১৭৭৫-এর ২১শে মার্চ, গভর্নর-জেনারেল প্রস্তাব করলেন, রাজস্ব নির্ধারণ আর আদায়ের সর্বোত্তম পদ্ধতি কি হতে পারে, সে সম্পর্কে কাউন্সিল সদস্যরা পৃথক পৃথক মতামত নথিবদ্ধ করুন এবং সেই মতামতগুলো লিখিত আকারে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর কাছে পাঠানো হোক। এই প্রস্তাব যে বিরোধী পক্ষকে বেশ বিভ্রান্তিতে ফেলেছিল, সেটা স্পষ্ট; কারণ হেস্টিংস আর বারওয়েল যখন একটা নির্দিষ্ট যৌথ পরিকল্পনা নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখন ক্ল্যাভারিং, মনসন ও ফ্রান্সিসকে একটি ‘মিনিট’ বা কার্যবিবরণীতে স্বীকার করে নিতে হয়েছিল -এই মুহূর্তে যদি আমাদের ওপর নতুন করে ভূমি-বন্দোবস্তের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় এবং সেটা কার্যকর করার ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়, তবে আমরা অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হবো। হেস্টিংস-বারওয়েল পরিকল্পনা — যেটা আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭৭৫-এর ২২শে এপ্রিল তারিখযুক্ত ছিল — সেটি বিরোধী জোটের সেই তিন সদস্যের (ত্রয়ী) কাছে আগেই জানা ছিল; আর তাই ১১ই এপ্রিল তারা তাদের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন –
“এই দেশে আমাদের আগমনের পর থেকে এবং আমাদের সহকর্মীদের সাথে যাবতীয় বিতর্কের সময়কালে, এমন কোনো ঘটনার সম্মুখীন আমরা হইনি যা আমাদের মনে গভর্নর-জেনারেল ও মিস্টার বারওয়েলের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার শর্ত আর মূল বিষয়বস্তুর মতো এত গভীর বিস্ময় জাগিয়েছে — যে পরিকল্পনা বর্তমান ইজারার মেয়াদ শেষে প্রদেশগুলোর নতুন বন্দোবস্তের উদ্দেশ্যে প্রণীত। যে ভদ্রমহোদয়গণ এই দেশের শাসনব্যবস্থা আর স্থানীয় অধিবাসীদের অধিকারকে পরাধীন করার কাজে সহায়তা করেছেন, তারাই এখন সেই শাসনব্যবস্থায় ফিরে যেতে চাইছেন যা তারা অতি সম্প্রতিই নস্যাৎ করেছিলেন; এবং তারা নিজেদের এতটাই বিস্মৃত হয়েছেন যে, তারা এখন ঠিক সেই ব্যবস্থাকেই লুপ্ত করার সুপারিশ করছেন — যে ব্যবস্থাকে তারা প্রতিদিন সমর্থন করে আসছেন,তাকে গভর্নর-জেনারেল তাঁর সাম্প্রতিক একটি কার্যবিবরণীতে তাঁর মতে ‘গ্রহণযোগ্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন, এবং যে ব্যবস্থার প্রতি আমাদের অননুমোদন বা বিরোধিতাই সর্বদা তাঁদের সমালোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের এই আচরণের ব্যাখ্যা কেবল তাঁরা নিজেরাই দিতে পারেন। অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই আচরণ হয়তো অসংলগ্ন বা স্ববিরোধী মনে হতে পারত; কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ ও অবিচল — ঠিক সেই অস্থিরতারই প্রতিচ্ছবি, যা তাঁদের শাসনব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য।”
ফ্রান্সিস তাঁর বইয়ের কোথাওই এই সত্যটি স্বীকার করেননি যে, ‘কমিটি অফ সার্কিট’ (Committee of Circuit) বহু ক্ষেত্রেই জমিদার ও তালুকদারদের সাথে সরাসরি বন্দোবস্ত সম্পাদন করেছিল। অবশ্য, তাঁর নিজের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এই সত্য উপেক্ষা করা এবং জমিদারদের অধিকারবঞ্চিত হিসেবে চিত্রিত করা — এটাই তো তাঁর কাজেরই অংশ। তিনি লিখছেন, জমিজমাগুলো — মোটামুটিভাবে বলতে গেলে, সর্বসাধারণের জন্য খোলা নিলামে তোলা হয়েছিল; যেখানে বহিরাগতদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল যেন তারা প্রকৃত মালিকদের বিরুদ্ধেই দর হাঁকেন। এর ফলে মালিকরা হয় তাঁদের ভূসম্পত্তির দখল ও ব্যবস্থাপনার অধিকার থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলেন, নতুবা কেবল ‘চাষি’ বা প্রজার মর্যাদায় তা নিজেদের দখলে রাখার অনুমতি পেয়েছিলেন…। এই চাষিদের অনেকেই ছিলেন কলকাতার ‘বানিয়া’ — যাদের এই কাজ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না; এমতাবস্থায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁরা বাধ্য হয়েছিলেন সেই প্রকৃত মালিকদেরই নিজেদের অধীনস্থ চাষি কিংবা প্রজা হিসেবে নিয়োগ দিতে।”
হেস্টিংস এবং বারওয়েলের উপস্থাপন করা পরিকল্পনা ঐতিহাসিক রূপরেখা দিয়ে শুরু হয়, যেখানে ‘কমিটি অফ সার্কিট’-এর নীতি প্রণয়নে যেসব বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল, তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ‘ফার্মিং সিস্টেম’ বা ইজারা ব্যবস্থায় বর্ধমান প্রদেশের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল এবং কোম্পানির কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার পর থেকে এর প্রকৃত মূল্যও নিরূপিত হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল যে, বাংলার অবশিষ্ট অংশেও অনুরূপ সুফল পরিলক্ষিত হবে… বিভিন্ন জেলার মূল্য নিরূপণের কাজ যথেষ্ট সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছে বটে; কিন্তু আমরা এ কথা বলতে পারব না যে, কাঙ্ক্ষিত উন্নতিটুকুও সাধিত হয়েছে। মূলত এমন একটি আকস্মিক ঘটনার কারণে এই উন্নতি ব্যাহত হয়েছে, যা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল না; আমরা সেই পরিস্থিতির কথাই বলছি, যেখানে ইজারাদাররা জেলার প্রকৃত সামর্থ্যের চেয়েও অনেক বেশি রাজস্ব জমা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল।”
এই ব্যাখ্যা দ্বিমুখীভাবে দুর্ভাগ্যজনক। “বিভিন্ন জেলার মূল্য নিরূপণের কাজটি যথেষ্ট সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছে” — এই দাবি ফ্রান্সিসকে ঠিক সেই সুযোগটিই করে দিয়েছিল, যার সদ্ব্যবহার করতে তিনি অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। ঠিক এর পরের নভেম্বর মাসেই যখন গভর্নর একটা কমিশন তৈরির প্রস্তাব করলেন — “যাতে প্রদেশের নতুন রাজস্ব বন্দোবস্ত বা ‘সেটেলমেন্ট’ গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে জমির সঠিক ও নির্ভুল বিবরণ বা তথ্য সংগ্রহ করা যায়” — তখনই ফ্রান্সিস সুযোগটি কাজে লাগালেন। (১ ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ বা পরিচালক পর্ষদ তাঁদের ১৭৭৭-এর ৪ঠা জুলাই তারিখের চিঠিতে এই অসংগতির বিষয় তুলে ধরেন: “একটা ‘কমিটি অফ সার্কিট’ গঠন করা হয়েছিল — যাদের সম্পর্কে আমাদের জানানো হয়েছিল যে, তারা প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য অত্যন্ত নির্ভুল ও সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপণ করেছে; অথচ এখন, ১৭৭৭-এ এসে, মাত্র দুই কনিষ্ঠ কর্মকর্তা — কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তির সহায়তায় — এমন সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করার কাজে নিয়োজিত হয়েছেন, যা ইতিপূর্বেই আমাদের বিভিন্ন স্তরের অসংখ্য কর্মকর্তা সংগ্রহ, পরীক্ষা আর সংশোধন করেছে।”) সরকারের এই আচরণ দেখে সেই সব নির্বোধ নারীদের কথাই মনে পড়ে যায়, যাদের সম্পর্কে ধর্মপ্রচারক সেন্ট পল বর্ণনা করেছেন যে — তারা সর্বদা সত্যের সন্ধানে রত থাকে, কিন্তু কখনোই সত্যের জ্ঞান লাভে সমর্থ হয় না। অধিকন্তু, এ কথা দাবি করা যে — ইজারাদারদের নিছক অনুমান-নির্ভর ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়ার প্রবণতা এবং মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হলে কিংবা নিজেদের দায়বদ্ধতা পূরণে অপারগ হলে পালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থেকে উদ্ভূত ‘ফার্মিং সিস্টেম’-এর ব্যর্থতাগুলো আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল না — তা ছিল অতীতের অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার শামিল। (এ বিষয়ে ভেরেলস্ট-এর বিবৃতির জন্য দেখুন: উপরে, পৃষ্ঠা cxlii এবং পরবর্তী অংশসমূহ।) ‘ফার্মিং সিস্টেম’ বা ইজারা ব্যবস্থা যে এ ধরনের অপব্যবহারের সুযোগ করে দেয় — সে বিষয়টি নথিপত্রে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ ছিল; এবং এ কথাও জোরালোভাবে বলা যেতে পারে যে — যারা এমন একটা অত্যন্ত সম্ভাব্য ও স্বাভাবিক পরিস্থিতির কথা আগে থেকে অনুমান করতে অক্ষম ছিলেন, রাজস্ব বন্দোবস্ত প্রণয়নের মতো গুরুদায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁরা আদৌ যোগ্য বা উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন না। হেস্টিংস কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাবসমূহ এখন ক্রমানুসারে বিবেচনা করা যেতে পারে —
প্রস্তাব ১: কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর থেকে রায়তদের ওপর আরোপিত সমস্ত কর সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হোক। ‘কমিটি অফ সার্কিট’ যদিও কিছু কিছু কর বা শুল্ক বিলুপ্ত করেছিল, কিন্তু রাজস্ব হ্রাসের আশঙ্কাই তাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ওপর একটি সীমা টেনে দিয়েছিল। দেওয়ানি লাভের পর থেকে আরোপিত করের মোট পরিমাণ সম্ভবত পনেরো লক্ষ টাকার কম হবে না; এবং সম্ভবত বর্ধমান ও ২৪-পরগনা ব্যতীত, বাংলার অন্য কোনো অংশই এই করের আওতা থেকে মুক্ত ছিল না।
প্রস্তাব ২.- ২৪ পরগনা জমিদারি হিসেবে প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করা হোক, যার প্রতিটি লটের বার্ষিক মূল্য ২০,০০০ বা ৩০,০০০ রুপির অনধিক হবে। ইউরোপীয়দের নিলামে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে, “এই শর্তে যে, তাদেরকে রাজস্ব আদালতের আওতাধীন করা যাবে এবং খাজনা পরিশোধ ও রায়তদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের মতো একই নিয়মের অধীন করা যাবে।” (১) “স্থানীয়দের চেয়ে অধিক উদ্যোগী হওয়ায়, তাদের নতুন পণ্য প্রবর্তন করার এবং এমনকি বিদেশী দেশ থেকে অধিবাসী আমদানি করার সম্ভাবনা বেশি থাকবে, এবং তারা কালক্রমে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।” বাংলায় ইংরেজ বসতি স্থাপনকারীদের বিষয়ে ফ্রান্সিসের একটি সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তিনি লেখেন, “বাংলায় ইউরোপীয়দের সংখ্যা সরকারি পরিষেবার আওতায় যতটা সম্ভব কম রাখা উচিত।” “সরকারি রাজস্ব ছাড়া এমন কোনো তহবিল নেই যেখান থেকে তারা জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। কোনো না কোনোভাবে এর খরচ দেশ বহন করে, এবং কোনো না কোনোভাবে তা সরকারের উপর দায়বদ্ধ হয়ে পড়ে। সরকারি চাকরি বা ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে চুক্তি ব্যতীত, বাংলায় ইউরোপীয়দের পরিশ্রমের জন্য কোনো কাজ নেই। তারা যে উদ্যোগেই নিযুক্ত হোক না কেন, তা বৈদেশিক বাণিজ্য হোক বা অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, তা তাদের দুর্দশার দিকে ঠেলে দেয়, যদি না তা তাদের সর্বনাশ ডেকে আনে। এমনকি দুঃসাহসীরাও, দখলের প্রতিটি পথ অনুসরণ করে, খুব কম সংখ্যকই সফল হয়েছে, যদি আদৌ কেউ হয়ে থাকে।” ফ্রান্সিস আরও যুক্তি দেন যে এই ধরনের দুঃসাহসীদের অবশ্যই কালক্রমে তারা ‘উপনিবেশকারী’ হয়ে উঠবে, গ্রেট ব্রিটেন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুপাতে দেশটির প্রতি তাদের আনুগত্য হ্রাস পাবে, এবং এর ফলে বাংলা ‘ইংল্যান্ডকে করও দেবে না, আনুগত্যও করবে না।’ হেস্টিংস-বারওয়েল পরিকল্পনায় ‘ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য’ অভিব্যক্তিটির ব্যবহারকে ফ্রান্সিসের এই উক্তির সাথে তুলনা করা যেতে পারে: ‘একটি ইউরোপীয় সরকারের অধীনে বাংলা উন্নতি করতে পারে না।’
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ