জমিদারদের প্রতি নরম মনোভাব নেওয়ার সপক্ষে যতই যুক্তি উপস্থাপন করা হোক না কেন, এ কথা অত্যন্ত স্পষ্ট যে ১৭৭৬-এ ফ্রান্সিস সরকারের ব্যয়ের হিসাব এতটা নিখুঁতভাবে নিরূপণ করার মতো অবস্থানে ছিলেন না যে, তিনি রাষ্ট্রের সম্পদে স্থায়ী সীমা বা বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারেন। তাঁর পরিকল্পনা — যেমনটা আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখব — চালু প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের দাবি রাখা দরকার ছিল; এবং নতুন ব্যবস্থা কিছুদিন কার্যকরভাবে পরিচালিত না হওয়া পর্যন্ত, এই বিষয়টা নিশ্চিত করা অসম্ভব ছিল যে তাঁর পরিকল্পনায় হিসেব করা ৩৭,১১,৫৪৭ টাকার অনাবন্টিত উদ্বৃত্ত অর্থ বাস্তবে অর্জিত হবে কি না। বস্তুত, ১৭৭৬ থেকে ১৭৮৪-র মাঝের সময়ে সরকারের ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ফ্রান্সিসের হিসেব বিপর্যয়কর ভুল হিসাব হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। (১৭৮৪-র ১৬ই জুন হাউস অফ কমন্সে বক্তৃতা দেওয়ার সময় ফ্রান্সিস মন্তব্য করেছিলেন যে, “হয় ১৭৮৪-র আয়ের উৎস বা সংস্থানগুলো প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে, অথবা সরকারি ব্যয়ের খাতগুলো ১৭৭৬-এর তুলনায় প্রায় ২,২০০,০০০ পাউন্ডের সমপরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে; এবং বাংলা সরকারের রাজস্ব কিংবা ব্যয়ের ক্ষেত্রে এমন উদ্বেগজনক পরিবর্তন পার্লামেন্টের অবিলম্বে মনোযোগ দাবি করে।”) অধিকন্তু, এই পরিকল্পনায় পতিত জমি সংক্রান্ত সমস্যার সুরাহা করা হয়নি — এটা এমন এক সমস্যা যা দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ পরিণামের ফলে বিশেষ মনোযোগের দাবিদার হয়ে উঠেছিল। কোনো স্বীকৃত এস্টেট বা জমিদারির অন্তর্ভুক্ত নয় এমন জমিকে আবাদের আওতায় নিয়ে আসার বিষয় ছিল এমন একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি, যার জন্য ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’-এর প্রণেতারা বিধি-বিধান রাখেননি; কারণ জমির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান না অর্জন করা পর্যন্ত, পতিত জমি আবাদের বিষয় কেবল সেইসব জমিদারদেরই কৃতিত্ব বা উদ্যোগের ফল হিসেবে গণ্য করা হবে, যাঁরা জমি ইত্যাদি উন্নয়নের কাজে ব্রতী ছিলেন। ১৭৭৬-এ ফ্রান্সিসের প্রস্তাব গৃহীত হলে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হতো, যেখানে বিদ্যমান এস্টেট বা জমিদারির মালিকদের ভূমির রাজস্ব প্রদানের দায়বদ্ধতার সম্মুখীন হতে হতো — অথচ অবৈধভাবে জমি দখলকারী বা ‘স্কোয়াটার’রা সেই দায়বদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকত। এই মূলনীতি প্রতিষ্ঠার পর (অর্থাৎ জমি থেকে সর্বোচ্চ কত পরিমান ফলন পাওয়া সম্ভব, কেবল এই অনুমানের ভিত্তিতে রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত নয়, বরং নির্ধারিত হওয়া উচিত সরকারের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে, যা একবারেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে) ফ্রান্সিস তাঁর বক্তব্যে বলেন –
“যখন দেশ থেকে আদায়যোগ্য মোট অর্থের পরিমাণ নির্ধারিত হয়ে যায় — যা কেবল রাজস্বের জন্যই নয়, বরং এর আনুষঙ্গিক যাবতীয় ব্যয়ের জন্যও নির্ধারিত — তখন প্রতি জমিদারিকে তার আনুপাতিক অংশ অনুযায়ী কর ধার্য করা উচিত… এবং সেই নির্ধারিত অর্থই ওই নির্দিষ্ট জমিগুলোর জন্য ‘স্থায়ী খাজনা’ (quit-rent) হিসেবে চিরকালের জন্য ঘোষণা করা হোক… এই বন্টন-পদ্ধতিকে ‘তুমর জমা’ (Tumar Jumma) নামে অভিহিত করা উচিত; স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে এই পরিভাষা অত্যন্ত পবিত্র ও শ্রদ্ধেয়, কারণ এর সাথে ‘নিরাপত্তা’ বা স্থিতিশীলতার ধারণা ওতপ্রোতভাবে জড়িত — (মিল [উদ্ধৃত গ্রন্থ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪০৫] উল্লেখ করেছেন, “কর বা খাজনা সর্বোচ্চ মাত্রায় সুনিশ্চিত হতে পারে, তবুও তা আইনসভার ইচ্ছানুযায়ী বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়… করের ক্ষেত্রে ‘নিশ্চয়তা’ বা স্থিতিশীলতার সুফল প্রমাণের জন্য যেসব সাধারণ যুক্তি ব্যবহার করা হয়, তার ভিত্তিতে মিস্টার ফ্রান্সিস আসলে কর বৃদ্ধির ক্ষমতা বা অধিকারের বিরুদ্ধে কিছুই প্রমাণ করতে পারেননি। সামগ্রিকভাবে করের হার যথাসম্ভব ন্যূন সীমায় সীমাবদ্ধ রাখার পবিত্র কর্তব্য আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সমপরিমাণ শক্তিশালী কিছু যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত”) — যা স্থানীয় অধিবাসীরা দীর্ঘকাল ধরে এই পরিভাষার সাথে যুক্ত থেকেছেন। আমার মতে, এমন কোনো অপরিহার্য প্রয়োজন বা জরুরি পরিস্থিতি নেই, যা সরকারকে ‘জমা’ বা রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে প্ররোচিত করতে পারে। সাময়িক আর্থিক সংকট বা অভাবের মোকাবিলা সাময়িক চাঁদা বা অনুদানের মাধ্যমেই করা সম্ভব, যা একটি সমৃদ্ধশালী দেশের পক্ষে বহন করা খুব একটা কষ্টকর নয়। কিন্তু আধুনিক প্রথা অনুযায়ী, যদি একবার এই অতিরিক্ত অর্থ ‘জমা’-র সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তবে তা চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে; এর ফলে জমির মালিক বা জমিদার — যিনি তাঁর জমির ওপর আরোপিত করের কোনো সীমারেখা দেখতে পান না — হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং শেষমেশ প্রতারণা বা কর্মবিমুখতার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন… এই বিধিবিধানগুলোর উদ্দেশ্য এমন নয় যে, জমিদারকে তাঁর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন অংশ থেকে — নির্ধারিত রাজস্বের আনুপাতিক হারের চেয়ে — অধিক পরিমাণ খাজনা আদায় করা থেকে বিরত রাখা হবে; কিংবা জমিদার যদি তাঁর জমির উন্নতি সাধন করেন, তবে সেই জমিকে তাঁর নিজের কাছে অধিকতর লাভজনক করে তোলা থেকে তাঁকে বাধা দেওয়া হবে। এমনটি করা হলে তা হবে চরম অযৌক্তিক এবং তা বর্তমান পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করবে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতের সকল বিক্রয় বা সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জমির প্রতি অংশের জন্য সরকারের খাজনা নির্ধারণ করা, যা ছাড়া প্রকৃত মালিক বা ক্রেতা কেউই এর মূল্য সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে মোট পরিমাণ অপরিবর্তনীয়ভাবে নির্ধারিত, তবে এইভাবে গঠিত মূল্যায়নের মধ্যে বৈষম্যকে নগণ্য বলে বিবেচনা করা যেতে পারে, এবং হস্তবুদের মতো পদ্ধতির মাধ্যমে তার প্রতিকারের প্রয়োজন নেই।” (ফ্রান্সিস এই যুক্তিতে হস্তবুদের বিরোধিতা করেন:- (i) “যেহেতু আমরা ইতিমধ্যেই জানি যে দেশ কী পরিমাণ অর্থ প্রদান করবে, তাই হস্তবুদ কেবল জমিদার এবং রায়তদের আতঙ্কিত কররে।” (ii) “একটি হস্তবুদ হওয়া উচিত জমি থেকে আদায় করা সমস্ত খাজনার প্রকৃত মূল্যায়ন; কিন্তু, কিছু প্রজার ব্যর্থতার কারণে, এর সম্পূর্ণ পরিমাণ খুব কমই আদায় করা হয়। অতএব, যদি এটি সঠিকও হয়, তবে জেলা থেকে এই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা খুব বেশি। এখন পর্যন্ত, যেখানেই সম্পূর্ণ আদায়ের পরিমাণ উদ্ঘাটন করা হয়েছে, তা কেবল আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।” সরকারের লোভ এবং খাজনা নির্ধারণে তাদেরকে ভ্রান্তিতে প্ররোচিত করা।”) “বিগত তিন বছরের প্রকৃত প্রদত্ত রাজস্ব প্রদেশগুলোর সাধারণ কর নির্ধারণী কর প্রণয়নের জন্য যথেষ্ট হবে।”
ফ্রান্সিস এইভাবে একটি নির্দিষ্ট বন্দোবস্তের পক্ষে মত দেন, এবং তা জমিদারের সাথে “প্রমাণ দাখিলের বিষয়ে খুব বেশি চিন্তা না করেই,” (মিল: পূর্বোক্ত গ্রন্থ, খণ্ড ৪, পৃ. ৪) তাকে জমির বৈধ মালিক বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, “কোম্পানির প্রাথমিক, কিন্তু ভ্রান্ত, ধারণা ছিল শাসনকারী শক্তিই জমির মালিক; ফলস্বরূপ, তাদের অধিগ্রহণকৃত ভূখণ্ডের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে, সরকার হিসেবে নির্দিষ্ট কর নিয়ে তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত নয়, যেহেতু জমিদার হিসেবে তাদের সমগ্র উৎপাদিত ফসল বাজেয়াপ্ত করার অধিকার ছিল।” পরবর্তীকালের এক নথিতে (ডিসেম্বর, ১৭৭৬), হেস্টিংসের প্রতি তাঁর বিরোধিতা যে কোনো আপোসে চলবে না, তা দেখানোর জন্য তিনি বলেন, তাঁর কাছে এটি একটি অপরিহার্য বিষয় যে, “জমি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্পত্তি নয়, বরং জমিদার এবং অন্যান্য শ্রেণীর দেশীয়দের, যারা সরকারের কাছে নতুন উৎপাদিত ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশ ছাড়া আর কিছুই ঋণী নয়” এবং তিনি গভর্নরকে এই বলে চ্যালেঞ্জ জানান যে, তিনি “আমার মতো একই নীতি থেকে বিচ্যুত হন কি না।” (হেস্টিংসের মত সম্পর্কে ফ্রান্সিস লেখেন: “বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন উপলক্ষে প্রদত্ত তাঁর মতামত তুলনা করে আমি উভয় পক্ষের এমন কিছু ঘোষণা দেখতে পাই, যা আমাকে দ্বিধায় ফেলে রেখেছে এবং যার নিষ্পত্তি এখন কেবল একটি স্পষ্ট নেতিবাচক বা ইতিবাচক উত্তরের মাধ্যমেই করা সম্ভব।”) তিনি ঘোষণা করেন যে এই বিষয়ে তিনি “দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পাত্র নন,” এবং যদি ঘটনাক্রমে কোম্পানি এর বিপরীত কোনো রায় ঘোষণা করে, তবে তাঁর তাৎক্ষণিক কর্তব্য হবে কোম্পানিকে “জমিদারদের অনুকূলে নিজেদের জমি থেকে উচ্ছেদ করার” পরামর্শ দেওয়া, কারণ “সরকারের সরাসরি ব্যবস্থাপনার অধীনে, তা সে জমিই হোক বা অন্য কিছু।” কৃষক বা প্রতিনিধিদের দ্বারা জমিগুলো অবশ্যই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ