হেস্টিংস উপলব্ধি করেছিলেন, ফ্রান্সিস যে দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন, সেটা আলোচ্য বিষয়ের ব্যাখ্যার জন্য আসলে অপরিহার্য নয়। এমনকি যদি মেনেও নেওয়া যায় জমিদারই ছিলেন ভূমির আসল মালিক, স্বত্বাধিকারী, তবুও সুপ্রাচীন প্রথা অনুযায়ী সরকারও সমানভাবে কৃষকের শস্যক্ষেত্রে উৎপাদিত শস্যের একটি অংশের মালিক ছিল — এবং সেই অংশ নির্দিষ্ট বা অপরিবর্তনীয় পরিমাণ ছিল না। জমিদারের সম্পত্তি যদি ভূমিও হয়, উৎপন্ন ফসলের অংশভাগ ছিল সরকারের সম্পত্তি; আর তার আলোচনার মূল বিষয় ছিল — সরকার কীভাবে সর্বোত্তম উপায়ে তার ভূমি রাজস্ব আদায় করবে, যা কোনো বিজিত জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া খাজনা বা করের সমতুল্য নয়। ফ্রান্সিসের বারবার উচ্চারিত দাবিগুলোর ফলে পরবর্তী পনেরো বছরের আলোচনায় ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত এমন একটা প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উঠে আসে, যা কঠোর যুক্তির বিচারে দেখতে গেলে আসলে বহুকাল ধরেই অপ্রাসঙ্গিকই হয়ে ছিল। এই আলোচনা — যতটুকু এটি প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধানের পথ খুলে দিয়েছিল — ততটুকুই ছিল অত্যন্ত ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন; কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জনমত যতই ফ্রান্সিসের সমর্থিত দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ঝুঁকেছে, ততই জমিদারের দাবির সাথে যুক্ত একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বা সীমাবদ্ধতা উপেক্ষিত হতে শুরু করেছে। ফ্রান্সিসের জবাবে হেস্টিংস যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেগুলোকে যদি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হতো, তবে তা অত্যন্ত মঙ্গলজনক হতো — “এই দেশে সম্পত্তির অধিকার যেভাবে বোঝা হয়, আমি এখানে তার বিভিন্ন বিভাজন বা প্রকৃতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব না। শুধু এটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট — যতদিন রায়ত বা প্রজা তার খাজনা নিয়মিত পরিশোধ করবে, ততদিন তাকে জমি থেকে উচ্ছেদ করার কোনো অধিকার জমিদারের থাকবে না; এমনকি আইনি অধিকারবলে জমিদার তার পট্টা বা ইজারাপত্রে নির্ধারিত খাজনার চেয়ে বেশি অর্থও তার কাছ থেকে আদায় করতে পারবেন না।”
ইতিপূর্বেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হেস্টিংস তাঁর বন্দোবস্ত বা রাজস্ব-ব্যবস্থা নির্ধারণে — যেখানে সম্ভব ছিল — জমিদারদের জুড়ে নেওয়ার গুরুত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে স্বীকার করেছিলেন। এই নির্দিষ্ট বিষয়ে ১৭৭২-এর ৩রা নভেম্বর তারিখে লেখা তাঁর চিঠিতে উল্লিখিত বক্তব্যের চেয়ে অধিকতর স্পষ্ট আর কিছুই হতে পারে না। রিচার্ড বারওয়েলের সহযোগিতায় তিনি যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন, তাতে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়েছিলেন এবং এক বা দুই ব্যক্তির যৌথ জীবনকাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে — এমন এক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তেরও সুপারিশও করেছিলেন। হেস্টিংস নিঃসন্দেহে আশা করেছিলেন, তাঁর পরিকল্পনা যখন পর্যালোচিত হবে, তখন ফ্রান্সিস দেখতে পাবেন, তাঁর উত্থাপন করা বিষয়গুলোর মূল উদ্দেশ্য কার্যত সাধন হয়েছে; আর তখন লক্ষ্য অর্জনের উপায় বা পদ্ধতি সংক্রান্ত কেবল গুটিকয়েক গৌণ বিষয়ই পরবর্তী আলোচনার জন্য অবশিষ্ট থাকবে। তবে ফ্রান্সিস এই বিতর্কে জড়িয়েছিলেন এমন এক অভিপ্রায়ে, যার লক্ষ্য ছিল সাময়িক রাজনীতির কোনো একটি প্রশ্নের মীমাংসার চেয়েও অনেক ব্যাপকতর কোনো উদ্দেশ্য সাধনে তাঁর যুক্তিগুলোকে কাজে লাগানো। তাঁর এই গভীর ভাবনার স্বরূপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে সেই ভূমিকায়, যা তিনি কার্যবিবরণীর মুদ্রিত খণ্ডে জুড়েছিলেন। গভর্নরের রাজস্ব প্রশাসনের ওপর তাঁর আক্রমণ ছিল বাংলার জনগণের সাথে কোম্পানির সামগ্রিক আচরণের বিরুদ্ধে আনীত এক ব্যাপক অভিযোগনামারই অবিচ্ছেদ্য অংশ; আর এমন এক সময়ে তিনি এই নথিপত্রগুলো প্রকাশ করেছিলেন — যখন তিনি কোম্পানির পরিচালকদের বেতনভুক কর্মচারী হিসেবে আর কাজ করতেন না এবং তিনি ছিলেন ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার অনুগ্রহপ্রত্যাশী — সেই নথিপত্রগুলোর উদ্দেশ্য ছিল এই বিষয়টাই প্রমাণ করা যে, “এই রাজ্যগুলোর — যাকে আমরা আমাদের অধিকৃত ভূখণ্ড বলে দাবি করছি — অধিবাসীদের নিজস্ব আইন, অধিকার এবং সম্পত্তি ছিল; যা মুসলিম শাসকদের শাসনামলে ছিল অত্যন্ত সম্মানিত এবং সম্পূর্ণ সুরক্ষিত, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের অধীনে এসে এ সবের কোনোটিকেই আর গুরুত্ব দেওয়া হয়নি কিংবা তাদের চরিত্র উপযুক্তভাবে অনুধাবনও করা হয়নি।” তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল এই বিষয় তুলে ধরা যে, বাংলার ‘ভূস্বামী বা অভিজাত শ্রেণী’ হিসেবে তিনি যাদের চিত্রিত করেছেন — সেই জমিদারদের অস্তিত্বকে সরকার নির্মমভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল; সরকার এক অদম্য বাসনায় তাড়িত হয়ে — “এমন এক শ্রেণীর মানুষকে নির্মূল করে দিতে চাইছিল, যাদের ওপর বাংলার ভূমির উত্তরাধিকার ও মালিকানা ন্যস্ত রয়েছে; যাতে তাদের ভূসম্পত্তির যাবতীয় ফসল ও আয় শাসকগোষ্ঠীর কুক্ষিগত হয় এবং মালিকদের জন্য কেবল কোনোমতে বেঁচে থাকার মতো সামান্য সংস্থানটুকু ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট না থাকে” — হেস্টিংসের নীতির এমন এক চিত্র, যা ইংল্যান্ডের হুইগ দলের মনে তীব্র ক্ষোভ আর আতঙ্কের সঞ্চার করতে যথেষ্ট ছিল! তাই হেস্টিংস-বারওয়েল পরিকল্পনায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর নীতি আংশিকভাবে গ্রহণ এবং জমিদারদের প্রতি ঘোষিত আনুকূল্য প্রদর্শন করা হলেও — প্রবল অভিযোগকারী ফ্রান্সিসকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এই পর্যায়ে এসে কোনো প্রকার আপস করার অর্থই হতো তাঁর সেই বিশাল অভিযোগনামাকে নস্যাৎ করা। তার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু — এই ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীই মুঘল আমলের সেই প্রজ্ঞাপূর্ণ ও জনহিতকর প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল; তাই এখন এসে অনুশোচনামূলক কোনো পদক্ষেপ নিয়ে হাজির হওয়ার জন্য তাদের হাতে আর যথেষ্ট সময় অবশিষ্ট ছিল না। প্রকাশিত কার্যবিবরণীগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল এই বিষয়ই প্রমাণ করা, ভূমির মালিক হিসেবে জমিদারদের অবস্থানই ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের টিকে থাকার মৌলিক ভিত্তি — সেই সাম্রাজ্য, শাসনপদ্ধতির দিক থেকে স্বৈরাচারী হলেও, প্রকৃত আচরণের ক্ষেত্রে ছিল মানবীয় সহমর্মিতা ও করুণারই মূর্ত প্রতীক; এবং এমন এক শাসকগোষ্ঠীর হাতে ভূখণ্ডের শাসনভার ন্যস্ত করা হয়েছিল — যারা জমিদারদের ইংল্যান্ডের আদর্শ ভূস্বামীদের মতো উন্নয়নকামী জমিদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ ছিল এবং সেই ভূখণ্ডকে চরম ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া ছাড়া তাদের থেকে আর কিছুই প্রত্যাশা সম্ভব সম্ভব ছিল না (The aim of the published minutes is to show that the position of the zamindar as land-owner had been the saving grace of the Mughal Empire, which if despotic in modo had also been the milk of human kindness itself in re, and that from rulers who would not recognise in the zamindars the improving landlords of an ideal English type nothing could be expected, but the absolute ruin of the land entrusted to their government.)।
ফ্রান্সিস প্রস্তাবিত বন্দোবস্তের মূল নীতিগুলো আলোচনার পর, এখন আমরা তাঁর পরিকল্পনার বিস্তারিত বিষয়গুলো বিবেচনা করব। ফ্রান্সিস মনে করেন যে, “জমিদারদের বর্তমান দুর্দশাগ্রস্ত ও হতাশাজনক পরিস্থিতিতে তাঁদের অনেকেই জমি হারানোর শাস্তির মুখে পড়তে পারেন” — তাঁদের অক্ষমতা, সরকারের সন্দেহভাজন মনোভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে “চরম জেদ, নিজস্ব কুসংস্কারের প্রতি ইচ্ছাকৃত অনড়তা ও প্রতারণামূলক প্রবণতার” কারণে এমনটা ঘটতে পারে। তাই কাবলিয়তে (চুক্তিপত্রে) স্পষ্টভাবে এই শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যে, প্রয়োজনে বকেয়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট জমিদারি বা তার কোনো অংশ বিক্রি করে দেওয়া হবে। বিত্তবান ও উন্নয়নে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের হাতে ভূ-সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয় সরকার এবং দেশ — উভয়ের পক্ষে লাভজনক হবে। তবে বাংলার জমিদাররা তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তির প্রতি কতটা মমতা পোষণ করেন এবং সামান্য জমির অধিকার নিয়েও — এমনকি তা যদি বর্তমানে অত্যধিক খাজনা-ভারাক্রান্ত ও বিতর্কিত কোনো স্বত্বও হয় — তাঁরা যে চরম তিক্ততা ও অটল জেদ নিয়ে বছরের পর বছর বিবাদ চালিয়ে যান, সে সম্পর্কে যাঁদের ধারণা আছে, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই বুঝবেন যে — যখন তাঁরা দেখবেন কোনো রকম বিলম্ব বা নমনীয়তা ছাড়াই তাঁদের বিরুদ্ধে এই বিধি কার্যকর করা হচ্ছে, তাঁরা বর্তমান নিষ্ক্রিয় ও হতাশাজনক অবস্থা থেকে জেগে উঠবেন এবং এখন সমমূল্যমানসম্পন্ন হয়ে ওঠা তাঁদের এস্টেট বা ভূ-সম্পত্তি রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবেন। যেহেতু অনেক জমিদারই হয়তো তাঁদের জমিদারি পরিচালনার ক্ষেত্রে অক্ষম, তাই প্রতি ক্ষেত্রেই তাঁদের দেওয়ান নিয়োগ করতে বাধ্য করা উচিত; এই দেওয়ান যদিও তাঁর কাজের জন্য জমিদারের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন, তবুও সরকারি রাজস্ব পরিশোধের বিষয়ে তিনিই সরকারের কাছে জবাবদিহি করবেন। এ কারণেই, বন্দোবস্ত-পরবর্তী প্রথম চার বা পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারের অনুমোদন ছাড়া তাঁকে বরখাস্ত করা উচিত নয়। এ ধরনের কর্মকর্তাদের তাঁদের ব্যবস্থাপনার অধীন এস্টেটে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা মালিকানা অর্জনের সুযোগ দেওয়া উচিত নয় এবং এস্টেট নিলামে উঠলে তা কেনার অনুমতিও তাঁদের দেওয়া যাবে না।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ