এরপর তিনি “প্রাচীন তুমার বা তাকসিম, বা ভূমি রাজস্বের বন্টন”-কে ( ভূমি রেকর্ড হিসেবে তাকসিম হল যৌথ মালিকানাধীন জমির বিভাজন বা মিউটেশন। উত্তরাধিকার সূত্রে বা যৌথভাবে কেনা কোনো বড় জমির প্লট যখন সব শরীক বা মালিকদের মধ্যে আলাদা করে দেওয়া হয়, তখন এই আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। আর ভূমি রাজস্ব বা কর নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তাকসিম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যাতে প্রত্যেক মালিক নিজ নিজ অংশের খাজনা বা রাজস্ব সরাসরি সরকারের রাজস্ব বিভাগ বা তহসিল অফিসে পরিশোধ করতে পারেন — অনুবাদক) “শুধুমাত্র কৌতূহলের বিষয়” হিসেবে বর্ণনা করেন, যা আগের একটা অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ফ্রান্সিসের দ্বিতীয় অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেন — অসম মূল্যায়নের অসুবিধা প্রতিকারযোগ্য নয়, কারণ জমির উপযুক্ত মূল্যায়ন করা অসম্ভব। এর বিপরীতে, হেস্টিংস মনে করেন, “বর্তমান পরিস্থিতি এই প্রচেষ্টার জন্য বিশেষভাবে অনুকূল, এবং এই কাজ সাফল্যের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছাড়া করা উচিত নয়।” পরিমাপ বা জরিপের মাধ্যমে জমির মূল্যায়ন করার চেষ্টা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য হবে, কিন্তু ভূমি রাজস্বের হিসাব প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করবে। (হেস্টিংস লিখেছেন — “বাংলায় রাজস্বের হিসাব এমন এক নিয়মনিষ্ঠা ও নির্ভুলতার সাথে রাখা হয় যা ইউরোপেও অজানা। আমি যতদূর জানি, এই হিসাবগুলো প্রায় একটি অভিন্ন পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি করা হয় এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর এর হিসাব মেলানো হয়। প্রত্যেক রায়ত বা প্রজার জন্য একটি পৃথক হিসাব (বা কড়চা) রাখা হয়, যার একপাশে তার এক বছরের খাজনার বিভিন্ন অংশ উল্লেখ করা থাকে এবং অন্যপাশে তার প্রদত্ত অর্থ লিপিবদ্ধ করা হয়। পরবর্তীকালে এই সমস্ত হিসাব বার্ষিক ভিত্তিতে সারসংক্ষেপে পরিণত করা হয়, যাতে প্রতিটি গ্রামের খাজনা, প্রাপ্তি এবং বকেয়ার একটি বিশদ বিবরণ থাকে। সমস্ত গ্রামের সারসংক্ষেপগুলো মিলে পরগনা হিসাব তৈরি হয়; এবং জমিদারি বা রাজধানী বিভাগের সাধারণ হিসাব পরগনাগুলোর হিসাবের সমষ্টি দিয়ে গঠিত হয়…। এই সমস্ত বিভিন্ন হিসাব তাদের নিজ নিজ কাছারিতে প্রকাশ্যে রাখা থাকে। এগুলোর মাধ্যমেই খাজনা আদায় করা হয় এবং তা সবসময় খাজনা আদায়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়, তিনি জমিদার, সেজওয়াল বা অন্য যেই হোন না কেন।”) যেহেতু একটা পরগনার সমস্ত অংশ জাল না করে তার মোট যোগফল জাল করা অসম্ভব, তাই প্রতিজন রায়ত আর গ্রামের হিসাব পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না। কিছু ছোট জমিদার হয়ত তাদের হিসাব জাল করতে সফল হতে পারে, কিন্তু বড় জমিদারদের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। যেহেতু কৃষকেরা তাদের মূল অঙ্গীকার অনুসারে সরকারের কাছে তাদের সংগৃহীত অর্থের হিসাব দাখিল করতে বাধ্য; যেহেতু দেশের প্রথা অনুযায়ী ইজারার মেয়াদ শেষে মফস্বলের হিসাব জমা দিতে হয়; এবং যেহেতু বছরের শেষে তাদের জমি ছেড়ে দিতেই হয়, তাই হিসাব আটকে রাখার মতো স্বার্থও তাদের তেমন নেই, সুতরাং বাংলার একটা উপযুক্ত মূল্যায়ন বা হস্তবুদ (ঐতিহাসিক ফারসি-বাংলা শব্দ; আভিধানিক অর্থ জমাবন্দি, রাজস্ব নিরূপক হিসাব। মূলত জমিদারির আমলে কোনো এস্টেট বা সম্পত্তির সম্ভাব্য আয় এবং জমির পরিমাণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণী বা হিসাবপত্রকে হস্তবুদ বলা হয় — অনুবাদক) সম্পাদনের জন্য বর্তমান মুহূর্ত অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুকূল। জমিগুলো জমিদারদের ফিরিয়ে দেওয়া হলে, পরবর্তীকালে এটি গঠন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং এর ফলে পাঁচশালা বন্দোবস্তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য — অর্থাৎ সমান কর নির্ধারণের একটি নিয়ম আবিষ্কার — হারিয়ে যাবে।
নিজের পরিকল্পনার পক্ষে সাফাই গাওয়ার পর, হেস্টিংস এবার শত্রুপক্ষের শিবিরে পাল্টা আক্রমণ হানতে এবং ফ্রান্সিসের সেই পরিকল্পনার সমালোচনা করতে উদ্যত হন — যে পরিকল্পনা অনুযায়ী বিগত তিন বছরের প্রকৃত রাজস্ব আয়ের ভিত্তিতে একটি বন্দোবস্ত বা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছিল; অবশ্য এই আয়ের হিসাবকে প্রাদেশিক পরিষদগুলোর মতামতের আলোকে সংশোধন করে নেওয়ার কথা ছিল, যাতে যেসব জমির রাজস্ব হার অতিরিক্ত বা কম ধার্য করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করা যায়। আপাতদৃষ্টিতে এই পরিকল্পনার প্রধান গুণ হলো এর চরম সরলতা; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও অপর্যাপ্ত। এটি সমস্ত আকস্মিক ও আনুষঙ্গিক পরিস্থিতি — যেমন বন্যা, অত্যাচারমূলক কার্যকলাপ, জমিদারদের নাবালকত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলে; অথচ এসব পরিস্থিতির কারণে জমির প্রকৃত মূল্য বা উর্বরতা বিন্দুমাত্র হ্রাস না পেলেও, রাজস্ব আদায় নিশ্চিতভাবেই কমে যায়। এমন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যে বন্দোবস্ত গড়ে উঠবে, তা হবে অযোগ্য ব্যক্তিদের প্রতি এক ধরনের অন্যায্য ছাড়; এটি সেইসব ব্যক্তিকে আরও উৎসাহিত করবে, যারা রাজস্ব বকেয়া ফেলে রাখাকেই ‘ললিতকলা’ বা সূক্ষ্ম কৌশলে পরিণত করেছে; আর অন্যদিকে, এটি সেইসব সৎ আর কর্তব্যপরায়ণ জমিদারদের জন্য শাস্তিস্বরূপ হবে, যারা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সময়ানুবর্তিতায় নিজেদের প্রাপ্য রাজস্ব পরিশোধ করে এসেছেন — যার ফলে তাঁদের জমির ওপরই পূর্ণমাত্রায় রাজস্ব ধার্য করা হবে।
এরপর হেস্টিংস বিগত তিন বছরের রাজস্ব আয়ের ওপর ভিত্তি করে রাজস্ব হার নির্ধারণের পদ্ধতিটি যে কতটা অপর্যাপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ, তার একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। ১৭৭৬-এর বসন্তকালে মুর্শিদাবাদের পাশের এলাকার বেশ কয়েকজন প্রাচীন আর প্রতিষ্ঠিত তালুকদার রাজস্ব বকেয়া রাখার দায়ে অভিযুক্ত হন এবং সেই বকেয়া অর্থ আদায়ের লক্ষ্যে তাঁদের জমিজমা বিক্রি করে দেওয়া হয়। বোর্ড Board তখন প্রাদেশিক পরিষদের কাছে এই মর্মে কৈফিয়ত তলব করে জানতে চায় যে, এই রাজস্ব বকেয়া পড়ার মূল কারণ কি জমির ওপর অতিরিক্ত হারে রাজস্ব ধার্য করা — নাকি তালুকদারদের নিজস্ব অবহেলা বা অব্যবস্থাপনার ফলেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এই জিজ্ঞাসার জবাবে প্রাদেশিক পরিষদ নিম্নোক্ত উত্তর প্রদান করে: “এই রাজস্ব বকেয়ার দায়ভার ঠিক কতটা জমির মালিকদের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার ওপর বর্তায়, আর কতটা জমির ওপর অতিরিক্ত হারে রাজস্ব ধার্য করার কারণে সৃষ্টি হয়েছে — তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। তবে একটা বিষয় লক্ষ্য করার যে, বিগত তিন বছর রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিয়মিত আর স্বাভাবিক গতিতে অব্যাহত থাকলেও, চতুর্থ বছরে এসে হঠাৎ করেই রাজস্বের পরিমাণ বিপুলভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং বকেয়ার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এই ঘটনা অন্ততপক্ষে এমন এক অনুমানের অবকাশ সৃষ্টি করে যে, ওই নির্দিষ্ট বছরে খরার প্রকোপ সম্পর্কে জমিদাররা যে অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন, তা হয়তো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল না; এবং সম্ভবত এই খরাই ছিল সেই বছরের রাজস্ব ঘাটতির মূল কারণ।”
এই ছোট উপাখ্যান ফ্রান্সিসকে কঠোর সমালোচনার সুযোগ করে দিল। গভর্নর-জেনারেল কেন তালুকদারদের জমি বিক্রির মতো এত কঠোর একটি পদক্ষেপ অনুমোদন করলেন? কেন তিনি সেই ‘মূল্যবান মফস্বল হিসাবপত্র’ খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন না — যা নিয়ে এত আলোচনা হয়েছিল — যাতে যাচাই করা যায়, রাজস্বের হার অতিরিক্ত নির্ধারণ করা হয়েছে কি না। ফ্রান্সিসের যুক্তি মেনে নিলেও, উল্লিখিত এই দৃষ্টান্ত হেস্টিংসের সেই দাবিই সমর্থন করে যে, প্রকৃত আয়ের ওপর ভিত্তি করে তিন বছরের একটি পর্যালোচনা কোনো রাজস্ব বন্দোবস্তের ভিত্তি হিসেবে যথেষ্ট নয়; এবং প্রাদেশিক পরিষদ তাদের চোখের সামনেই অবস্থিত জমিদারি বা এস্টেটের রাজস্বের হার অতিরিক্ত নির্ধারণ করা হয়েছে কি না — তা বলতে অক্ষম হওয়ায় প্রমাণিত হয় যে, প্রাদেশিক পরিষদের মতামতের গুরুত্ব অত্যন্ত নগণ্য। “একটা প্রাদেশিক পরিষদ — যার ইংরেজ সদস্য এবং স্থানীয় কর্মকর্তারা উভয়েই মেধার দিক থেকে বাংলার অন্য কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই — তারাও নিশ্চিত করে বলতে অক্ষম যে, কোনো নির্দিষ্ট জেলার রাজস্বের হার অতিরিক্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, নাকি সেটিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কারণ, যদি তাদের নিজেদের এলাকারই কোনো জমিদারি — যা ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে — তার রাজস্বের হার কম বা বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে মতামত দেওয়ার ক্ষমতা তাদের না থাকে; তবে আমরা কীভাবে আশা করতে পারি যে, তারা সমগ্র বিভাগের রাজস্ব সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিতে পারবে — যে বিভাগের মোট রাজস্বের পরিমাণ পঞ্চাশ লক্ষ টাকা?” আর তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, সরকারি হিসাবপত্রের চেয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ব্যক্তিগত মতামতই অধিক নির্ভরযোগ্য; তবুও নতুন রাজস্ব বন্দোবস্ত কার্যকর করার জন্য জমিদারদের সম্মতির প্রয়োজন হবে। আমরা যদি কোনো বৈষম্যমূলক রাজস্ব নির্ধারণ জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতেই অনড় থাকি, তবে জমিদাররা (যেমনটি নদীয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছিল) তাদের জমিদারি হারানোর ভয়ে এমন একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য হবেন, যার শর্তাবলি শেষ পর্যন্ত তাদের নিশ্চিত ধ্বংসের পথই প্রশস্ত করবে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ