শ্রাবণ মানেই শিব পুজো, সবুজ চুড়ি আর মেহেন্দি। গোটা শ্রাবণ মাস জুড়ে ভোলানাথের পুজার রীতি বহু পুরনো কিন্তু ইদানিং শ্রাবণ মাসে বহু মহিলার হাতে
সবুজ চুড়ি আর মেহেন্দি পরা চোখে পড়ে। শ্রাবণ মাসে মহিলাদের সবুজ চুড়ি পরার রেওয়াজ নিছক কী কোনো আধুনিক ফ্যাশন ট্রেন্ড নাকি প্রকৃতি, ধর্ম ও স্বাস্থ্যের সাথে জড়িত কোন প্রাচীন ঐতিহ্য? আজকের লেখায় বলবো তারই কথা।
শ্রাবণ মাসে বাঙালি মেয়েদের সবুজ চুড়ি পরার এই রীতিটি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস, ঋতুভিত্তিক সতেজতা এবং আধুনিক ফ্যাশন ট্রেন্ডের একটি মিশ্রণ। রেওয়াজটি মূলত উত্তর ও পশ্চিম ভারতের (উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান এবং মহারাষ্ট্র) হরিয়ালি তিজ নামক ব্রত থেকে এসেছে যা বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
তিজ ব্রত হলো হিন্দু নারীদের একটি পবিত্র ও জনপ্রিয় উপবাস যা মূলত ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর পূজা উপলক্ষে পালিত হয়। হরিয়ালী তিজ, কাজরী তিজ এবং হরতালিকা তিজ নামে প্রধানত তিন প্রকার তিজ হয়ে থাকে।

শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে হরিয়ালী তিজ পালিত হয়। একে সাবণ তিজ বা ছোট তিজও বলা হয়। এই উৎসব দেবাদিদেব মহাদেব ও মাতা পার্বতীর পুনর্মিলনের স্মরণে উদযাপিত হয়। হরিয়ালি তিজ ২০২৬ সালে ১৫ আগস্ট (শনিবার) উদযাপিত হবে।
কজরি তিজ ভাদ্রপদ মাসের কৃষ্ণপক্ষের তৃতীয় দিনে পালন করা হয়। হরতালিকা তিজ ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয় তিথিতে সারা রাত জেগে কঠিন নির্জলা উপবাস ও নিয়ম মেনে পালিত হয়।
তিজ ব্রতের মূল কাহিনীটি দেবী পার্বতীর কঠোর তপস্যা এবং ভগবান শিবকে পতি হিসেবে লাভ করার অলৌকিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত। দেবী পার্বতী বাল্যকাল থেকেই ভগবান শিবকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার সাধনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পিতা হিমালয় দেবর্ষি নারদের পরামর্শে পার্বতীর বিবাহ ভগবান বিষ্ণুর সঙ্গে স্থির করেন। পার্বতী বিষ্ণুকে বিবাহ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাই তাঁর প্রিয় সখীরা তাঁকে রাজপ্রাসাদ থেকে হরণ করে (লুকিয়ে) একটি ঘন জঙ্গলে নিয়ে যান। ‘হরতালিকা’ শব্দটির উৎপত্তি এখানেই — ‘হরৎ’ মানে হরণ এবং ‘আলিকা’ মানে সখী।
জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে দেবী পার্বতী বালি দিয়ে শিবলিঙ্গ তৈরি করেন এবং অন্ন-জল ত্যাগ করে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তাঁর এই একনিষ্ঠ ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে ভগবান শিব প্রকট হন এবং পার্বতীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার বর দেন।পরবর্তীকালে দেবী পার্বতীর এই ত্যাগ ও সাধনাকে স্মরণ করেই হিন্দু নারীরা নিজেদের দাম্পত্য সুখ ও সৌভাগ্যের জন্য প্রতি বছর এই ব্রত পালন করে আসছেন।

ব্রতের দিন ব্রতীরা মাটি বা বালি দিয়ে ভগবান শিব, দেবী পার্বতী এবং গণেশের মূর্তি তৈরি করে পুজো করেন।
শিব-পার্বতীকে ফুল, ফল, ধূপ, দীপ, বেলপাতা, ধুতুরা ফুল এবং বিশেষ মিষ্টি যেমন — গুজিয়া বা মালপোয়া নিবেদন করা হয়। পূজার রাতে নারীরা একসঙ্গে জড়ো হয়ে শিব-পার্বতীর ভজন-কীর্তন করেন এবং সারা রাত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন।
হিন্দু শাস্ত্র ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই মাসে সবুজ রঙের চুড়ি এবং পোশাক পরার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক এবং প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে।ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সবুজে ঘেরা প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং সরলতা ভগবান শিবের অত্যন্ত প্রিয়। তাই শ্রাবণ মাসে সবুজ রঙের চুড়ি পরলে মহাদেব এবং দেবী পার্বতীর বিশেষ আশীর্বাদ পাওয়া যায় বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন।
বিবাহিত নারীরা তাঁদের স্বামীর দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য এবং সুখী দাম্পত্য জীবনের কামনায় এই মাসে সবুজ রঙের চুড়ি এবং মেহেন্দি পরেন।শুধু বিবাহিত নারীরাই নন, অবিবাহিত বা কুমারী মেয়েরাও এই মাসে সবুজ রঙের কাঁচের চুড়ি পরতে পারেন। মনে করা হয়, শ্রাবণ মাসের সোমবারে ব্রত রেখে সবুজ চুড়ি পরলে মনের মতো যোগ্য জীবনসঙ্গী পাওয়া যায়।
শ্রাবণ হলো বর্ষাকাল, যখন চারপাশের প্রকৃতি বৃষ্টি পেয়ে নতুন করে সবুজ এবং সতেজ হয়ে ওঠে। সবুজ রঙ মূলত জীবন, উর্বরতা, ইতিবাচক শক্তি এবং নতুন সূচনার প্রতীক। মহিলারা এই রূপকে নিজেদের জীবনে ধারণ করার জন্য সবুজ সাজে সাজেন।
জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে, সবুজ রঙ বুধ গ্রহের (Budh Graha) সাথে সম্পর্কিত। সবুজ চুড়ি বা পোশাক পরিধান করলে বুধ শান্ত থাকে, যা মানুষের বুদ্ধিমত্তা, একাগ্রতা এবং মানসিক শান্তি বৃদ্ধি করে।
আয়ুর্বেদ মতে, বর্ষাকালে মানুষের শরীরে ‘পিত্ত’ দোষ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সবুজ রঙের সান্নিধ্য মন ও শরীরকে শীতল রাখতে এবং শান্ত করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া হাতের কব্জিতে চুড়ির ঘর্ষণ নির্দিষ্ট কিছু প্রেসার পয়েন্টকে উদ্দীপিত করে শরীরের রক্ত সঞ্চালন ভালো রাখে।
শ্রাবণ মাসে হাতে সবুজ চুড়ি পরার বিশেষ নিয়ম রয়েছে। এই মাসে সোমবার, শুক্রবার বা রবিবার সকালে স্নান সেরে শিব ও পার্বতীর পুজো করে তাঁদের চরণে চুড়ি নিবেদন করার পর তা হাতে পরতে হয়। মনস্কামনা জানিয়ে শিবের সামনে ১০৮ বার “ওঁ নমঃ শিবায়” জপ করুন। প্লাস্টিক বা ধাতুর পরিবর্তে কাচের সবুজ চুড়ি পরা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।

সবসময় জোড় সংখ্যায় (যেমন ১৬ বা ২৪টি) সবুজ চুড়ি হাতে পরতে হয়। নতুন চুড়ি বাজার থেকে শুক্রবার বা রবিবার কিনে আনুন। পুরনো বা আগে কেনা চুড়ি ব্যবহার করবেন না। ভুল করেও মঙ্গলবার বা শনিবার সবুজ চুড়ি কিনবেন না বা পরবেন না।
সাধারণত শ্রাবণ মাসের শেষ দিনে (শ্রাবণ সংক্রান্তি) অথবা ভাদ্র মাসের প্রথম দিনে এই চুড়ি খোলা হয়। সংক্রান্তি ছাড়া অন্য দিনে খুলতে চাইলে সোম, বুধ, বৃহস্পতি বা শুক্রবার দেখে খোলা ভালো। মঙ্গলবার বা শনিবার সাধারণত এই ধরনের শুভ জিনিস হাত থেকে খোলা এড়ানো হয়। শ্রাবণ মাস শেষ হওয়ার পর হাতের সবুজ চুড়ি খুলে নিরাপদে রাখতে হয় বা জলাশয়ে বিসর্জন দিতে হয়, এবং শিবের পুজো সম্পন্ন করে ব্রত বা নিয়ম শেষ করতে হয়।
শেষে বলা যায়, শ্রাবণ মাসের রূপ ও সজীবতার সঙ্গে মিলিয়ে নারীদের হাতে সবুজ চুড়ির শোভা আজ কেবল আধুনিক কোনো ফ্যাশন ট্রেন্ড নয়, বরং এটি আবহমানকালের ঐতিহ্য, প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন এবং শিব-পার্বতীর আরাধনার এক সুন্দর ও পবিত্র প্রকাশ। আধুনিকতার ভিড়েও রিমঝিম বৃষ্টির ছন্দের সাথে এই চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ বাঙালির হৃদয়ে অম্লান ভালোবাসা ও আনন্দ বয়ে নিয়ে আসুক।