
রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতাকে বৈজ্ঞানিক মনন নিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন সম্প্রতিপ্রয়াত সাহিত্যিক কেতকী কুশারী ডাইসন। বস্তুত সুশোভন অধিকারীকে সহলেখক করে লেখা তাঁর বই রঙের রবীন্দ্রনাথ আমাদের চোখ খুলে দেয়। তাঁদের আগে এরকম বিস্তৃত গবেষণা হয়নি রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম ও সাহিত্যে বর্ণান্ধতার পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে।
কবিগুরু জীবনস্মৃতিতে লিখছেন, “ক্রমশ নর্মাল স্কুলের স্মৃতিটা যেখানে ঝাপসা অবস্থা পার হইয়া স্ফুটতর হইয়া উঠিয়াছে সেখানে কোনো অংশেই তাহা লেশমাত্র মধুর নহে। ছেলেদের সঙ্গে যদি মিশিতে পারিতাম, তবে বিদ্যাশিক্ষার দুঃখ তেমন অসহ্য বোধ হইত না। কিন্তু সে কোনোমতেই ঘটে নাই। অধিকাংশ ছেলেরই সংস্রব এমনই অশুচি ও অপমানজনক ছিল যে, ছুটির সময় আমি চাকরকে লইয়া দোতলার রাস্তার দিকের এক জানালার কাছে একলা বসিয়া কাটাইয়া দিতাম। মনে মনে হিসাব করিতাম, এক বৎসর, দুই বৎসর, তিন বৎসর — আরও কত বৎসর এমন করিয়া কাটাইতে হইবে। শিক্ষকদের মধ্যে একজনে কথা আমার মনে আছে, তিনি এমন কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করিতেন যে তাঁহার প্রতি অশ্রদ্ধাবশত তাঁহার কোনো প্রশ্নের উত্তর করিতাম না। সম্বৎসর তাঁহার ক্লাসে আমি সকল ছাত্রের শেষে নীরবে বসিয়া থাকিতাম।”
সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে তাঁর অকৃতকার্যতার কথা তো প্রথমেই বলা হয়েছে। ফাদার পেনারান্ডা সান্নিধ্য ছাড়া সেখানে তিনি কিছুই পাননি। ভারতবর্ষের প্রাচ্য শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে তিনি অসফল হলেন তো বটেই, পরে পাশ্চাত্যের শিক্ষাও তাঁর কাছে অধরা থেকেছিল। ব্যারিস্টারি পড়ার বাসনায় ১৮৭৮ এ তিনি মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিলেতে ব্রাইটনের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন পিতা দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে। সেখানে আগেই গিয়ে হাজির হয়েছিলেন মেজবৌদি জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। রবীন্দ্রনাথ সেখানে কলেজে ভর্তি হন, ক্লাসও করেন কিছুদিন। পরে এক পারিবারিক বন্ধু পরামর্শে একজন সাহেবের কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন, যাতে তিনি ল’ কলেজে চান্স পান। ব্রাইটনের পড়াশোনার ধারা কবির ভালো লাগেনি। জীবনস্মৃতিতে এরপর নিজের যে কলেজের নাম করেছেন কবি সেটি হল ‘য়ুনিভার্সিটি কলেজ’। সেই কলেজে ক্লাস করার সময় তিনি ডা. স্কট বলে একজন চিকিৎসকের বাড়িতে গেস্ট হিসেবে থাকতেন। বলা বাহুল্য ইংল্যান্ডের পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থাতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যারিস্টার হয়ে ওঠা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ১৮৮০ তে মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ও মেজবৌদি জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সঙ্গে তিনি ভারতে ফিরে আসেন।
কবির শিক্ষাজীবনে প্রেসিডেন্সী কলেজের এক্সটার্নাল ছাত্র হিসেবে একদিন হাজির থাকার রেকর্ড আছে। কেন ভর্তি হয়েছিলেন কোথাও তা পরিষ্কারভাবে বলা নেই। তবে মনে করা যেতেই পারে ব্যারিস্টারি পড়তে গেলে এখানকার একটি কলেজের রেফার-লেটারের দরকার হয়। সেইজন্যেই কি একদিনের প্রেসিডেন্সী- সংযোগ তাঁর?
এই উপর্যুপরি ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞরা তাঁর বিরল প্রতিভার দোহাই দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের মতো জিনিয়াসকে ইস্কুলের চৌহদ্দিতে বেঁধে রাখা যায় না। তাঁর মতো প্রতিভার জন্যে এই প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা নাকি যথেষ্ট ছিল না।
কিন্তু সত্যিই কি তাই?
কবিগুরুর কোনও রোগবালাই ছিল কিনা স্কুল জীবনে তার খোঁজ নিতেই হয়। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সেরেস্তার যে মোটা মোটা জাবদা খাতার খোঁজ মিলেছে পরবর্তীকালে, তাতে এক জায়গায় লেখা আছে বাল্যকালে নার্ভের অসুখের জন্যে তাঁর জন্যে ডাক্তাররা বিয়ারের সুপারিশ করেছিলেন। বালক অবস্থায় তাঁর চোখে চশমা ছিল না। পড়াশুনায় আশানুরূপ রেজাল্ট না হওয়ায় ডিপ্রেশন ছিল হয়তো বা। চোখে চশমা উঠেছিল তিরিশোর্ধ বয়সে। একটা কথা মনে রাখতে হবে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েরা মানুষ হত চাকরদের হাতে। অন্দরমহলের রমণীদের হাতে নয়। এক শক্তিশালী ভৃত্যরাজতন্ত্র বিরাজ করত সেখানে। তারা যেমন আখড়ায় কুস্তি শেখাত, স্নান-খাওয়াদাওয়াও করাতো তারা। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে বাচ্চাদের কলেরা বা আন্ত্রিক হতো অনেকের। এটা এই আনহাইজিনিক ফিডিং প্র্যাকটিসের জন্যেও হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের গাত্রবর্ণ ছিল যাকে বলে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। তিনি বিশুদ্ধ গৌরবর্ণের অধিকারী ছিলেন না। শোনা যায় গাত্রবর্ণ উজ্জ্বলতর করার জন্যে ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের শিশু অবস্থায় দুধে চান করানোর রেওয়াজ ছিল। দেবেন্দ্রজায়া সারদা দেবী রবীন্দ্রনাথকে কালো বলতেন। যেটা আদরের বহিঃপ্রকাশ হতেই পারে। তিনি বলতেন, “সব ছেলের মধ্যে রবিই আমার কালো।”
অনেকেই জানেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আংশিক বর্ণান্ধ ছিলেন। এ নিয়ে অনেক লেখকই লিখেছেন। শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক রাণী চন্দের স্মৃতিকথাধর্মী বইয়ে, প্রশান্তকুমার মহলানবিশের স্ত্রী নির্মলকুমারী মহলানবিশের স্মৃতিকথায় রবীন্দ্রনাথের আংশিক বর্ণান্ধতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি যে লাল রঙের ফুল ভালো করে দেখতে পেতেন না, নীল ফুল সহজেই তাঁর নজরে পড়ত, তা তিনি স্বীকার করেছিলেন দুজনের কাছেই।
কাব্যসাহিত্যে তিনি ‘লাল’ শব্দটি বেশি জায়গায় লেখেননি। ‘রাঙা’ ব্যবহার করেছেন। ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে’ — যেমন লিখেছেন, তেমনি ছেলে-ভোলানো ‘রবিমামা দেয় হামা, গায়ে রাঙা জামা ওই’ — এটাও লিখেছেন। লাল একেবারে লেখেননি তা নয়, তবে তুলনায় কম। সাহিত্যে তো বটেই তাঁর আত্মজৈবনিক লেখাতেও লাল রঙের উল্লেখ পাওয়া যায়। জীবনস্মৃতিতেই ‘হিমালয়যাত্রা’ পর্বে লিখেছেন ‘পিতা গায়ে একটি লাল শাল পরিয়া হাতে একটি মোমবাতির সেজ লইয়া নিঃশব্দসঞ্চরণে চলিয়াছেন’।
‘য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র’-এ লিখিয়াছেন, “একজন মুসলমানিনী সাজিয়াছেন, লাল ফুলো ইজের, তার উপর একটা রেশমের পেশোয়াজ, মাথায় টুপির মতো —”।
আর একটি পত্রে লিখিয়াছেন, “ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে লাল লাল ফুলো ফুলো মুখ নিয়া বাড়ির দরজার বাইরে ও রাস্তায় খেলা করিতেছে।”
তবে কবিতা, গল্প, উপন্যাসে লাল-এর চেয়ে ‘রাঙা’ যে বেশি ব্যবহার করেছেন, সেটা অনস্বীকার্য।
কবিগুরু যে আংশিক বর্ণান্ধ ছিলেন, তা কবি নিজে স্বীকার না করলে কেউ অবশ্য জানতেই পারতেন না। ভাইঝি (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা) ইন্দিরাকে লেখা অসংখ্য চিঠির একটিতে লিখেছেন, “ আমার মতো বিখ্যাত রঙকানা…”।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আংশিক বর্ণান্ধ। তিনি লালকে সবুজ দেখতেন। শুধু সবুজ নয়, হলুদ ও বাদামিও দেখতেন। এইজন্যে তাঁর আঁকা ছবিতেও এর প্রতিফলন হয়েছে। যদিও কবিগুরু ৬৭ বছর বয়সে ছবি আঁকা গুরুত্বসহকারে শুরু করেন। তার আগে কবিতার কাটাকুটিকে একটি আকার দেওয়ার অভ্যাস ছিল তাঁর। কখনও তা অতিপ্রাকৃতিক জীবজন্তু ও প্রাগৈতিহাসিক মনুষ্য-অবয়ব হত।
কবির জন্মশতবার্ষিকী হয় ১৯৬১-তে। তখন আমেরিকান লেখক-সমালোচক ও ইতিহাসবিদ স্টেলা ক্রামরিশ জন্মশতবর্ষে প্রকাশিত ‘ড্রইংস অ্যান্ড পেন্টিংস অব রবীন্দ্রনাথ টেগোর’-এ লিখেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ বলতেন তিনি রঙকানা, লাল আর সবুজ তিনি একই রকম দেখতেন। তবুও তাঁর ছবিতে লাল ও সবুজ পাশাপাশি অবস্থান করেছে এবং মাত্রা ও ঘনত্ব আলাদা থেকেছে।” লেখক ও চিত্রসমালোচক শোভন সোম ১৯৮২ তে অনুষ্টুপ থেকে প্রকাশিত ‘শিল্পী, শিল্প ও সমাজ’ নামক বইটিতে সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথকে আংশিক বর্ণান্ধ বা ‘প্রোটানোপ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। পরের বই ‘তিন শিল্পী’তেও (বাণীশিল্প, ১৯৮৫) এই বিষয়টি নিয়ে মনোগ্রাহী আলোচনা করেছেন। এরপর ১৯৮৭ সালে চক্ষুচিকিৎসক জ্যোতির্ময় বসু আর ডব্লিউ পিকফোর্ড একটি গবেষণাপত্র লেখেন ‘কালার ভিশন অ্যান্ড এসথেটিক প্রবলেমস ইন পিকচারস বাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। এতে অনেক নতুন আলোকপাত করা হয়েছিল। যার সূত্র ধরে ১৯৯৭ এ বেরোয় কেতকী কুশারী ডাইসন ও সুশোভন অধিকারীর লেখা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’। এই ঢাউস বইটি অনেক দিক থেকে অভিনব। আবির্ভাবেই সাড়া ফেলে। কবির জীবন ও সাহিত্য তন্ন তন্ন করে খুঁজে তাঁরা দেখাতে চেয়েছেন, তিনি বর্ণান্ধ ছিলেন। শোভন সোম যেখানে বলেছেন তিনি ‘প্রোটানোপ’ ছিলেন, কেতকী কুশারী ডাইসন সেই প্রোটানোপিয়াকে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। কবিগুরু লালকে সবুজ ছাড়াও হলুদ, বাদামি আর ধূসরও দেখতেন।
সাহিত্য থেকে তো বটেই, কবির জীবনের বিভিন্ন ঘটনা, চিঠিচাপাটি থেকেও তাঁরা অনুসন্ধিৎসু তথ্য উদ্ধার করেছেন।
এর মধ্যে রোম্যা রোঁলার সঙ্গে কবির সাক্ষাৎকারের কথা আছে। এই ফরাসি বিদ্বজ্জনও তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন নীল ছিল কবির পছন্দের রঙ।
ইতালিতে গিয়ে কবি লাল পপিফুলের সমারোহ দেখেও নীরব থাকলেন কেন, সেটাও তাঁর বর্ণান্ধতার পক্ষে সওয়াল করছে। তিনি ইতালিতে দু’ধরনের আঙুরের কথা লিখেছেন, সাদা আর কালো। কেতকী কুশারী ডাইসন এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন, লাল আঙুরকে কবি কালচে দেখেছিলেন বর্ণান্ধতার কারণে।
কবিগুরুর অল্পবয়সে স্কুল ছাড়ার যে কারণগুলি বহুলপ্রচলিত, সেগুলি হল, প্রচলিত ছকে বাঁধা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি কবির বিতৃষ্ণা, তাঁর মতো বিরাট প্রতিভাকে স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে বেঁধে রাখা অসম্ভব, — এইসব তত্ত্ব।
কেউ কেউ তো তাঁকে ইফেমিনেট করে দেখিয়েছেন। তাঁর মেয়েলি হাবভাবের জন্যে ষণ্ডামার্কা ছাত্রদের আদর-অত্যাচার তিনি মানসিকভাবে নিতে পারেননি। এরকম তত্ত্বও বাজারে চলে।
কেতকী কুশারী ডাইসন ও সুশোভন অধিকারী তাঁদের গবেষণাকে কবির বাল্যকাল অবধি যদি বিস্তৃত করতেন, তাহলে তাঁরা কবির অকালে স্কুল ড্রপআউটের কারণটি ধরতে পারতেন। কিন্তু তা তাঁরা করেননি। তাঁদের কাজ পুরোটাই সাবালক রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা নিয়ে।
কিন্তু যেহেতু কালার ব্লাইন্ডনেস সেক্সলিঙ্কড রিসেসিভ ডিসঅর্ডার, এর প্রভাব তাঁর শৈশব ও বাল্যকালেও পড়েছিল অনিবার্যভাবে। তারই ফলশ্রুতি তাঁর বর্ণান্ধতাজনিত হীনমন্যতা ও স্কুল ছেড়ে দেওয়া।
পরবর্তীকালে এই স্কুল-ড্রপআউটের বিষয়টি কবির আংশিক বর্ণান্ধতা দিয়েই ব্যাখ্যা করা গেছে। ‘স্কুলছুট রবি ও বর্ণান্ধতা’ বইটিতে বিষয়টি প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তবে পথ দেখিয়েছেন শোভন সোম ও কেতকী কুশারী ডাইসন।