি হন। কিন্তু মন যার দেশ ও সমাজের ভালো করার জন্য ছটফট করে, তাঁকে কি আর কলেজে বেঁধে রাখা যায়?

তাঁর বাবা অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক ছিলেন। বাবাই তাঁকে হাত ধরে নিয়ে যান ব্রিগেড ময়দানে, ক্রুশ্চেভ বুলগানিনের সম্বর্ধনা সভায়। সেটা ছিল ১৯৫৫ সালের নভেম্বর। ১৯৫৯ সালের ৩১ জুলাই দেশের প্রথম কমিউনিস্ট সরকার তথা কেরলের নাম্বুদিরিপাদ মন্ত্রীসভাকে নেহেরু সরকার বরখাস্ত করে। প্রতিবাদে বামপন্থীদের ডাকে দেশপ্রিয় পার্ক থেকে বেরিয়েছিল বিশাল মিছিল। ১১ বছরের কিশোর সুমিতকে সঙ্গে নিয়ে রাসবিহারী মোড়ে সেই মিছিল দেখতে গিয়েছিলেন তাঁর বাবা। তাঁর মার বান্ধবী ছিলেন গীতা মুখার্জি। তাঁর মামা ও কাকা কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। সেই পরিবারেই বেড়ে উঠেছিলেন সুমিত।

১৯৬৬-৬৭ সালে উত্তাল বাংলায় আলোড়িত হয়েছিলেন ১৮ বছরের যুবক সুমিত। বাংলার অলিতে গলিতে তখন স্লোগান ছিল ‘তোমার নাম আমার নাম ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম’। ১৯৬৫ সালে সৌরীন সেনের লেখা উপন্যাস ‘ভিয়েতনাম’ ও ‘আখের স্বাদ নোনতা’ গোগ্রাসে গিলছিল বাংলার যুবকরা। আর্জেন্টিনাবাসী আর্নেস্টো চে গুয়েভারা, ফিদেলের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাইফেল তাক করে কিউবায় এগিয়ে যান। ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি জনগণ ছাড়াই কয়েকজন বিপ্লবী কিউবায় বিপ্লব ঘটান। লেনিন বলেছিলেন, বিপ্লব করতে গেলে দরকার বিপ্লবী তত্ত্বে সমৃদ্ধ জনগণের সমর্থনপুষ্ট একটি কমিউনিস্ট পার্টি। লেনিনের কথা কিউবায় মিললো না। চে আবার অর্থমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করে চলে যান বলিভিয়া মুক্ত করতে। বলিভিয়ার জঙ্গলেই মিলিটারিরা তাঁকে গুলি করে মারে। দ্বারকানাথ কোটনিসের মতো আরও একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী দেখা গেল।

কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস তখন মাও লাইন বনাম চে লাইন, রেজিশ দেব্রে বনাম তারিক আলি নিয়ে মইদুল, নিখিলেশরা মাতাচ্ছিল। যাদবপুর কফি হাউসে চর্চা হচ্ছিল ভারতীয় বিপ্লবের চরিত্র জনগণতান্ত্রিক না সমাজতান্ত্রিক হবে। সূর্য সেন স্ট্রিটের ফেবারিট কেবিনে গরম চায়ের পেয়ালা নিয়ে তর্ক হতো ভারতীয় বুর্জোয়াদের চরিত্র স্বাধীন না কোলাবরেটর, না কম্প্রাডর তাই নিয়ে। সেই সময় সুমিত ফিজিক্স-কেমেস্ট্রি-অঙ্ক, ফুটবল-ক্রিকেট ব্যাট, স্প্রিন্ট ছেড়ে দিয়ে মেতে ওঠেন ‘নিজেকে বদলাও দুনিয়া বদলাও স্লোগানে’।

১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলন এবং ১৯৬৭ সালের ২ মার্চ প্রথম অকংগ্রেসী যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন সুমিতকে আরও অনুপ্রাণিত করলো বামপন্থী ঘরানায়। নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন তাঁকে নাড়া দেয়। কেরিয়ার, বঙ্গবাসী কলেজ, ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা ছেড়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন আন্দোলনে। ভালো অ্যাথলিটও ছিলেন।

নকশালপন্থীদের মধ্যেকার দক্ষিণ দেশ গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। শ্রমিকদের সঙ্গে মেশার জন্য কিছুদিন ব্রিটানিয়া বিস্কুট কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। শ্রমিক বস্তিতেও যেতে থাকেন। আজকের সিপিআই (মাওবাদী) দলের পলিটব্যুরোর দ্বিতীয় স্থানাধিকারী নেতা হলেন প্রশান্ত বসু ওরফে কিষাণদা। এই প্রশান্ত ছিলেন সুমিতের ঘনিষ্ট কমরেড। দুজনে বহুরাত একসঙ্গে শেল্টারে কাটিয়েছেন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে পুলিশ সুমিতকে গ্রেফতার করে। ১৬ মাস জেলে ছিলেন তারপর মুক্তি পান। জেলে বসে ২৩ বছরের যুবক সুমিত ভাবতে থাকেন তাঁর ফুটবল খেলা দেখে রবীন মুখার্জি তাঁকে ফুটবল প্রশিক্ষক অচ্যুত ব্যানার্জির কাছে পাঠিয়েছিলেন। রাজনীতিতে যুক্ত না হলে তিনি হয়তো বড়ো ফুটবলার হতে পারতেন।

জেলে বসেই তিনি বুঝতে পারেন রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় ভুল হয়েছে। ভারতের বাস্তব পরিস্থিতির বাস্তব বিশ্লেষণে ভুল হয়েছে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ এই ৪ বছর তিনি সক্রিয় রাজনীতি করেন। বৈশিষ্ট্য হলো শুধু নিজে নয়, অনুজ দুই বোন ও এক ভাইকেও রাজনীতিতে টানেন। বামপন্থী কমিউনিজমে সক্রিয় হয়ে শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা করলেও বিশ্বাস ও নিষ্ঠায় কোনও ঘাটতি ছিল না। তাই পুরো পরিবারকেই জড়িয়ে ফেলেছিলেন, যা অনেক শীর্ষ নেতাও করেন নি।

১৯৭২ সালে আন্দোলনে ভাটার সময় সুমিত জেল থেকে বেরোন। তিনি বোঝেন ভারত কিউবা নয়। দেশে বিপ্লব দরকার। কিন্তু বিপ্লবী পরিস্থিতি ও সংগঠনের অভাব ছিল বলেই ১৯৬৭-র আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বুঝেছিলেন কিলিয়ে কাঁঠাল পাকাতে যাওয়া ঠিক হয় নি।

তাঁর বাবা ১৯৭০ সালে অবসর নেন। তখন শিক্ষকদের পেনশনের ব্যবস্থাও ছিল না। ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে বাবা মারা যান। দায়িত্বশীল সুমিত বোঝেন কিছু অর্থ উপার্জন করা দরকার। সেজন্য তিনি নানারকম অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যবসায় নামেন।

বামপন্থায় বিশ্বাস ছিল তাই মাতলেন নাটকে। রাসবিহারী মোড়ে ঢাকার মাঠে তখন নাটক হতো। সুমিত প্রথমে ক্রিটিক ও পরে রূপসানী নামে দুটি নাটক গোষ্ঠীতে যুক্ত হন।

১৯৭৭ সালের ২১ জুন রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। পুরানো নকশালপন্থীরা তখন যুক্ত ছিলেন রাজনৈতিক বন্দীমুক্তি আন্দোলনে। ১৯৭৭ সালের ৭ এপ্রিল লেনিন মূর্তি থেকে মিছিল যায় কলেজ স্কোয়ারের স্টুডেন্টস হলে। স্টুডেন্টস হলের সভায় তৈরি হয় বন্দীমুক্তি ও গণদাবী কমিটি। সেই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন শৈবাল মিত্র ও পীযুষ দে। সেই সভায় এসেছিলেন মুম্বাই থেকে লাল নিশান পার্টির নেত্রী সুন্দরী নাভালকার, ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা ভক্তিভূষণ মন্ডল। তাঁর ১৫ দিন আগেই লোকসভা ভোটের পর কেন্দ্রে তৈরি হয়েছিল মোরারজী দেশাইয়ের নেতৃত্বাধীন জনতা পার্টির সরকার। সেই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন চরন সিং। চরন সিং বলেছিলেন, নকশালপন্থী বন্দিদের মুক্তি পেতে হলে মুচলেকা দিয়ে বলতে হবে হিংসায় বিশ্বাস করি না। চরন সিং-এর কথায় ক্ষেপে যান নকশালপন্থীরা। তাঁরা বলেন, জনতা পার্টির সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে। তখন মিছিলে গান শোনা যেত, ‘ওরা দেশের কাজে জেলে গেছে, অন্য কাজে নয়, সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি চাই মুক্তি চাই’। গানটি সবচেয়ে ভালো গাইতেন বিপুল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতায় সিপিআই সমর্থক বুদ্ধিজীবী নৃপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে বন্দিমুক্তি নিয়ে একটি বৈঠক হয়েছিল। সেই বৈঠকে কালীঘাট থেকে ছিলেন গৌতম ভদ্র ও অরুণ রায়চৌধুরী।

এই লেখক তখন প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী। ১৯৭৭ সালের ২৬ এপ্রিল কল্লোল দাশগুপ্ত এবং লেখক মুক্তি পান। দুজনের বিরুদ্ধেই দুটো মিথ্যে মামলা ছিল। একটি জোড়াসাঁকো থানার ষড়যন্ত্র মামলা অন্যটি ওয়াটগঞ্জ থানার ষড়যন্ত্র মামলা। ওয়াটগঞ্জ ষড়যন্ত্র মামলার বিষয় ছিল ১৯৭৫ সালের ১ জুলাই ওই থানার অধীন ১২৯ নং সার্কুলার গার্ডেনরিচ রোডের একটি ঘরে বসে আমরা নাকি ভারত সরকার উচ্ছেদের পরিকল্পনা করি। আমরা দুজনে ছিলাম এই মামলার ৯৬ এবং ৯৭ নম্বর ব্যক্তি। প্রশ্ন উঠেছিল ১২০ বর্গফুটের ঘরে অতজন আদৌ একসঙ্গে বসতে পারে কিনা ষড়যন্ত্র করা তো দূরের কথা। জেল থেকে বেরিয়ে আমরা বন্দিমুক্তি আন্দোলনকে আরো জোরাল করে তুলি। এই পর্বে যুক্ত হয় জয়মোহন, পূর্ণেন্দু, স্বপন হালদার, মলয় গুপ্ত প্রমুখেরা। তখন কথা হয় বিধানসভা নির্বাচন আসছে। বিধানসভা নির্বাচনে আমাদের ভূমিকা ঠিক করতে হবে। আমরা বুঝেছিলাম বামফ্রন্ট সরকারে এলে বন্দিমুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত হবে। তাই আমরা গড়ে তুলি বামফ্রন্ট নির্বাচনি সহায়ক কমিটি। তারিখ ছিল ১৯৭৭ সালের ১ মে। ওই কমিটির আহ্বায়ক করা হয় পূর্ণেন্দু ভট্টাচার্যকে। সুমিতদার সঙ্গে তখনও পরিচয় হয় নি।

বামফ্রন্টকে ভোট দেওয়ার জন্য আমাদের কথা শুনতে পথসভায় খুব ভিড় হতো। আমরা অনেকগুলি পথসভা ও মিছিল করে ছিলাম। রাসবিহারী কেন্দ্রে বামফ্রন্ট সমর্থিত নির্দল প্রার্থী অশোক মিত্র আমাদের মোট ৭০০ টাকা দিয়েছিলেন। নির্বাচনের ফল বেরনোর পর দিন, আমরা তাঁর হাতে ২৪৪ টাকা খরচের হিসেব ও ৪৫৬ টাকা ফেরত দিই। তাঁর ঘরে উপস্থিত সিপিআইএম-এর দুই নেতা সদ্য নির্বাচিত আলিপুরের বিধায়ক অশোক বসু ও অশোক মিত্রের নির্বাচনি এজেন্ট মন্টু ভঞ্জ অবাক হয়ে যান।

এরপর জয়মোহন ও কল্লোলকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, গুরুদ্বার পার্কে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মদিন পালনের জন্য। ওরা রাজি হয়। ঠিক হয়, ১৯৭৭ সালের ১৬ ও ১৭ আগস্ট দু-দিন ধরে গুরুদ্বার পার্কে নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী পালিত হবে। এই পর্বে এলাকার পুরনো দিনের নকশালপন্থী রঞ্জন ব্যানার্জী ওরফে মিঠুয়া এবং সুমিত চ্যাটার্জী যুক্ত হন। বাদামতলা ৬৬ পল্লী অনামী সংঘ এলাকায় মিঠুয়াদার জনপ্রিয়তা ছিল। মিঠুয়াদা ১ টাকা ও ২ টাকার কুপনে ৮০০ টাকা একাই তুলেছিলেন। এছাড়া স্টেজে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা তিনি করে দেন। সুমিতদা তিনটি কাজ করেছিলেন। বিশিষ্ট শিল্পী তড়িৎ চৌধুরীকে দিয়ে ৩০ ইঞ্চি লম্বা এবং ১৮ ইঞ্চি চওড়া নজরুল ও সুকান্তের দুটি দারুন ছবি আঁকান। দ্বিতীয়ত, সুকান্তর কবিতা নিয়ে একটা পোস্টার প্রদর্শনী করেন। গৌতম বসু আঁকেন এবং অরুণ রায়চৌধুরী লেখার কাজটি করেন। পোস্টার প্রদর্শনী দারুণ আকর্ষণীয় হয়। তৃতীয়ত, সুকান্তকে নিয়ে বলার জন্য আমরা সরোজমোহন মিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁকে পাই না। সুমিতদা আর একজন বিশেষজ্ঞ কল্যাণ চক্রবর্তীকে যোগাযোগ করে নিয়ে আসেন। পিপলস পাপেট থিয়াটার তখন একটা পুতুল নাটক করেছিল। সুকান্তর কবিতা অবলম্বনে। নাটকটির নাম একটি মোরগের কাহিনী। দ্বিতীয় দিনের শেষ অনুষ্ঠানে ছিল সেই পুতুল নাটক। দর্শকদের ভিড় উপচে রাস্তায় চলে যায়। পিপিটিকে আমরা দিয়েছিলাম ২৮০ টাকা। সেটাই ছিল ওদের প্রথম কল শো। দু-দিনের ওই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ সেন, প্রধান অতিথি ছিলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রমা চৌধুরী। বক্তা ছিলেন দৈনিক সত্যযুগ পত্রিকার সম্পাদক জীবনলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।

বন্দিমুক্তি আন্দোলনে বুঝিয়েছিলাম আমরা স্বার্থপর নই, বন্ধুদের মুক্তির কথাও ভাবি। বিধানসভা ভোটের প্রচারে অংশ নিয়ে বুঝিয়েছিলাম, আমরা নির্বাচন বয়কটের লাইন মানি না। তৃতীয়ত, গুরুদ্বার পার্কের অনুষ্ঠানে দুই উপাচার্যকে এনে আমরা আমাদের নকশালপন্থী তকমার বাজে দিকটি মুছে দিতে চেয়েছিলাম। ভালো দিক হলো, দেশ ও দশের বদল চায় এটুকু বোঝাতে পেরেছিলাম। নজরুল-সুকান্ত জন্মজয়ন্তী কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন মিঠুয়াদা ও দেবাশিস। এই অনুষ্ঠান সফল হয়েছিল।

এই অনুষ্ঠানের পর আমরা বহু কর্মী ও সমর্থক পাই। ঠিক হয় ৩১ আগস্ট চেতলা পার্কে শহিদ দিবস পালন করা হবে। বাংলায় বামপন্থীরা ১৯৫৯ সালের ৩১ আগস্ট কে কেন্দ্র করে শহিদ দিবস পালন করে। অবামপন্থীরা করে ৯ আগস্ট ১৯৪২ সালের আন্দোলনে যাঁরা শহিদ হয়েছিলেন তাঁদের স্মরণে। সেই সভায় নির্ধারিত বক্তা ছিলেন, প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র, পঞ্চায়েত ও সংশোধনাগার (তখন কারাগার বলা হতো) মন্ত্রী ও আরএসপি নেতা দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সিপিআই (এমএল) দলের প্রথম বিধায়ক সন্তোষ রানা। তিনজনেই আসবো বলে কথা দিয়েছিলেন, কেউ আসেন নি। সভা শুরু করে টানার জন্য সুমিতদা কল্লোলকে একটার পর একটা গণসংগীত গাইতে বলে। সেই প্রথম কল্লোল দাশগুপ্তর গণসংগীত শিল্পী হিসেবে জন্ম হয়। সভায় দেড়ঘন্টা বক্তব্য রাখি। সভাপতি ছিলেন গৌতম ভদ্র। আজ স্বীকার করছি ৯ আগস্টেও আমাদের শহিদ স্মরণ সভা করা উচিত ছিল। পরে বুঝেছিলাম সেদিনও আমরা বাম সংকীর্নতাবাদী ঝোঁক কাটাতে পারি নি।

এলো ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭। মাওসেতুং-এর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা ঠিক করলাম গুরুদ্বারের বিপরীতে গলি পাড়ায় অনুষ্ঠান হবে। মাওসেতুং-এর জীবনী নিয়ে গৌতম বসু ও অরুণ রায়চৌধুরী একটা দারুণ প্রদর্শনী সেট তৈরি করেছিল। সেই সেটের শেষে ছিল ইয়াংসি নদীতে বিপরীত স্রোতে মাও-এর সাঁতার কাটার ছবি।

এক একটা দিন পালন করতে গিয়ে একটা করে কমিটি গড়তে হচ্ছিল। সেই সমস্যার সমাধানে আমরা একটি স্থায়ী সংগঠন গড়ার সিদ্ধান্ত নিই। ১৯৭৭ সালের ১২ অক্টোবর গৌতম ভদ্রের বাড়িতে দুপুর ২টো থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আলোচনা করে প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রগতিশীল গণ ফোরাম (পিপিএফ) বিপ্লব বসুকে আহ্বায়ক করে ৬ জনের একটি প্রস্তুতি কমিটি তৈরি হয়। বাকি ৫ জন হলেন গৌতম ভদ্র, অরুণ রায়চৌধুরী, কল্লোল দাশগুপ্ত, জয়মোহন চক্রবর্তী, এবং এই লেখক। বৈঠকে ১৫ জন ছিলেন। সুমিতদাকে আসতে বললেও তিনি আসেন নি। তাঁর বক্তব্য ছিল, আমি কিছু সাংস্কৃতিক কাজ কর্মে থাকবো। রাজনৈতিক কাজে আর যুক্ত হবো না।

পিপিএফ এলাকায় ছাপ ফেলতে থাকলো। সংগঠনের রাজনৈতিক বক্তব্য ও গঠনতন্ত্র তৈরি হলো। সদস্য হওয়ার ফর্মও তৈরি হলো। বেশির ভাগই তখন বেকার, তাই হোলটাইমারও বটে।

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮। ইরানের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি শাহ দিল্লিতে আসেন। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও জেএনইউএ পাঠরত ইরানী ছাত্ররা বিক্ষোভ দেখান। বিক্ষোভের কারণ স্বদেশে শাহ স্বৈরতন্ত্র চালাচ্ছেন। তাই ওরা কালো পতাকা দেখিয়েছিলেন। শাহ তেহেরান ফিরে গিয়ে গোয়েন্দা সূত্রে ৬ জন ছাত্রের নাম পান। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাইকে চিঠি লেখেন ওই ৬ ছাত্রকে বহিষ্কার করে ইরানে ফেরত পাঠানোর জন্য। ইরানের কমিউনিস্টপার্টি অর্থাৎ তুদে পার্টি মোরারজী দেশাইকে গোপনে চিঠি লেখেন ওই ছাত্রদেরকে না ফেরানোর জন্য। ফেরালে ওদের কোতল করা হতো। মোরারজী দেশাই শাহর প্রস্তাবে রাজী হন নি। ভারত সরকার যাতে শাহর কথা না শোনে এ জন্য পিপিএফ গোলিপাড়ায় একটা প্রতিবাদ সভা করে। তদানীন্তন বিদেশ মন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী বলেছিলেন, পুত্রসম ছাত্রদের বলি দেওয়ার জন্য হাঁড়ি কাঠে পাঠাতে পারবো না। সভার দিন সুমিতদা প্রশ্ন করেছিল, নকশালপন্থীরা এই ইস্যুতে চুপ কেন? বলেছিলাম নকশালপন্থীরা শাহর মদতদাতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে হয়তো তুদে পার্টির মদতদাতা সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদকে বড়ো শত্রু মনে করেন। সুমিতদা বললো, আমাদের বন্ধুরা কি পাগল হয়ে গেছে। সেই সময় ওই ইস্যুতে আমরা মুভ করেছিলাম বলে, ইরানী ফুটবলার খাবাজি পিপিএফ অফিসে দু-দিন এসেছিলেন আলোচনা করার জন্য। জামসেদ নাসিরিরও আসার কথা ছিল। খাবাজি ছিলেন মজিদ বাসকার ও জামসেদের নেতা।

যোগাযোগ হয় ডেবরার কৃষক আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে। ১৯৭৮ সালের মার্চে গৌতম ভদ্রের বি.এল. সাহা রোডের বাড়িতে ভবদেব মন্ডল, গুণধর মুর্মু, নিতাই দাস, দিলীপ সরকার-সহ ১০ জন আসেন। গৌতমদা, জয়মোহন, কল্লোল, অরুণ ও দেবাশিস ছিল। সেখানে ভবদেববাবুরা তৈরি করেন কৃষক সংগ্রাম কমিটি। সুমিতদাকে ওই বৈঠকে থাকতে বলেছিলাম, সুমিতদা রাজি হননি। বলেছিলেন তোমরা কি পিপিএফ-এর কৃষকফ্রন্ট তৈরি করছো? উত্তরে বলেছিলাম, কোনও শ্রেণী সংগঠন, গণসংগঠন অথবা সাংস্কৃতিক সংগঠনকে পিপিএফ কেন কোনও সংগঠনেরই লেজুড় করতে আমরা রাজি নই। প্রতিটি সংগঠনের স্বাধীন সত্ত্বা থাকা উচিত। গণসংগঠনের সম্মেলন হলো, সেটির উদ্বোধন করলেন দলের নেতা, প্রকাশ্য সমাবেশে প্রধান বক্তা হলেন দলের তারকা নেতা। পোস্টারে সেটা দেখে অন্যরা আর যেতে রাজি হন না। সে ভুল আমরা করবো না। তখনই অঙ্কুর নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন জোরদার হয়েছিল যাতে পিপিএফ-এর কিছু সদস্য-সদস্যা ব্যাক্তিগত ক্যাপাসিটিতে ছিলেন।

ওই সময় কল্লোল, গুণধর মুর্মু, নিতাই দাস-সহ আরো দু-তিনজন ডেবরা থেকে নকশালবাড়ি যান। তাঁরা জঙ্গল সাঁওতালের সঙ্গে আলোচনা করেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। এই যাত্রার জন্য কল্লোলকে পিপিএফ-এর প্রস্তুতি কমিটির কাছ থেকে কোনও অনুমতি নিতে হয় নি। পিপিএফ-এর ফোরামের গঠনতন্ত্র তেমন নমনীয় ভাবেই তৈরি হয়েছিল।

১৯৭৮ সালের ৪ জুন। রাজ্যে প্রথম পঞ্চায়েত ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেই ভোট কংগ্রেস বয়কট করে। প্রফুল্ল সেনের নেতৃত্বাধীন জনতা পার্টি দলহীন পঞ্চায়েত গড়ার নামে ভোটকে জলাঞ্জলি দেয়। ডেবরার কৃষক সংগ্রাম কমিটি কয়েকটি আসনে প্রার্থী দেয়। ওদের নেতা ভবদেব মন্ডল কলকাতায় এসে পিপিএফ-এর সাহায্য চান। আমরা সহযোগিতা করতে রাজি হই। সে সময় জয়মোহন একটানা প্রায় ১৫ দিন ডেবরায় ছিল। কল্লোল, অরুণ রায়চৌধুরী, গৌতম বসু, সুজাত প্রমুখরা যাতায়াত করছিল। হাওড়া থেকে পাঁশকুড়ার দু-টি মান্থলি টিকিট কাটা হয়েছিল। বাদলদা ও স্বপন হালদার দু-দিন অন্তর এটা সেটা নিয়ে যেতেন। মাটির বাড়ির দেওয়ালে গৌতমের আঁকা ও অরুণের লেখা দেখে ডেবরার মানুষ অবাক হয়ে যান। ডেবরা-১ ও ২ দুটি ব্লকেই এমন অনেকগুলি ওয়ালিং হয়েছিল।

সে সময় এলাকায় আমাদের সহযোগী সংগঠন পিওয়াইএসএল-এর বুদ্ধদেবকে গ্রেফতার করার প্রতিক্রিয়ায় ব্যস্ত ছিলাম। জয়মোহনরা খবর পাঠায় জরুরি আলোচনার জন্য যেতে হবে। ২৭ মে গৌতম ভদ্রকে নিয়ে ভোর ৬ টায় বেড়িয়ে ১০ টায় ডেবরার মাড়াতলায় পৌঁছাই। দুজনে রাস্তার ধারের একটা দোকানে সারাদিন কাটাই। রাত ১১টায় জয়মোহন, সুজাতরা ফেরে, ওই রাতেই আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসি। জয়মোহন রিপোর্ট করে কৃষক সংগ্রাম কমিটি এই ভোটে সিপিআই-এর সঙ্গে বোঝাপড়া করে লড়ছে। সিপিআই তখনও কংগ্রেসের সঙ্গে গাঁটছাড়া খোলে নি, ওই দলের ভাতিন্দা পার্টি কংগ্রেস তখনো হয় নি। পরদিন সকাল ৯ টায় গুণধর মুর্মুকে আমরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করি। নিতাই দাস বলেন, আমাদেরকে কমিউনিস্ট পার্টিতে এনেছেন সিপিআই নেতা দেবেন দাস। তাঁর কথা আমরা ফেলতে পারি নি। গুণধর মুর্মু বলেন, ইচ্ছে করে জেনে শুনে ভুল করেছি। আমরা বোঝালাম, জেনে শুনে কেউ ভুল করে না। সাদাসিধে সরল মানুষ গুণাদা একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। বৈঠক ভেঙে গেল আমরা বললাম ফিরে যাচ্ছি। মাড়াতলা গ্রামপঞ্চায়েতে ওঁদের একজন প্রার্থী ছিলেন যতদূর নাম মনে পড়ছে বটকৃষ্ণ পইড়া। তিনি বললেন, আমার ওয়ালিংগুলি করে দিয়ে যান। ফিরে এলাম। সুমিতদা বললো, ১৯৬৮-র পর ১৯৭৮-এ তোমাদের গ্রামে চলোও ব্যর্থ হলো। সুমিতদাকে বলেছিলাম, মাও-এর কথা নেগেটিভ এক্সপিরিয়েন্স ইজ অলসো এন এক্সিপিরিয়েন্স। সুমিতদাকে বললাম, সব সময় ঠুকে কথা বলো না। আমরা সবাই মানুষ। মানুষ দোষেগুণে হয়। কেউ অভ্রান্ত নয়। অনেক ভালো গুণের অধিকারী সুমিতদার এ ব্যাপারে ত্রুটি ছিল। ‘তুমি কে হে হরি’ বলে চেঁচিয়ে মাত করতেন। সুমিতদাকে অন্তত ২০ বার এই ত্রুটি শোধরাতে বলেছি কিন্তু সফল হই নি।

১৯৭৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাত থেকে শুরু হলো বিংশ শতাব্দীর রেকর্ড বৃষ্টি। কলকাতা-সহ তদানীন্তন বাংলার ১৬টি জেলাই প্লাবিত হলো। সদ্য গঠিত পঞ্চায়েত নিয়ে ১৫ মাস আগে ক্ষমতায় আসা বামফ্রন্টের ৯৯ শতাংশ সৎকর্মী ত্রাণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে মেদিনীপুরে জলের তোড়ে ভেসে গেলেন গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের নেতা। আমাদের বন্ধুরা তৈরি করেছিলেন ন্যাশনাস রিলিফ কমিটি। তার কনভেনর ছিলেন কবি কমলেশ সেন। আমরা ঠিক করলাম, ত্রাণ সংগ্রহ করবো ওই এনআরসি-র ব্যানারে। পুজোর মুখে আমাদের ত্রাণ সংগ্রহে থাকতেন কম করে ৭০-৭৫ জন সেচ্ছাসেবক। মাইকে বলা হতো, ‘যাঁরা সারা বছর রোদে পুড়ে জলে ভিজে ধান চাষ করেন, আমাদের মুখে অন্ন জোগান, তাঁরা আজ বিপন্ন। শহরবাসীকে পরীক্ষা দিতে হবে। গ্রামবাসীদের বিপদের দিনে কে কতটা তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারছি তার পরীক্ষা। অর্থ, চাল, চিঁড়ে, জামা-কাপড় যে যা পারেন দিন’। তখন শহরবাসী আজকের মতো এতটা উন্নাসিক হন নি। অনেক দরদী ছিলেন। প্রচুর ত্রাণসামগ্রী সংগৃহীত হতো। এই কাজে দক্ষতম ও এক নম্বর বলে স্বীকৃতি দিতে হবে সুমিতদাকে। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন সলিল রায়। সবচেয়ে কম নম্বর দিতে হতো ৫৩-৫৪ বছর বয়সী ভবানী রায়চৌধুরীকে। ভবানীদা রিক্সা ওয়ালা, ঠেলা চালকদের বোঝাতেন তোমাদের শ্রেণী ভাইরা বিপন্ন তোমরা তাঁদের সাহায্য করো। ১০ মিনিট বোঝানোর পর চার আনা পাওয়া যেত। নাট্য সংগঠক অলোক রায়চৌধুরী ভবানীদাকে বলতেন, বাস্তববাদী হোন। গ্রামে একটু বেশি পরিমাণ জিনিস না নিয়ে গেলে, গরিবের উপকার করা যাবে না। আমরা তখন ডেবরা, বাগনান, নাকাশীপাড়া, ইত্যাদি অঞ্চলে গিয়ে দুর্গতদের মধ্যে গিয়ে ত্রাণ বিলি করেছিলাম।

১৭ নভেম্বর, ১৯৭৮। দুনিয়া কাঁপানো দশ দিনের শেষ দিন। সেদিন প্রতাপাদিত্য প্লেসে সাহানগর ইনস্টিটিউট লাইব্রেরী হলে সংগঠিত হয়েছিল পিপিএফ-এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলন। আমরা ঠিক করেছিলাম, লোককে জানিয়ে সম্মেলন করবো। যেচে পড়েই দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন সুমিতদা। বললেন, চেতলা ব্রিজের মুখে একটা তোরণ করবো। এলাকা রঙিন ওয়ালিংয়ে সাজিয়ে দেব। প্রতাপাদিত্য প্লেসে একজন খুদে ডেকরেটার ব্যবসায়ী ছিলেন নাম সুশীলদা। সুশীলদাকে সুমিতদা বোঝালেন কি করতে হবে। রং তুলি নিয়ে মাঠে নামলেন গৌতম বসু, অরুণ রায়চৌধুরী, অরুণ কাশ্যপীর মতো শিল্পীরা। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল জনমনে ছাপ ফেলা। সুমিতদার তত্ত্বাবধানে সেই কাজটা দারুণ হয়েছিল। সম্মেলনে পিপিএফ-র ৩৮ জন সদস্য-সদস্যাই প্রতিনিধি ছিলেন। পর্যবেক্ষক ছিলেন ২৬-২৭ জন। সম্পাদকীয় রিপোর্ট পেশ করেন বিপ্লব বসু। ঠিক হয়েছিল প্রস্তুতি কমিটির ৬ জন সম্মেলনে আলোচনা করতে পারবেন না। কারন তাঁদের সম্মিলিত মতই ছিল সম্পাদকীয় রিপোর্ট। বাকি ৩২ জন সদস্যের মধ্যে ৪ জন বক্তব্য রাখেন। পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বর্ষীয়ান শ্রমিক নেতা বীরেন রায়, ১৯৫৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ছাত্র আন্দোলনের নেত্রী ঝর্ণা ভৌমিক, ১৯৬৬ সালের ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক অচিন্ত্য গুপ্ত, কবি কমলেশ সেন, নাট্যকার অমল রায় প্রমুখেরা বক্তব্য রাখেন।

পিপিএফ-এর গঠনতন্ত্রে কর্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল। এতটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের উদাহরণ এর আগে দেখা যায় নি। ৩৮ জন সদস্যের নাম একটা সাদা কাগজে পর পর টাইপ করা হয়েছিল। ব্যালট বাক্স ছিল। বলা হয়েছিল প্রত্যেককে সততার সঙ্গে নিজের নামের পাশে টিক দিতে হবে। কারন দায় এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। বাকি ৩৭ জনের মধ্যে থেকে ১০ জনকে বাছতে হবে। দু-জন রিটার্নিং অফিসার ছিলেন বেনীমাধব বসু ও অসিত গাঙ্গুলী। সবাই দেখলেন ৩৮ জন ভোট দিলেন। ভোট গোনার পর বেনীমাধব বসু ঘোষণা করলেন, ৩৮ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছে দেবাশিস, ৩৭ ভোট পেয়ে দু-জন যুগ্মভাবে দ্বিতীয় হয়েছে জয়মোহন ও কল্লোল। ৩২ ভোট পেয়েছিলেন অরুণ, ২৪ ভোট পেয়ে একাদশ স্থানে ছিলেন সুমিত চট্টোপাধ্যায়। ওই ১১ জনের কমিটি বসে কল্লোল দাসগুপ্তকে সম্পাদক করে।

পরদিন রাতে পারিবারিক কাজে পুণেতে যেতে হয়েছিল। কিন্তু অমল রায় আমাদের একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। ১৯৭০ সালের ২১ নভেম্বর বিকেলে আড়িয়াদহের ৮ জন নকশালপন্থীকে ধর্মতলার এক বৈঠক থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে। রাত ১২টায় লালাবাজারের পুলিশ ওই ৮ জনকে নিয়ে বারাসত থেকে কৃষ্ণনগর যাওয়ার পথে ৩৪ নং জাতীয় সড়কে যায়। আমডাঙায় ওই ৮ জনকে ভ্যান থেকে নামতে বলে গুলি করে খুন করে। ৫০ বছর আগে ওই রাস্তায় তখন রাতে লরি ছাড়া তেমন গাড়ি যেত না। ভোরের আলো ফুটলে গ্রামবাসীরা দেখেন গুলিবিদ্ধ ৮টি যুবকের দেহ। ১৯৭৭ সালের পর ১৯৭৮ সালের ২১ নভেম্বরও ওই ৮ শহিদকে স্মরণ করা হয়। পিপিএফ-এর ২০-২২ জন সেদিন আড়িয়াদহে গিয়েছিলেন। সেই কর্মসূচি সংগঠিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুমিতদাকে।

(চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev