৪৯. বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্মৃত প্রতিষ্ঠাতা অনিলকুমার গায়েন
১৯৭৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি।
দিল্লি থেকে বিমানে কলকাতায় ফিরছেন এক বাঙালি গণিত ও পরিসংখ্যানবিদ। মেদিনীপুরের সন্তান তিনি। তিনি দল্লি গিয়েছিলেন বিশেষ কারণে। গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাছে। এর আগে আরও অনেকবার গিয়েছেন তিনি। মেদিনীপুরে বিদ্যাসাগরের নামে একটা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে চান তিনি। বিশেষত্ব থাকবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের। সেটা হবে প্রথাবহির্ভূত। পরিসংখ্যানবিদের যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ এবং গঠনমূলক ভাবনাকে উপেক্ষা করতে পারে নি মঞ্জুরি কমিশন।
কিন্তু নিজের শ্রমের ফসল তিনি দেখে যেতে পারলেন না।
১৯৭৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিমানের মধ্যে হৃদরোগে মৃত্যু হল মানুষটির।
এই পরিসংখ্যানবিদের নাম অনিলকুমার গায়েন (১৯১৯-১৯৭৮)।
মেদিনীপুরের খেজুরির লাক্ষী গ্রামে এক গরিব কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। জীবনকৃষ্ণ গায়েন তাঁর বাবা, পঞ্চমীদেবী তাঁর মা। অল্প বয়েসে মারা গেলেন বাবা। অনেক কষ্টে মা তাঁকে আগলে রাখেন। ভর্তি হয়েছিলেন মণীন্দ্রনাথ এম ই স্কুলে। এরপর চলে আসেন হঁড়্যা শিবপ্রসাদ শিক্ষায়তনে। সংস্কৃত ও গণিতে লেটার মার্ক পেয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করেন ম্যাট্রিক।
তারপর কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ। সেখান থেকে আই এ এবং রিপন কলেজ থেকে গণিতে অনার্স নিয়ে বি এ পাশ করলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত নিয়ে এম এ-তে ভর্তি হলেন তিনি। প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করলেন এম এ-তে।
প্রেসিডেন্সি কলেজ, শিবপুর এঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কিছুদিন অধ্যাপনা করে তিনি চলে যান লণ্ডনের কেম্ব্রিজ কলেজে। পরিসংখ্যান বিজ্ঞানে গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে যোগ দেন ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইন্সটিটিউটে। তারপরে খড়গপুর আই আই টিতে গণিতের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত হন। পরিসংখ্যান বিজ্ঞানে তাঁর অবদান প্রশংসিত হয়। তিনি এফ এন এ ও এফ এস এস সম্মান লাভ করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন্যাল রিসার্চ অ্যাণ্ড ট্রেনিংএর আর্থিক সহায়তায় তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যশিক্ষা পর্ষদের স্কুল ফাইন্যাল পরীক্ষার নানা দিক তুলে ধরেছিলেন।। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান সংস্থার ভারতীয় প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
নিজের কেরিয়ারটা তাঁর কাছে বড় ছিল না। দেশ ও দশের কথা ভাবতেন তিনি। স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কি সেই স্বপ্ন?
মেদিনীপুরের গৌরব বিদ্যাসাগরের নামে একটা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করার স্বপ্ন। সে বিশ্ববিদ্যালয় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো হবে না। হবে প্রথা বহির্ভত।
পরিসংখ্যানবিদ অনিলকুমার গায়েন শুধু স্বপ্নই দেখেন নি। তাকে বাস্তবায়িত করার জন্য চেষ্টা করে গেছেন। মেদিনীপুরে বিদ্যাসাগরের নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির ব্যাপারে মঞ্জুরি কমিশনের সম্মতি আদায়ও করেছেন। কিন্তু শেষ দেখে যেতে পারেন নি। তার আগেই বিমানে হৃদরোগে তাঁর মৃত্যু হয়।
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠল।
কিন্তু তার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা যে অনিলকুমার গায়েন, সে কথা তলিয়ে গেল বিস্মৃতির গর্ভে। প্রচারিত হতে লাগল এক ‘শিক্ষাবিদে’র নাম। তিনিই যেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। হয়তো এর পেছনে ছিল রাজনীতির চোরা স্রোত। প্রথন নলজাতকের সম্মান যেমন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে না দেবার চক্রান্ত হয়েছিল, তেমনি চক্রান্ত হল অনিলকুমার গায়েনের বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে কেউ তাঁর নাম করেন না। ‘অনিল গায়েন বক্তৃতা’র আয়োজনও করা হয় না। ছাত্র-ছাত্রীরাও জানেন না তাঁর নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের রজত জয়ন্তী বর্ষ উদযাপনের সময় কোন বক্তা উল্লেখ করলেন না তাঁর নাম। কোন উপাচার্যের মুখেও কি শোনা গেছে তাঁর কথা? বিশ্বদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে কি আছে তাঁর উল্লেখ?
১৯৯৯ সালের ২৪-২৬ জানুয়ারি বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদের ১৫দশ বার্ষিক সম্মেলনে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ব্যাপারে অভিজিৎ গুহ যে গবেষণাপত্র দাখিল করেন, সেখানেই অনিলকুমার গায়েনের প্রকৃত ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।
‘দুর্বার ভাবনা’ পত্রিকার ৪র্থ বর্ষের ১২দশ সংখ্যায় ‘বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্মৃত প্রতিষ্ঠাতা’ নিবন্ধে ক্ষোভের সঙ্গে অভিজিৎ গুহ লিখেছেন : —
‘আসলে গায়েনের কীর্তি-কাহিনিকে ভুলিয়ে দেবার একটা প্রচেষ্টা বহুদিন যাবৎ ক্রিয়াশীল। আগে মেকি শিক্ষাবিদদের দাপটে ভয়ে মানুষ প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতার কথা জানতে চাইত না। পরিবর্তনের পরেও এই প্রচেষ্টা চালু আছে। সে কারণেই কেউ কেউ উপাচার্যের কাছে চিঠি লিখে বলে ফেলেন — অনিল গায়েনকে নিয়ে লেখালেখি করাটা আসলে নাকি স্থানীয় সংবেদনশীলতায় সুড়সুড়ি দিয়ে জনপ্রিয় হবার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন করে বসেন, আচ্ছা, একজন ব্যক্তির পক্ষে কি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার সম্মান পাওয়া উচিত?’