শনিবার | ২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৯:২৯
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তারাশঙ্করের উপন্যাসে সমাজগতির ধারা : ড. অলোক রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিউরাল কারেন্সি’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কালীঘাট পটচিত্রের ইতিকথা : মনোজিৎকুমার দাস খোলাখাম : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জামা, জামি, জামাইষষ্ঠী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আবশ্যক : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (শেষ পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (প্রথম পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজুরিকা চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘একাকিনী’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটির অনবদ্য সুরঞ্জলি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী : ফারজানা নাজ শম্পা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায়
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

তারাশঙ্করের উপন্যাসে সমাজগতির ধারা : ড. অলোক রায়

ড. অলোক রায় / ৭৩ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

তারাশঙ্করের উপন্যাসে দেশকালের ছবি যতটা স্পষ্টভাবে ফুটেছে, সম্ভবত আর কোনো বাঙালি লেখকের রচনায় তেমনটা পাইনি। সেই প্রথম উপন্যাস চৈতালী ঘূর্ণি থেকে শুরু করে মৃত্যুর পরে গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত কীর্তিহাটের কড়চা পর্যন্ত অধিকাংশ উপন্যাসে তিনি ‘কালের লীলা, কালান্তরের রূপমহিমা’ প্রত্যক্ষ করেছেন।১৮৯৮ সালে জন্ম থেকে প্রায় বেয়াল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে বাস করেছেন, বা জন্মভূমির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। গ্রাম বাংলার সঙ্গে এমন নিবিড় সম্পর্ক একালে খুব কম লেখকের ছিল। তারাশঙ্কর তাঁর উপন্যাসে গ্রামবাংলার সমাজপটভূমি ব্যবহার করেন, কিন্তু স্থিরচিত্র হিসেবে নয়, দ্বন্দ্বমুখর কালান্তরের ইতিহাস হিসেবে। তিনি বারবার বলেন, “আমার কাল সেকাল আর একালের সন্ধিক্ষণের কাল।” তারাশঙ্করের সমাজভাবনায় তাই সমাজগতির ধারা আবিষ্কারের প্রয়াস প্রধান হয়ে ওঠে। পুরনো জমিদার পরিবারের সন্তান, যদিও জমিদারি থেকে আয় যৎসামান্য। ইতিমধ্যে বিত্তশালী নতুন ব্যবসায়ী বা পুরনো মহাজন জমির মালিক হতে শুরু করেছে। তারাশঙ্করের ভাষায় “এমনি দ্বন্দ্বের সমারোহে সমৃদ্ধ লাভপুরের মৃত্তিকায় আমি জন্মেছি। সামন্ততন্ত্র  বা জমিদারতন্ত্রের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দ্বন্দ্ব আমি দু চোখ ভরে দেখেছি। সে দ্বন্দ্বের ধাক্কা খেয়েছি। আমরাও ছিলাম ক্ষুদ্র জমিদার। সে দ্বন্দ্বে আমাদেরও অংশ ছিল।”

তারাশঙ্কর যখন প্রথম উপন্যাস লিখছেন (১৯২৯-৩০) তার অনেক আগেই গৌরবময় সেকালের অবসান হয়েছে। কিন্তু সেকালের সঙ্গে তাঁর যোগ বিচ্ছিন্ন হয় নি। সে-কাল কবে এ-কালে পরিণত হয়েছে তার সাল-তারিখের বিচার আপাতত জরুরি নয়। এক হিসেবে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেই একালের সূচনা। রাজনারায়ণ বসু আরও একটু পিছিয়ে গেছেন, তবে তাঁর সেকাল-একাল অনেকটাই শহরের ইংরেজিনবিশদের সঙ্গে তুলনা-সূত্রে এসেছে। তারাশঙ্কর লাভপুর গ্রামে নবযুগের আগমনী প্রত্যক্ষ করেছেন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় — “এল ঝড়। এল নূতন কাল। এল আমার কালের নূতন কাল।” অন্যত্র তিনি লেখেন “মহাকাল নূতন যুগে বেশ পরিবর্তন করলেন, রূপান্তর গ্রহণ করলেন।১৯০৫ সাল নিয়ে এল নূতন দৃষ্টি। নূতন উপলব্ধি। নূতন ভাবধারা।” ধাত্রীদেবতা উপন্যাসে শিবনাথের হাতে মায়ের রাখি পরিয়ে দেওয়া, তারাশঙ্করের নিজের কৈশোরস্মৃতিকে ভিত্তি করে বর্ণিত হয়েছে। তারাশঙ্কর শৈশবেই যেন প্রত্যক্ষ করেছেন সেকালের অবসান এবং একালের আবির্ভাব। তবে পল্লীজীবনে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন একভাবে প্রভাব বিস্তার করলেও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যথার্থ কালান্তরের সূচনা করেছে। বিভিন্ন উপন্যাসে তিনি এই পরিবর্তনের কথা বলেছেন। পরিবর্তনের বাস্তবভিত্তি তিনি অস্বীকার করেন না।

কালান্তরকে নানা দিক থেকে তারাশঙ্কর দেখেছেন তাঁর উপন্যাসগুলির মধ্যে। বিশ শতকের সূচনা থেকেই জমির মালিকানা ক্রমশ ছোট ছোট জমিদারদের হাতে এসেছে। বীরভূমের জমিদারদের সম্বন্ধে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল। তাই জমিদার বলতে লাভপুর এবং তার কাছাকাছি গ্রামের জমিদারদের কথাই তিনি বেশি বলেন। আধিকাংশ জমিদারির আয়তন ক্ষুদ্র এবং আয়ও যৎসামান্য। দশ হাজার টাকা বছরে যাঁদের আয় তাঁরা রাজতুল্য ব্যক্তি। কিন্তু চাষের জমির সঙ্গে পঞ্চাশ থেকে পাঁচশো বা এক হাজার টাকা বাৎসরিক আয়ের জমিদারের সংখ্যাই বেশি। কালিন্দীর ইন্দ্র রায়ের বাৎসরিক আয় দেড় হাজার থেকে দু হাজার হবে। ধাত্রীদেবতার শিবনাথের জমিদারির কথাও প্রসঙ্গত মনে পড়বে — সাত আনায় তাদের আয় হাজার চারেক টাকা। অস্থাবর সেসের জন্য দিতে হবে মাত্র একশো বারো টাকা পাঁচ আনা তিন পাই। কিন্তু তাও এস্টে্টে মজুত নেই। তখন “সাত-আনি বাঁড়ুজ্জেদের বাড়িখানার অবস্থা হইয়াছে নির্বাপিত-শিখা প্রদীপের মত। প্রদীপের ধাতুময় অঙ্গের মত তাহার অঙ্গরাগের দীপ্তি এক বিন্দু কমে নাই, কিন্তু তাহাতে আলো জ্বলে না।” পুরনো প্রথারক্ষা তথা সেকালের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য মহাজনের কাছে জমিদার ধার করছে, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় করছে। আসলে বাইরে কেতা রক্ষা করতে হয়, তাই নায়েব গোমস্তা পাইক লাঠিয়াল। অতি ক্ষুদ্র জমিদার শিবনাথেরও “পাকা বন্দোবস্ত অনেক আছে; পালকি-বহনের বেহারা চাকরান জমি ভোগ করে, মহলে পাইকদের জমি দেওয়া আছে, সদরে কাজ করিবার জন্যও চারজন পাইকের কায়েমী বন্দোবস্ত; নাপিত, বৃত্তিভোগী পুরোহিত, দেবোত্তরের পূজক, এমন কি গয়া শ্রীক্ষেত্র কাশী প্রভৃতি তীর্থস্থলের পাণ্ডারা পর্যন্ত জমি ভোগ করেন। গৃহদেবতার ফুল যোগাইবার ভারও একজনকে দেওয়া আছে, চাকরান ভোগী বাদ্যকরকে নিত্য সকাল সন্ধ্যায় ‘টেকরা’ বাজাইতে হয়, সেজন্য মালিককে চিন্তা করিবার প্রয়োজন নাই।”

অথচ শিবনাথকে বিয়ের সময়ে ঋণ গ্রহণ করে রায়বেঁশে ঢুলির বাজনা ব্যাণ্ড ব্যাগপাইপ নাচ তরজা আলো চতুর্দোলা শোভাযাত্রার আয়োজন করতেই হবে — বাপপিতামহের ধারা অক্ষুণ্ণ রাখার দায়ে। এরকম অবস্থায় জমিদারকে খাজনা আদায়ের জন্য নির্বিবেক হওয়া ছাড়া উপায় নেই। প্রজাশোষণের নিত্য নতুন উপায় উদ্ভাবনে জমিদার এবং তাঁদের নায়েব গোমস্তা সদা তত্পর। শিবনাথের পিসিমা নায়েবকে নির্দেশ দেন — “খাজনা আদায় করতেই হবে। ধরে এনে বসিয়ে রেখে খাজনা আদায় কর। ফসল থাকলে আটক কর; খাজনা না দিলে ফসল তুলতে কি বেচতে দিও না। প্রত্যেক মৌজায় আর একজন করে চাপরাসী বন্দোবস্ত করে দিন।” অনাবৃষ্টি বা প্রাকৃতিক বিপযর্য়ে কৃষকের দুরবস্থার কথা জেনেও খাজনা মাপ হয়নি, “বরং শাসনসূত্র কঠোর আকর্ষণে এমন হইয়া উঠিয়াছে যে, স্পর্শমাত্রেই যেন টঙ্কার দিয়া উঠে।” পৌষ-কিস্তিতে যে টাকা কম আদায় হয়েছিল, চৈত্র-কিস্তিতে সে টাকা পূরণ হল।

নতুন কালের মাহাত্ম্য ঘোষণা করা হলেও জমিদারের মানসিকতার কোন পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। শিবনাথ সমাজসেবার আদর্শ গ্রহণ করেছে, প্রুধোঁ পড়ে জমিদারের শোষণের স্বরূপ জেনেছে (সেজন্য অবশ্য প্রুধোঁ পড়বার দরকার ছিল না), কিন্তু “প্রপার্ ইজ থেফট — জানিয়াও ক্রমশ সে বিচলিত হইয়া পড়িতেছে, সম্পত্তির মমতায় সে ব্যাকুল হইয়া উঠিতেছে। প্রজাদের অনুরোধ, পিতৃপুরুষের সম্পত্তি, এই দুইটা কথা মনে পড়িলে চোখে জল আসে।” একে যদি স্ববিরোধ বলতে চাই তাহলে তারাশঙ্করের সমাজভাবনার মধ্যে তার সন্ধান মিলবে। তিনি বারবার যে-দ্বন্দ্বের কথা বলেন, শেষ পর্যন্ত তার অবসান ঘটে অন্যভাবে।

আমরা আগেই দেখেছি, ১৯০৫ নয়, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পল্লীবাংলার সঙ্গে বাইরের জগতের সংযোগ সাধন করে — প্রথাবদ্ধ জীবনধারায় এই প্রথম বড় রকমের সংকট দেখা গেল। — “নতুন ইতিহাসের সন তারিখ বন্ধু — নাইটিন ফোরটিন — ফোর্থ আগস্ট যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বাঙালির ছিল না। কিন্তু যুদ্ধের সময় থেকে একদিকে সব কিছু জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে সর্বক্ষেত্রে সামাজিক অস্থিতি, পল্লীগ্রামেও সেকালের অবসান ঘটিয়েছে। এখানে ‘সেকাল’ বলতে তারাশঙ্করের মনে যে-ছবি জেগেছে তার মধ্যে অতিরঞ্জন আছে, “দেশেও তখন [সেকালে] প্রাচুর্য ছিল। ক্ষেত্র ছিল উর্বর, বর্ষাও তখন এখন থেকে প্রবল ছিল, মাঠে পুকুরগুলিও তখন এখনকার মত এমনভাবে মাঠের সমান হয়ে মজে যায়নি, ফসল যথেষ্ট হত।…… গোয়ালে ভালো ভালো গাই ছিল, দুধও হত প্রচুর, পুকুরে বড় বড় মাছ থাকত, অভাব দেশে ছিল না; অল্প চার-পাঁচ হাজার টাকা আয়ে রাজার হালে চলে যেত।” দেশে অভাব ছিল না, একথা সত্য হতে পারে না। তখনও অভাব ছিল, বা অভাবী মানুষ ছিল। তবে উনিশ শতকের শেষের দিকে বা বিশ শতকের সূচনায় জিনিসপত্রের দাম ছিল তুলনামূলকভাবে কম, হয়তো ছোট জমিদারদের ‘কেতা’ রক্ষায় তখনও অসুবিধা হত না। তারাশঙ্কর জানিয়েছেন, তাঁর যখন বারো-চোদ্দ বছর বয়স (অর্থাৎ ১৯১০-১২) তখন সপ্তাহে দু দিন হাটে তরকারির খরচা ছিল ছ’আনা হিসেবে বারো আনা।

মহাযুদ্ধের পরে খরচা বাড়ল — বারো আনা থেকে পাঁচ সিকেতে পৌঁছল। গণদেবতা উপন্যাসে ১৯২২ সালে গ্রামের মানুষের দুরবস্থা সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে হয়েছিল জিনিসপত্রের দাম আকাশ-ছোঁওয়া — “দুঃখ-দুর্দশা সবকালেই আছে, কিন্তু যুদ্ধের পর এই কালটির মত দুর্দশা আর কখন হয় নাই।” অবশ্য দ্বারকা চৌধুরীকে ঠিক সাধারণ মানুষ বলা যায় না — এক পুরুষ আগে জমিদার ছিলেন, এখন জমিদারি নেই — চাষবাস করেন বলে চাষিই বলতে হয়। একদিকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, অন্যদিকে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দ্বারকা চৌধুরীর মতো আত্ম-প্রসন্ন উদারমনা মানুষকেও বিচলিত করেছে — “একালের সঙ্গে সে কিছুতেই আপনাকে খাপ খাওয়াইতে পারিতেছে না। রীতি-নীতি, মতি-গতি, আচার-ধর্ম সব পালটাইয়া গেল। তাহারই পুরানো পাকা বাড়িটার মত সব যেন ভাঙিয়া পড়িবার জন্য উন্মুখ হইয়া উঠিয়াছে। ঝুর-ঝুর করিয়া অহরহ যেমন বাড়িটার চুনবালি ঝরিয়া পড়িতেছে — তেমনি ভাবেই সেকালের সব ঝরিয়া পড়িতেছে। লোক আর পরকাল মানে না, দেব-দ্বিজে ভক্তি নাই, প্রবীণকে সমীহ করে না, রাজা-জমিদার-মহাজনের প্রতি শ্রদ্ধা নাই; অভক্ষ্যভক্ষণেও দ্বিধা নাই। পুরোহিতের ছেলে সাহেবী ফ্যাশনে চুল ছাঁটিয়া টিকি কাটিয়া কি না করিতেছে ? কঙ্কণার চাটুজ্জেদের ছেলে চামড়ার ব্যবসা করে। গ্রামের কুমোর পলাইয়াছে, কামার ব্যবসা তুলিয়া দিল, বায়েন ঢাক বাজানো ছাড়িল; ডোমে আর তালপাতা বাঁশ লইয়া ডোম-বৃত্তি দেয় না, নাপিত আর ধান লইয়া ক্ষৌরি করে না, তেলে ভেজাল, ঘিয়ে চর্বি, নুনের ভিতর মধ্যে মধ্যে হাড়ও বাহির হয়। সকলের চেয়ে খারাপ — মানুষের সঙ্গে মানুষের অমিল।” (পঞ্চগ্রাম)। বর্ণ এবং বৃত্তিগত প্রাচীন স্থিতাবস্থা রক্ষা করা যাচ্ছে না, ফলে চারদিকে ‘যায় যায়’ রব উঠেছে।

লক্ষণীয় যে, শুধু প্রবীণ দ্বারকা চৌধুরী নয়, তরুণ দেবু ঘোষও গ্রামের সমাজ-শৃঙ্খলা বজায় রাখার পক্ষপাতী — “সে প্রাণপণে আপন সংস্কারকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে। তাহাকে সে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিতে চায়।” তাই নবান্নের দিনে অনিরুদ্ধকে চণ্ডীমণ্ডপে পূজার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাকে শাস্তি দেবার জন্য জগনের সঙ্গে মিলিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু অনিরুদ্ধ যখন অবলীলায় ভোগপূজার থালা তুলে নিয়ে চলে গেল, তখন গ্রামের লোকে বলেছে — “এর আর করবে কি দেবু ? উপায় কি বল ? যদি থাকে তাহলে তুমি কর! তবে বুঝচ কি না — উ হবে না! কি সমাজ সমাজ করছ ? সমাজ কই ?” যে-চণ্ডীমণ্ডপকে দেবু গ্রামের হৃৎপিণ্ড তথা সমস্ত জীবনীশক্তির কেন্দ্রস্থল মনে করতো, তা আজ ভেঙে পড়ছে। অথচ সেখানে তখনও বিশ্বনাথের কথা মতো কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক গড়ে ওঠেনি। যতীনের একবার মনে হয়েছে, “পল্লীর কিন্তু সেই একই রূপ! অদ্ভুত পল্লীগ্রাম। বিশেষ এদেশের পল্লীগ্রাম। সমাজ-গঠনের আদিকাল হইতে ঠিক একই স্থানে অনন্ত-পরমায়ু পুরুষের মত বসিয়া আছে।” কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, “সে কি কোনদিন নড়িবে না ? বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে বিরাট পরিবর্তন শুরু হইয়াছে। সর্বত্র নববিধানের সাড়া উঠিয়াছে। এ দেশের পল্লীতে কি জীর্ণ স্থবির পুরাতনের পরিবর্তন হম্পবে না ?”

তারাশঙ্করও পরিবর্তন চেয়েছেন, পরিবর্তন অনিবার্য বিবেচনা করেছেন। তবে পরিবর্তনের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তাঁর উপন্যাসে সব সময় খুব গভীরে প্রবেশ করে না। অথচ লাভপুরের সেই দরিদ্র সন্তান, যিনি এক বিচিত্র সংঘটনের মধ্যে ইংরেজ কয়লা ব্যবসায়ীর কুঠিতে পাঁচ টাকা মাইনের চাকরিতে ঢুকে শেষ পর্যন্ত কয়লাখনির মালিক হলেন এবং পরে লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক সেই ভাগ্যবান ব্যবসায়ীর সঙ্গে ক্ষুদ্র জমিদারদের বিরোধ বাধলো, তারাশঙ্করের কাছে তা কখনও ‘কালের লীলা, কালান্তরের রূপমহিমা’ বলে মনে হয়। আসলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে জমিদার ও মহাজনের বিরোধ থাকলেও বিশ শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকেই জমিদার ও শিল্পপতির বিরোধ প্রবল হয়ে ওঠে। শিল্প বলতে রাঢ় বাংলায় প্রধান হল কয়লাখনি। ধাত্রীদেবতা উপন্যাসে শুনতে পাই, যুদ্ধকালে “কয়লার বাজার না কি হু হু করিয়া চড়িয়া যাইবে, প্রচুর ধন, অতুল ঐশ্বর্য বাড়িঘর ভরিয়া উঠিবে।” অবশ্য বঙ্গীয় শিল্পবিপ্লবের চিত্র সেভাবে তারাশঙ্করের উপন্যাসে প্রাধান্য পায় না। কালিন্দীর “চরের উপর বয়লারের সিটি বাজিয়া উঠিল। প্রভাতের আলোকে লাল সুরকির পথ, সুদীর্ঘ চিমনি, নূতন মিল হাউস, কুলি-ব্যারাকের বাড়ি ঘর লইয়া চরখানা এক নগরের মত ঝলমল করিতেছে।” কিন্তু অনেক দূর থেকে দেখা এই পরিবর্তনের চিত্র। কলের মালিক অন্যায় করেছে সত্য, তবু কলকারখানা গড়ে ওঠার ফলে দীন-দরিদ্রের মজুরির সুবিধা হয়েছে, চারদিকের পথঘাটের উন্নতি হয়েছে, আখের চাষের বিশেষ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিরোধ যা ঘটেছে তা জমিদারের সঙ্গে কলের মালিকের প্রতিপত্তি নিয়ে।

অহীন্দ্র কালিন্দীর চরের রূপান্তরে আহত হয়েছে, কিন্তু সেইসঙ্গে কলকারখানার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে স্বাগত জানিয়েছে, “চরের উপর কর্মকোলাহল তখনও স্তব্ধ হয় নাই। শেডটার লৌহকঙ্কাল তৈয়ারী ইহারই মধ্যে শেষ হইয়া গিয়াছে, আজ তাহার উপরে করোগেটেড শীট পিটানো হইতেছে। বোল্টগুলির উপর হাতুড়ির ঘা পড়িতেছে। আকাশমুখী সুদীর্ঘ চিমনিটার আকার এইবার সরু হইতে আরম্ভ করিয়াছে; আজ আবার নূতন মাচান বাঁধা হইতেছে।…..একটা লরির এঞ্জিন কোথায় দুর্দান্তভাবে গর্জন করিতেছে, বোধ হয় কোন দুরন্ত বাধা ঠেলিয়া চলিত হইতেছে। মাঝে মাঝে অবরুদ্ধ স্টীমে বয়লারটা থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। এ সমস্তকে এক ক্ষীণ আচ্ছাদনের মত আবরণে আবৃত করিয়া মানুষের কোলাহল-কলরবের উচ্চ গুঞ্জন রোল অবিরাম গুঞ্জিত হইয়া চলিয়াছে। অহীন্দ্র নদীর বুকে দাঁড়ানো এই অর্ধনির্মিত যন্ত্র পুরীটির দিকে বিস্ময়বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া দেখিল; সে নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র, বিজ্ঞানকে সে মনে মনে নমস্কার করিল।” বাংলার পল্লীজীবনে অবশ্য কলকারখানার প্রবেশ খুব দ্রুতগতিতে বা ব্যাপকভাবে ঘটেনি। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজে অস্থিতি দেখা দিয়েছে। জমিদার নিজেই অনেক সময় কলকারখানা স্থাপনে উদ্যোগ নিয়েছেন। সমগ্র দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের সময়ে পুরনো জমিদার-পরিবার ইচ্ছা থাকলেও অতীতকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারেন না — অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই নতুন কালকে স্বীকার করে নেন।

এইভাবে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটা মিলমিশ গড়ে ওঠে — একাল ও সেকালের দ্বন্দ্বের সমাধান নিশ্চয় নয়, কিন্তু একালের দাবি হয় প্রবলতর। কীর্তিহাটের কড়চায় সুরেশ্বরের মনে প্রশ্ন জাগে, “মানুষ কাল তৈরি করে, না কাল মানুষ তৈরি করে ? হয়তো বা দুইটা সত্য। নাইনটিনথ সেঞ্চুরীতে বীরেশ্বর রত্নেশ্বর দেবেশ্বর রায়দের মত জমিদার অনেক ছিল। এঁদের থেকে উন্নত আর বেশি কেউ ছিল না। থাকবার মধ্যে এক  আধটা ঠাকুরবাড়ির মত বাড়ি — মানুষের মধ্যে মহারাজ মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর মত মানুষ ছিলেন জমিদারদের মধ্যে।” বীরেশ্বর-রত্নেশ্বর যে-ভাবে জমিদারি চালিয়েছেন, দেবেশ্বরের আমলে অর্থাৎ বিশ শতকের সূচনায় তার পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় জমিদার-সভা অর্থাৎ ল্যান্ড হোল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন খুবই শক্তিশালী ছিল, পরে জমিদারদের সঙ্গে রাজনীতিক ও সংবাদপত্রসেবীরা হাত মিলিয়েছেন, জন্ম নিয়েছে ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। এর পরে তার স্থান নিযেছে দেশি চেম্বার্স অফ কমার্সগুলি। শুধু ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের উত্থান হয়নি, সেই সঙ্গে উকিল মোক্তার ব্যারিস্টার ডাক্তার জার্নালিস্ট প্রোফেসরের কাল শুরু হয়েছে। জমিদার পরিবারেও সকলে না হলেও কেউ কেউ লেখাপড়া শিখেছেন, কলকাতায় নতুন জীবিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্তশ্রেণীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। তারাশঙ্করের কয়লাখনি সম্বন্ধে বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল (”১৯১৯ সালে কয়লা-ব্যবসায়ী আত্মীয়কুলের আওতায় কয়লার ব্যবসা শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন।”) তাই তাঁর উপন্যাসে নতুন মূল্যবোধ, যাকে তিনি মন থেকে অনেকসময় মেনে নিতে পারেননি, তার কথা বলতে গিয়ে কয়লাখনির মালিকের কথা বলেন। প্রথম যুগে কয়লাখনি স্থাপনের মধ্যে কিছুটা ফাটকাবাজি কাজ করেছে — হঠাৎ যেন গুপ্তধনের সন্ধানলাভ।

কীর্তিহাটের কড়চায় দেবেশ্বর রায় একসময় কয়লাখনির জন্য জমি কেনেন — “সেই কয়লাখনির জন্য কেনা জায়গাগুলি পড়েই ছিল, অধিকাংশই যার অযোগ্য মনে হয়েছিল, তারই মধ্যে বেরিয়ে গেল উৎকৃষ্ট কয়লার জমি। জায়গাটা বরাকরে। জমিদার কাশিমবাজারের রাজএস্টেট। তখনও রাণী স্বর্ণময়ীর আমল। দেবেশ্বর রায় আরও জায়গা সেখানে বন্দোবস্ত নিয়ে দস্তুরমত ক্লাইভ স্ট্রীটে আপিস খুলে বসলেন।…..দেখতে দেখতে বছর তিনেকের মধ্যে রয় অ্যাণ্ড চক্রবর্তী কোম্পানী কলকাতায় বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ওই বরাকর সিমের কয়লার জন্য।” দেবেশ্বর রায় কয়লাখনির ব্যবসা করলেও নীলরক্ত তখনও লাল হয়ে যায়নি, ফলে সেতার এসরাজ নিয়ে গান গাওয়া, সংবাদপত্র প্রকাশ ও সমকালের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ — সব কিছুর মধ্যে একধরনের স্বাতন্ত্র্যবোধের পরিচয় মেলে। কিন্তু দেবেশ্বরের ছেলে যজ্ঞেশ্বর যখন কয়লার ব্যবসা করেছে, তখন তার মধ্যে মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটেছে — সে মস্ত বড় খনি মালিক, কলিয়ারী প্রোপাইটার, — কোনো আদর্শবাদের ধার ধারে না।

আগেকার দিনের জমিদারেরাও সকলে আদর্শবাদী ছিলেন না, প্রজার উপর অত্যাচার শোষণ তাঁরা করেছেন, তবু সমাজের সঙ্গে তাঁদের একটা যোগ ছিল। সেইসঙ্গে ছিল একধরনের উদারতা, যা কখনও মহত্ত্বের পরিচয়বাহী। তারাশঙ্করের উপন্যাসধারায় শ্রেষ্ঠ জমিদার রত্নেশ্বর রায় — “পনের বছর অন্তর বৃদ্ধি পাবার হকদার ছিল জমিদারেরা। তার কারণ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। ফসলের দাম বাড়লেই জমিদার তাঁর অংশ বাবদ খাজনা বাড়াতেন। সারাটা জীবনভর এ কর্তব্যকর্ম ভোলেন নি। এবং কোন সময়েই আপসে করেন নি, আদালতে গিয়ে নালিশ করে লড়ে পাওনা আদায় করেছেন অথবা প্রজার সঙ্গে আদালত সাক্ষী রেখে সোলেনামা করেছেন। এ ছাড়া পতিত পুকুর কাটিয়েছেন। নদীর ধারের গ্রামে বন্যা নিবারণের জন্য বাঁধ তৈরি করিয়েছেন। সুতরাং জমির উন্নতি করেছেন বলেও খাজনা বৃদ্ধিতে তাঁর একটা দাবি ছিল। তিন এনট্রান্স স্কুল, দুটো চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি করেছিলেন, মেয়েদের প্রাইমারী স্কুলও করে গেছেন দুটো। মাইনর স্কুল করেছেন আরও কয়েকটা। নিঃসন্দেহে কীর্তিমান পুরুষ। কীর্তিহাট থেকে তমলুক পর্যন্ত কাঁচা পথটা পাকা করেছিলেন; বহু দরিদ্রকে দান করেছেন; বহু বুদ্ধিমান ছেলেকে লেখাপড়া শিখতে বৃত্তি দিতেন। এই জানবাজারের বাড়িতে ওই ওপাশের একতলা ঘরগুলোতে তারা থাকত; তাদের জন্য রান্নার ব্যবস্থা ছিল, তারা খেয়ে কলেজ যেত।”

সব জমিদার অবশ্য রত্নেশ্বর রায় ছিলেন না, সব কলিয়ারি মালিকও যজ্ঞেশ্বর রায় নন। তবু তারাশঙ্করের চোখে “রায়বাহাদুর রত্নেশ্বর রায় কীর্তিতে কীর্তিমান, আর নাতি যজ্ঞেশ্বর রায় কীর্তিভ্রষ্ট। রায়বাহাদুর সম্পত্তি বাড়িয়ে গেছেন, বাপের আমলের আয়কে চারগুণ করেছেন — আর নাতি যজ্ঞেশ্বর রায় দশের বাঁদিকের একটাকেই মুছে দিয়েছেন। অবশেষে স্ত্রীর পিতৃদত্ত বরানগরের এই পুরনো বাড়িটায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে আছেন।” কিন্তু জমিদারি প্রথাই যেকালে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, তখন যজ্ঞেশ্বর কিভাবে ব্যতিক্রম হবেন। রত্নেশ্বরের প্রতি তারাশঙ্করের পক্ষপাত গোপন থাকেনি, তবে যজ্ঞেশ্বরের প্রতিও তিনি অবিচার করতে চাননি। — “বিচিত্র যজ্ঞেশ্বর রায়। মহিমান্বিত রায়বংশের কফিনে পোরা মমি। বরানগরের গঙ্গার ধারে একখানা বড় ফাটল ধরা বাড়িতে থাকতেন তখন। বাড়িখানা সত্যিই কফিনের মত, আর জ্যাঠামশাই রায়বংশের সমস্ত বৈশিষ্ট্যের মমি। ইনসলভেন্ট, প্যারালিটিক, দিলদরিয়া লোক, জেদী, উদার, বদমেজাজী, অতিভদ্র, পরস্বাপহারী, দাতা — একসঙ্গে সব। ছ’ফুটের কাছাকাছি লম্বা মানুষটা খাটজুড়ে পড়েছিলেন।” যজ্ঞেশ্বরের উত্থান-পতনের সঙ্গে যেন রাযবাড়ির উত্থান-পতন জড়িয়ে আছে — “গড়েছেন, ভেঙেছেন, আবার গড়েছেন, আবার ভেঙেছেন।’ কিন্তু কালের গতিকে রোধ করার সামর্থ্য তাঁর নেই। জমিদারিপ্রথার অবলুপ্তি যেমন ঘটেছে কালের নিয়মে, তেমনি “নতুন কালের মানুষেরা স্পষ্ট বলছে — পুরনো কিছু চলবে না।” তারাশঙ্কর নতুনকালকে স্বীকার করে নিয়েছেন — ভারতবর্ষের কালান্তরের ইতিহাস লেখা তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাঁর উপন্যাসের গঠন বা শিল্পরূপ নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে, এমন কি তাঁর জীবনদর্শন তথা সমাজদর্শনও সকলের মনঃপূত না হতে পারে, কিন্তু তিনি একালের সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক সে কথা মানতে বাধা নেই — সমাজগতির ধারা অনুধাবনের সচেতন প্রয়াসের জন্যই তিনি শ্রদ্ধেয় এবং স্মরণীয় কীর্তির অধিকারী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন