কালীঘাট পটচিত্র উনিশ শতকের বাংলার একটি চিত্রকলা। কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে কালীমন্দিরের কাছে এই চিত্রশিল্প বিকাশলাভ করেছিল। সেকালে এই সব পটচিত্র মন্দিরের তীর্থযাত্রীরা স্মারক হিসেবে কিনে নিয়ে যেত। কালে কালে এই চিত্রকলা ভারতীয় চিত্রকলার একটি স্বতন্ত্র ঘরানায় পরিণত হয়। হিন্দু দেবদেবী ও অন্যান্য পৌরাণিক চরিত্র ও সমসাময়িক নানা ঘটনার ছবি ছিল এই চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য।
পশ্চিমবঙ্গের পটচিত্রের মধ্যে কালীঘাটের পট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কালীঘাটের পট মূলত চৌকাপট। যা তুলনামূলক ছোট মাপের কাগজের উপর আঁকা। ঔপনিবেশিক সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়কে ব্যঙ্গ করে উপস্থাপন করার বিশেষ দিক কালীঘাটের পটে দেখতে পাওয়া যায়।এই পটচিত্র দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯১৭ সালের ৮ই আগস্ট, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম। খ্যাতিমান সাহিত্যিক রুডইয়ার্ড কিপলিং এলেন তাঁর পিতা জন লকউড কিপলিং-এর লাহোরের আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ থাকাকালীন সংগৃহীত ২৮টি জল রঙে আঁকা ছবি মিউজিয়ামকে উপহার দেবার জন্য। একই শৈলীর ছবি এই মিউজিয়ামের সংগ্রহে আগে ছিল না এমনটি নয়, কিন্তু রুডইয়ার্ড কিপলিং উপহার দেওয়ার পর থেকে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে নজর দিলেন তাঁদের সংগৃহীত এই বিশিষ্ট শৈলীতে আঁকা ৬৪৫টি জল রঙে আঁকা ছবি, রেখাচিত্র ও হাতে রং করা লিথোগ্রাফের দিকে। অচিরেই বিশ্বের শিল্পবেত্তাদের কাছে বাংলার এই চিত্রশৈলী পরিচিত হলো ‘কালীঘাট পট’ নামে।
বর্তমান দক্ষিণ কলকাতার এক জনবহুল এলাকা কালীঘাট অন্ত-মধ্যযুগ বা সম্ভবত তারও পূর্ববর্তী কাল থেকে অন্যতম শক্তিপীঠ হিসাবে পরিচিত। অষ্টাদশ শতকের শুরু থেকেই ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের কারণে কলকাতার দ্রুত নগরায়নের প্রক্রিয়া চালু হয়ে যায়। ১৮০৯ সালে তখনকার কলকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল কালীঘাটে আদিগঙ্গা বা টালির নালার ধারে অবস্থিত পুরোনো কালী মন্দিরকে বর্তমান রূপে পুনর্নির্মাণ করান সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার। উনিশ শতকের প্রথম দিক থেকে কলকাতার নগরায়ন ও সুগমতা বৃদ্ধির কারণে কালীঘাটের এই কালীমন্দিরে তীর্থযাত্রীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। কলকাতার উপকণ্ঠবর্তী কালীঘাটের তীর্থক্ষেত্র হিসাবে পরিচিতি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে আশেপাশের এলাকায় কর্মচঞ্চলতাও বৃদ্ধি পায়। কালীঘাটের মন্দিরের আশেপাশের দোকানে পটচিত্র বিকিকিনি ঠিক কবে শুরু হয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব না হলেও ১৮২৫-১৮২৬ সাল থেকে এখানকার পটচিত্রের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে, প্রায় শুরুর দিন থেকেই, কালীঘাটের পটচিত্র শিল্পীরা আঁকার জন্য বেছে নেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের জড়ানো পটের পরিবর্তে কাগজের চৌকো পট। জড়ানো পটের বিস্তারিত পৌরাণিক বা সামাজিক কাহিনি বর্ণনার পরিবর্তে শুরু হয় একটি বিশেষ আখ্যানবস্তুর চিত্রায়ন। কোনও কোনও আধুনিক শিল্পবেত্তা, যেমন আর্চার, এই পরিবর্তনের কারণ হিসাবে ইউরোপীয় চিত্ররীতির প্রভাবের কথা ভেবেছেন, আবার অনেকে এই প্রভাব মানতে চাননি। কালীঘাটে আগত তীর্থযাত্রীদের মধ্যে এই সুলভ পটচিত্রগুলির চাহিদার ক্রমিক বৃদ্ধি দক্ষিণ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিল্পীদের কালীঘাটে আসার জন্য আকর্ষিত করে। কালীঘাটে আসা শিল্পীদের মধ্যে অনেকেই বাংলার গ্রামের চিরাচরিত পটুয়া বা চিত্রকর সমাজের পরিবর্তে কুম্ভকার, সদগোপ বা সূত্রধর সমাজ থেকে এসেছিলেন। তাঁদের অনেকের মাটির প্রতিমা বা কাঠের খেলনা নির্মাণের, রথের গায়ে চিত্র অঙ্কনের অথবা পোড়ামাটির সরা চিত্রণের পূর্ব অভিজ্ঞতা এই নতুন চিত্ররীতির উপর প্রভাব বিস্তার করে।
কালীঘাট পটচিত্রের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ফলে শুধু কালীঘাট নয়, সেই সময়কার কলকাতা শহরের সীমার মধ্যেও বিভিন্ন স্থানেও পটুয়ারা এসে একত্রে বসবাস করতে শুরু করেন। বর্তমান মধ্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিট এলাকায় পটুয়াটোলা আর নারকেলডাঙার কাছে পোটোপাড়া লেন তারই সাক্ষ্য বহন করছে। তবে, কলকাতার বিভিন্ন এলাকার পটুয়ারা ঠিক কী চিত্রশৈলীর অনুসরণ করতেন বলা কঠিন, কারণ কুমোরটুলির তৎকালীন চালচিত্র শৈলীর সঙ্গে কালীঘাট পটের শৈলীর মিল খুব কম।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, লাঙ্গলবাঁধ মাগুরা।