৪৮. মানভূম জননী লাবণ্যপ্রভা ঘোষ ও তাঁর ছায়া সঙ্গী ভাবিনী মাহাতো
হাওড়া ব্রিজের উপর দিয়ে চলেছে একটি মিছিল। সত্যাগ্রহীদের মিছিল। ১৯৫৬ সালের ৬ মে। ভজহরি মাহাতোর লেখা টুসু গান গাইতে গাইতে চলেছে সেই মিছিল। ২০ এপ্রিল এই সত্যাগ্রহীরা পুরুলিয়ার পুঞ্চার পাকবিড়া থেকে শুরু করেছিল তাদের যাত্রা। টানা ১৭ দিন পায়ে হেঁটে ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে অবশেষে তারা এসেছে হাওড়া ব্রিজে।
পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলনের সত্যাগ্রহীরা গাইছে টুসু গান : —
শুন বিহারী ভাই তোরা রাখতে লারবি ডাঙ দেখাই
তোরা আপন তরে ভেদ বাড়ালি বাংলা ভাষায় দিলি ছাই।
ভাইকে ভুলে করলি বড় বাংলা বিহার বুদ্ধিটাই
বাঙালি-বিহারি সবই এক ভারতের আপন ভাই।
বাঙালিকে মারলি তবু বিষ ছড়ালি — হিন্দি চাই
বাংলা ভাষার পদবীতে ভাই কোন ভেদের কথা নেই।
সত্যাগ্রহীদের মিছিলের সামনে আছেন দুই প্রৌঢ়া নারী। একজন লাবণ্যপ্রভা ঘোষ। যাঁকে বলা হত ‘মানভূম জননী’। আর একজন তাঁর ছায়াসঙ্গী ভাবিনী মাহাতো। বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন তাঁদের। শুরু হয়েছিল সেই ১৯১২ সালে। এখানে বাংলা থাকবে। এখানকার মানুষ বাংলাতে কথা বলে। মানব না হিন্দিকে। মর্যাদা দিতে হবে বাংলা ভাষাকে। বাংলা ভাষার মর্যদার দাবিতে কংগ্রেস ছেড়ে ‘লোকসেবক সংঘ’ গঠন করেছিলেন শরৎচন্দ্র সেন, রজনীকান্ত সরকার, গুণেন্দ্রনাথ রায়েরা। পুরুলিয়া ছিল বিহারের অন্তর্গত। অথচ এখানকার অধিকাংশ মানুষের ভাষা বাংলা। কিন্তু বাংলাকে মুছে দিয়ে হিন্দিকে চাপিয়ে দেবার চেষ্টা চলে বলে এখানকার মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ১৮৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত মানভূম অঞ্চলে ভাষা আন্দোলন দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা দেশের ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে যে আবেগ দেখা গিয়েছিল, মানভূমেও বাংলা ভাষার প্রতি সেই আবেগ দেখা যায়। অরুণচন্দ্র ঘোষের টুসু গানেও সেই প্রতিবাদী আবেগ : —
আমার বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা রে।
(ও ভাই) মারবি তোরা কে তারে।।
বাংলা ভাষা রে।।
এই ভাষাতে কাজ চলেছে
সাত পুরুষের আমলে।
এই ভাষাতেই মায়ের কোলে
মুখ ফুটেছে মা বলে।।
এই ভাষাতেও পরচা রেকর্ড
এই ভাষাতেই চেক কাটা।
এই ভাষাতেই দলিল নথি
সাত পুরুষের হক পাটা।।
দেশের মানুষ ছাড়িস যদি
ভাষার চির অধিকার।
দেশের শাসন অচল হবে
ঘটবে দেশে অনাচার।।
মানভূমের ভাষা আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন মানভূম জননী লাবণভপ্রভা ঘোষ (১৮৯৭-২০১৪)। শিক্ষক ও স্বাধীনতাপ্রেমী নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্তের কন্যা লাবণ্যপ্রভা জন্মগ্রহণ করেন পুরুলিয়ার এক গ্রামে। প্রধাগত পড়াশুনোর সুযোগ ছিল না। বাবার কাছে পেয়েছিলেন দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার দীক্ষা। মাত্র ১১বছরে অতুলচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে বিয়ে হল। অতুল ঘোষও ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনিও ছিলেন লাবণভপ্রভার প্রেরণা। অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। তারপর ‘শিল্পাশ্রমে’র সঙ্গে। এই শিল্পাশ্রম ছিল বিপ্লবীদের মিলনক্ষেত্র। কর্মক্ষেত্রও। গান্ধিজি, সুভাষচন্দ্র, চিত্তরঞ্জন সকলেই এসেছিলেন এই আশ্রমে। লবণ সত্যাগ্রহ, পতাকা সত্যাগ্র্হেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন লাবন্যপ্রভা।
১৯২৫ সালে নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্ত প্রকাশ করেন ‘মুক্তি’ নামক এক পত্রিকা। নিবারণচন্দ্রের পরে সে পত্রিকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন অতুলচন্দ্র। তাঁর মৃত্যুর পরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন লাবণ্যপ্রভা। অন্য অনেকের মতো এই পত্রিকায় প্রকাশিত হত তাঁরও লেখা। তারপরে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন ভাষা আন্দোলনে।
ভাবিনী মাহাতো (১৯১৫-২০১৪) মানভূমের এক কৃষক পরিবারের সন্তান। লাবণ্যপ্রভাদের শিল্পাশ্রমে যেতেন তিনি। দেশপ্রেমের প্রেরণা লাভ করেন সেখান থেকেই। চার আনা দিয়ে সদস্য হন কংগ্রেসের। তারপর হয়ে ওঠেন লাবণ্যপ্রভার ছায়াসঙ্গী। বহুবার কারাবরণ করেন। ভাষা সত্যাগ্রহ বা টুসু সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৫৪ সালে বিহার সরকার আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা আইনের অজুহাতে ভাষা সত্যাগ্রহীদের বিরুদ্ধে মামলা করলে ২২ জানুয়ারি ভজহরি মাহাতো ও লাবণ্যপ্রভা ঘোষ এবং ২৫ জানুয়ারি সমরেন্দ্রনাথ ওঝা, কুশধ্বজ মাহাতো, কালীরাম মাহাতো ও ভাবিনী মাহাতো স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন।