তাই ফ্রান্সিস ১৭৭৬-এর ৮ই নভেম্বরের কার্যবিবরণীতে লিখেছিলেন: তাঁর বক্তব্য ছিল, নিশ্চিতভাবেই — যদি দেশের রাজস্ব আয়ের সর্বোচ্চ সীমাই আবিষ্কার করাই মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে — তবে ‘সার্কিট কমিটি’র Committee of Circuit কে ব্যবফার করেই ইতিমধ্যেই সেটা অর্জিত হয়ে থাকার কথা। আর গভর্নর-জেনারেল আর মিস্টার বারওয়েল কি ১৭৭৫-এর ২২শে এপ্রিল বোর্ডকে জানাননি যে, “বিভিন্ন জেলার রাজস্বমূল্য নির্ধারণের কাজ ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে?” আর এখন এই সমস্ত জটিল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যই বা কার কাছ থেকে পাওয়া যাবে? কৃষকদের থেকে? তারা কি অবিরাম রাজস্ব মওকুফের জন্য আর্তনাদ করে আসছে না? আর তারা যদি কোনো হিসাবপত্র পেশ করেই থাকে, তবে এটা কি নিশ্চিত নয় যে, সেই হিসাবগুলোকে ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবেই মিথ্যা, বানোয়াটি তৈরি করা হয়েছে? জমিদারদের থেকে? তবে কি সত্য নয়, আমাদের নিপীড়নের মুখে তাদের সহায়-সম্পদ গোপন করাই এখন তাদের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে? এরা তো সেই শেষ শ্রেণীর মানুষ, যাদের থেকে আমরা, কোনো রকমের সহায়তা আশা করার অধিকার রাখি। তাহলে কি রায়তদের, প্রজাদের থেকে? কিন্তু কেন — গভর্নর-জেনারেল এবং মিস্টার বারওয়েল স্বয়ং সরকারের প্রতি রায়তদের অনাস্থা নিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। রায়তদের স্বার্থই হলো নিজেদের দুর্দশাকে বাড়িয়ে বলা এবং “তাদের প্রকৃত পরিশোধের পরিমাণ কমিয়ে দেখানো — যাতে ভবিষ্যতে তারা কতটুকু পরিশোধ করতে সক্ষম হবে, তা যেন তাদের অতীতের পরিশোধের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত না হয়ে যায়।” আর ধরে নেওয়া যাক, প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য আমাদের হাতে এসে পৌঁছাল; তবুও আগামী এপ্রিল মাসের আগেই কীভাবে সেই তথ্য যাচাই-বাছাই আর সুবিন্যস্ত করার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে? “এই সমগ্র কার্যক্রম আমার মনে যে জটিল ধারণার জন্ম দেয়, তা হলো বিশৃঙ্খলা আর অসম্ভবতার অদ্ভুত মিশেল — যার জট খুলে উপযুক্ত পথ খুঁজে পাওয়া কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয় বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।” বাংলায় রাজস্বমূল্য নির্ধারণের এই প্রক্রিয়া কেবল নির্দিষ্ট মুহূর্তের জন্য সত্য হতে পারে; কারণ বন্যা বা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলেই সেই নির্ধারিত মূল্যের বৈধতা বা উপযোগিতা অতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। আমাদের যা কিছু জানার প্রয়োজন, তা ইতিমধ্যেই আমাদের জানা হয়ে গেছে। “আমাদের ব্যয়ের পরিমাণ কত, তা আমরা জানি; এবং সাধারণভাবে এই দেশ থেকে কতটুকু রাজস্ব আদায় করা সম্ভব, সে সম্পর্কেও আমাদের ধারণা রয়েছে। আমরা এ-ও জানি যে, সামগ্রিকভাবে দেশের রাজস্বমূল্য অনেক বেশি বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাদেশিক পরিষদগুলো আমাদের জানাতে সক্ষম যে, কোন কোন জেলা বিশেষ সুবিধা পেয়েছে আর কোন কোনগুলো চরম নিপীড়নের শিকার হয়েছে; দেশের কোন কোন অঞ্চলে কোনো রকম অসুবিধা ছাড়াই রাজস্ব আদায় সম্ভবপর হয়েছে এবং কোন কোন জেলার জন্য অবিলম্বে রাজস্ব মওকুফ বা ত্রাণ সহায়তা প্রদান করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আমাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এই শিক্ষাই দেয় যে — সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে বিচার করলে — দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির আলোকে রাজস্ব মওকুফ করাই এখন যথার্থ কর্ম হবে।” এখানে একটি নতুন বন্দোবস্তের জন্য পর্যাপ্ত উপাদান বিদ্যমান; যা হয়তো নিখুঁতভাবে নির্ভুল বা সমতাময় না-ও হতে পারে, তবে এতে কেবল অতি নগণ্য কিছু অসামঞ্জস্যই থেকে যাবে, যা শীঘ্রই “স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মিটে যাবে” (level of themselves)। এই উপাদানগুলো একটি নির্দিষ্ট ‘জমা’ (রাজস্বের পরিমাণ) নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট হবে; আর আমি জোর দিয়ে বলছি — “একটি নির্দিষ্ট ‘জমা’ নির্ধারিত না হলে, অন্য কোনো পদক্ষেপই এই দেশকে রক্ষা করতে পারবে না।” এই যুক্তিগুলোর সমর্থনে ফ্রান্সিস স্যার জে. স্টুয়ার্ট, ব্ল্যাকস্টোন, স্মিথ, মন্টেস্কিউ এবং মিরাবোর মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের মতামতের বা প্রামাণ্যতার আশ্রয় নিয়েছেন।
জমির মূল্যায়নের বিষয়ে তদন্ত করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর পর, ফ্রান্সিস এবার রায়তদের (প্রজাদের) সুরক্ষার জন্য প্রস্তাবিত পদক্ষেপ আলোচনা করতে অগ্রসর হলেন। তিনি অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে মন্তব্য করলেন — “এই ধরনের বুলি বেশ জনপ্রিয়; কিন্তু রায়তদের দৃশ্যমান কোনো উপকার না করেই, বরং জমিদার এবং অন্যান্য উচ্চবর্গীয় দেশীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হিংসা ও অবিচারের ঘটনাগুলোকে আড়াল করতে এবং সেগুলোকে বৈধতার ছদ্মবেশ পরাতে এই বুলি প্রায়শই ব্যবহৃত হয়ে থাকে।” পরহিতৈষণা বা বদান্যতার চর্চা নিজের ঘর থেকেই শুরু হওয়া উচিত। এমন একটি সরকার — “যারা যথেচ্ছভাবে কর আরোপ ও আদায়ের অধিকার দাবি করে এবং প্রয়োগও করে, এবং যাদের ঘোষিত লক্ষ্যই হলো দেশ থেকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা — তাদের পক্ষে কৃষকদের প্রতি কোমলতা দেখানোর বুলি আওড়ানো বা উপদেশ দেওয়া মানায় না।” এরপর তিনি ‘লিজা ফেয়ার, লিজা পাসের’ (laissez faire, laissez passer) — অর্থাৎ অবাধ আর অ-হস্তক্ষেপমূলক নীতির পক্ষে জোরালো সওয়াল করলেন। জমিদার আর রায়তদের যদি তাদের নিজেদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে একটি সমঝোতায় উপনীত হবে, যার ফলে উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থ বা সুবিধা খুঁজে নেবে। গভর্নরের এই পরিকল্পনাটি দেখে মনে হয় যেন এটি — “রায়ত এবং সরকারের মধ্যবর্তী স্তরে বিদ্যমান সমস্ত মুনাফা বা লাভকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করারই একটি প্রচেষ্টা।”
পরবর্তী ১২ই নভেম্বর, গভর্নর-জেনারেল কমিশনের সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট বেতন-কাঠামো বা ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ (অর্থাৎ বেতন-ভাতা) প্রস্তাব করলেন। এই বাবদ মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়াল প্রতি মাসে ৪৮,০০০ টাকা বা তারও কিছু বেশি। গভর্নর ডেভিড অ্যান্ডারসন এবং জর্জ বোগল (তিব্বত ভ্রমণকারী হিসেবে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব) — এই দুজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিলেন; তাঁদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন নির্ধারিত হলো ১,২০০ টাকা। এছাড়া তিনি হেনরি ভ্যানসিটার্টকে ‘ফার্সি অনুবাদক’ এবং গঙ্গা গোবিন্দ সিংহকে — যাঁর নামের সাথে বার্ক (Burke) অত্যন্ত কুখ্যাত ও অশুভ একটি ভাবমূর্তি জুড়ে দিয়েছিলেন — ‘পেশকার’ হিসেবে নিয়োগ প্রদান করলেন। (পেশ = ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্মুখে; কার = যিনি কাজ করেন। অর্থাৎ, একজন “সহকারী ব্যবস্থাপক” বা ডেপুটি ম্যানেজার।) সেই একই দিনে বারওয়েল একটি আপোষমূলক প্রস্তাব পেশ করেন; এতে তিনি উল্লেখ করেন যে, “আমাদের সকলের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু এবং যেটির অপরিহার্যতা আমরা সকলেই স্বীকার করে নিই — সেই প্রধান লক্ষ্যটি হলো, হ্রাসকৃত করের ভিত্তিতে রাজস্ব ব্যবস্থার একটি সুদৃঢ় ও স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা।” তিনি দাবি করেন যে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভর্নর-জেনারেল এবং মিস্টার ফ্রান্সিস একমত পোষণ করেন: —
১. রাজস্বের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ও স্থির মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা উচিত।
২. রাজস্বের পরিমাণে কিছুটা হ্রাস বা ছাড় দেওয়া উচিত।
৩. “এবং পরিশেষে আমরা প্রস্তাব করছি যে, এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দোবস্তটি যেন স্থায়ী প্রকৃতির হয়।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ